সংবাদ

লো অল্টিটিউড ইকোনমি: নিচু আকাশে নতুন অর্থনীতি


মুহাম্মাদ আলতামিশ নাবিল
মুহাম্মাদ আলতামিশ নাবিল
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম

লো অল্টিটিউড ইকোনমি: নিচু আকাশে নতুন অর্থনীতি

ধরা যাক, ভোলার কোনো চরে একটি ছোট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি ওষুধ প্রয়োজন। ওষুধটি আছে উপজেলা সদরে। দূরত্ব আহামরি তেমন বেশি নয়, কিন্তু পৌঁছানোর পথে রয়েছে নদী, ঘাটে ট্রলারের জন্য অপেক্ষা আর দূর্গম রাস্তা। এবার চিন্তা করে দেখুন, অনুমোদিত একটি ড্রোন নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সেই ওষুধ নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিল। দৃশ্যটি আমাদের দেশের জন্য এখনো একটি সম্ভাবনার ছবি। তবে এমন সেবাকে ঘিরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গড়ে উঠছে অর্থনীতির নতুন এক পরিসর।

এর নাম ‘লো অল্টিটিউড ইকোনমি’, সংক্ষেপে এলএই। বাংলায় বলা যায় ‘নিম্ন আকাশসীমাভিত্তিক অর্থনীতি’। নামটি কিছুটা ভারী শোনালেও ধারণাটি বোঝা কঠিন নয়। ভূমির তুলনামূলক কাছাকাছি আকাশে চলাচলকারী উড়োযান দিয়ে পণ্য পরিবহন, কৃষিকাজ, জরিপ, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অন্যান্য সেবা দেওয়া এবং এসব কার্যক্রমকে ঘিরে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এর মূল কথা। উড়োযান তৈরি, মেরামত, ব্যাটারি, সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ উড্ডয়ন ব্যবস্থাপনাও এই অর্থনীতির অংশ।

ড্রোনের সঙ্গে আমাদের অনেকের পরিচয় হয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা পর্যটনকেন্দ্রের আকাশ থেকে তোলা ভিডিও দেখে। সেই পরিচিত যন্ত্রই ভিন্ন প্রযুক্তি ও অনুমোদন নিয়ে পণ্য বহন করতে পারে, জমির ছবি বিশ্লেষণে সাহায্য করতে পারে কিংবা দুর্যোগের পরে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। চালকবিহীন উড়োযান বা ইউএভির পাশাপাশি বিদ্যুৎচালিত, খাড়াভাবে ওঠানামা করতে সক্ষম ইভিটলও এই আলোচনায় আসে। যাত্রী পরিবহন এর একটি সম্ভাব্য ব্যবহার। তবে বাংলাদেশের প্রাথমিক প্রয়োজন বিবেচনায় ছোট পণ্য পরিবহন ও জনসেবামূলক কাজের দিকেই আমার আগ্রহ বেশি।

প্রচলিত বিমান পরিবহনে আমরা সাধারণত বিমানবন্দর, বড় উড়োজাহাজ এবং দীর্ঘ দূরত্বের কথা ভাবি। এলএইর অনেক ব্যবহার স্থানীয় ও স্বল্প দূরত্বের। একটি উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন জনপদে প্রয়োজনীয় কিছু পাঠানো কিংবা একটি কৃষিজমির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করাও এখানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তবে ‘নিচু আকাশ’ বলতে সব দেশে একই উচ্চতা বা একই অনুমতি বোঝায় না। কোথায়, কত উঁচুতে এবং কী উদ্দেশ্যে উড়া যাবে, তা সংশ্লিষ্ট দেশের বিধিবিধান ও অনুমোদনের বিষয়।

চীন এই খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটিতে ড্রোন ডেলিভারি, জরুরি উদ্ধার, বিদ্যুৎ অবকাঠামো পরিদর্শনসহ বিভিন্ন কাজে এর ব্যবহার সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য সেখান থেকে শেখার বিষয় হলো, একটি ড্রোন কেনার সঙ্গে একটি কার্যকর সেবা গড়ে তোলার পার্থক্য রয়েছে। প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজন অবকাঠামো, দক্ষ মানুষ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিয়মিত সেবার চাহিদা।

আমাদের দেশের মানচিত্রের দিকে তাকালেই সম্ভাবনার কিছু জায়গা চোখে পড়ে। নদী, চর, উপকূল এবং দ্বীপাঞ্চলে যাতায়াতের দূরত্ব ও সময়ের মধ্যে অনেক সময় বড় ব্যবধান থাকে। সরলরেখায় কাছাকাছি দুটি জায়গায় যেতে ঘুরপথ পাড়ি দিতে হয়। এসব এলাকায় নির্দিষ্ট ধরনের পরিবহনে আকাশপথের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

শুরুর জায়গা হতে পারে স্বাস্থ্যসেবা। জরুরি ওষুধ, ছোট চিকিৎসাসামগ্রী কিংবা পরীক্ষাগারে পাঠানোর নমুনা বহনে ড্রোনের সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্য ওষুধের মান, নমুনার নিরাপত্তা, তাপমাত্রা এবং গ্রহণকারীর পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু দ্রুত পৌঁছালেই চিকিৎসাসেবার দায়িত্ব শেষ হয় না।

এ ধরনের ব্যবহারের বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দুর্গম পথ অতিক্রম করে ড্রোনের মাধ্যমে টিকা পৌঁছানো হয়েছিল। বাংলাদেশের ভূগোল ও পরিচালনব্যবস্থা ভিন্ন। তবু বিচ্ছিন্ন জনপদে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ঘটনাটি আমাদের ভাবনার খোরাক জোগায়।

ই-কমার্সেও বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ আছে। শহরে বসে অনলাইনে পণ্য অর্ডার করা যত সহজ, প্রত্যন্ত এলাকায় সেই পণ্য গ্রহণের অভিজ্ঞতা সব সময় তেমন নয়। চরাঞ্চলের একজন ক্রেতার ছোট পার্সেল কিংবা কোনো দোকানের জরুরি যন্ত্রাংশ নির্দিষ্ট সংগ্রহকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। উপজেলা পর্যায়ে একটি কেন্দ্র থেকে ড্রোনে পণ্য যাবে স্থানীয় গ্রহণকেন্দ্রে। সেখান থেকে ক্রেতা সংগ্রহ করবেন অথবা স্থানীয় কর্মী শেষ অংশটুকু পৌঁছে দেবেন।

তবে প্রতিটি পণ্য আকাশে পাঠানোর হিসাব মিলবে না। চালের বস্তা, নির্মাণসামগ্রী কিংবা ভারী পণ্যের জন্য নৌকা ও ট্রাকের গুরুত্ব যথারীতি থাকবে। ড্রোনের প্রাথমিক ব্যবহার বাছাই করতে হবে পণ্যের ওজন, সময়ের প্রয়োজন এবং বিকল্প পরিবহনের খরচ দেখে। একটি জরুরি ওষুধ দ্রুত পৌঁছানোর মূল্য আর একটি সাধারণ পার্সেল কয়েক ঘণ্টা আগে পৌঁছানোর মূল্য এক নয়। ব্যবসার পরিকল্পনায় এই পার্থক্যটি বুঝতে হবে।

কৃষিতেও কাজের সুযোগ রয়েছে। জমির ছবি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় ফসলের অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে বা কোথায় আরও পরীক্ষা প্রয়োজন, তা শনাক্ত করার সেবা তৈরি হতে পারে। ছোট কৃষকের পক্ষে নিজস্ব ড্রোন কেনার প্রয়োজন নেই। সমবায় কিংবা স্থানীয় উদ্যোক্তার মাধ্যমে জমির পরিমাণ অনুযায়ী সেবা নেওয়ার ব্যবস্থা পরীক্ষা করা যায়। তবে ছবি সংগ্রহের পর কৃষক কী সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই পরামর্শ দেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।

উপকূলীয় এলাকায় বাঁধের অবস্থা দেখা, নদীভাঙনের পরিবর্তন নথিবদ্ধ করা এবং দুর্যোগের পরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চিহ্নিত করাও সম্ভাব্য ব্যবহার। এখানে একটি সীমা মনে রাখা জরুরি। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র বাতাসের মধ্যে ড্রোন পাঠানোকে সাধারণ সমাধান ভাবার সুযোগ নেই। আবহাওয়া নিরাপদ হলে তথ্য সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানোর কাজে এর ভূমিকা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করার সুবাদে বিষয়টির সফটওয়্যারভিত্তিক সম্ভাবনা আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। পণ্য বুকিং, রুট পরিকল্পনা, অবস্থান পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডেলিভারির প্রমাণ এবং গ্রাহকের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা প্রয়োজন হবে। স্থানীয় সমস্যার জন্য এসব সমাধান তৈরিতে বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে।

তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন নিয়েও এখানে ভাবা দরকার। ড্রোন পরিচালনার পাশাপাশি যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, মানচিত্র তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, ব্যাটারির নিরাপত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তায় কাজ তৈরি হতে পারে। আমার কাছে প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শেখার পরে সেই দক্ষতা কোথায় কাজে লাগবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিকের প্রশিক্ষণকে বাস্তব পরীক্ষামূলক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা দিয়ে কর্মসংস্থানের সাফল্য মাপা যাবে না।

বাংলাদেশে শুরুটা হতে পারে ‘চরসেতু’ নামের একটি সীমিত পরীক্ষামূলক উদ্যোগ দিয়ে। চর অর্থ নদীর বুকে জেগে ওঠা জনপদ, ইংরেজিতে ‘রিভার আইল্যান্ড’; সেতু অর্থ সংযোগের পথ বা ‘ব্রিজ’। চরসেতুর ভাবনা হবে বিচ্ছিন্ন জনপদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেবার নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে তোলা।

প্রথমে দক্ষিণাঞ্চলের একটি উপযুক্ত উপজেলা এবং কাছের এক বা দুটি চরের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। বরিশাল বিভাগের কোনো নদীবেষ্টিত এলাকা প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় আসতে পারে। সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া গেলে খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপযোগী এলাকাতেও পরীক্ষা সম্প্রসারণ করা যাবে। শুরুতেই প্রতিটি জেলা-উপজেলায় কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার চাপ বাড়াবে।

উদ্যোগটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে পরিচালনার সুযোগ আছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও জনসেবার চাহিদা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি ও পরিচালনা সেবা দিতে পারে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যবসায়ী, তরুণ উদ্যোক্তা এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে পারে ব্যবহার ও মূল্যায়নে। জনস্বার্থে কোনো ভর্তুকি প্রয়োজন হলে কারা সুবিধা পাবেন, কত দিন সহায়তা চলবে এবং তার ফল কী হবে, তা আগে থেকেই স্পষ্ট রাখা দরকার।

নিরাপত্তা ও অনুমোদনের বিষয়টি শুরু থেকেই পরিকল্পনায় থাকতে হবে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে ড্রোনসংক্রান্ত সার্কুলার ও উড্ডয়নের আবেদনপদ্ধতির তথ্য রয়েছে। প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য অনুমোদন যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে অপারেটরের সরাসরি দৃষ্টিসীমার বাইরে পণ্য পাঠানোর মতো কার্যক্রম সাধারণ ড্রোন ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে করা যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।

পাশাপাশি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে করণীয়, নিরাপদ অবতরণ, দুর্ঘটনার দায়, বীমা এবং মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষকে জানাতে হবে ড্রোন কী বহন করছে, ছবি তুলছে কি না এবং অভিযোগ জানাবেন কোথায়। গ্রহণযোগ্যতা তৈরির এই কাজ বাদ দিয়ে প্রযুক্তি চালু করলে সেবার প্রতি আস্থা তৈরি করা কঠিন হবে।

পরীক্ষামূলক প্রকল্প শেষে হিসাবটিও পরিষ্কার হতে হবে। প্রতিটি সফল ডেলিভারিতে মোট খরচ কত, কত সময় বাঁচল, আবহাওয়ার কারণে কত দিন সেবা বন্ধ থাকল এবং মানুষ সেবাটি ব্যবহার করতে আগ্রহী কি না, তা প্রকাশ করা উচিত। ব্যাটারি বদল, মেরামত, কর্মীদের বেতন ও বিকল্প পরিবহনের খরচও সেই হিসাবে আসবে।

বাংলাদেশের জন্য এলএইর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, পরিচিত কিছু সমস্যাকে নতুনভাবে সমাধানের সুযোগ। চরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছানো, কৃষককে কাজে লাগার মতো তথ্য দেওয়া কিংবা স্থানীয় তরুণের জন্য দক্ষতাভিত্তিক আয় তৈরি করা দিয়ে এর মূল্য বোঝা যাবে। আমাদের প্রথম পদক্ষেপ তাই হতে পারে ছোট, পরিমাপযোগ্য এবং মানুষের প্রয়োজনের কাছাকাছি। সেই অভিজ্ঞতাই বলে দেবে, বাংলাদেশের নিচু আকাশে নতুন অর্থনীতির পথ কতটা বিস্তৃত হতে পারে।

[লেখক: তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, প্রশিক্ষক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬


লো অল্টিটিউড ইকোনমি: নিচু আকাশে নতুন অর্থনীতি

প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ধরা যাক, ভোলার কোনো চরে একটি ছোট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি ওষুধ প্রয়োজন। ওষুধটি আছে উপজেলা সদরে। দূরত্ব আহামরি তেমন বেশি নয়, কিন্তু পৌঁছানোর পথে রয়েছে নদী, ঘাটে ট্রলারের জন্য অপেক্ষা আর দূর্গম রাস্তা। এবার চিন্তা করে দেখুন, অনুমোদিত একটি ড্রোন নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সেই ওষুধ নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিল। দৃশ্যটি আমাদের দেশের জন্য এখনো একটি সম্ভাবনার ছবি। তবে এমন সেবাকে ঘিরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গড়ে উঠছে অর্থনীতির নতুন এক পরিসর।

এর নাম ‘লো অল্টিটিউড ইকোনমি’, সংক্ষেপে এলএই। বাংলায় বলা যায় ‘নিম্ন আকাশসীমাভিত্তিক অর্থনীতি’। নামটি কিছুটা ভারী শোনালেও ধারণাটি বোঝা কঠিন নয়। ভূমির তুলনামূলক কাছাকাছি আকাশে চলাচলকারী উড়োযান দিয়ে পণ্য পরিবহন, কৃষিকাজ, জরিপ, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অন্যান্য সেবা দেওয়া এবং এসব কার্যক্রমকে ঘিরে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এর মূল কথা। উড়োযান তৈরি, মেরামত, ব্যাটারি, সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ উড্ডয়ন ব্যবস্থাপনাও এই অর্থনীতির অংশ।

ড্রোনের সঙ্গে আমাদের অনেকের পরিচয় হয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা পর্যটনকেন্দ্রের আকাশ থেকে তোলা ভিডিও দেখে। সেই পরিচিত যন্ত্রই ভিন্ন প্রযুক্তি ও অনুমোদন নিয়ে পণ্য বহন করতে পারে, জমির ছবি বিশ্লেষণে সাহায্য করতে পারে কিংবা দুর্যোগের পরে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। চালকবিহীন উড়োযান বা ইউএভির পাশাপাশি বিদ্যুৎচালিত, খাড়াভাবে ওঠানামা করতে সক্ষম ইভিটলও এই আলোচনায় আসে। যাত্রী পরিবহন এর একটি সম্ভাব্য ব্যবহার। তবে বাংলাদেশের প্রাথমিক প্রয়োজন বিবেচনায় ছোট পণ্য পরিবহন ও জনসেবামূলক কাজের দিকেই আমার আগ্রহ বেশি।

প্রচলিত বিমান পরিবহনে আমরা সাধারণত বিমানবন্দর, বড় উড়োজাহাজ এবং দীর্ঘ দূরত্বের কথা ভাবি। এলএইর অনেক ব্যবহার স্থানীয় ও স্বল্প দূরত্বের। একটি উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন জনপদে প্রয়োজনীয় কিছু পাঠানো কিংবা একটি কৃষিজমির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করাও এখানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তবে ‘নিচু আকাশ’ বলতে সব দেশে একই উচ্চতা বা একই অনুমতি বোঝায় না। কোথায়, কত উঁচুতে এবং কী উদ্দেশ্যে উড়া যাবে, তা সংশ্লিষ্ট দেশের বিধিবিধান ও অনুমোদনের বিষয়।

চীন এই খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটিতে ড্রোন ডেলিভারি, জরুরি উদ্ধার, বিদ্যুৎ অবকাঠামো পরিদর্শনসহ বিভিন্ন কাজে এর ব্যবহার সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য সেখান থেকে শেখার বিষয় হলো, একটি ড্রোন কেনার সঙ্গে একটি কার্যকর সেবা গড়ে তোলার পার্থক্য রয়েছে। প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজন অবকাঠামো, দক্ষ মানুষ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিয়মিত সেবার চাহিদা।

আমাদের দেশের মানচিত্রের দিকে তাকালেই সম্ভাবনার কিছু জায়গা চোখে পড়ে। নদী, চর, উপকূল এবং দ্বীপাঞ্চলে যাতায়াতের দূরত্ব ও সময়ের মধ্যে অনেক সময় বড় ব্যবধান থাকে। সরলরেখায় কাছাকাছি দুটি জায়গায় যেতে ঘুরপথ পাড়ি দিতে হয়। এসব এলাকায় নির্দিষ্ট ধরনের পরিবহনে আকাশপথের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

শুরুর জায়গা হতে পারে স্বাস্থ্যসেবা। জরুরি ওষুধ, ছোট চিকিৎসাসামগ্রী কিংবা পরীক্ষাগারে পাঠানোর নমুনা বহনে ড্রোনের সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্য ওষুধের মান, নমুনার নিরাপত্তা, তাপমাত্রা এবং গ্রহণকারীর পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু দ্রুত পৌঁছালেই চিকিৎসাসেবার দায়িত্ব শেষ হয় না।

এ ধরনের ব্যবহারের বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দুর্গম পথ অতিক্রম করে ড্রোনের মাধ্যমে টিকা পৌঁছানো হয়েছিল। বাংলাদেশের ভূগোল ও পরিচালনব্যবস্থা ভিন্ন। তবু বিচ্ছিন্ন জনপদে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ঘটনাটি আমাদের ভাবনার খোরাক জোগায়।

ই-কমার্সেও বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ আছে। শহরে বসে অনলাইনে পণ্য অর্ডার করা যত সহজ, প্রত্যন্ত এলাকায় সেই পণ্য গ্রহণের অভিজ্ঞতা সব সময় তেমন নয়। চরাঞ্চলের একজন ক্রেতার ছোট পার্সেল কিংবা কোনো দোকানের জরুরি যন্ত্রাংশ নির্দিষ্ট সংগ্রহকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। উপজেলা পর্যায়ে একটি কেন্দ্র থেকে ড্রোনে পণ্য যাবে স্থানীয় গ্রহণকেন্দ্রে। সেখান থেকে ক্রেতা সংগ্রহ করবেন অথবা স্থানীয় কর্মী শেষ অংশটুকু পৌঁছে দেবেন।

তবে প্রতিটি পণ্য আকাশে পাঠানোর হিসাব মিলবে না। চালের বস্তা, নির্মাণসামগ্রী কিংবা ভারী পণ্যের জন্য নৌকা ও ট্রাকের গুরুত্ব যথারীতি থাকবে। ড্রোনের প্রাথমিক ব্যবহার বাছাই করতে হবে পণ্যের ওজন, সময়ের প্রয়োজন এবং বিকল্প পরিবহনের খরচ দেখে। একটি জরুরি ওষুধ দ্রুত পৌঁছানোর মূল্য আর একটি সাধারণ পার্সেল কয়েক ঘণ্টা আগে পৌঁছানোর মূল্য এক নয়। ব্যবসার পরিকল্পনায় এই পার্থক্যটি বুঝতে হবে।

কৃষিতেও কাজের সুযোগ রয়েছে। জমির ছবি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় ফসলের অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে বা কোথায় আরও পরীক্ষা প্রয়োজন, তা শনাক্ত করার সেবা তৈরি হতে পারে। ছোট কৃষকের পক্ষে নিজস্ব ড্রোন কেনার প্রয়োজন নেই। সমবায় কিংবা স্থানীয় উদ্যোক্তার মাধ্যমে জমির পরিমাণ অনুযায়ী সেবা নেওয়ার ব্যবস্থা পরীক্ষা করা যায়। তবে ছবি সংগ্রহের পর কৃষক কী সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই পরামর্শ দেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।

উপকূলীয় এলাকায় বাঁধের অবস্থা দেখা, নদীভাঙনের পরিবর্তন নথিবদ্ধ করা এবং দুর্যোগের পরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চিহ্নিত করাও সম্ভাব্য ব্যবহার। এখানে একটি সীমা মনে রাখা জরুরি। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র বাতাসের মধ্যে ড্রোন পাঠানোকে সাধারণ সমাধান ভাবার সুযোগ নেই। আবহাওয়া নিরাপদ হলে তথ্য সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানোর কাজে এর ভূমিকা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করার সুবাদে বিষয়টির সফটওয়্যারভিত্তিক সম্ভাবনা আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। পণ্য বুকিং, রুট পরিকল্পনা, অবস্থান পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডেলিভারির প্রমাণ এবং গ্রাহকের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা প্রয়োজন হবে। স্থানীয় সমস্যার জন্য এসব সমাধান তৈরিতে বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে।

তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন নিয়েও এখানে ভাবা দরকার। ড্রোন পরিচালনার পাশাপাশি যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, মানচিত্র তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, ব্যাটারির নিরাপত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তায় কাজ তৈরি হতে পারে। আমার কাছে প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শেখার পরে সেই দক্ষতা কোথায় কাজে লাগবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিকের প্রশিক্ষণকে বাস্তব পরীক্ষামূলক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা দিয়ে কর্মসংস্থানের সাফল্য মাপা যাবে না।

বাংলাদেশে শুরুটা হতে পারে ‘চরসেতু’ নামের একটি সীমিত পরীক্ষামূলক উদ্যোগ দিয়ে। চর অর্থ নদীর বুকে জেগে ওঠা জনপদ, ইংরেজিতে ‘রিভার আইল্যান্ড’; সেতু অর্থ সংযোগের পথ বা ‘ব্রিজ’। চরসেতুর ভাবনা হবে বিচ্ছিন্ন জনপদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেবার নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে তোলা।

প্রথমে দক্ষিণাঞ্চলের একটি উপযুক্ত উপজেলা এবং কাছের এক বা দুটি চরের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। বরিশাল বিভাগের কোনো নদীবেষ্টিত এলাকা প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় আসতে পারে। সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া গেলে খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপযোগী এলাকাতেও পরীক্ষা সম্প্রসারণ করা যাবে। শুরুতেই প্রতিটি জেলা-উপজেলায় কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার চাপ বাড়াবে।

উদ্যোগটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে পরিচালনার সুযোগ আছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও জনসেবার চাহিদা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি ও পরিচালনা সেবা দিতে পারে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যবসায়ী, তরুণ উদ্যোক্তা এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে পারে ব্যবহার ও মূল্যায়নে। জনস্বার্থে কোনো ভর্তুকি প্রয়োজন হলে কারা সুবিধা পাবেন, কত দিন সহায়তা চলবে এবং তার ফল কী হবে, তা আগে থেকেই স্পষ্ট রাখা দরকার।

নিরাপত্তা ও অনুমোদনের বিষয়টি শুরু থেকেই পরিকল্পনায় থাকতে হবে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে ড্রোনসংক্রান্ত সার্কুলার ও উড্ডয়নের আবেদনপদ্ধতির তথ্য রয়েছে। প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য অনুমোদন যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে অপারেটরের সরাসরি দৃষ্টিসীমার বাইরে পণ্য পাঠানোর মতো কার্যক্রম সাধারণ ড্রোন ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে করা যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।

পাশাপাশি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে করণীয়, নিরাপদ অবতরণ, দুর্ঘটনার দায়, বীমা এবং মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষকে জানাতে হবে ড্রোন কী বহন করছে, ছবি তুলছে কি না এবং অভিযোগ জানাবেন কোথায়। গ্রহণযোগ্যতা তৈরির এই কাজ বাদ দিয়ে প্রযুক্তি চালু করলে সেবার প্রতি আস্থা তৈরি করা কঠিন হবে।

পরীক্ষামূলক প্রকল্প শেষে হিসাবটিও পরিষ্কার হতে হবে। প্রতিটি সফল ডেলিভারিতে মোট খরচ কত, কত সময় বাঁচল, আবহাওয়ার কারণে কত দিন সেবা বন্ধ থাকল এবং মানুষ সেবাটি ব্যবহার করতে আগ্রহী কি না, তা প্রকাশ করা উচিত। ব্যাটারি বদল, মেরামত, কর্মীদের বেতন ও বিকল্প পরিবহনের খরচও সেই হিসাবে আসবে।

বাংলাদেশের জন্য এলএইর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, পরিচিত কিছু সমস্যাকে নতুনভাবে সমাধানের সুযোগ। চরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছানো, কৃষককে কাজে লাগার মতো তথ্য দেওয়া কিংবা স্থানীয় তরুণের জন্য দক্ষতাভিত্তিক আয় তৈরি করা দিয়ে এর মূল্য বোঝা যাবে। আমাদের প্রথম পদক্ষেপ তাই হতে পারে ছোট, পরিমাপযোগ্য এবং মানুষের প্রয়োজনের কাছাকাছি। সেই অভিজ্ঞতাই বলে দেবে, বাংলাদেশের নিচু আকাশে নতুন অর্থনীতির পথ কতটা বিস্তৃত হতে পারে।

[লেখক: তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, প্রশিক্ষক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত