সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ১৭

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৭ এএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী: সঞ্জয় দে রিপন


দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

সাত.

মমিনার মাথায় সত্যি আকাশ ভেঙে পড়ল। সে মোটেও আশা করেনি এমন একটা খবর শুনবে। দুপুরে তার ছোট ভাই হানিফের মোবাইলে তার বড়ভাই শওকত আলী ফোন দিয়েছিল। সে নাকি চট্রগ্রামের কাজীরদেউরিতে আলিমুজ্জামানকে রিকশায় বউ নিয়ে ঘুরতে দেখেছে।

শওকত আলীর সঙ্গে পরে মমিনারও কথা হয়। ব্যাপারটা এমন ছিল, শওকত আলী কাজীরদেউরির এক দোকানে গিয়েছিল তার কোম্পানির কী একটা পার্টস ডেলিভারি দিতে। দোকান থেকে বের হয়ে দেখে, তার সামনে দিয়ে রিকশায় করে আলিমুজ্জামান এক যুবতীকে নিয়ে যাচ্ছে। মাথায় ঘোমটা। ওরা যাচ্ছিল হেসে-হেসে কথা বলতে বলতে। ওরা একে-অপরের হাত ধরে রেখেছিল।

মমিনা একবার ভেবেছিল, তার বড়ভাই হয়তো ভুল দেখেছে। মানুষের চোখ তো ভুল করতে পারে। মানুষের এমন ভুল তো অহরহই হয়। যে নিজেও একবার মীরবহরির হাটে গিয়ে একজনকে দেখে আলিমুজ্জামান ভেবে ভুল করেছে। আরেকবার উপজেলা সদরে গিয়ে একজনকে তার স্বামী ভেবে অনুসরণ করতে করতে খানিকটা দূরে গিয়ে কয়েকবার ডেকে যখন সাড়া পাচ্ছিল না, তখন পেছন থেকে খাবলে ধরে থামাতে গিয়ে কী এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। সে দেখে, ওটা তার স্বামী নয়, অন্য একজন। সে বিব্রত হলেও সেই মানুষটা বেশ আনন্দ পায়।

কিন্তু মমিনা বিশ্বাস করতে না চাইলেও কী হবে, তার বড়ভাই শওকত আলী যেভাবে জোর দিয়ে বলেছে! সে এখন পুরোপুরি বুঝতে পারছে, তার সত্যি কপাল পুড়েছে।

স্বামীর সঙ্গে মমিনার যোগাযোগ নেই ছয় মাসের ওপরে হয়ে গেছে। সে তার ছোট ভাই হানিফের ফোন থেকে স্বামীর মোবাইল নম্বরে কতবার যে ফোন দিয়েছে! বারবার মেসেজে গেছে, ধরেনি। স্বামী আজ পর্যন্ত নিজে থেকে কখনও ফোন দেয়নি। স্বামী তাকে বিয়ের পরপর একটা চ্যাপ্টা মোবাইল কিনে দিয়েছিল। স্মার্ট ফোন না কী ফোন জানি...! সেটা স্বামী একদিন ফেরত চায়। সে সরল মনেই স্বামীকে দিয়ে দেয়। পরে শোনে, স্বামী সেটা বিক্রি করে দিয়েছে।

মমিনা গাল ফুলিয়ে স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনে নাকি আমার হেই মোবাইলটা বেইচে দিচ্ছেন, হাছাইনি?’

আলিমুজ্জামান আহ্লাদ করে বলে, ‘ওরে আমার গুনাইবিবি, এর জন্যি কি মন খারাপ?’

মমিনা বলে, ‘মন খারাপ তো হইবোই। আপনে আমারে হাউস কইরা কিন্যা দিছিলেন।’

আলিমুজ্জামান সায় দিয়ে বলে, ‘হ, হ, বড় হাউস কইরা কিন্যা দিছিলাম। অখন কী করমু কও? আমার দেনা গুলান শেষ হোক, আমি তোমারে দশটা মোবাইল কিন্যা দিমু। আমি কসম খাইয়া কইতাছি।’

স্বামীর কথায় মমিনা তৃপ্ত হয় না। সে তবুও গাল ফুলিয়ে থাকে।

আলিমুজ্জামান মমিনার গলা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘বউ আমার, দেনার চাপ সহ্যি করতে পারতাছি না। তাই মোবাইলটা বেইচে একজনের দেনা শোধ করছি। তুমি না আমার আনারকলি? গোস্বা করে না...!

