শিক্ষা খাতের জরাজীর্ণ অবস্থা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন ব্যাপক সহিংস রূপ নিয়েছে। শনিবারের (১৭ অক্টোবর) বিক্ষোভে দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংঘর্ষে প্রায় ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ ফ্রান্সের প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। বিভিন্ন স্থানে ভবন ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, দোকানে লুটপাট এবং সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
প্যারিসে বিকেলের দিকে মূল মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও সন্ধ্যার পর সহিংস হয়ে ওঠে। শহরের কেন্দ্রস্থল ‘প্লাস দ্য লা রিপাবলিক’সহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কয়েক ডজন দোকানে ভাঙচুর চালিয় লুটপাট করা হয় এবং অগ্নিকাণ্ডে অন্তত একটি রেস্তোরাঁ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ জানান, দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সরকার কোনো কর্ণপাত না করায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর বাইরে লিমোজ শহরের সিটি হলে আগুন লাগায় ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়ে। লিয়ঁ শহরের ঐতিহাসিক পর্যটন দপ্তরের ভবনে আগুন দেওয়া হয়, যাকে ‘ট্র্যাজেডি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন শহরটির মেয়র গ্রেগরি দুসেত। সাঁ-এতিয়েন শহরে গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া মার্সেই, রেন, তুলুজ, আঞ্জেস ও গ্রেনোবলসহ একাধিক শহরে ব্যাপক সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। লিলের একটি অ্যাপল স্টোরে ঢুকে ব্যাপকভাবে লুটপাট চালানো হয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা ‘লিসে’গুলোতে তীব্র শিক্ষকসংকট ও অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছিলেন। শনিবার তাদের এই আন্দোলনে যোগ দেন ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য ও ২০১৮ সালের আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ (হলুদ জ্যাকেট) আন্দোলনের কর্মীরা। শিক্ষা খাতের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
সামনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে এই আন্দোলন রাজনৈতিক মাঠেও চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুললেও লুটপাটের নিন্দা জানান। তবে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু একে ‘কপটতা’ বলে মন্তব্য করে অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই সহিংসতা উসকে দেওয়া হচ্ছে। উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মারিন লে পেনও সহিংস আচরণের জন্য উগ্র বামপন্থীদের দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর আইনি শাস্তির মুখে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
এর আগে বিক্ষোভ দমাতে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রে অতিরিক্ত তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিলেও আন্দোলন থামেনি। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বলপ্রয়োগ করে এই অসন্তোষ দমন সম্ভব নয়; বরং শিক্ষা খাতের মৌলিক সংস্কার ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না নিলে ফ্রান্সের এই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
/

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬
শিক্ষা খাতের জরাজীর্ণ অবস্থা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন ব্যাপক সহিংস রূপ নিয়েছে। শনিবারের (১৭ অক্টোবর) বিক্ষোভে দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংঘর্ষে প্রায় ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ ফ্রান্সের প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। বিভিন্ন স্থানে ভবন ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, দোকানে লুটপাট এবং সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
প্যারিসে বিকেলের দিকে মূল মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও সন্ধ্যার পর সহিংস হয়ে ওঠে। শহরের কেন্দ্রস্থল ‘প্লাস দ্য লা রিপাবলিক’সহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কয়েক ডজন দোকানে ভাঙচুর চালিয় লুটপাট করা হয় এবং অগ্নিকাণ্ডে অন্তত একটি রেস্তোরাঁ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ জানান, দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সরকার কোনো কর্ণপাত না করায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর বাইরে লিমোজ শহরের সিটি হলে আগুন লাগায় ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়ে। লিয়ঁ শহরের ঐতিহাসিক পর্যটন দপ্তরের ভবনে আগুন দেওয়া হয়, যাকে ‘ট্র্যাজেডি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন শহরটির মেয়র গ্রেগরি দুসেত। সাঁ-এতিয়েন শহরে গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া মার্সেই, রেন, তুলুজ, আঞ্জেস ও গ্রেনোবলসহ একাধিক শহরে ব্যাপক সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। লিলের একটি অ্যাপল স্টোরে ঢুকে ব্যাপকভাবে লুটপাট চালানো হয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা ‘লিসে’গুলোতে তীব্র শিক্ষকসংকট ও অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছিলেন। শনিবার তাদের এই আন্দোলনে যোগ দেন ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য ও ২০১৮ সালের আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ (হলুদ জ্যাকেট) আন্দোলনের কর্মীরা। শিক্ষা খাতের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
সামনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে এই আন্দোলন রাজনৈতিক মাঠেও চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুললেও লুটপাটের নিন্দা জানান। তবে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু একে ‘কপটতা’ বলে মন্তব্য করে অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই সহিংসতা উসকে দেওয়া হচ্ছে। উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মারিন লে পেনও সহিংস আচরণের জন্য উগ্র বামপন্থীদের দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর আইনি শাস্তির মুখে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
এর আগে বিক্ষোভ দমাতে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রে অতিরিক্ত তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিলেও আন্দোলন থামেনি। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বলপ্রয়োগ করে এই অসন্তোষ দমন সম্ভব নয়; বরং শিক্ষা খাতের মৌলিক সংস্কার ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না নিলে ফ্রান্সের এই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
/

আপনার মতামত লিখুন