সংবাদ

ছোটগল্প

আখ্যান: সাবলী বালা


শেলী সেনগুপ্তা
শেলী সেনগুপ্তা
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৩ এএম

আখ্যান: সাবলী বালা
শিল্পী: সঞ্জয় দে রিপন


পাশের বাড়ির রমলা গজ গজ করতে করতে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছে। আমার ঘরটা রাস্তার পাশে, তাই গজগজানিটা ভালোই শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এমন গজগজানি শুনতে ভালোই লাগে। গ্রাম্য গালিগালাজ শুনে খুব হাসি পায়, আবার কষ্ট হয় একজন বয়স্ক মহিলা এতো বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করে শুনে।

আজ আমার হাতে তেমন কাজ নেই, তাই বাইরে এসে রমলাকে ডাকলাম,

- কি গো  রমলাদি, সাতসকালে কার মুন্ডু চটকাচ্ছো?

- কার আবার, ভাতারখাকি বুড়ি মাগী সাবলীর।

- সাবলী মাসি তোমার কী ক্ষতি করেছে গো?

- আর কইয়ো না, গেল সালে ছেলের পরীক্ষার ফিস জমা দেয়ার জন্য কিছু টাকা নিছিলাম, প্রতিমাসে সুদ গুনতে গুনতে পাগল হওনের অবস্থা। সুদ দিতে দিতে আসলই দিতে পারলাম না, কহন যে সব ট্যাহা শোধ অইবো জানি না। মাগী সুদের এক ট্যাহাও ছাড়ে না।

- বারে, সুদে ট্যাহা নিছো, সুদ দিবা না, এটা কি হয়?

- মাগী, আইজ মরলে কাইল দু’দিন, এতো ট্যাহা দিয়ে কি করবো?

- মনে হয় সুদের ট্যাহায় চলে।

- না গো, বুড়ির বর্গা জমির ধান আছে না? এইডা হইলো স্বভাব।

বলতে বলতে রমলা চলে গেলো, অনেক দূর রমলার বকাবকির শব্দ শোনা গেলো। দরকারে ধার নিলো আবার সুদ দেয়ার সময় এমন চেঁচামেচি শুনে হাসি পাচ্ছে।

সাবলী মাসিকে সবাই একনামেই চেনে তবে সুনামে না। যখন যার দরকার হয় ছুটে সাবলী মাসির কাছে। সুদে টাকা নিয়ে আসে। সবার বিপদে আপদে সাবলী মাসি টাকা ধার দেয়, কিন্তু সুদের বিনিময়ে। সুদের হিসেবে খুব কঠিন, সময় মতো উপস্থিত হয়ে টাকা নিয়ে নেয়। সবার অপছন্দের মানুষ, কিন্তু বিপদে আগে সাবলী মাসির কথাই মনে হয় সবার।

গ্রামের একপাশে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘরে বসবাস করে সাবলী বালা। রীতিমত জংলা জায়গা, সাপখোপের অভয়ারণ্য।

সাধারণত কেউ যেতে চায় না সাবলী মাসির বাড়ির দিকে। কিন্তু বিপদে পড়লে ছুটে যায়। যে কোনো সময় যে কেউ।

এক  ডাকে সবলী মাসি বাড়ির বাইরে আসে, টাকার খতিটা সঙ্গে নিয়ে। শুধু জানতে চায়,

- কত টাহা লাগবো?

টাকার অংকটা শুনে নিয়ে গুনে দিয়ে দেয়। টাকা হাতে দিয়ে কঠিন কণ্ঠে বলে,

- আসল যহন মন চায় দিইও, সুদডা কিন্তু মাসে মাসে দেওন লাগবো। তিন তারিখের মইধ্যেই দিতে অয়বো।

হা, না জবাব না শুনে বাড়ির ভেতর চলে যায়। যা বলা হলো যেন এটাই একমাত্র সিদ্ধান্ত।

অনেকদিন থেকে সাবলী  মাসিকে চিনি , উপকারও পেয়েছি, কিন্তু প্রকৃতই যেটা জানা বলে তা এখনও হয়ে ওঠে নি।

আমি শোভা, এই গ্রামের বৌ। না, কেউ আমাকে বরণ করে বাড়িতে তুলে নেয় নি। বিয়ে করে স্বামীর হাত ধরে এই গ্রামে এসেছিলাম, তারপর নিজেরাই সাজিয়ে নিয়েছি একটা সংসার । এই গ্রামে আমি বৌ হয়ে এসেছিলাম বেশ আগে। সুজন আর আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। সুজন এ গ্রামের ছেলে, আমি পার্শ্ববর্তী শহরের মেয়ে।

আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করতাম। সুজনের বাবা এই গ্রামের জোতদার। তিনি খুব বদমেজাজি মানুষ, ছেলে নিজের পছন্দে বিয়ে করাতে তিনি বউ নিয়ে বাড়িতে উঠতে দেননি।

সুজন আমাকে নিয়ে সাবলী মাসির কাছে গেল। আমাকে দেখেই এক গাল হাসি দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর ঘরের ভেতর থেকে মাদুর এনে বারান্দায় বিছিয়ে দিলো। সুজন আর আমি বসলাম। ক্লান্ত ছিলাম, শরীর চাইছিলো শুয়ে পড়তে। বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসে আছি। এর মধ্যে সাবলী মাসি মাটির সানকিতে আমাদের জন্য খিচুড়ি আর জলপাই আচার  নিয়ে এলো। সামনে রেখে মৃদু স্বরে ডেকে বললো,

- খাইয়া লও, সারাদিন পেডে দানাপানি পরছে না, দেইখাই বুজছি।

আমি সুজনের দিকে তাকালাম, সে নির্বিকারভাবে সানকি হাতে নিলো। আমাকে বললো,

- খেয়ে নাও, এর পর কোথায় যাবো ভাবতে হবে। সাবলী মাসির সাহায্য লাগবে।

আমিও সানকিটা হাতে নিয়ে একটু একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছি। এতো অল্প আয়োজন, কিন্তু অমৃতের মতো লাগছে। আমাদের খেতে দিয়ে সাবলী মাসি যেন কোথায় চলে গেছে। অনেকক্ষণ দেখছি না। খাওয়া শেষ করে ক্লান্ত আমি মাদুরের ওপর কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম। দু’চোখ জুড়ে ঘুম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। ঘুম ভাঙল সাবলী মাসির ডাকে।  আমাকে না, আধো ঘুম আধো জাগরণে শুনছি, সাবলী মাসি কত আদর করে হাঁসগুলোকে পুকুর থেকে ডেকে তুলছে। মনে হচ্ছে, সন্ধ্যেবেলা মা তার দুষ্টু ছেলেকে ঘরে ফেরাচ্ছে। হাঁসগুলোও পাড়ের কাছে এসে আবার ফিরে যাচ্ছে, ভাবখানা এমন ‘আর একটু সাঁতরে আসি’।

হাতের কাজ শেষ করে সাবলী মাসি এসে বসলো আমাদের পাশে। সুজনও এসেছে বাইরে থেকে। মাসি জিজ্ঞেস করলো,

- বাবু, বিয়া কইরা ফালাইছো, বাবা যে বাড়িত তুলবো না, জানতা না? তোমারই বাপ, জেদ্দি, বুইজা শুইনা  বিয়া করন লাগে।

সুজন মাথা চুলকে বললো,

- বিয়ে না করে উপায় ছিল না মাসি। শোভার যে অন্যখানে বিয়ে হয়ে যাচ্ছিলো।

- ঠিক আছে , বিয়া তো করলা, অহন কি করবা?

- তুমি একটু সাহায্য করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

- কী সাহায্য চাও? আমি তো সুদখোর, তোমাগোরে কি সাহায্য করমু। কও দেহি কি করবার পারি।

- মাসি, কিছু টাকা লাগবে, ব্যবসা করবো আর কয়েকটা দিন থাকার ব্যবস্থা করে দাও।

- কোনহানে থাকবার দিমু? আমার ভাঙা বাড়িত থাহন লাগবো। থাহন খাওন ফ্রি। টাকা লইলে সুদ দেওন লাগবো, আসল যহনই দাও, মাসের তিন তারিখের মইধ্যে। বুইজ্যা দেহ।

সুজন হেসে বললো,

- মাসি, সুদের জন্য ভেবো না, মাসের তিন তারিখের মধ্যেই পেয়ে যাবে।

সাবলী মাসির কাছ থেকে টাকা নিয়ে সুজন দুইটা দুধের গরু কিনলো। পাশেই একটা পতিত জায়গা ভাড়া নিয়ে গোয়ালঘর আর আমাদের জন্য একটা ঘর করে নিলো। এক শুভদিনে আমরা আমাদের নিজেদের জন্য করা বাড়িতে চলে এলাম। একজন রাখাল রেখে সুজন নিজেই গরুর পরিচর্যা শুরু করলো। দেখতে দেখতে বাজারে বেশ সুনাম অর্জন করলো আমাদের ‘এস এস ডেইরি ফার্ম’। কয়েক মাসের মধ্যে আয়ের টাকা দিয়ে আরো দু’টো দুধের গরু কেনা হলো। সবকিছু ভালোই চলছে। সুজনের এখন সময় কাটে ডেইরি ফার্ম নিয়ে। সারাদিন তেমন কাজ না থাকায় আমিও ঘরের কাজ শেষ করে বেশ টিউশনি করি। পাড়ার কিছু ছেলেমেয়ে বাসায় এসে পড়ে।

সাবলী মাসি নির্বিকার। আমাদের যেন চেনেই না। শুধু মাসের তিন তারিখ বিকেলে স্পঞ্জের স্যান্ডেলে চটাং চটাং শব্দ তুলে  দরজার সামনে দাঁড়ায়, হাঁক দেয় সুদের টাকার জন্য।

এ মাসেও এসেছিল, আমি বের হয়ে বললাম—

- মাসি, ভেতরে এসো, চা খেয়ে যাও।

মাসি বেশ রুষ্ট হয়ে বললো,

- দেহ, আমি সুদের ট্যাহা তুলইতে আইলে কিছু খাই না, ট্যাহা দেও, চইলা যাই।

আমি হেসে মাসির হাতে টাকা দিয়ে দিলাম। টাকাটা হাতে নিয়ে আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে পেছন ফিরে ঝুঁকে ঝুঁকে হেঁটে চলে গেলো। মাসির চাহনির মধ্যে আমি একরাশ আশীর্বাদ দেখলাম, মনটা আনন্দে  ভরে উঠলো।

আজ সকালে সরলার বকাবকি শুনে প্রথমে হাসলেও পরে মন খারাপ হয়ে গেলো। সাবলী মাসিকে আমাদের চেয়ে বেশি কে জানে? এই মানুষটির বয়স্ক এবং রুক্ষ দেহের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কোমল মনটা তো আমরাই দেখেছি।

সাবলী মাসির কথা ভাবতে ভাবতে আমি পুকুর পাড়ে এলাম। সকালে মাছের চাড় দিয়ে বড়শি পুঁতে রেখেছিলাম। দেখি, মাছ ধরা পড়েছে কিনা। আজকাল এইভাবে মাছ ধরার আনন্দটা বেশ উপভোগ করছি। দু’এক বেলা তাজা মাছ খাওয়ার সুযোগও হয়।

বিকেল হয়ে গেলো, সুজন ফিরেছে, দিন দিন বাজারে দুধের চাহিদা বাড়ছে। ওর ইচ্ছে আরও কয়েকটা দুধের গরু কেনা। আমাকে জিজ্ঞেস করলো,

- শোভারে, আরো কয়েকটা গরু কেনা দরকার, কী করি?

- কেন সাবলী মাসির কাছ থেকে টাকা নাও।

- কীভাবে নেবো? মাসির আগের টাকাগুলো তো এখনও শোধ করতে পারি নি।

- মাসি কি আসল টাকার জন্য কখনো তাগাদা দেয়? নিয়মিত সুদ পেলেই তিনি খুশি। ভেবে দেখো, মাসির কাছ থেকে আরও কিছু টাকা নিয়ে গরু কেনা যায় কিনা। তারপর নাহয় লাভের টাকা জমিয়ে শোধ করে দিও।

- মাসির সঙ্গে কথা বলে দেখি। কাল একবার যাবো, তুমিও আমার সঙ্গে যেতে পারো।

সুজন পুকুর পাড়ে যেতে যেতে আমাকে বললো,

- একটু চা দেবে,আমি পুকুর পাড়ে আছি।

ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকাতে তাকাতে আমি রান্নাঘরে এলাম। বেশ যত্ন করে সুজন আর আমার জন্য দু’কাপ চা করলাম, সঙ্গে মুড়িমাখা। সব নিয়ে পুকুর পাড়ে এলাম।

আমরা চা মুড়ি খেতে খেতে গল্প করছি। এমন সময় শুনি অনেক দূরে মাইকিং হচ্ছে, ‘এখানকার সরকারি জমিতে হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে, আগামীকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী আসবেন হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার জন্য’। এই অনুষ্ঠানে গ্রামবাসীকে আমন্ত্রণ জানানো হলো।

অনেক দিন পর গ্রামে একটা সাজ সাজ রব পড়ে গেলো। বাজারের পাশে মাঠে বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। মাঠের একপাশে  মঞ্চ সাজানো হয়েছে, সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে সারি সারি চেয়ার সাজিয়ে রাখা হয়েছে, কয়েক গ্রামের মানুষ এসে বসে আছে সামিয়ানার নিচে। কী হতে যাচ্ছে জানার জন্য কৌতূহলের শেষ নেই, কিন্তু কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। দুপুর নাগাদ সাইরেন বাজানো পুলিশের গাড়ির বিশাল বহর নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এলেন। মঞ্চে উঠলেন, কয়েকজন মহিলা পুলিশ সাবলী মাসিকে নিয়ে এলো। সবার মধ্যে চাপা গুঞ্জন। যারা সাবলী মাসির কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়েছে তারা খুব খুশি, ভাবছে একবার সাবলী পুলিশের গারদে ঢুকলে আর টাকা দিতে হবে না। কিঞ্চিত কুঁজো হয়ে হাঁটা সাবলী মাসি আরও কুঁকড়ে আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পাশের আসনে জবুথবু বসে আছে সাবলী মাসী। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই অনেক কথা বললো। এর পর উঠলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তিনি যা বললেন তা শুনে গ্রামের মানুষের চোখ কপালে উঠে গেলো। এই গ্রামে একটা হাসপাতাল গড়ে তোলার জন্য সাবলী মাসি নিজের সারাজীবনের সঞ্চয় তুলে দিয়েছে সরকারের কোষাগারে। এই মহানুভবতার পরিচয় পেয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাবলী মাসির টাকার সঙ্গে আরো টাকা দিয়ে এ গ্রামে একটা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবে এবং হাসপাতালের নাম হবে ‘সাবলী বালা সরকারি আরোগ্যালয়’।  সাবলী মাসির এই প্রচেষ্টা এবং ইচ্ছার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আজকের এই আয়োজন।

সবাই অবাক হয়ে ভাবছে, এটা কীভাবে হলো! যে মানুষটা সুদে টাকা ধার দেয় আর মাসের তিন তারিখ তাগাদা দিয়ে সুদের টাকা তুলে নেয় সে মানুষ কী করে এতো বড় কাজের জন্য সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে দিতে পারে।

আমি আর সুজন একটু দূরে বসে অনুষ্ঠান দেখছিলাম। সাবলী মাসির এই সম্মানপ্রাপ্তিতে আমাদের মন ভালো হয়ে গেলো। আমাদের মতো করে কেউ তাকে চেনে নি।

বিকেল হতে হতে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলো। সাবলী মাসিকে সবার আলোচনার বিষয়ে পরিণত করে মন্ত্রীর গাড়ির বহর চলে গেলো। জটলা জটলা মানুষের আলোচনা আর সমালোচনার মধ্যে সন্ধ্যে নেমে এলো, একসময় রাতও। একরাশ কৌতূহল বুকে চেপে গ্রামের সবাই ঘুমাতে গেলো, আমরাও।

পরের দিন ভোরে মোরগের ডাক সঙ্গে নিয়ে গ্রাম জেগে উঠলো, কৃষক লাঙল নিয়ে মাঠে যাচ্ছে। পুকুর ঘাটে নারীদের কাজের ঝগড়া চলছে, এর মধ্যেই আগের দিনের অবাক মানুষগুলোকে আরো অবাক করে দিয়ে সাবলী মাসি স্পঞ্জের স্যান্ডেলের চটাং চটাং শব্দ তুলে বাড়ি থেকে বের হয়েছে সুদের টাকা তোলার জন্য।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


আখ্যান: সাবলী বালা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image


পাশের বাড়ির রমলা গজ গজ করতে করতে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছে। আমার ঘরটা রাস্তার পাশে, তাই গজগজানিটা ভালোই শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এমন গজগজানি শুনতে ভালোই লাগে। গ্রাম্য গালিগালাজ শুনে খুব হাসি পায়, আবার কষ্ট হয় একজন বয়স্ক মহিলা এতো বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করে শুনে।

আজ আমার হাতে তেমন কাজ নেই, তাই বাইরে এসে রমলাকে ডাকলাম,

- কি গো  রমলাদি, সাতসকালে কার মুন্ডু চটকাচ্ছো?

- কার আবার, ভাতারখাকি বুড়ি মাগী সাবলীর।

- সাবলী মাসি তোমার কী ক্ষতি করেছে গো?

- আর কইয়ো না, গেল সালে ছেলের পরীক্ষার ফিস জমা দেয়ার জন্য কিছু টাকা নিছিলাম, প্রতিমাসে সুদ গুনতে গুনতে পাগল হওনের অবস্থা। সুদ দিতে দিতে আসলই দিতে পারলাম না, কহন যে সব ট্যাহা শোধ অইবো জানি না। মাগী সুদের এক ট্যাহাও ছাড়ে না।

- বারে, সুদে ট্যাহা নিছো, সুদ দিবা না, এটা কি হয়?

- মাগী, আইজ মরলে কাইল দু’দিন, এতো ট্যাহা দিয়ে কি করবো?

- মনে হয় সুদের ট্যাহায় চলে।

- না গো, বুড়ির বর্গা জমির ধান আছে না? এইডা হইলো স্বভাব।

বলতে বলতে রমলা চলে গেলো, অনেক দূর রমলার বকাবকির শব্দ শোনা গেলো। দরকারে ধার নিলো আবার সুদ দেয়ার সময় এমন চেঁচামেচি শুনে হাসি পাচ্ছে।

সাবলী মাসিকে সবাই একনামেই চেনে তবে সুনামে না। যখন যার দরকার হয় ছুটে সাবলী মাসির কাছে। সুদে টাকা নিয়ে আসে। সবার বিপদে আপদে সাবলী মাসি টাকা ধার দেয়, কিন্তু সুদের বিনিময়ে। সুদের হিসেবে খুব কঠিন, সময় মতো উপস্থিত হয়ে টাকা নিয়ে নেয়। সবার অপছন্দের মানুষ, কিন্তু বিপদে আগে সাবলী মাসির কথাই মনে হয় সবার।

গ্রামের একপাশে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘরে বসবাস করে সাবলী বালা। রীতিমত জংলা জায়গা, সাপখোপের অভয়ারণ্য।

সাধারণত কেউ যেতে চায় না সাবলী মাসির বাড়ির দিকে। কিন্তু বিপদে পড়লে ছুটে যায়। যে কোনো সময় যে কেউ।

এক  ডাকে সবলী মাসি বাড়ির বাইরে আসে, টাকার খতিটা সঙ্গে নিয়ে। শুধু জানতে চায়,

- কত টাহা লাগবো?

টাকার অংকটা শুনে নিয়ে গুনে দিয়ে দেয়। টাকা হাতে দিয়ে কঠিন কণ্ঠে বলে,

- আসল যহন মন চায় দিইও, সুদডা কিন্তু মাসে মাসে দেওন লাগবো। তিন তারিখের মইধ্যেই দিতে অয়বো।

হা, না জবাব না শুনে বাড়ির ভেতর চলে যায়। যা বলা হলো যেন এটাই একমাত্র সিদ্ধান্ত।

অনেকদিন থেকে সাবলী  মাসিকে চিনি , উপকারও পেয়েছি, কিন্তু প্রকৃতই যেটা জানা বলে তা এখনও হয়ে ওঠে নি।

আমি শোভা, এই গ্রামের বৌ। না, কেউ আমাকে বরণ করে বাড়িতে তুলে নেয় নি। বিয়ে করে স্বামীর হাত ধরে এই গ্রামে এসেছিলাম, তারপর নিজেরাই সাজিয়ে নিয়েছি একটা সংসার । এই গ্রামে আমি বৌ হয়ে এসেছিলাম বেশ আগে। সুজন আর আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। সুজন এ গ্রামের ছেলে, আমি পার্শ্ববর্তী শহরের মেয়ে।

আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করতাম। সুজনের বাবা এই গ্রামের জোতদার। তিনি খুব বদমেজাজি মানুষ, ছেলে নিজের পছন্দে বিয়ে করাতে তিনি বউ নিয়ে বাড়িতে উঠতে দেননি।

সুজন আমাকে নিয়ে সাবলী মাসির কাছে গেল। আমাকে দেখেই এক গাল হাসি দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর ঘরের ভেতর থেকে মাদুর এনে বারান্দায় বিছিয়ে দিলো। সুজন আর আমি বসলাম। ক্লান্ত ছিলাম, শরীর চাইছিলো শুয়ে পড়তে। বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসে আছি। এর মধ্যে সাবলী মাসি মাটির সানকিতে আমাদের জন্য খিচুড়ি আর জলপাই আচার  নিয়ে এলো। সামনে রেখে মৃদু স্বরে ডেকে বললো,

- খাইয়া লও, সারাদিন পেডে দানাপানি পরছে না, দেইখাই বুজছি।

আমি সুজনের দিকে তাকালাম, সে নির্বিকারভাবে সানকি হাতে নিলো। আমাকে বললো,

- খেয়ে নাও, এর পর কোথায় যাবো ভাবতে হবে। সাবলী মাসির সাহায্য লাগবে।

আমিও সানকিটা হাতে নিয়ে একটু একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছি। এতো অল্প আয়োজন, কিন্তু অমৃতের মতো লাগছে। আমাদের খেতে দিয়ে সাবলী মাসি যেন কোথায় চলে গেছে। অনেকক্ষণ দেখছি না। খাওয়া শেষ করে ক্লান্ত আমি মাদুরের ওপর কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম। দু’চোখ জুড়ে ঘুম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। ঘুম ভাঙল সাবলী মাসির ডাকে।  আমাকে না, আধো ঘুম আধো জাগরণে শুনছি, সাবলী মাসি কত আদর করে হাঁসগুলোকে পুকুর থেকে ডেকে তুলছে। মনে হচ্ছে, সন্ধ্যেবেলা মা তার দুষ্টু ছেলেকে ঘরে ফেরাচ্ছে। হাঁসগুলোও পাড়ের কাছে এসে আবার ফিরে যাচ্ছে, ভাবখানা এমন ‘আর একটু সাঁতরে আসি’।

হাতের কাজ শেষ করে সাবলী মাসি এসে বসলো আমাদের পাশে। সুজনও এসেছে বাইরে থেকে। মাসি জিজ্ঞেস করলো,

- বাবু, বিয়া কইরা ফালাইছো, বাবা যে বাড়িত তুলবো না, জানতা না? তোমারই বাপ, জেদ্দি, বুইজা শুইনা  বিয়া করন লাগে।

সুজন মাথা চুলকে বললো,

- বিয়ে না করে উপায় ছিল না মাসি। শোভার যে অন্যখানে বিয়ে হয়ে যাচ্ছিলো।

- ঠিক আছে , বিয়া তো করলা, অহন কি করবা?

- তুমি একটু সাহায্য করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

- কী সাহায্য চাও? আমি তো সুদখোর, তোমাগোরে কি সাহায্য করমু। কও দেহি কি করবার পারি।

- মাসি, কিছু টাকা লাগবে, ব্যবসা করবো আর কয়েকটা দিন থাকার ব্যবস্থা করে দাও।

- কোনহানে থাকবার দিমু? আমার ভাঙা বাড়িত থাহন লাগবো। থাহন খাওন ফ্রি। টাকা লইলে সুদ দেওন লাগবো, আসল যহনই দাও, মাসের তিন তারিখের মইধ্যে। বুইজ্যা দেহ।

সুজন হেসে বললো,

- মাসি, সুদের জন্য ভেবো না, মাসের তিন তারিখের মধ্যেই পেয়ে যাবে।

সাবলী মাসির কাছ থেকে টাকা নিয়ে সুজন দুইটা দুধের গরু কিনলো। পাশেই একটা পতিত জায়গা ভাড়া নিয়ে গোয়ালঘর আর আমাদের জন্য একটা ঘর করে নিলো। এক শুভদিনে আমরা আমাদের নিজেদের জন্য করা বাড়িতে চলে এলাম। একজন রাখাল রেখে সুজন নিজেই গরুর পরিচর্যা শুরু করলো। দেখতে দেখতে বাজারে বেশ সুনাম অর্জন করলো আমাদের ‘এস এস ডেইরি ফার্ম’। কয়েক মাসের মধ্যে আয়ের টাকা দিয়ে আরো দু’টো দুধের গরু কেনা হলো। সবকিছু ভালোই চলছে। সুজনের এখন সময় কাটে ডেইরি ফার্ম নিয়ে। সারাদিন তেমন কাজ না থাকায় আমিও ঘরের কাজ শেষ করে বেশ টিউশনি করি। পাড়ার কিছু ছেলেমেয়ে বাসায় এসে পড়ে।

সাবলী মাসি নির্বিকার। আমাদের যেন চেনেই না। শুধু মাসের তিন তারিখ বিকেলে স্পঞ্জের স্যান্ডেলে চটাং চটাং শব্দ তুলে  দরজার সামনে দাঁড়ায়, হাঁক দেয় সুদের টাকার জন্য।

এ মাসেও এসেছিল, আমি বের হয়ে বললাম—

- মাসি, ভেতরে এসো, চা খেয়ে যাও।

মাসি বেশ রুষ্ট হয়ে বললো,

- দেহ, আমি সুদের ট্যাহা তুলইতে আইলে কিছু খাই না, ট্যাহা দেও, চইলা যাই।

আমি হেসে মাসির হাতে টাকা দিয়ে দিলাম। টাকাটা হাতে নিয়ে আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে পেছন ফিরে ঝুঁকে ঝুঁকে হেঁটে চলে গেলো। মাসির চাহনির মধ্যে আমি একরাশ আশীর্বাদ দেখলাম, মনটা আনন্দে  ভরে উঠলো।

আজ সকালে সরলার বকাবকি শুনে প্রথমে হাসলেও পরে মন খারাপ হয়ে গেলো। সাবলী মাসিকে আমাদের চেয়ে বেশি কে জানে? এই মানুষটির বয়স্ক এবং রুক্ষ দেহের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কোমল মনটা তো আমরাই দেখেছি।

সাবলী মাসির কথা ভাবতে ভাবতে আমি পুকুর পাড়ে এলাম। সকালে মাছের চাড় দিয়ে বড়শি পুঁতে রেখেছিলাম। দেখি, মাছ ধরা পড়েছে কিনা। আজকাল এইভাবে মাছ ধরার আনন্দটা বেশ উপভোগ করছি। দু’এক বেলা তাজা মাছ খাওয়ার সুযোগও হয়।

বিকেল হয়ে গেলো, সুজন ফিরেছে, দিন দিন বাজারে দুধের চাহিদা বাড়ছে। ওর ইচ্ছে আরও কয়েকটা দুধের গরু কেনা। আমাকে জিজ্ঞেস করলো,

- শোভারে, আরো কয়েকটা গরু কেনা দরকার, কী করি?

- কেন সাবলী মাসির কাছ থেকে টাকা নাও।

- কীভাবে নেবো? মাসির আগের টাকাগুলো তো এখনও শোধ করতে পারি নি।

- মাসি কি আসল টাকার জন্য কখনো তাগাদা দেয়? নিয়মিত সুদ পেলেই তিনি খুশি। ভেবে দেখো, মাসির কাছ থেকে আরও কিছু টাকা নিয়ে গরু কেনা যায় কিনা। তারপর নাহয় লাভের টাকা জমিয়ে শোধ করে দিও।

- মাসির সঙ্গে কথা বলে দেখি। কাল একবার যাবো, তুমিও আমার সঙ্গে যেতে পারো।

সুজন পুকুর পাড়ে যেতে যেতে আমাকে বললো,

- একটু চা দেবে,আমি পুকুর পাড়ে আছি।

ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকাতে তাকাতে আমি রান্নাঘরে এলাম। বেশ যত্ন করে সুজন আর আমার জন্য দু’কাপ চা করলাম, সঙ্গে মুড়িমাখা। সব নিয়ে পুকুর পাড়ে এলাম।

আমরা চা মুড়ি খেতে খেতে গল্প করছি। এমন সময় শুনি অনেক দূরে মাইকিং হচ্ছে, ‘এখানকার সরকারি জমিতে হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে, আগামীকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী আসবেন হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার জন্য’। এই অনুষ্ঠানে গ্রামবাসীকে আমন্ত্রণ জানানো হলো।

অনেক দিন পর গ্রামে একটা সাজ সাজ রব পড়ে গেলো। বাজারের পাশে মাঠে বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। মাঠের একপাশে  মঞ্চ সাজানো হয়েছে, সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে সারি সারি চেয়ার সাজিয়ে রাখা হয়েছে, কয়েক গ্রামের মানুষ এসে বসে আছে সামিয়ানার নিচে। কী হতে যাচ্ছে জানার জন্য কৌতূহলের শেষ নেই, কিন্তু কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। দুপুর নাগাদ সাইরেন বাজানো পুলিশের গাড়ির বিশাল বহর নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এলেন। মঞ্চে উঠলেন, কয়েকজন মহিলা পুলিশ সাবলী মাসিকে নিয়ে এলো। সবার মধ্যে চাপা গুঞ্জন। যারা সাবলী মাসির কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়েছে তারা খুব খুশি, ভাবছে একবার সাবলী পুলিশের গারদে ঢুকলে আর টাকা দিতে হবে না। কিঞ্চিত কুঁজো হয়ে হাঁটা সাবলী মাসি আরও কুঁকড়ে আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পাশের আসনে জবুথবু বসে আছে সাবলী মাসী। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই অনেক কথা বললো। এর পর উঠলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তিনি যা বললেন তা শুনে গ্রামের মানুষের চোখ কপালে উঠে গেলো। এই গ্রামে একটা হাসপাতাল গড়ে তোলার জন্য সাবলী মাসি নিজের সারাজীবনের সঞ্চয় তুলে দিয়েছে সরকারের কোষাগারে। এই মহানুভবতার পরিচয় পেয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাবলী মাসির টাকার সঙ্গে আরো টাকা দিয়ে এ গ্রামে একটা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবে এবং হাসপাতালের নাম হবে ‘সাবলী বালা সরকারি আরোগ্যালয়’।  সাবলী মাসির এই প্রচেষ্টা এবং ইচ্ছার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আজকের এই আয়োজন।

সবাই অবাক হয়ে ভাবছে, এটা কীভাবে হলো! যে মানুষটা সুদে টাকা ধার দেয় আর মাসের তিন তারিখ তাগাদা দিয়ে সুদের টাকা তুলে নেয় সে মানুষ কী করে এতো বড় কাজের জন্য সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে দিতে পারে।

আমি আর সুজন একটু দূরে বসে অনুষ্ঠান দেখছিলাম। সাবলী মাসির এই সম্মানপ্রাপ্তিতে আমাদের মন ভালো হয়ে গেলো। আমাদের মতো করে কেউ তাকে চেনে নি।

বিকেল হতে হতে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলো। সাবলী মাসিকে সবার আলোচনার বিষয়ে পরিণত করে মন্ত্রীর গাড়ির বহর চলে গেলো। জটলা জটলা মানুষের আলোচনা আর সমালোচনার মধ্যে সন্ধ্যে নেমে এলো, একসময় রাতও। একরাশ কৌতূহল বুকে চেপে গ্রামের সবাই ঘুমাতে গেলো, আমরাও।

পরের দিন ভোরে মোরগের ডাক সঙ্গে নিয়ে গ্রাম জেগে উঠলো, কৃষক লাঙল নিয়ে মাঠে যাচ্ছে। পুকুর ঘাটে নারীদের কাজের ঝগড়া চলছে, এর মধ্যেই আগের দিনের অবাক মানুষগুলোকে আরো অবাক করে দিয়ে সাবলী মাসি স্পঞ্জের স্যান্ডেলের চটাং চটাং শব্দ তুলে বাড়ি থেকে বের হয়েছে সুদের টাকা তোলার জন্য।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত