সংবাদ

শরতের উৎসব, বাংলার সর্বজনীন পরিচয়


সমীর কুমার সাহা
সমীর কুমার সাহা
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৫ এএম

শরতের উৎসব, বাংলার সর্বজনীন পরিচয়
দুর্গোৎসব ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সাংস্কৃতিক মহামিলনে পরিণত হয়েছে

বাংলার ঋতুচক্রে শরৎ কেবল একটি ঋতু নয়; এটি একটি মনস্তত্ত্ব, একটি সামগ্রিক অনুভূতি। দীর্ঘ তিন মাসের বর্ষার কর্দমাক্ত, রুদ্ধ ও অনেকটা স্থবির জীবন পেরিয়ে যখন আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভাসতে শুরু করে, নদীর ধূসর চরে সাদা কাশফুল মাথা দোলায়, ভোরের বাতাস শিউলির মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে এবং দূর্বাঘাসের ডগায় শিশির জমে, তখন বাঙালি মাত্রই বুঝতে পারে, মা আসছেন। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাংলার প্রকৃতি, কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের এক সামগ্রিক উদযাপন। এই উৎসবের সর্বজনীনতা বুঝতে হলে তাকে শুধু আলোকসজ্জায় সজ্জিত মণ্ডপের ভেতরে খুঁজলে চলবে না; খুঁজতে হবে ধানখেতে, কুমোরের উঠোনে, তাঁতির মাকুতে, বাজারের ভিড়ে এবং মানুষের আনন্দে।

এই উৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সর্বজনীন দর্শন। দুর্গাপূজার সঙ্গে ‘সর্বজনীন’ শব্দটি এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তা আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলায় বারোয়ারি পূজার সূচনা হয়েছিল জাতিভেদপ্রথা ও জমিদারদের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙার একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু চাঁদা তুলে যে পূজার আয়োজন করেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল—পূজা কোনো জমিদারের ব্যক্তিগত বৈভব প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়; এটি সবার, সবার জন্য। সেই চেতনা আজ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। দুর্গোৎসব ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সাংস্কৃতিক মহামিলনে পরিণত হয়েছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে কলকাতার কুমোরটুলি, রাজশাহীর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চট্টগ্রামের শহরাঞ্চল—বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপ তৈরিতে বাঁশের কাজ করেন মুসলমান কারিগর, প্রতিমার খড়ের কাঠামো বাঁধেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কারিগর, আর মণ্ডপের আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার কাজে যুক্ত হন নানা ধর্মের মানুষ। পূজার ভোগ রান্না থেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায় পারস্পরিক সহযোগিতা। দর্শনার্থীদের সারিতে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আরতি দেখেন। এই দৃশ্য বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক হলো নারীশক্তির আরাধনা। দুর্গা এখানে কেবল দশভুজা অসুরদলনী দেবী নন; তিনি কন্যা, তিনি মা, যিনি বছরে একবার বাপের বাড়িতে আসেন। বাংলার পারিবারিক পরিসরে কন্যাসন্তানকে যে স্নেহ ও সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়, দেবী দুর্গার মধ্যেও সেই আবেগের প্রতিফলন ঘটে। তাই এই উৎসব নারীর প্রতি সম্মান, শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং মাতৃত্বের প্রতি ভালোবাসারও এক সামাজিক প্রকাশ।

শরতের প্রকৃতি এই উৎসবের একটি অপরিহার্য প্রেক্ষাপট তৈরি করে। শরৎকে এমনি এমনি ঋতুরানি বলা হয় না; এর পেছনে রয়েছে জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য ও নান্দনিকতার সম্মিলন। বর্ষার পর অনেক সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে আসে, আকাশ হয়ে ওঠে নির্মল ও গভীর নীল। নদীর চরে কাশফুল ফোটে, বিলে শাপলা ও পদ্ম দেখা যায়, ভোরে ঘাসের ওপর জমে শিশির। এসব প্রাকৃতিক উপাদান দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। বর্ষাকালে কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি ও শুকানো কঠিন হলেও শরতের রোদে তা তুলনামূলক সহজ হয়। নদীর পানি কমে এলে কোথাও কোথাও পলিমাটি সংগ্রহ করাও সহজ হয়। গ্রামীণ বাংলায় খাল-বিলের পদ্ম ও শাপলা ফুল পূজার সাজসজ্জায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতি যেন নিজেই উৎসবের আয়োজন সাজিয়ে দেয়। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শরৎকালেও অসময়ে ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক ঝড়ের ঘটনা ঘটছে। অনেক এলাকায় কাশবন কমে যাচ্ছে, নদী ভরাট হচ্ছে। আকস্মিক বৃষ্টিতে মণ্ডপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং প্রতিমা তৈরিতে বিলম্বের ঘটনাও ঘটে। তাই শারদীয় উৎসবের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে শরতের প্রকৃতি রক্ষা করা জরুরি। নদী ও বিল রক্ষা, কাশবন সংরক্ষণ এবং পদ্মবিলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এখন শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের উৎসব ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।

বাংলার কৃষকের কাছে শরৎ আশা ও শঙ্কার যুগপৎ সময়। মাঠে তখন আমন ধান। ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে আমন ধানের বৃদ্ধি, ফুল ফোটা ও শিষ গঠনের বিভিন্ন পর্যায় চলে। এ সময় কৃষক সারা বছরের শ্রম ও স্বপ্ন নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। একটি ভারী বৃষ্টি, ঝড় কিংবা বন্যা তাঁর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। কৃষির এই বাস্তবতার সঙ্গে দুর্গাপূজার সময়ের সম্পর্ক রয়েছে, যদিও উৎসবটিকে সরাসরি ফসল তোলার উৎসব হিসেবে চিহ্নিত করা পুরোপুরি যথাযথ নয়। বাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে শারদীয় উৎসবের সম্পর্ক বহুদিনের। নবান্নের আগমুহূর্তে নতুন ফসলের প্রত্যাশা, ভালো ফলনের প্রার্থনা এবং উৎসবের আয়োজন গ্রামীণ জীবনে এক বিশেষ আবহ তৈরি করে। ভালো ফসল হলে কৃষকের হাতে অর্থ আসে, আর্থিক স্বস্তি বাড়ে এবং উৎসবের খরচ বহন করাও তুলনামূলক সহজ হয়। আজও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা যায়। আমন ধান কাটার মৌসুমের আগে-পরে কৃষকের আয়, ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য কৃষি উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। একই সময়ে বাজারে নানা ধরনের মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়ে। এই কৃষিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড স্থানীয় বাজারকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখে। শরৎ তাই শুধু দেবীর আগমনের বার্তা নয়; কৃষকের ঘরেও সম্ভাব্য সমৃদ্ধির প্রত্যাশা নিয়ে আসে। ধানের শিষে যখন দোলা লাগে, তখন ঢাকের বাদ্যিও যেন সেই দোলায় তাল মেলায়।

অর্থনীতির দৃষ্টিতে দুর্গাপূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড। একে অনেক সময় ‘উৎসব অর্থনীতি’ বলা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজাকে ঘিরে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন গবেষণায় এই অর্থনীতির বড় আকারের কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। এই অর্থনীতির বিস্তার ও গভীরতা বোঝা যায় এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশার মানুষের দিকে তাকালে। একজন মৃৎশিল্পী সারা বছর অপেক্ষা করেন পূজার মৌসুমের জন্য। তাঁর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন খড়, বাঁশ ও মাটি সরবরাহকারী, মাটি কাটার শ্রমিক এবং রং বিক্রেতারা। ঢাকার ধামরাই, রাজশাহীর বানেশ্বর, যশোর ও চট্টগ্রামের পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এই শিল্প বহু পরিবারের জীবিকার উৎস। বস্ত্র ও ফ্যাশন খাতেও পূজার প্রভাব রয়েছে। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদীর তাঁতপল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ সময় পোশাক তৈরির কাজ বাড়ে। পূজাকে সামনে রেখে অনেকে নতুন পোশাক কেনেন। ঢাক, আলোকসজ্জা, মণ্ডপ নির্মাণ ও শব্দব্যবস্থাপনার কাজেও বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। পূজার দিনগুলোতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ফুল, মিষ্টি ও প্রসাধনসামগ্রীর ব্যবসায়ও লেনদেন বাড়ে। মানুষ ঘর থেকে বের হন, কেনাকাটা করেন, খাওয়াদাওয়া করেন এবং বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যান। এই বাড়তি চাহিদা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করে। এই অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর সুফল বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও। গ্রামের কুমোর, শহরের দর্জি, ফুটপাতের চা বিক্রেতা ও রিকশাচালক—অনেকেই এই উৎসবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে উপকৃত হন। তাই দুর্গাপূজা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের পাশাপাশি বহু মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতেও শরৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্ষার পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। ফলে এ সময় ডেঙ্গুর ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন চর্মরোগের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যুক্ত করা যেতে পারে। মণ্ডপের আশপাশে জমে থাকা পানি, ফেলে দেওয়া খাবারের পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল ও ডাবের খোসায় পানি জমলে তা মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা জরুরি। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের একটি ইতিবাচক দিক হলো মানসিক সুস্থতা। বর্ষার একঘেয়েমি ও দীর্ঘ সময় ঘরবন্দী থাকার পর শরতের উৎসব মানুষকে ঘরের বাইরে আসার, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ দেয়। সামাজিক মেলামেশা, সম্মিলিত আনন্দ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের মানসিক প্রশান্তিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের মিলন, পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলন এবং বন্ধুদের আড্ডা মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হতে পারে। এ কারণে দুর্গাপূজাকে শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে নয়, সামাজিক সুস্থতা ও পারস্পরিক সংযোগের উপলক্ষ হিসেবেও দেখা যায়। এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগের করণীয় হলো বড় মণ্ডপগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং জনসমাগমস্থলে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখতে আয়োজকদের সহায়তা করা।

শেষ পর্যন্ত শারদীয় দুর্গোৎসব এমন এক আয়না, যেখানে বাংলার প্রকৃত মুখ প্রতিফলিত হয়। সেই আয়নায় আছে শরতের নীল আকাশ, আমন ধানের সবুজ মাঠ, কুমোরের হাতে গড়া প্রতিমা, নতুন পোশাকের আনন্দ এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আরতি দেখার অপূর্ব দৃশ্য। এই উৎসবকে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে দেখলে এর সঙ্গে যুক্ত বাংলার কৃষি, অর্থনীতি, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বিস্তৃত সম্পর্ক উপেক্ষিত থেকে যায়। রাষ্ট্রের উচিত এই উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এর সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্প ও জীবিকাকে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। মনে রাখতে হবে, নদী বাঁচলে কাশফুল বাঁচবে, কাশফুল বাঁচলে শরতের সৌন্দর্য টিকে থাকবে, আর প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান বজায় থাকলেই বাঙালির এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব তার সব রং নিয়ে বিকশিত হবে।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬


শরতের উৎসব, বাংলার সর্বজনীন পরিচয়

প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বাংলার ঋতুচক্রে শরৎ কেবল একটি ঋতু নয়; এটি একটি মনস্তত্ত্ব, একটি সামগ্রিক অনুভূতি। দীর্ঘ তিন মাসের বর্ষার কর্দমাক্ত, রুদ্ধ ও অনেকটা স্থবির জীবন পেরিয়ে যখন আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভাসতে শুরু করে, নদীর ধূসর চরে সাদা কাশফুল মাথা দোলায়, ভোরের বাতাস শিউলির মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে এবং দূর্বাঘাসের ডগায় শিশির জমে, তখন বাঙালি মাত্রই বুঝতে পারে, মা আসছেন। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাংলার প্রকৃতি, কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের এক সামগ্রিক উদযাপন। এই উৎসবের সর্বজনীনতা বুঝতে হলে তাকে শুধু আলোকসজ্জায় সজ্জিত মণ্ডপের ভেতরে খুঁজলে চলবে না; খুঁজতে হবে ধানখেতে, কুমোরের উঠোনে, তাঁতির মাকুতে, বাজারের ভিড়ে এবং মানুষের আনন্দে।

এই উৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সর্বজনীন দর্শন। দুর্গাপূজার সঙ্গে ‘সর্বজনীন’ শব্দটি এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তা আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলায় বারোয়ারি পূজার সূচনা হয়েছিল জাতিভেদপ্রথা ও জমিদারদের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙার একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু চাঁদা তুলে যে পূজার আয়োজন করেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল—পূজা কোনো জমিদারের ব্যক্তিগত বৈভব প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়; এটি সবার, সবার জন্য। সেই চেতনা আজ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। দুর্গোৎসব ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সাংস্কৃতিক মহামিলনে পরিণত হয়েছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে কলকাতার কুমোরটুলি, রাজশাহীর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চট্টগ্রামের শহরাঞ্চল—বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপ তৈরিতে বাঁশের কাজ করেন মুসলমান কারিগর, প্রতিমার খড়ের কাঠামো বাঁধেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কারিগর, আর মণ্ডপের আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার কাজে যুক্ত হন নানা ধর্মের মানুষ। পূজার ভোগ রান্না থেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায় পারস্পরিক সহযোগিতা। দর্শনার্থীদের সারিতে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আরতি দেখেন। এই দৃশ্য বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক হলো নারীশক্তির আরাধনা। দুর্গা এখানে কেবল দশভুজা অসুরদলনী দেবী নন; তিনি কন্যা, তিনি মা, যিনি বছরে একবার বাপের বাড়িতে আসেন। বাংলার পারিবারিক পরিসরে কন্যাসন্তানকে যে স্নেহ ও সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়, দেবী দুর্গার মধ্যেও সেই আবেগের প্রতিফলন ঘটে। তাই এই উৎসব নারীর প্রতি সম্মান, শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং মাতৃত্বের প্রতি ভালোবাসারও এক সামাজিক প্রকাশ।

শরতের প্রকৃতি এই উৎসবের একটি অপরিহার্য প্রেক্ষাপট তৈরি করে। শরৎকে এমনি এমনি ঋতুরানি বলা হয় না; এর পেছনে রয়েছে জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য ও নান্দনিকতার সম্মিলন। বর্ষার পর অনেক সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে আসে, আকাশ হয়ে ওঠে নির্মল ও গভীর নীল। নদীর চরে কাশফুল ফোটে, বিলে শাপলা ও পদ্ম দেখা যায়, ভোরে ঘাসের ওপর জমে শিশির। এসব প্রাকৃতিক উপাদান দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। বর্ষাকালে কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি ও শুকানো কঠিন হলেও শরতের রোদে তা তুলনামূলক সহজ হয়। নদীর পানি কমে এলে কোথাও কোথাও পলিমাটি সংগ্রহ করাও সহজ হয়। গ্রামীণ বাংলায় খাল-বিলের পদ্ম ও শাপলা ফুল পূজার সাজসজ্জায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতি যেন নিজেই উৎসবের আয়োজন সাজিয়ে দেয়। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শরৎকালেও অসময়ে ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক ঝড়ের ঘটনা ঘটছে। অনেক এলাকায় কাশবন কমে যাচ্ছে, নদী ভরাট হচ্ছে। আকস্মিক বৃষ্টিতে মণ্ডপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং প্রতিমা তৈরিতে বিলম্বের ঘটনাও ঘটে। তাই শারদীয় উৎসবের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে শরতের প্রকৃতি রক্ষা করা জরুরি। নদী ও বিল রক্ষা, কাশবন সংরক্ষণ এবং পদ্মবিলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এখন শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের উৎসব ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।

বাংলার কৃষকের কাছে শরৎ আশা ও শঙ্কার যুগপৎ সময়। মাঠে তখন আমন ধান। ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে আমন ধানের বৃদ্ধি, ফুল ফোটা ও শিষ গঠনের বিভিন্ন পর্যায় চলে। এ সময় কৃষক সারা বছরের শ্রম ও স্বপ্ন নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। একটি ভারী বৃষ্টি, ঝড় কিংবা বন্যা তাঁর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। কৃষির এই বাস্তবতার সঙ্গে দুর্গাপূজার সময়ের সম্পর্ক রয়েছে, যদিও উৎসবটিকে সরাসরি ফসল তোলার উৎসব হিসেবে চিহ্নিত করা পুরোপুরি যথাযথ নয়। বাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে শারদীয় উৎসবের সম্পর্ক বহুদিনের। নবান্নের আগমুহূর্তে নতুন ফসলের প্রত্যাশা, ভালো ফলনের প্রার্থনা এবং উৎসবের আয়োজন গ্রামীণ জীবনে এক বিশেষ আবহ তৈরি করে। ভালো ফসল হলে কৃষকের হাতে অর্থ আসে, আর্থিক স্বস্তি বাড়ে এবং উৎসবের খরচ বহন করাও তুলনামূলক সহজ হয়। আজও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা যায়। আমন ধান কাটার মৌসুমের আগে-পরে কৃষকের আয়, ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য কৃষি উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। একই সময়ে বাজারে নানা ধরনের মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়ে। এই কৃষিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড স্থানীয় বাজারকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখে। শরৎ তাই শুধু দেবীর আগমনের বার্তা নয়; কৃষকের ঘরেও সম্ভাব্য সমৃদ্ধির প্রত্যাশা নিয়ে আসে। ধানের শিষে যখন দোলা লাগে, তখন ঢাকের বাদ্যিও যেন সেই দোলায় তাল মেলায়।

অর্থনীতির দৃষ্টিতে দুর্গাপূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড। একে অনেক সময় ‘উৎসব অর্থনীতি’ বলা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজাকে ঘিরে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন গবেষণায় এই অর্থনীতির বড় আকারের কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। এই অর্থনীতির বিস্তার ও গভীরতা বোঝা যায় এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশার মানুষের দিকে তাকালে। একজন মৃৎশিল্পী সারা বছর অপেক্ষা করেন পূজার মৌসুমের জন্য। তাঁর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন খড়, বাঁশ ও মাটি সরবরাহকারী, মাটি কাটার শ্রমিক এবং রং বিক্রেতারা। ঢাকার ধামরাই, রাজশাহীর বানেশ্বর, যশোর ও চট্টগ্রামের পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এই শিল্প বহু পরিবারের জীবিকার উৎস। বস্ত্র ও ফ্যাশন খাতেও পূজার প্রভাব রয়েছে। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদীর তাঁতপল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ সময় পোশাক তৈরির কাজ বাড়ে। পূজাকে সামনে রেখে অনেকে নতুন পোশাক কেনেন। ঢাক, আলোকসজ্জা, মণ্ডপ নির্মাণ ও শব্দব্যবস্থাপনার কাজেও বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। পূজার দিনগুলোতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ফুল, মিষ্টি ও প্রসাধনসামগ্রীর ব্যবসায়ও লেনদেন বাড়ে। মানুষ ঘর থেকে বের হন, কেনাকাটা করেন, খাওয়াদাওয়া করেন এবং বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যান। এই বাড়তি চাহিদা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করে। এই অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর সুফল বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও। গ্রামের কুমোর, শহরের দর্জি, ফুটপাতের চা বিক্রেতা ও রিকশাচালক—অনেকেই এই উৎসবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে উপকৃত হন। তাই দুর্গাপূজা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের পাশাপাশি বহু মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতেও শরৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্ষার পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। ফলে এ সময় ডেঙ্গুর ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন চর্মরোগের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যুক্ত করা যেতে পারে। মণ্ডপের আশপাশে জমে থাকা পানি, ফেলে দেওয়া খাবারের পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল ও ডাবের খোসায় পানি জমলে তা মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা জরুরি। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের একটি ইতিবাচক দিক হলো মানসিক সুস্থতা। বর্ষার একঘেয়েমি ও দীর্ঘ সময় ঘরবন্দী থাকার পর শরতের উৎসব মানুষকে ঘরের বাইরে আসার, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ দেয়। সামাজিক মেলামেশা, সম্মিলিত আনন্দ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের মানসিক প্রশান্তিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের মিলন, পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলন এবং বন্ধুদের আড্ডা মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হতে পারে। এ কারণে দুর্গাপূজাকে শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে নয়, সামাজিক সুস্থতা ও পারস্পরিক সংযোগের উপলক্ষ হিসেবেও দেখা যায়। এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগের করণীয় হলো বড় মণ্ডপগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং জনসমাগমস্থলে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখতে আয়োজকদের সহায়তা করা।

শেষ পর্যন্ত শারদীয় দুর্গোৎসব এমন এক আয়না, যেখানে বাংলার প্রকৃত মুখ প্রতিফলিত হয়। সেই আয়নায় আছে শরতের নীল আকাশ, আমন ধানের সবুজ মাঠ, কুমোরের হাতে গড়া প্রতিমা, নতুন পোশাকের আনন্দ এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আরতি দেখার অপূর্ব দৃশ্য। এই উৎসবকে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে দেখলে এর সঙ্গে যুক্ত বাংলার কৃষি, অর্থনীতি, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বিস্তৃত সম্পর্ক উপেক্ষিত থেকে যায়। রাষ্ট্রের উচিত এই উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এর সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্প ও জীবিকাকে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। মনে রাখতে হবে, নদী বাঁচলে কাশফুল বাঁচবে, কাশফুল বাঁচলে শরতের সৌন্দর্য টিকে থাকবে, আর প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান বজায় থাকলেই বাঙালির এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব তার সব রং নিয়ে বিকশিত হবে।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত