সংবাদ

মানুষের আত্মার ওজন কি সত্যিই ২১ গ্রাম?


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

মানুষের আত্মার ওজন কি সত্যিই ২১ গ্রাম?

মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা শরীর ছেড়ে চলে যায় কি না, সেই প্রশ্ন বহুদিন ধরেই মানুষের কৌতূহলের বিষয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে আত্মার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অস্তিত্ব কিংবা ওজন নির্ধারণের কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেই। তা সত্ত্বেও ১৯০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক চিকিৎসক দাবি করেছিলেন, মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের শরীর থেকে ২১ গ্রাম ওজন কমে যায়। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ থেকেই জন্ম নেয় ‘২১ গ্রাম পরীক্ষা’ নিয়ে আলোচনা।

চিকিৎসক ডানকান ম্যাকডুগাল যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের হ্যাভারহিলে কর্মরত ছিলেন। মৃত্যুর আগে ও পরে মানুষের শরীরের ওজন তুলনা করে আত্মার ওজন নির্ধারণের চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল অ্যামেরিকান মেডিসিন সাময়িকীতে। তবে পরীক্ষার ফল, পদ্ধতি এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

কীভাবে করা হয়েছিল ২১ গ্রাম পরীক্ষা?

ম্যাকডুগাল তাঁর পরীক্ষার জন্য নার্সিং হোমে থাকা ছয়জন মৃত্যুপথযাত্রীকে বেছে নেন। তাঁদের মধ্যে চারজন যক্ষ্মায় এবং একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ষষ্ঠ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে রোগীদের বিছানাসহ বিশেষ ধরনের বড় ওজন মাপার যন্ত্রে রাখা হয়। চিকিৎসক পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলেন, মৃত্যুর মুহূর্তে শরীরের ওজনে কোনো পরিবর্তন ঘটে কি না।

ম্যাকডুগালের দাবি অনুযায়ী, একজন রোগীর মৃত্যুর সময় শরীরের ওজন ২১ দশমিক ৩ গ্রাম কমে যায়। তিনি এই পরিবর্তনকে আত্মা শরীর ছেড়ে চলে যাওয়ার সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। পরে তাঁর এই দাবি জনপ্রিয়ভাবে ‘আত্মার ওজন ২১ গ্রাম’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বাকি পাঁচজনের পরীক্ষায় কী পাওয়া গিয়েছিল?

ছয়জনের ওপর পরীক্ষা চালালেও ম্যাকডুগাল সব ফলকে সমানভাবে গ্রহণ করেননি। তাঁর পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু অসংগতি দেখা যায়।

·         একজনের মৃত্যুর সময় ওজন কমলেও পরে আবার বেড়ে যায়।

·         অন্য দুজনের ক্ষেত্রে প্রথমে ওজন কমে, পরে তা আরও বেশি বেড়ে যায়।

·         আরেকটি পরীক্ষায় ওজন মাপার যন্ত্রের যথাযথ সমন্বয় ছিল না।

·         ষষ্ঠ রোগীর মৃত্যু হয় যন্ত্রের পরিমাপ ঠিক করার সময়।

ফলে ছয়টি পরীক্ষার মধ্যে মাত্র একটি ফলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আত্মার ওজন সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছান ম্যাকডুগাল। কিন্তু একটি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কুকুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়েও মেলেনি প্রমাণ

মানুষের ওপর পরীক্ষার পর ম্যাকডুগাল ১৫টি কুকুরের ওপর একই ধরনের পরীক্ষা চালান। তাঁর দাবি ছিল, কুকুরগুলোর মৃত্যুর সময় ওজনে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এ থেকে তিনি ধারণা করেন, মানুষের আত্মা আছে, কিন্তু কুকুরের নেই।

তবে এই সিদ্ধান্তও পরীক্ষার ফল দিয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ওজনে পরিবর্তন না দেখা যাওয়াকে আত্মার অনুপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

কেন পরীক্ষাটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে?

বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের গবেষক ডোনাল্ড এভারহার্টের মতে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাই এই ফলকে নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া বিছানাসহ ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহার করে আত্মার মতো অধরা বিষয় পরিমাপ করা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

গবেষণাটির আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অন্য কোনো গবেষক একই পরীক্ষা পুনরায় চালিয়ে ম্যাকডুগালের ফল নিশ্চিত করতে পারেননি। বৈজ্ঞানিক দাবির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে স্বাধীনভাবে একই পরীক্ষা পুনরাবৃত্তি করে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফল পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় হলেও ২১ গ্রামের দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই

ম্যাকডুগালের পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আত্মার ওজন ২১ গ্রাম - এই ধারণা বিভিন্ন মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ২১ গ্রাম চলচ্চিত্রও বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় আনে।

তবে কোনো ধারণা জনপ্রিয় হওয়া আর তার বৈজ্ঞানিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক বিষয় নয়। ম্যাকডুগালের পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং স্বাধীনভাবে ফল পুনরায় নিশ্চিত করতে না পারার কারণে মানুষের আত্মার ওজন ২১ গ্রাম - এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


মানুষের আত্মার ওজন কি সত্যিই ২১ গ্রাম?

প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা শরীর ছেড়ে চলে যায় কি না, সেই প্রশ্ন বহুদিন ধরেই মানুষের কৌতূহলের বিষয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে আত্মার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অস্তিত্ব কিংবা ওজন নির্ধারণের কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেই। তা সত্ত্বেও ১৯০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক চিকিৎসক দাবি করেছিলেন, মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের শরীর থেকে ২১ গ্রাম ওজন কমে যায়। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ থেকেই জন্ম নেয় ‘২১ গ্রাম পরীক্ষা’ নিয়ে আলোচনা।

চিকিৎসক ডানকান ম্যাকডুগাল যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের হ্যাভারহিলে কর্মরত ছিলেন। মৃত্যুর আগে ও পরে মানুষের শরীরের ওজন তুলনা করে আত্মার ওজন নির্ধারণের চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল অ্যামেরিকান মেডিসিন সাময়িকীতে। তবে পরীক্ষার ফল, পদ্ধতি এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

কীভাবে করা হয়েছিল ২১ গ্রাম পরীক্ষা?

ম্যাকডুগাল তাঁর পরীক্ষার জন্য নার্সিং হোমে থাকা ছয়জন মৃত্যুপথযাত্রীকে বেছে নেন। তাঁদের মধ্যে চারজন যক্ষ্মায় এবং একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ষষ্ঠ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে রোগীদের বিছানাসহ বিশেষ ধরনের বড় ওজন মাপার যন্ত্রে রাখা হয়। চিকিৎসক পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলেন, মৃত্যুর মুহূর্তে শরীরের ওজনে কোনো পরিবর্তন ঘটে কি না।

ম্যাকডুগালের দাবি অনুযায়ী, একজন রোগীর মৃত্যুর সময় শরীরের ওজন ২১ দশমিক ৩ গ্রাম কমে যায়। তিনি এই পরিবর্তনকে আত্মা শরীর ছেড়ে চলে যাওয়ার সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। পরে তাঁর এই দাবি জনপ্রিয়ভাবে ‘আত্মার ওজন ২১ গ্রাম’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বাকি পাঁচজনের পরীক্ষায় কী পাওয়া গিয়েছিল?

ছয়জনের ওপর পরীক্ষা চালালেও ম্যাকডুগাল সব ফলকে সমানভাবে গ্রহণ করেননি। তাঁর পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু অসংগতি দেখা যায়।

·         একজনের মৃত্যুর সময় ওজন কমলেও পরে আবার বেড়ে যায়।

·         অন্য দুজনের ক্ষেত্রে প্রথমে ওজন কমে, পরে তা আরও বেশি বেড়ে যায়।

·         আরেকটি পরীক্ষায় ওজন মাপার যন্ত্রের যথাযথ সমন্বয় ছিল না।

·         ষষ্ঠ রোগীর মৃত্যু হয় যন্ত্রের পরিমাপ ঠিক করার সময়।

ফলে ছয়টি পরীক্ষার মধ্যে মাত্র একটি ফলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আত্মার ওজন সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছান ম্যাকডুগাল। কিন্তু একটি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কুকুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়েও মেলেনি প্রমাণ

মানুষের ওপর পরীক্ষার পর ম্যাকডুগাল ১৫টি কুকুরের ওপর একই ধরনের পরীক্ষা চালান। তাঁর দাবি ছিল, কুকুরগুলোর মৃত্যুর সময় ওজনে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এ থেকে তিনি ধারণা করেন, মানুষের আত্মা আছে, কিন্তু কুকুরের নেই।

তবে এই সিদ্ধান্তও পরীক্ষার ফল দিয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ওজনে পরিবর্তন না দেখা যাওয়াকে আত্মার অনুপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

কেন পরীক্ষাটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে?

বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের গবেষক ডোনাল্ড এভারহার্টের মতে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাই এই ফলকে নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া বিছানাসহ ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহার করে আত্মার মতো অধরা বিষয় পরিমাপ করা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

গবেষণাটির আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অন্য কোনো গবেষক একই পরীক্ষা পুনরায় চালিয়ে ম্যাকডুগালের ফল নিশ্চিত করতে পারেননি। বৈজ্ঞানিক দাবির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে স্বাধীনভাবে একই পরীক্ষা পুনরাবৃত্তি করে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফল পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় হলেও ২১ গ্রামের দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই

ম্যাকডুগালের পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আত্মার ওজন ২১ গ্রাম - এই ধারণা বিভিন্ন মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ২১ গ্রাম চলচ্চিত্রও বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় আনে।

তবে কোনো ধারণা জনপ্রিয় হওয়া আর তার বৈজ্ঞানিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক বিষয় নয়। ম্যাকডুগালের পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং স্বাধীনভাবে ফল পুনরায় নিশ্চিত করতে না পারার কারণে মানুষের আত্মার ওজন ২১ গ্রাম - এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত