সমাজে যখন অস্থিরতা ও প্রতিহিংসাবোধের প্রকাশ ঘটে, তখন ফকির লালনের কথা মনে হয়। এই সুবর্ণ পলিমাটির দেশে লালনের মতো অসংখ্য মরমি সাধকের জন্ম হয়েছে। এ দেশের মানুষের জীবনদর্শনের প্রকাশ ঘটেছে তাদের সংগীত ও জীবনাচরণের মাধ্যমে। ফকির লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ও সৃষ্টিশীলতা মূলত মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য জীবনদর্শন। তিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সামাজিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। লালনদর্শনকে একটি বৃত্ত কল্পনা করলে এর কেন্দ্রে আছে মানুষ।
আবারও বলি, লালনদর্শনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘মানুষ’। তিনি মনে করতেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সব মানুষের ভেতরেই ঈশ্বর বা ‘মনের মানুষ’ বসবাস করেন। তাই আলাদা করে কোনো উপাসনালয় বা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে মানুষের সেবা ও মনকে চেনা বড় সাধনা।
লালন কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বা গোঁড়া ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। তিনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধসহ সব ধর্মের সংকীর্ণতা ও বিভেদকে অস্বীকার করেছেন। তার গানে মানুষের পরিচয় কোনো জাতিগত বা ধর্মীয় কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। ‘আপনারে আপনি চেনা, সেই বটে উপাসনা’—লালন এই বাণীর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও নিজের ভেতরকার সত্যকে উপলব্ধি করার ওপর জোর দিয়েছেন। মহাত্মা লালনকে উপলব্ধি করতে হলে তার চেতনাকে জানতে হবে। আমরা তার চেতনার উত্তরাধিকারী না হয়ে লালনের মূর্ত রূপের উত্তরাধিকারী হতে চাই, বিপত্তি এখানেই। এর মধ্যে আমরা অনেকেই আছি, যারা লালনের চেতনা ও মূর্ত বাণী—দুটোকেই বাতিল করে দিতে চাই।
বাংলাদেশের মরমি কবিদের দর্শন মূলত সৃষ্টিশীল আধ্যাত্মিকতা, মানবপ্রেম এবং স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের ব্যাকুলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মরমিবাদ বা সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া ও বাউল দর্শনের এক অপূর্ব মিশ্রণে এই অঞ্চলের মরমি সাহিত্য গড়ে উঠেছে। লালন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত এবং শাহ আবদুল করিমের মতো সাধকেরা এই দর্শনের প্রধান ধারক ও বাহক।
লালনের সঙ্গে মরমি সাধকদের সাদৃশ্য থাকলেও লালনদর্শনের সঙ্গে অন্য সাধকদের দর্শনের কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায়। লালনদর্শনের সঙ্গে শাহ আবদুল করিমের দর্শনের কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে। লালন সাঁইয়ের সঙ্গে অন্য মরমি সাধকদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, লালনের সমাজমনস্কতা ও মানবতাবোধ সরাসরি দৃশ্যমান, যা অন্যদের ক্ষেত্রে কিছুটা বিমূর্ত। লালন যেমন গভীরভাবে সমাজমনস্ক ছিলেন এবং সাম্যের সমাজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন, শাহ আবদুল করিমও এই দর্শনের অনুসারী হয়েছেন।
ড. আবুল আহসান চৌধুরী তার ‘লালন সাঁই প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ’ গ্রন্থে লালনকে সমাজমনস্ক সাধক-কবি বলে অভিহিত করেছেন। সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত ‘বাউল লালন রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে সুবোধচন্দ্র তার ‘গ্রাম্য সাহিত্য’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘লালন ফকির নাম শুনিয়াই হয়তো অনেকে মনে করিতে পারেন ইনি বিষয়হীন ফকির ছিলেন; বস্তুত তাহা নহে; ইনি সংসারী ছিলেন, সামান্য জোতজমা আছে; বাটিঘরও মন্দ নহে। জিনিসপত্র মধ্যবর্তী গৃহস্থের মতো, নগদ টাকা প্রায় ২ হাজার রাখিয়া মারা যান’ (মিত্র, পৃ. ১০২)। লেখাটির মূল বিষয়ের সঙ্গে এসব উক্তির যৌক্তিক প্রাসঙ্গিকতা হলো, লালন যেভাবে সমাজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সামাজিক বৈষম্য ও সংস্কার নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন, অন্য মরমি কবিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ছিল কিছুটা ভাবমূলক।
ফিরে আসি লালনসহ মরমি কবিদের জীবনদর্শনে। আমাদের মরমি কবিদের জীবন ত্যাগে ভরপুর ছিল। ভোগ তাদের জীবনদর্শনে ছিল না। তাদের দর্শনের ভিন্নতা ছিল, ছিল বহুমুখিতা। লালনের সঙ্গে মরমি কবিদের মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোনো বৈসাদৃশ্য ছিল না।
আত্ম-অন্বেষণ, পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের আকুলতা (বিরহ ও প্রেম), সংসারজীবনের অনিত্যতা, লৌকিক জীবন নিয়ে বৈরাগ্য—বাংলার সব মরমি কবির মধ্যেই এসব বিষয় ছিল। বাংলার মরমি দর্শনের নিজস্বতা এসব উপাদানেই নিহিত আছে। তবে ভাবসম্পদ ও দর্শনে প্রত্যেকেই ছিলেন অনন্য। ফকির লালন সাঁইয়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল সমাজের অসামঞ্জস্যের প্রতি তার সংবেদনশীলতা। ভারতীয় সমাজে প্রশ্নের পরিসর অত্যন্ত ক্ষুদ্র। আধ্যাত্মিক জীবন হোক বা ইহলৌকিক জীবন, সৃষ্টি কিংবা সামাজিক নিয়মকে প্রশ্ন না করলে সত্যকে বের করে আনা বড় কঠিন। লালন তার অধিকাংশ গানে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। এ ধরনের প্রশ্ন তোলা উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে প্রথাবিরোধী কর্মকাণ্ড।
লালনের জীবনদর্শন তার গানে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। গানের মধ্য দিয়ে লালন ফকির সে সময়ের সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজজীবনের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছিলেন। দর্শনের অন্যতম একটি পদ্ধতি হলো প্রশ্ন করে বাস্তবতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটোসহ দর্শনের বিশ্বখ্যাত মনীষীরা এই পদ্ধতিতে মানুষকে আলোকিত করেছিলেন। লালন ফকিরও তার গানে নানাবিধ প্রশ্ন ও জবাবের মাধ্যমে একই পদ্ধতিতে সামাজিক অসংগতি, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির স্বরূপ তুলে ধরেছিলেন। বলা যায়, লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী সাধক, যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সব প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে তিনি তার গান রচনা করেছেন। লালন নিজের গানে নিজেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। (৬৫৭)
প্রশ্ন হলো, লালনের দর্শনে সমৃদ্ধ এই জনপদে মানুষের মধ্যে বিভক্তি, অনৈক্য, অস্থিরতা ও হিংসার আগুন কেন নিয়ত প্রজ্বলিত? শুধু লালন নয়, যে দেশের লোকগানে লেখা হয়, ‘নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ; জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।’ (‘নকশী কাঁথার মাঠ’ (নবম পর্ব)-এর একটি বহুল প্রচলিত গাজীর গানের চরণ।) বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কোণে যতটুকু বিচরণ করেছি, এরকম সংহতি, ভালোবাসা ও মানবতার বার্তা কোথাও খুঁজে পাইনি।
লালনের মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক ধর্মমত সমাজের অপাঙ্ক্তেয়, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মুক্তির সনদ হয়ে সবার মনে নবজাগরণ এনেছিল। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে লালনদর্শনে দীক্ষিত হয়ে অনেকে মানবতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। লালন এখনো অসীম সাগরে বাঙালির মানবতাদর্শনের প্রধান পথপ্রদর্শক। মানবতাদর্শনের চর্চা হলো সমাজের শ্রেণিবৈষম্যকে উপহাস করে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আমরা যখন ধর্মের গোঁড়ামি পরিহার করে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংগ্রাম করি, লালন তখন আমাদের চেতনার সাথি হয়ে অনুপ্রেরণা জোগান। প্রমিথিউসের মতো লালন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সাহস জোগান নিয়ত। লালনের গান ও তার জীবনের সামগ্রিক প্রয়াস বিবাদ, কলহ ও হিংস্রতায় নিমজ্জিত মানুষের মহামিলনের বার্তা। লালন বাঙালি সমাজ ও লোকায়ত জীবনে মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হয়ে থাকবেন অনন্তকাল। এই বক্তব্যকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করে তার এই বাণী: ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে/যে দিন হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ আর খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।’
আমাদের সমাজে প্রবাহিত অন্ধকার দেখে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। পলিমাটির দেশের মানুষ, বিশেষত প্রান্তিক মানুষেরাই বিপর্যয়ে এগিয়ে আসেন। তারাই লালনচেতনা ধারণ করেন। মরমি কবিদের মতো তাদের জীবনদর্শনেও জাতপাত, ধর্ম বা বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। মানুষের কৃত্রিম, বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার ভেতরের ‘মানুষ’ তাদের কাছে আপন। লালনের গান শুধুমাত্র মরমি ভাবে ভাবাতুর নয়। তাতে সংশয়বাদী দর্শন আছে, আছে সঠিক পথ সন্ধানের আর্ত আকুতি। লালন তাই অন্ধকার থেকে আলোর পথে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একজন দার্শনিক অভিভাবক।
[লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক]

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
সমাজে যখন অস্থিরতা ও প্রতিহিংসাবোধের প্রকাশ ঘটে, তখন ফকির লালনের কথা মনে হয়। এই সুবর্ণ পলিমাটির দেশে লালনের মতো অসংখ্য মরমি সাধকের জন্ম হয়েছে। এ দেশের মানুষের জীবনদর্শনের প্রকাশ ঘটেছে তাদের সংগীত ও জীবনাচরণের মাধ্যমে। ফকির লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ও সৃষ্টিশীলতা মূলত মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য জীবনদর্শন। তিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সামাজিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। লালনদর্শনকে একটি বৃত্ত কল্পনা করলে এর কেন্দ্রে আছে মানুষ।
আবারও বলি, লালনদর্শনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘মানুষ’। তিনি মনে করতেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সব মানুষের ভেতরেই ঈশ্বর বা ‘মনের মানুষ’ বসবাস করেন। তাই আলাদা করে কোনো উপাসনালয় বা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে মানুষের সেবা ও মনকে চেনা বড় সাধনা।
লালন কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বা গোঁড়া ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। তিনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধসহ সব ধর্মের সংকীর্ণতা ও বিভেদকে অস্বীকার করেছেন। তার গানে মানুষের পরিচয় কোনো জাতিগত বা ধর্মীয় কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। ‘আপনারে আপনি চেনা, সেই বটে উপাসনা’—লালন এই বাণীর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও নিজের ভেতরকার সত্যকে উপলব্ধি করার ওপর জোর দিয়েছেন। মহাত্মা লালনকে উপলব্ধি করতে হলে তার চেতনাকে জানতে হবে। আমরা তার চেতনার উত্তরাধিকারী না হয়ে লালনের মূর্ত রূপের উত্তরাধিকারী হতে চাই, বিপত্তি এখানেই। এর মধ্যে আমরা অনেকেই আছি, যারা লালনের চেতনা ও মূর্ত বাণী—দুটোকেই বাতিল করে দিতে চাই।
বাংলাদেশের মরমি কবিদের দর্শন মূলত সৃষ্টিশীল আধ্যাত্মিকতা, মানবপ্রেম এবং স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের ব্যাকুলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মরমিবাদ বা সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া ও বাউল দর্শনের এক অপূর্ব মিশ্রণে এই অঞ্চলের মরমি সাহিত্য গড়ে উঠেছে। লালন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত এবং শাহ আবদুল করিমের মতো সাধকেরা এই দর্শনের প্রধান ধারক ও বাহক।
লালনের সঙ্গে মরমি সাধকদের সাদৃশ্য থাকলেও লালনদর্শনের সঙ্গে অন্য সাধকদের দর্শনের কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায়। লালনদর্শনের সঙ্গে শাহ আবদুল করিমের দর্শনের কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে। লালন সাঁইয়ের সঙ্গে অন্য মরমি সাধকদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, লালনের সমাজমনস্কতা ও মানবতাবোধ সরাসরি দৃশ্যমান, যা অন্যদের ক্ষেত্রে কিছুটা বিমূর্ত। লালন যেমন গভীরভাবে সমাজমনস্ক ছিলেন এবং সাম্যের সমাজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন, শাহ আবদুল করিমও এই দর্শনের অনুসারী হয়েছেন।
ড. আবুল আহসান চৌধুরী তার ‘লালন সাঁই প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ’ গ্রন্থে লালনকে সমাজমনস্ক সাধক-কবি বলে অভিহিত করেছেন। সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত ‘বাউল লালন রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে সুবোধচন্দ্র তার ‘গ্রাম্য সাহিত্য’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘লালন ফকির নাম শুনিয়াই হয়তো অনেকে মনে করিতে পারেন ইনি বিষয়হীন ফকির ছিলেন; বস্তুত তাহা নহে; ইনি সংসারী ছিলেন, সামান্য জোতজমা আছে; বাটিঘরও মন্দ নহে। জিনিসপত্র মধ্যবর্তী গৃহস্থের মতো, নগদ টাকা প্রায় ২ হাজার রাখিয়া মারা যান’ (মিত্র, পৃ. ১০২)। লেখাটির মূল বিষয়ের সঙ্গে এসব উক্তির যৌক্তিক প্রাসঙ্গিকতা হলো, লালন যেভাবে সমাজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সামাজিক বৈষম্য ও সংস্কার নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন, অন্য মরমি কবিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ছিল কিছুটা ভাবমূলক।
ফিরে আসি লালনসহ মরমি কবিদের জীবনদর্শনে। আমাদের মরমি কবিদের জীবন ত্যাগে ভরপুর ছিল। ভোগ তাদের জীবনদর্শনে ছিল না। তাদের দর্শনের ভিন্নতা ছিল, ছিল বহুমুখিতা। লালনের সঙ্গে মরমি কবিদের মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোনো বৈসাদৃশ্য ছিল না।
আত্ম-অন্বেষণ, পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের আকুলতা (বিরহ ও প্রেম), সংসারজীবনের অনিত্যতা, লৌকিক জীবন নিয়ে বৈরাগ্য—বাংলার সব মরমি কবির মধ্যেই এসব বিষয় ছিল। বাংলার মরমি দর্শনের নিজস্বতা এসব উপাদানেই নিহিত আছে। তবে ভাবসম্পদ ও দর্শনে প্রত্যেকেই ছিলেন অনন্য। ফকির লালন সাঁইয়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল সমাজের অসামঞ্জস্যের প্রতি তার সংবেদনশীলতা। ভারতীয় সমাজে প্রশ্নের পরিসর অত্যন্ত ক্ষুদ্র। আধ্যাত্মিক জীবন হোক বা ইহলৌকিক জীবন, সৃষ্টি কিংবা সামাজিক নিয়মকে প্রশ্ন না করলে সত্যকে বের করে আনা বড় কঠিন। লালন তার অধিকাংশ গানে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। এ ধরনের প্রশ্ন তোলা উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে প্রথাবিরোধী কর্মকাণ্ড।
লালনের জীবনদর্শন তার গানে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। গানের মধ্য দিয়ে লালন ফকির সে সময়ের সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজজীবনের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছিলেন। দর্শনের অন্যতম একটি পদ্ধতি হলো প্রশ্ন করে বাস্তবতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটোসহ দর্শনের বিশ্বখ্যাত মনীষীরা এই পদ্ধতিতে মানুষকে আলোকিত করেছিলেন। লালন ফকিরও তার গানে নানাবিধ প্রশ্ন ও জবাবের মাধ্যমে একই পদ্ধতিতে সামাজিক অসংগতি, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির স্বরূপ তুলে ধরেছিলেন। বলা যায়, লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী সাধক, যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সব প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে তিনি তার গান রচনা করেছেন। লালন নিজের গানে নিজেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। (৬৫৭)
প্রশ্ন হলো, লালনের দর্শনে সমৃদ্ধ এই জনপদে মানুষের মধ্যে বিভক্তি, অনৈক্য, অস্থিরতা ও হিংসার আগুন কেন নিয়ত প্রজ্বলিত? শুধু লালন নয়, যে দেশের লোকগানে লেখা হয়, ‘নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ; জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।’ (‘নকশী কাঁথার মাঠ’ (নবম পর্ব)-এর একটি বহুল প্রচলিত গাজীর গানের চরণ।) বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কোণে যতটুকু বিচরণ করেছি, এরকম সংহতি, ভালোবাসা ও মানবতার বার্তা কোথাও খুঁজে পাইনি।
লালনের মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক ধর্মমত সমাজের অপাঙ্ক্তেয়, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মুক্তির সনদ হয়ে সবার মনে নবজাগরণ এনেছিল। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে লালনদর্শনে দীক্ষিত হয়ে অনেকে মানবতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। লালন এখনো অসীম সাগরে বাঙালির মানবতাদর্শনের প্রধান পথপ্রদর্শক। মানবতাদর্শনের চর্চা হলো সমাজের শ্রেণিবৈষম্যকে উপহাস করে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আমরা যখন ধর্মের গোঁড়ামি পরিহার করে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংগ্রাম করি, লালন তখন আমাদের চেতনার সাথি হয়ে অনুপ্রেরণা জোগান। প্রমিথিউসের মতো লালন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সাহস জোগান নিয়ত। লালনের গান ও তার জীবনের সামগ্রিক প্রয়াস বিবাদ, কলহ ও হিংস্রতায় নিমজ্জিত মানুষের মহামিলনের বার্তা। লালন বাঙালি সমাজ ও লোকায়ত জীবনে মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হয়ে থাকবেন অনন্তকাল। এই বক্তব্যকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করে তার এই বাণী: ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে/যে দিন হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ আর খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।’
আমাদের সমাজে প্রবাহিত অন্ধকার দেখে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। পলিমাটির দেশের মানুষ, বিশেষত প্রান্তিক মানুষেরাই বিপর্যয়ে এগিয়ে আসেন। তারাই লালনচেতনা ধারণ করেন। মরমি কবিদের মতো তাদের জীবনদর্শনেও জাতপাত, ধর্ম বা বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। মানুষের কৃত্রিম, বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার ভেতরের ‘মানুষ’ তাদের কাছে আপন। লালনের গান শুধুমাত্র মরমি ভাবে ভাবাতুর নয়। তাতে সংশয়বাদী দর্শন আছে, আছে সঠিক পথ সন্ধানের আর্ত আকুতি। লালন তাই অন্ধকার থেকে আলোর পথে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একজন দার্শনিক অভিভাবক।
[লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক]

আপনার মতামত লিখুন