মমিনা এতে মেনে নেয়।

আলিমুজ্জামান পরে আর কোনো মোবাইল কিনে দেয়নি। আর সে কিনে দিবে কী, তার তো দেনাই শেষ হয়নি। পরে মাস ছয়েক আগে সে তার শ্বশুরের গরু দুটো চুরি করেই পালায়।

মমিনার নিজের একটা বোতামটেপা নষ্ট মোবাইল ফোন ছিল। সেটা সে মীরবহরি বাজারে গিয়ে ঠিক করে আনে। হাত একেবারে খালি ছিল। টাকা সে কোথায় পাবে? সে বাধ্য হয়ে কমলা খাতুনের কাছ থেকে তিনশো টাকা চেয়ে নেয়। সেই টাকা নিয়ে সে মীরবহরি বাজারে হিরণ মোবাইল মেকানিকসের কাছে যায়। একশো টাকা দিয়ে সে মোবাইলটা ঠিক করে, আর দুইশো টাকার রিচার্জ করে নিয়ে আসে। পরে সেই বোতামটেপা মোবাইল দিয়ে কতবার যে স্বামীকে ফোন করেছে, এর ইয়ত্তা নেই। প্রতিবার সে আশা করেছে, এই বুঝি তার স্বামী ফোনটা ধরবে। কিন্তু কোনোদিন ধরেনি। আগে তবুও মেসেজে যেত। সে কখনও আবেগের গলায়, কখনও কেঁদেকেটে মেসেজ রাখত। এখন আর সে মেসেজও দিতে পারে না। স্বামীর মোবাইলে ফোন করলেই শুধু পো পো শব্দ আসে।

মমিনা শুধু মোবাইলে ফোন করেই ক্ষান্ত হয়নি, দু-দু’বার হোসেনপুর স্বামীর ভিটায় গিয়েছিল। একবার তার ছোটভাই হানিফকে নিয়ে, আরেকবার নিজে একাই। হানিফকে নিয়ে সে শুধু স্বামীর ভিটায় গিয়েছিল। আর সে নিজে যখন একা যায়, তখন স্বামীর ভিটা হয়ে কাছাকছি স্বামীর বড়বোন আছিয়া খাতুনের বাড়িতেও গিয়েছিল। দু’বারই সে স্বামীর কোনো খবর নিয়ে আসেনি। স্বামীর ভিটাতে ছিল হাহাকার করা খাঁ খাঁ। ঘর তালা দেওয়া ছিল। বাড়ির চারিপাশে আগাছা জন্মেছিল। এমনকি ঘরের চারিপাশেও। বরই গাছটায় বরই ধরেছিল অনেক। পড়শিরা এসে নাকি পেরে নিয়ে যেত। সে আশেপাশের পড়শিদের কাছে খবর নিয়ে জেনেছে, স্বামী নাকি সর্বশেষ তাকে নিয়ে বাড়ি এসেছিল, এরপর আর কোনোদিন বাড়ি আসেনি।

মমিনা স্বামীর বড়বোন আছিয়া খাতুনের বাড়ি গিয়ে জেনেছে, সেখানেও নাকি স্বামী অনেকদিন যায়নি। সেটা গরু চুরি করার বেশ আগে থেকেই। স্বামী তার বড়বোনের কাছ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা ব্যবসার কথা বলে নেয়। পরে ফেরত দিবে থাক দূরের কথা যোগাযোগই নাকি বন্ধ করে দেয়। স্বামী তার মেজবোনের কাছ থেকেও এমনই ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা ধার নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল।

মমিনা অবশ্য স্বামীর মেজবোনের বাড়িতে কখনও যায়নি। মেজবোনের কাছ থেকে স্বামীর টাকা ধার করার গল্পটা সে স্বামীর বড়বোনের কাছ থেকেই শুনেছে। স্বামীর বড়বোন আছিয়া খাতুন অবশ্য বেশ নরম প্রকৃতির। ছোট ভাইয়ের বউ হিসেবে তাকে বেশ স্নেহ করে। বাড়িতে গেলে আদর আপ্যায়ন করে বেশ। অবশ্য সে স্বামীর সঙ্গে একবারই আছিয়া খাতুনের বাড়িতে গিয়েছিল। পরে একা একদিন। একা যাওয়ার পরও তাকে আদর-আপ্যায়ন কম করেনি। বরং একমাত্র ছোট ভাইকেই অভিসম্পাত করেছে বেশি।

স্বামী গরু চুরি করেছে শীতের এক রাতে। সুদিন ছিল তখন। বুইদ্দার বিল ছিল শুকনো। এখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে আষাঢ়ের শুরুতে বুইদ্দার খাল জলে ভরাট হয়ে উঠেছে। গোমতী নদী থেকে আসা জল সেটা। বুইদ্দার বিলে উত্তরের জোয়ারের জল এখনও আসতে শুরু করেনি। তবে বৃষ্টিও হচ্ছে বেশ। গত তিন দিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। উঠোনের মাটি ভিজে থকথকে কাদা হয়ে পা ডেবে যায় গোড়ালি অব্দি। মমিনা পাকের ঘরের ভেতর একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে বৃষ্টি দেখছে। তার হাতে তখনও বোতামটেপা মোবাইলটা। স্বামীকে তার আবারও একটা ফোন দিতে ইচ্ছে হলো। সে জানে, ফোন দিয়ে কোনো লাভ নেই। সেই একই পোঁ পোঁ শব্দ আসবে। তারপরও সে স্বামীর নম্বরে আবার ফোন দিল। ওপাশ থেকে সেই একই শব্দ এলো— পোঁ পোঁ, পোঁ পোঁ।

মমিনা তার হাতের মোবাইলটা ঢিল মেরে পাকঘরের মেঝেয় ফেলে দিল। ভাগ্যিস চারচোখা চুলার কাছে খড় জমা করা ছিল। খড়ের ওপর পড়াতে তার মোবাইলটা ভাঙল না। জেদের বসে ঢিল মারলেও মোবাইলটা ভাঙেনি দেখে সে মনে মনে খানিকটা স্বস্তি পেল। কিন্তু স্বস্তি পেলেও সে নিজে নিজে কেঁদে ফেলল। বেশি শব্দ করে সে কাঁদতে পারছে না। পাছে তার মা যদি শুনতে পায়? তার মা ছেনোয়ারা বেগম আজকাল তার সঙ্গে খুবই খারাপ ব্যবহার করে। কাজের বেটির মতো খাটায়। রান্নাবাড়া তো আছেই, তার অপর ঘরদুয়ার লেপপোছ করা, উঠোন ঝাড় দেওয়া, ডেকডেকচি মাজা, পুকুর থেকে কলস ভরে জল আনা, এমনকি সন্ধ্যার বাতিটাও তাকে জ্বালাতে হয়। তার মা কিচ্ছু কাজ করে না।

মমিনার মাঝেমধ্যে মনে হয়, ছেনোয়ারা বেগম তার মা না, পালিত মা। কিন্তু তার এসব মনে হওয়া বা না হওয়া দিয়ে কিছু যায়-আসে না। ছেনোয়ারা বেগম তার আসল মা-ই। তার জন্মের অনেক গল্পই সে তার বড়চাচি কমলা খাতুনের কাছে শুনেছে। সে জন্মের পর কোনো কান্না করেনি বলে দাই মৃত ভেবে একটা গামলায় করে বাইরে নিয়ে গিয়েছিল, আর তখনই সে কান্না করে ওঠে। এ গল্প তাদের আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার অনেকেই জানে।

মমিনা বেশি শব্দ করে কাঁদতে না চাইলেও তার বুক ঠেলে যেন জোরে কান্নাই বের হতে চাচ্ছে। সে একসময় জোরেই কান্না শুরু করল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তার কান্না বসতঘর পর্যন্ত গেল। সে বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কাঁদল। একটা সময় সে দেখল, তার বাবা কেরামত আলী বৃষ্টির মধ্যেই বসতঘর থেকে বের হয়ে পাকঘরের দিকে আসছে। পেছনে তার মা ছেনোয়ারা বেগম।

মমিনা তাদেরকে দেখে কান্না থামাতে গেল। কিন্তু সে পারল না।

কেরামত আলী পাকঘরে ঢুকে সরাসরি তার পাশে এসে দাঁড়াল। ছেনোয়ারা বেগম দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে বৃষ্টিটা একই ধারায় পড়ছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নয়, আবার তুমুল ধারায় নয়। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই একটা মুরগি ছা-সহ পাকঘরে ভেতর যে খোয়ারটা, সেটায় ঢোকার চেষ্টা করছে। মমিনার জন্য পারছে না। ছয়টি হাঁস উঠোনের জমাজলে কেঁচো বা এজাতীয় খাবার খুঁজছে আর সম্মিলিতভাবে ডাকছে— প্যাঁক-প্যাঁক, প্যাঁক-প্যাঁক। গরুটা ডাকছে গোয়ালঘর থেকে— হাম্বা-অ-অ, হাম্বা-অ-অ। আলিমুজ্জামান গরু দুটো চুরি করে নিয়ে যাওয়ার দুই মাস পর কেরামত আলী একটি বলদ কিনেছে। কেনার সময় বেশ শুকনো ছিল, এখন বেশ তরতাজা হয়ে উঠেছে। নিশ্চয়ই বলদটা খড়কুটো বা ভুসি চাচ্ছে। বলদটার খড়কুটো বা ভুসি মমিনাই দেয়।

কেরামত আলী মমিনার পাশে হাঁটু মুড়িয়ে বসল। মাথায় হাত রেখে বলল, ‘মা গো, এমনে কান্দে না। আমি তোর লগে খারাপ ব্যবহার করি এইটা সইত্য। কিন্তুক আমার ভিতরটা ক্যামুন কান্দে, হেইডা বুঝাইতে পারমু না।’

মমিনার এবার কান্না থেমে গেল। সে ফ্যাল ফ্যাল করে তার বাপের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বাপ সত্যি গত ছয় মাস ধরে তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলেনি। কথায় কথায় কটাক্ষ করেছে। আলিমুজ্জামানকে নিয়ে অহরহ খোঁটা দিয়েছে। তার মা ছেনোয়ারা বেগম যে উঠতে-বসতে অপমান করে, অযথাই বাড়তি চাপ দিয়ে সংসারের সারা কাজ করায়, তার বাপ সেটা দেখেও না দেখার ভান করেছে। কিন্তু তারপরও তার মনে হয়েছে, তার বাপ হয়তো বেশ কিপ্টা, কিন্তু ছোট মেয়ে বলে ছোটবেলা থেকে তাকে আদরটা কম করেনি।

কেরামত আলী নিজ থেকেই বলল, ‘তরে হাউস কইরাই বিয়া দিছিলাম। বিয়ের আগে তো দেখছিলাম, পোলাডা ভালা। দোকানপাট আছে। সংসারে ঝুট-ঝামেলা নাই। ভাবছিলাম, মাইয়া আমার সুখি হইব। এর লাইগাই তো বিয়া দিছিলাম।

ছেনোয়ারা বেগম পাশ থেকে বলে, ‘পোলাডারে কোনোকালেই আমার ভালা লাগে নাই। পরথম থাইকাই আমার চোর মনে হইছে।’

কেরামত আলী ধমক দিয়ে বলল, ‘এই, চুপ কর। পোলা খারাপ আছিল না। বাদাইম্যা আছিল, এইটা সইত্য।’

ছেনোয়ারা বেগম জিজ্ঞেস করল, ‘তাইলে হেয় আমাগো দুইটা গরু চুরি কইরা লইয়া গেছে যে?’

‘আমার গরু চুরি কইরা লইয়া গেছে, অইটাও সইত্য। তয় হেয় চোর না। আমি জানি, হেয় দেনার দায়ে এইটা করছে।’

‘তারে এতই যেমুন ভালা জানো, তাইলে হেয় অখন চিটাগাঙে গিয়া আরেকটা বিয়া করছে ক্যান?’

‘ওইটা তো আমারও কথা। গরু দুইটা চুরি কইরা লইয়া গেছে, ভালা কথা। আমার গরু। অন্য কারও গরু না। হেয় আইলেই তো হইতো। আমি মাফ কইরা দিতাম। হেয় না আইয়া আরেকটা বিয়া করছে। আমার মাইয়ার কপালডা পুড়ছে।’

মমিনা আগের মতোই ফ্যাল ফ্যাল করে তার বাবা-মা’র কথা শুনছে। সে কিছুই বলতে পারছে। কী বলবে সে, সেটাও বুঝতে পারছে না। সে কখনই তার মনের দুঃখ বা বেদনার কথা তার বাবা-মাকে বলেনি। সেই ছোটবেলা থেকে আদর পেলেও না। তার বাবা তো বাইরে নানান কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকত। আদর-সোহাগ বলতে ছোটবেলায় ছিঁড়ে যাওয়া জালের একপাশ ধরা, আন্তায় গুঁড়া মাছ ধরা পড়লে সেগুলোকে কুটাকুটি করা, আর বাবার সেই ডাক, ‘যা তো মমিনা, আমার পাঞ্জাবিডা ঘর থাইকা লইয়া আয়, মীরবহরি বাজারে যাইমু...।’

মমিনা তার মা’র কাছ থেকে সেই আদরটুকুও পায়নি। ছোটবেলা থেকে সে দেখে আসছে, তার মা’র যত ধ্যান হানিফের প্রতি, তার প্রতি বিন্দুমাত্র ছিল না। তার মা হানিককে নিয়ে বলে, ‘এই পোলা হইল আমার পেটপোছা ধন, কইলজার টুকরা।’ পুত্র বলতেই ছেনোয়ারা বেগম বরাবরই অজ্ঞান। ছোটমেয়ের উপস্থিতি তার কাছে কখনই ছিল না। তবে মমিনা তার সব সুখদুঃখ, আবেগ-অনুভূতি সবই ভাগ করে নেয় একজনের কাছে। সে আর কেউ নয়, তার বড়চাচি কমলা খাতুন।

মমিনা কমলা খাতুনের কথা ভাবতে ভাবতে তার বাবা-মা’র ওপর থেকে দৃষ্টিটা সরিয়ে বাইরে তাকাল। সে দেখল, বৃষ্টির ধারা এরই মধ্যে কমে এসেছে। এখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সে ভাবল, বৃষ্টিটা একেবারে কমে গেলে সে একবার বড়চাচির ঘরে যাবে। বড়চাচির হাতটা ধরে সে মন খুলে কাঁদবে। তার স্বামী আলিমুজ্জামান তার বিশ্বাসটা এমনভাবে ভাঙল! ক্রমশ... 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image


দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

সাত.

মমিনার মাথায় সত্যি আকাশ ভেঙে পড়ল। সে মোটেও আশা করেনি এমন একটা খবর শুনবে। দুপুরে তার ছোট ভাই হানিফের মোবাইলে তার বড়ভাই শওকত আলী ফোন দিয়েছিল। সে নাকি চট্রগ্রামের কাজীরদেউরিতে আলিমুজ্জামানকে রিকশায় বউ নিয়ে ঘুরতে দেখেছে।

শওকত আলীর সঙ্গে পরে মমিনারও কথা হয়। ব্যাপারটা এমন ছিল, শওকত আলী কাজীরদেউরির এক দোকানে গিয়েছিল তার কোম্পানির কী একটা পার্টস ডেলিভারি দিতে। দোকান থেকে বের হয়ে দেখে, তার সামনে দিয়ে রিকশায় করে আলিমুজ্জামান এক যুবতীকে নিয়ে যাচ্ছে। মাথায় ঘোমটা। ওরা যাচ্ছিল হেসে-হেসে কথা বলতে বলতে। ওরা একে-অপরের হাত ধরে রেখেছিল।

মমিনা একবার ভেবেছিল, তার বড়ভাই হয়তো ভুল দেখেছে। মানুষের চোখ তো ভুল করতে পারে। মানুষের এমন ভুল তো অহরহই হয়। যে নিজেও একবার মীরবহরির হাটে গিয়ে একজনকে দেখে আলিমুজ্জামান ভেবে ভুল করেছে। আরেকবার উপজেলা সদরে গিয়ে একজনকে তার স্বামী ভেবে অনুসরণ করতে করতে খানিকটা দূরে গিয়ে কয়েকবার ডেকে যখন সাড়া পাচ্ছিল না, তখন পেছন থেকে খাবলে ধরে থামাতে গিয়ে কী এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। সে দেখে, ওটা তার স্বামী নয়, অন্য একজন। সে বিব্রত হলেও সেই মানুষটা বেশ আনন্দ পায়।

কিন্তু মমিনা বিশ্বাস করতে না চাইলেও কী হবে, তার বড়ভাই শওকত আলী যেভাবে জোর দিয়ে বলেছে! সে এখন পুরোপুরি বুঝতে পারছে, তার সত্যি কপাল পুড়েছে।

স্বামীর সঙ্গে মমিনার যোগাযোগ নেই ছয় মাসের ওপরে হয়ে গেছে। সে তার ছোট ভাই হানিফের ফোন থেকে স্বামীর মোবাইল নম্বরে কতবার যে ফোন দিয়েছে! বারবার মেসেজে গেছে, ধরেনি। স্বামী আজ পর্যন্ত নিজে থেকে কখনও ফোন দেয়নি। স্বামী তাকে বিয়ের পরপর একটা চ্যাপ্টা মোবাইল কিনে দিয়েছিল। স্মার্ট ফোন না কী ফোন জানি...! সেটা স্বামী একদিন ফেরত চায়। সে সরল মনেই স্বামীকে দিয়ে দেয়। পরে শোনে, স্বামী সেটা বিক্রি করে দিয়েছে।

মমিনা গাল ফুলিয়ে স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনে নাকি আমার হেই মোবাইলটা বেইচে দিচ্ছেন, হাছাইনি?’

আলিমুজ্জামান আহ্লাদ করে বলে, ‘ওরে আমার গুনাইবিবি, এর জন্যি কি মন খারাপ?’

মমিনা বলে, ‘মন খারাপ তো হইবোই। আপনে আমারে হাউস কইরা কিন্যা দিছিলেন।’

আলিমুজ্জামান সায় দিয়ে বলে, ‘হ, হ, বড় হাউস কইরা কিন্যা দিছিলাম। অখন কী করমু কও? আমার দেনা গুলান শেষ হোক, আমি তোমারে দশটা মোবাইল কিন্যা দিমু। আমি কসম খাইয়া কইতাছি।’

স্বামীর কথায় মমিনা তৃপ্ত হয় না। সে তবুও গাল ফুলিয়ে থাকে।

আলিমুজ্জামান মমিনার গলা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘বউ আমার, দেনার চাপ সহ্যি করতে পারতাছি না। তাই মোবাইলটা বেইচে একজনের দেনা শোধ করছি। তুমি না আমার আনারকলি? গোস্বা করে না...!

মমিনা এতে মেনে নেয়।

আলিমুজ্জামান পরে আর কোনো মোবাইল কিনে দেয়নি। আর সে কিনে দিবে কী, তার তো দেনাই শেষ হয়নি। পরে মাস ছয়েক আগে সে তার শ্বশুরের গরু দুটো চুরি করেই পালায়।

মমিনার নিজের একটা বোতামটেপা নষ্ট মোবাইল ফোন ছিল। সেটা সে মীরবহরি বাজারে গিয়ে ঠিক করে আনে। হাত একেবারে খালি ছিল। টাকা সে কোথায় পাবে? সে বাধ্য হয়ে কমলা খাতুনের কাছ থেকে তিনশো টাকা চেয়ে নেয়। সেই টাকা নিয়ে সে মীরবহরি বাজারে হিরণ মোবাইল মেকানিকসের কাছে যায়। একশো টাকা দিয়ে সে মোবাইলটা ঠিক করে, আর দুইশো টাকার রিচার্জ করে নিয়ে আসে। পরে সেই বোতামটেপা মোবাইল দিয়ে কতবার যে স্বামীকে ফোন করেছে, এর ইয়ত্তা নেই। প্রতিবার সে আশা করেছে, এই বুঝি তার স্বামী ফোনটা ধরবে। কিন্তু কোনোদিন ধরেনি। আগে তবুও মেসেজে যেত। সে কখনও আবেগের গলায়, কখনও কেঁদেকেটে মেসেজ রাখত। এখন আর সে মেসেজও দিতে পারে না। স্বামীর মোবাইলে ফোন করলেই শুধু পো পো শব্দ আসে।

মমিনা শুধু মোবাইলে ফোন করেই ক্ষান্ত হয়নি, দু-দু’বার হোসেনপুর স্বামীর ভিটায় গিয়েছিল। একবার তার ছোটভাই হানিফকে নিয়ে, আরেকবার নিজে একাই। হানিফকে নিয়ে সে শুধু স্বামীর ভিটায় গিয়েছিল। আর সে নিজে যখন একা যায়, তখন স্বামীর ভিটা হয়ে কাছাকছি স্বামীর বড়বোন আছিয়া খাতুনের বাড়িতেও গিয়েছিল। দু’বারই সে স্বামীর কোনো খবর নিয়ে আসেনি। স্বামীর ভিটাতে ছিল হাহাকার করা খাঁ খাঁ। ঘর তালা দেওয়া ছিল। বাড়ির চারিপাশে আগাছা জন্মেছিল। এমনকি ঘরের চারিপাশেও। বরই গাছটায় বরই ধরেছিল অনেক। পড়শিরা এসে নাকি পেরে নিয়ে যেত। সে আশেপাশের পড়শিদের কাছে খবর নিয়ে জেনেছে, স্বামী নাকি সর্বশেষ তাকে নিয়ে বাড়ি এসেছিল, এরপর আর কোনোদিন বাড়ি আসেনি।

মমিনা স্বামীর বড়বোন আছিয়া খাতুনের বাড়ি গিয়ে জেনেছে, সেখানেও নাকি স্বামী অনেকদিন যায়নি। সেটা গরু চুরি করার বেশ আগে থেকেই। স্বামী তার বড়বোনের কাছ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা ব্যবসার কথা বলে নেয়। পরে ফেরত দিবে থাক দূরের কথা যোগাযোগই নাকি বন্ধ করে দেয়। স্বামী তার মেজবোনের কাছ থেকেও এমনই ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা ধার নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল।

মমিনা অবশ্য স্বামীর মেজবোনের বাড়িতে কখনও যায়নি। মেজবোনের কাছ থেকে স্বামীর টাকা ধার করার গল্পটা সে স্বামীর বড়বোনের কাছ থেকেই শুনেছে। স্বামীর বড়বোন আছিয়া খাতুন অবশ্য বেশ নরম প্রকৃতির। ছোট ভাইয়ের বউ হিসেবে তাকে বেশ স্নেহ করে। বাড়িতে গেলে আদর আপ্যায়ন করে বেশ। অবশ্য সে স্বামীর সঙ্গে একবারই আছিয়া খাতুনের বাড়িতে গিয়েছিল। পরে একা একদিন। একা যাওয়ার পরও তাকে আদর-আপ্যায়ন কম করেনি। বরং একমাত্র ছোট ভাইকেই অভিসম্পাত করেছে বেশি।

স্বামী গরু চুরি করেছে শীতের এক রাতে। সুদিন ছিল তখন। বুইদ্দার বিল ছিল শুকনো। এখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে আষাঢ়ের শুরুতে বুইদ্দার খাল জলে ভরাট হয়ে উঠেছে। গোমতী নদী থেকে আসা জল সেটা। বুইদ্দার বিলে উত্তরের জোয়ারের জল এখনও আসতে শুরু করেনি। তবে বৃষ্টিও হচ্ছে বেশ। গত তিন দিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। উঠোনের মাটি ভিজে থকথকে কাদা হয়ে পা ডেবে যায় গোড়ালি অব্দি। মমিনা পাকের ঘরের ভেতর একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে বৃষ্টি দেখছে। তার হাতে তখনও বোতামটেপা মোবাইলটা। স্বামীকে তার আবারও একটা ফোন দিতে ইচ্ছে হলো। সে জানে, ফোন দিয়ে কোনো লাভ নেই। সেই একই পোঁ পোঁ শব্দ আসবে। তারপরও সে স্বামীর নম্বরে আবার ফোন দিল। ওপাশ থেকে সেই একই শব্দ এলো— পোঁ পোঁ, পোঁ পোঁ।

মমিনা তার হাতের মোবাইলটা ঢিল মেরে পাকঘরের মেঝেয় ফেলে দিল। ভাগ্যিস চারচোখা চুলার কাছে খড় জমা করা ছিল। খড়ের ওপর পড়াতে তার মোবাইলটা ভাঙল না। জেদের বসে ঢিল মারলেও মোবাইলটা ভাঙেনি দেখে সে মনে মনে খানিকটা স্বস্তি পেল। কিন্তু স্বস্তি পেলেও সে নিজে নিজে কেঁদে ফেলল। বেশি শব্দ করে সে কাঁদতে পারছে না। পাছে তার মা যদি শুনতে পায়? তার মা ছেনোয়ারা বেগম আজকাল তার সঙ্গে খুবই খারাপ ব্যবহার করে। কাজের বেটির মতো খাটায়। রান্নাবাড়া তো আছেই, তার অপর ঘরদুয়ার লেপপোছ করা, উঠোন ঝাড় দেওয়া, ডেকডেকচি মাজা, পুকুর থেকে কলস ভরে জল আনা, এমনকি সন্ধ্যার বাতিটাও তাকে জ্বালাতে হয়। তার মা কিচ্ছু কাজ করে না।

মমিনার মাঝেমধ্যে মনে হয়, ছেনোয়ারা বেগম তার মা না, পালিত মা। কিন্তু তার এসব মনে হওয়া বা না হওয়া দিয়ে কিছু যায়-আসে না। ছেনোয়ারা বেগম তার আসল মা-ই। তার জন্মের অনেক গল্পই সে তার বড়চাচি কমলা খাতুনের কাছে শুনেছে। সে জন্মের পর কোনো কান্না করেনি বলে দাই মৃত ভেবে একটা গামলায় করে বাইরে নিয়ে গিয়েছিল, আর তখনই সে কান্না করে ওঠে। এ গল্প তাদের আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার অনেকেই জানে।

মমিনা বেশি শব্দ করে কাঁদতে না চাইলেও তার বুক ঠেলে যেন জোরে কান্নাই বের হতে চাচ্ছে। সে একসময় জোরেই কান্না শুরু করল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তার কান্না বসতঘর পর্যন্ত গেল। সে বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কাঁদল। একটা সময় সে দেখল, তার বাবা কেরামত আলী বৃষ্টির মধ্যেই বসতঘর থেকে বের হয়ে পাকঘরের দিকে আসছে। পেছনে তার মা ছেনোয়ারা বেগম।

মমিনা তাদেরকে দেখে কান্না থামাতে গেল। কিন্তু সে পারল না।

কেরামত আলী পাকঘরে ঢুকে সরাসরি তার পাশে এসে দাঁড়াল। ছেনোয়ারা বেগম দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে বৃষ্টিটা একই ধারায় পড়ছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নয়, আবার তুমুল ধারায় নয়। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই একটা মুরগি ছা-সহ পাকঘরে ভেতর যে খোয়ারটা, সেটায় ঢোকার চেষ্টা করছে। মমিনার জন্য পারছে না। ছয়টি হাঁস উঠোনের জমাজলে কেঁচো বা এজাতীয় খাবার খুঁজছে আর সম্মিলিতভাবে ডাকছে— প্যাঁক-প্যাঁক, প্যাঁক-প্যাঁক। গরুটা ডাকছে গোয়ালঘর থেকে— হাম্বা-অ-অ, হাম্বা-অ-অ। আলিমুজ্জামান গরু দুটো চুরি করে নিয়ে যাওয়ার দুই মাস পর কেরামত আলী একটি বলদ কিনেছে। কেনার সময় বেশ শুকনো ছিল, এখন বেশ তরতাজা হয়ে উঠেছে। নিশ্চয়ই বলদটা খড়কুটো বা ভুসি চাচ্ছে। বলদটার খড়কুটো বা ভুসি মমিনাই দেয়।

কেরামত আলী মমিনার পাশে হাঁটু মুড়িয়ে বসল। মাথায় হাত রেখে বলল, ‘মা গো, এমনে কান্দে না। আমি তোর লগে খারাপ ব্যবহার করি এইটা সইত্য। কিন্তুক আমার ভিতরটা ক্যামুন কান্দে, হেইডা বুঝাইতে পারমু না।’

মমিনার এবার কান্না থেমে গেল। সে ফ্যাল ফ্যাল করে তার বাপের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বাপ সত্যি গত ছয় মাস ধরে তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলেনি। কথায় কথায় কটাক্ষ করেছে। আলিমুজ্জামানকে নিয়ে অহরহ খোঁটা দিয়েছে। তার মা ছেনোয়ারা বেগম যে উঠতে-বসতে অপমান করে, অযথাই বাড়তি চাপ দিয়ে সংসারের সারা কাজ করায়, তার বাপ সেটা দেখেও না দেখার ভান করেছে। কিন্তু তারপরও তার মনে হয়েছে, তার বাপ হয়তো বেশ কিপ্টা, কিন্তু ছোট মেয়ে বলে ছোটবেলা থেকে তাকে আদরটা কম করেনি।

কেরামত আলী নিজ থেকেই বলল, ‘তরে হাউস কইরাই বিয়া দিছিলাম। বিয়ের আগে তো দেখছিলাম, পোলাডা ভালা। দোকানপাট আছে। সংসারে ঝুট-ঝামেলা নাই। ভাবছিলাম, মাইয়া আমার সুখি হইব। এর লাইগাই তো বিয়া দিছিলাম।

ছেনোয়ারা বেগম পাশ থেকে বলে, ‘পোলাডারে কোনোকালেই আমার ভালা লাগে নাই। পরথম থাইকাই আমার চোর মনে হইছে।’

কেরামত আলী ধমক দিয়ে বলল, ‘এই, চুপ কর। পোলা খারাপ আছিল না। বাদাইম্যা আছিল, এইটা সইত্য।’

ছেনোয়ারা বেগম জিজ্ঞেস করল, ‘তাইলে হেয় আমাগো দুইটা গরু চুরি কইরা লইয়া গেছে যে?’

‘আমার গরু চুরি কইরা লইয়া গেছে, অইটাও সইত্য। তয় হেয় চোর না। আমি জানি, হেয় দেনার দায়ে এইটা করছে।’

‘তারে এতই যেমুন ভালা জানো, তাইলে হেয় অখন চিটাগাঙে গিয়া আরেকটা বিয়া করছে ক্যান?’

‘ওইটা তো আমারও কথা। গরু দুইটা চুরি কইরা লইয়া গেছে, ভালা কথা। আমার গরু। অন্য কারও গরু না। হেয় আইলেই তো হইতো। আমি মাফ কইরা দিতাম। হেয় না আইয়া আরেকটা বিয়া করছে। আমার মাইয়ার কপালডা পুড়ছে।’

মমিনা আগের মতোই ফ্যাল ফ্যাল করে তার বাবা-মা’র কথা শুনছে। সে কিছুই বলতে পারছে। কী বলবে সে, সেটাও বুঝতে পারছে না। সে কখনই তার মনের দুঃখ বা বেদনার কথা তার বাবা-মাকে বলেনি। সেই ছোটবেলা থেকে আদর পেলেও না। তার বাবা তো বাইরে নানান কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকত। আদর-সোহাগ বলতে ছোটবেলায় ছিঁড়ে যাওয়া জালের একপাশ ধরা, আন্তায় গুঁড়া মাছ ধরা পড়লে সেগুলোকে কুটাকুটি করা, আর বাবার সেই ডাক, ‘যা তো মমিনা, আমার পাঞ্জাবিডা ঘর থাইকা লইয়া আয়, মীরবহরি বাজারে যাইমু...।’

মমিনা তার মা’র কাছ থেকে সেই আদরটুকুও পায়নি। ছোটবেলা থেকে সে দেখে আসছে, তার মা’র যত ধ্যান হানিফের প্রতি, তার প্রতি বিন্দুমাত্র ছিল না। তার মা হানিককে নিয়ে বলে, ‘এই পোলা হইল আমার পেটপোছা ধন, কইলজার টুকরা।’ পুত্র বলতেই ছেনোয়ারা বেগম বরাবরই অজ্ঞান। ছোটমেয়ের উপস্থিতি তার কাছে কখনই ছিল না। তবে মমিনা তার সব সুখদুঃখ, আবেগ-অনুভূতি সবই ভাগ করে নেয় একজনের কাছে। সে আর কেউ নয়, তার বড়চাচি কমলা খাতুন।

মমিনা কমলা খাতুনের কথা ভাবতে ভাবতে তার বাবা-মা’র ওপর থেকে দৃষ্টিটা সরিয়ে বাইরে তাকাল। সে দেখল, বৃষ্টির ধারা এরই মধ্যে কমে এসেছে। এখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সে ভাবল, বৃষ্টিটা একেবারে কমে গেলে সে একবার বড়চাচির ঘরে যাবে। বড়চাচির হাতটা ধরে সে মন খুলে কাঁদবে। তার স্বামী আলিমুজ্জামান তার বিশ্বাসটা এমনভাবে ভাঙল! ক্রমশ... 



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত