সংবাদ

ঐতিহ্যের বিকৃতি: বাসিয়াহাট মেলা কেন ‘বউমেলা’ হলো


ষ্টেফান সরেন
ষ্টেফান সরেন
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৮ এএম

ঐতিহ্যের বিকৃতি: বাসিয়াহাট মেলা কেন ‘বউমেলা’ হলো
এই ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোপালগঞ্জের একটি ঐতিহ্যবাহী মেলাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর ও মুখরোচক তথ্য ছড়াতে দেখা গেছে। মেলাটিকে ‘বউমেলা’ বা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ হিসেবে উপস্থাপন করায় আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিবাহরীতি ও সামাজিক প্রথা নিয়ে অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের মনগড়া বর্ণনা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে নারীদের আত্মসম্মানকেও হেয় করা হচ্ছে।

প্রতি বছরের মতো এবারও ২৩ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বাসিয়াহাট মেলা’, যা ‘বাসিয়া মেলা’ নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে মেলাটি শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরদিন অনুষ্ঠিত হয়। মেলার প্রধান পুরোহিত একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ। এখানে আদিবাসীদের পুরোহিত হওয়ার কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই। মেলায় আদিবাসী তরুণ-তরুণী ও নারী-পুরুষের পাশাপাশি সনাতন ও ইসলাম ধর্মাবলম্বী স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

এই ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা। এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ‘দাসায় নাচ’ ও গান। দাসায় নাচ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস, সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই নাচের মাধ্যমে সাঁওতালরা পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলেছেন।

স্থানীয় আদিবাসী নারীশিল্পী ও সমাজসেবিকা রিতা হেমব্রমের মতে, বীরগঞ্জের এই আদিবাসী মিলনমেলাকে ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘বউমেলা’ হিসেবে প্রচার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মূলত নিজস্ব পোশাক ও সংস্কৃতি উদ্‌যাপনের জন্য দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আদিবাসীরা এখানে আসেন। তাদের দাসায় নাচ, গান ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের সমাগমেই মেলাটি পূর্ণতা পায়। তাই এই ঐতিহাসিক মিলনমেলা আদিবাসীদের সংস্কৃতি, পরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

তথ্য যাচাই না করে সংবাদ ও ভিডিও ছড়িয়ে দিলে সমাজে কতটা ক্ষতি হতে পারে, তা অনেকেই হয়তো উপলব্ধি করেন না। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব আদিবাসী সমাজে পড়েছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের জন্য সাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতাদের দায় থাকলেও মেলা আয়োজকদের অসচেতনতাও কম দায়ী নয়। মূলধারার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও বিভিন্ন সময়ে মেলাটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, প্রথম আলো ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর ‘পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজতে ২০০ বছর ধরে যেখানে জড়ো হন তরুণ-তরুণীরা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অথচ ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর একই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার ঐতিহ্য নেই, তবু টিকে আছে দিনাজপুরের মেলাটি’। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর যুগান্তরে ‘যে মেলায় মেলে পছন্দের জীবনসঙ্গী’, ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর দৈনিক টাইমস ন্যাশনালে ‘দিনাজপুরে বসছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’’ এবং ২০ অক্টোবর বাংলা টেলিগ্রাফে ‘২০০ বছরের ‘বউ মেলা’র ভেতর-বাহির’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব শিরোনাম মেলাটির প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য ও বীরগঞ্জ থানা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক শ্যামলাল মুরমু জানান, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মেলা শুরু করে গেছেন, আমরা কেবল তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করছি। তবে ঠিক কবে থেকে এ মেলার প্রচলন শুরু হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। মেলায় সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ অংশ নেন।’

ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর সংবাদ, সাক্ষাৎকার ও অপপ্রচার রোধে আয়োজক কমিটিকে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, তথ্যপুস্তিকা বিতরণ: মেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে একটি তথ্যপুস্তিকা বা প্রচারপত্র প্রকাশ করা যেতে পারে। মেলার প্রবেশদ্বারে তা দর্শনার্থীদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে, যাতে তারা সঠিক তথ্য জানতে পারেন। সাংবাদিকদের জন্য আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, তথ্য ও প্রচার সম্পাদক নিয়োগ: মেলা কমিটির একজন নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রচার সম্পাদক থাকা দরকার। তিনি প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক ও দর্শনার্থীদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা বিকৃতভাবে প্রকাশ কিংবা হয়রানির উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মেলায় সাংবাদিক ও ইউটিউবারদের পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সংবাদ সংগ্রহের অধিকারও বিবেচনায় রাখতে হবে।

চতুর্থত, স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন ও নজরদারি: নির্দিষ্ট টি-শার্ট, টুপি ও পরিচয়পত্রধারী স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা প্রয়োজন। তারা মেলাপ্রাঙ্গণে শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন এবং দর্শনার্থীদের, বিশেষ করে নারীদের, হয়রানি প্রতিরোধে কাজ করবেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত আয়োজক কমিটিকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

পঞ্চমত, মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা: মেলাপ্রাঙ্গণে নিয়মিত মাইকিং করে দর্শনার্থীদের সচেতন করতে হবে। অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ করে কাউকে হয়রানি করা কিংবা মেলার পরিবেশ নষ্ট করার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা প্রচার করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার শিলদার কাছে ওড়গোন্দায় অনুষ্ঠিত পাঁটাবিন্দো মেলার কথা উল্লেখ করা যায়। বিজয়া দশমীর পরদিন শুরু হওয়া এ মেলায় পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্য এবং বাংলাদেশ থেকে মানুষ অংশ নেন। এই বৈচিত্র্যময় সমাগমের কারণে মেলাটি আন্তর্জাতিক সাঁওতাল মেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এটি শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং সাঁওতাল সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। এখানে হস্তশিল্প, কৃষি উপকরণ, সাংস্কৃতিক সামগ্রী, পোশাক, অলংকার, বাসনপত্র ও বাদ্যযন্ত্র পাওয়া যায়। আদিবাসী নাচ, গান, লোককাহিনি এবং তাদের হাতে তৈরি বিশেষ খাবার—যেমন মাংস পিঠা, হাও রিং ও সাং তিকি—মেলাটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এ আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি সংস্কৃতি সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলাটিও এমন একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্র। এখানে সাঁওতাল, ওরাঁও, পাহান, মাহাতোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অংশ নেন। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলা থেকেও বহু মানুষ মেলায় আসেন। এই আয়োজন আদিবাসীদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, নাচ ও গানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

তাই মেলাটির প্রকৃত পরিচয় ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। গণমাধ্যমে আদিবাসীদের পরিচয় উঠে আসুক মর্যাদার সঙ্গে, আর সংবাদ প্রকাশিত হোক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে। আয়োজক কমিটি কার্যকর উদ্যোগ নিলে মেলাটিকে ঘিরে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদেরও কোনো শিরোনাম বা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করতে হবে। কারণ, একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি নিয়ে ভুল বর্ণনা শুধু তাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করে না, সমাজেও বিভাজন তৈরি করতে পারে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬


ঐতিহ্যের বিকৃতি: বাসিয়াহাট মেলা কেন ‘বউমেলা’ হলো

প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোপালগঞ্জের একটি ঐতিহ্যবাহী মেলাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর ও মুখরোচক তথ্য ছড়াতে দেখা গেছে। মেলাটিকে ‘বউমেলা’ বা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ হিসেবে উপস্থাপন করায় আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিবাহরীতি ও সামাজিক প্রথা নিয়ে অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের মনগড়া বর্ণনা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে নারীদের আত্মসম্মানকেও হেয় করা হচ্ছে।

প্রতি বছরের মতো এবারও ২৩ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বাসিয়াহাট মেলা’, যা ‘বাসিয়া মেলা’ নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে মেলাটি শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরদিন অনুষ্ঠিত হয়। মেলার প্রধান পুরোহিত একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ। এখানে আদিবাসীদের পুরোহিত হওয়ার কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই। মেলায় আদিবাসী তরুণ-তরুণী ও নারী-পুরুষের পাশাপাশি সনাতন ও ইসলাম ধর্মাবলম্বী স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

এই ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা। এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ‘দাসায় নাচ’ ও গান। দাসায় নাচ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস, সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই নাচের মাধ্যমে সাঁওতালরা পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলেছেন।

স্থানীয় আদিবাসী নারীশিল্পী ও সমাজসেবিকা রিতা হেমব্রমের মতে, বীরগঞ্জের এই আদিবাসী মিলনমেলাকে ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘বউমেলা’ হিসেবে প্রচার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মূলত নিজস্ব পোশাক ও সংস্কৃতি উদ্‌যাপনের জন্য দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আদিবাসীরা এখানে আসেন। তাদের দাসায় নাচ, গান ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের সমাগমেই মেলাটি পূর্ণতা পায়। তাই এই ঐতিহাসিক মিলনমেলা আদিবাসীদের সংস্কৃতি, পরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

তথ্য যাচাই না করে সংবাদ ও ভিডিও ছড়িয়ে দিলে সমাজে কতটা ক্ষতি হতে পারে, তা অনেকেই হয়তো উপলব্ধি করেন না। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব আদিবাসী সমাজে পড়েছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের জন্য সাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতাদের দায় থাকলেও মেলা আয়োজকদের অসচেতনতাও কম দায়ী নয়। মূলধারার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও বিভিন্ন সময়ে মেলাটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, প্রথম আলো ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর ‘পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজতে ২০০ বছর ধরে যেখানে জড়ো হন তরুণ-তরুণীরা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অথচ ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর একই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার ঐতিহ্য নেই, তবু টিকে আছে দিনাজপুরের মেলাটি’। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর যুগান্তরে ‘যে মেলায় মেলে পছন্দের জীবনসঙ্গী’, ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর দৈনিক টাইমস ন্যাশনালে ‘দিনাজপুরে বসছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’’ এবং ২০ অক্টোবর বাংলা টেলিগ্রাফে ‘২০০ বছরের ‘বউ মেলা’র ভেতর-বাহির’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব শিরোনাম মেলাটির প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য ও বীরগঞ্জ থানা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক শ্যামলাল মুরমু জানান, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মেলা শুরু করে গেছেন, আমরা কেবল তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করছি। তবে ঠিক কবে থেকে এ মেলার প্রচলন শুরু হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। মেলায় সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ অংশ নেন।’

ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর সংবাদ, সাক্ষাৎকার ও অপপ্রচার রোধে আয়োজক কমিটিকে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, তথ্যপুস্তিকা বিতরণ: মেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে একটি তথ্যপুস্তিকা বা প্রচারপত্র প্রকাশ করা যেতে পারে। মেলার প্রবেশদ্বারে তা দর্শনার্থীদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে, যাতে তারা সঠিক তথ্য জানতে পারেন। সাংবাদিকদের জন্য আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, তথ্য ও প্রচার সম্পাদক নিয়োগ: মেলা কমিটির একজন নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রচার সম্পাদক থাকা দরকার। তিনি প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক ও দর্শনার্থীদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা বিকৃতভাবে প্রকাশ কিংবা হয়রানির উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মেলায় সাংবাদিক ও ইউটিউবারদের পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সংবাদ সংগ্রহের অধিকারও বিবেচনায় রাখতে হবে।

চতুর্থত, স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন ও নজরদারি: নির্দিষ্ট টি-শার্ট, টুপি ও পরিচয়পত্রধারী স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা প্রয়োজন। তারা মেলাপ্রাঙ্গণে শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন এবং দর্শনার্থীদের, বিশেষ করে নারীদের, হয়রানি প্রতিরোধে কাজ করবেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত আয়োজক কমিটিকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

পঞ্চমত, মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা: মেলাপ্রাঙ্গণে নিয়মিত মাইকিং করে দর্শনার্থীদের সচেতন করতে হবে। অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ করে কাউকে হয়রানি করা কিংবা মেলার পরিবেশ নষ্ট করার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা প্রচার করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার শিলদার কাছে ওড়গোন্দায় অনুষ্ঠিত পাঁটাবিন্দো মেলার কথা উল্লেখ করা যায়। বিজয়া দশমীর পরদিন শুরু হওয়া এ মেলায় পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্য এবং বাংলাদেশ থেকে মানুষ অংশ নেন। এই বৈচিত্র্যময় সমাগমের কারণে মেলাটি আন্তর্জাতিক সাঁওতাল মেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এটি শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং সাঁওতাল সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। এখানে হস্তশিল্প, কৃষি উপকরণ, সাংস্কৃতিক সামগ্রী, পোশাক, অলংকার, বাসনপত্র ও বাদ্যযন্ত্র পাওয়া যায়। আদিবাসী নাচ, গান, লোককাহিনি এবং তাদের হাতে তৈরি বিশেষ খাবার—যেমন মাংস পিঠা, হাও রিং ও সাং তিকি—মেলাটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এ আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি সংস্কৃতি সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলাটিও এমন একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্র। এখানে সাঁওতাল, ওরাঁও, পাহান, মাহাতোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অংশ নেন। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলা থেকেও বহু মানুষ মেলায় আসেন। এই আয়োজন আদিবাসীদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, নাচ ও গানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

তাই মেলাটির প্রকৃত পরিচয় ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। গণমাধ্যমে আদিবাসীদের পরিচয় উঠে আসুক মর্যাদার সঙ্গে, আর সংবাদ প্রকাশিত হোক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে। আয়োজক কমিটি কার্যকর উদ্যোগ নিলে মেলাটিকে ঘিরে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদেরও কোনো শিরোনাম বা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করতে হবে। কারণ, একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি নিয়ে ভুল বর্ণনা শুধু তাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করে না, সমাজেও বিভাজন তৈরি করতে পারে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত