সংবাদ

চা-বাগানের বুকে লেক-জলধারা, প্রকৃতির ক্যানভাসে লাল শাপলার লালিমা


প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল
প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল
প্রকাশ: ৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩১ এএম

চা-বাগানের বুকে লেক-জলধারা, প্রকৃতির ক্যানভাসে লাল শাপলার লালিমা
ছবি : সংবাদ

চারদিকে শুধুু সবুজের সমারোহ। কোথাও উঁচু-নিচু টিলায় সারি সারি চা-গাছ, কোথাও বা ঘন বনানী। পাহাড়ের বুক চিরে এঁকেবেঁকে চলে গেছে আঁকাবাঁকা পথ। সেই সবুজের মাঝেই কোথাও স্বচ্ছ জলরাশির লেক, কোথাও বয়ে চলেছে প্রাকৃতিক জলধারা। আর কোনো কোনো লেকের শান্ত পানিতে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। সবুজের বুকে লাল ফুলের এমন সমারোহ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অপূর্ব জলরঙের ছবি।স

দূর থেকে তাকালেই চোখ আটকে যায়। মনে হয়, সবুজের রাজ্যে প্রকৃতি আপন মনে ছড়িয়ে দিয়েছে লালিমার এক মায়াবী চাদর। চা-বাগানের নিস্তব্ধ পরিবেশ, পাহাড়ি লেকের স্বচ্ছ পানি আর ফুটন্ত লাল শাপলার সৌন্দর্য মিলেমিশে তৈরি করেছে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

মৌলভীবাজারের পর্যটননগরী ও চায়ের স্বর্গরাজ্যখ্যাত শ্রীমঙ্গল এমনই এক অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। চা-বাগানের সবুজ সমারোহ, পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল, লেক, জলাশয় ও জলধারা—সব মিলিয়ে এ জনপদ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। এর মধ্যে বিভিন্ন চা-বাগানের লেকের পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলা শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন এক নান্দনিক মাত্রা।

লেক ও জলধারার মিতালি

চা শিল্পের নগরী শ্রীমঙ্গল ও এর চারপাশে বিস্তৃত রয়েছে অসংখ্য চা-বাগান। এসব বাগান শুধু চায়ের সবুজ সমারোহের জন্যই নয়, প্রাকৃতিক লেক, জলাশয় ও বিভিন্ন জলধারার কারণেও বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। কোথাও পাহাড়ি টিলার পাদদেশে স্বচ্ছ পানির লেক, কোথাও আবার চা-বাগানের বুক চিরে বয়ে চলেছে জলধারা। এসব জলাশয় ও জলধারা চা-বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশে যোগ করেছে ভিন্ন এক সৌন্দর্যমাত্রা।

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব লেক ও জলধারার রূপও বদলে যায়। বর্ষায় পানিতে ভরে ওঠে জলাশয়, কোথাও ফুটে ওঠে শাপলা, আবার কোথাও পানির ওপর ভেসে থাকে সবুজ পাতার সমারোহ। প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় দৃশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদেরও দারুণভাবে মুগ্ধ করে।

সবুজের বুকে লাল শাপলার মায়া

বাংলাদেশের খাল-বিল, হাওর, পুকুর ও নানা জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় শাপলা। জলজ এ ফুল দেশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে নিবিড়ভাবে। সাদা শাপলার পাশাপাশি বর্ষা ও শরৎকালে বিভিন্ন জলাশয়ে দেখা মেলে লাল শাপলার। তবে চা-বাগানের সবুজ টিলার কোলে স্বচ্ছ লেকের পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলার সৌন্দর্য যেন একটু ভিন্ন।

লাল শাপলার আরেক নাম রক্তকমল (Red Water Lily)। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea pubescens। বিশেষ করে ভোরের আলোয় ফুলের পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরবিন্দু যেন এর সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। সকালের কোমল রোদে লাল পাপড়িগুলো যখন ঝলমল করে ওঠে, তখন লেকের পানিতে তৈরি হয় এক মনোরম দৃশ্য।

সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাওর-বিল ও জলাশয়ে এ ফুলের দেখা মিললেও শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের লেকের লাল শাপলার বিশেষত্ব হলো, এখানে জলজ ফুলের সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড়, টিলা, চা-বাগান ও বনাঞ্চলের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ।

নির্জন লেক ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এ লেকে শাপলা ফুলের আধিক্য দেখা যায়। এ সময় লেকের পানিতে ফুটে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা পুরো এলাকাকে অন্য এক সৌন্দর্যে সাজিয়ে তোলে। আশপাশের এলাকার অনেক মানুষ অবসর সময়ে এ সৌন্দর্য দেখতে আসেন। কেউ ছবি তোলেন, কেউবা নীরবে উপভোগ করেন প্রকৃতির এই অপার সৃষ্টি।

উত্তর সুর তালতলার বাসিন্দা মো. আব্দুস ছোবহান বলেন, ‘চা-বাগানের উঁচু-নিচু টিলা আর লেকের মনকাড়া সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। জায়গাটি সত্যিই অসাধারণ। লেকটিকে আরও পরিকল্পিতভাবে সাজানো এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এটি মৌলভীবাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’

সৌন্দর্যের আড়ালে প্রবেশের বিধিনিষেধ

এত সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও চা-বাগানের লেকটি এখনো পর্যটকদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত নয়। চা-বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ নেই। ফলে যোগাযোগব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও পর্যটকদের আনাগোনা খুব বেশি নয়। চা-বাগানের কয়েকজন বাসিন্দা ও শ্রমিক জানান, উঁচু-নিচু টিলাভূমির কারণে লেকের আশপাশে চলাচল কিছুটা কষ্টকর। এর পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভ্রমণপিপাসু মানুষের উপস্থিতিও সীমিত।

চা-বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লেক ও আশপাশের এলাকা একটি বেসরকারি চা কোম্পানির নিজস্ব সম্পত্তি। বিভিন্ন নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাগত বিধিনিষেধের কারণে জায়গাটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে অল্পসংখ্যক প্রকৃতিপ্রেমী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ঘুরতে এলে সাধারণত তাদের বাধা দেওয়া হয় না।

শ্রীমঙ্গলের অজানা সৌন্দর্য তুলে ধরার আহ্বান

শ্রীমঙ্গলের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হ্যালো শ্রীমঙ্গল ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের কর্ণধার তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, চায়ের রাজধানী ও পর্যটননগরী হিসেবে শ্রীমঙ্গল একটি চমৎকার জনপদ। শহরটির চারপাশে রয়েছে অসংখ্য চা-বাগান, পাহাড়, উঁচু-নিচু টিলা, বনাঞ্চল, লেক, জলধারা ও নানা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের কালীঘাট রোড থেকে যাত্রা শুরু করে ফুলছড়া চা-বাগানের মধ্য দিয়ে কালীঘাট হয়ে ভারতীয় সীমান্তবর্তী হোসেনাবাদ চা-বাগান পর্যন্ত সড়কপথে এগিয়ে গেলে প্রকৃতির একের পর এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য, শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটক এই সড়কপথের সৌন্দর্য সম্পর্কে জানেন না। অথচ এই পথে রয়েছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক বিশাল ভান্ডার।’

পরিকল্পিত উদ্যোগে নতুন পর্যটন আকর্ষণ

শ্রীমঙ্গল এমনিতেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের কারণে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। এরই মধ্যে চা-বাগানের লেক, জলধারা ও পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলা প্রকৃতির আরেকটি অনন্য সৌন্দর্যের পরিচয় তুলে ধরেছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেসরকারি সম্পত্তির মালিকানা ও নিরাপত্তার বিষয়টি অক্ষুণ্ন রেখেই এ ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ এবং সীমিত পরিসরে প্রকৃতিবান্ধব পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, নিরাপদ যাতায়াত এবং নির্দিষ্ট দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে পর্যটনের নামে যেন লেকের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। শাপলা ছেঁড়া, জলাশয়ে ময়লা ফেলা কিংবা ফুল ও জলজ উদ্ভিদের ক্ষতি করা থেকে দর্শনার্থীদের বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ি গুহা, গিরিখাত ও বনে পর্যটকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

চায়ের স্বর্গরাজ্য শ্রীমঙ্গলের পরিচিত সৌন্দর্যের ভান্ডারে লেক, জলধারা আর লাল শাপলা যেন যোগ করেছে নতুন এক মাত্রা। সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে স্বচ্ছ জলরাশি আর লাল শাপলার লালিমা নীরবে মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সৌন্দর্য কখনো কখনো লোকচক্ষুর আড়ালেই সবচেয়ে বেশি মুগ্ধতা ছড়ায়।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


চা-বাগানের বুকে লেক-জলধারা, প্রকৃতির ক্যানভাসে লাল শাপলার লালিমা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

চারদিকে শুধুু সবুজের সমারোহ। কোথাও উঁচু-নিচু টিলায় সারি সারি চা-গাছ, কোথাও বা ঘন বনানী। পাহাড়ের বুক চিরে এঁকেবেঁকে চলে গেছে আঁকাবাঁকা পথ। সেই সবুজের মাঝেই কোথাও স্বচ্ছ জলরাশির লেক, কোথাও বয়ে চলেছে প্রাকৃতিক জলধারা। আর কোনো কোনো লেকের শান্ত পানিতে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। সবুজের বুকে লাল ফুলের এমন সমারোহ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অপূর্ব জলরঙের ছবি।স

দূর থেকে তাকালেই চোখ আটকে যায়। মনে হয়, সবুজের রাজ্যে প্রকৃতি আপন মনে ছড়িয়ে দিয়েছে লালিমার এক মায়াবী চাদর। চা-বাগানের নিস্তব্ধ পরিবেশ, পাহাড়ি লেকের স্বচ্ছ পানি আর ফুটন্ত লাল শাপলার সৌন্দর্য মিলেমিশে তৈরি করেছে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

মৌলভীবাজারের পর্যটননগরী ও চায়ের স্বর্গরাজ্যখ্যাত শ্রীমঙ্গল এমনই এক অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। চা-বাগানের সবুজ সমারোহ, পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল, লেক, জলাশয় ও জলধারা—সব মিলিয়ে এ জনপদ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। এর মধ্যে বিভিন্ন চা-বাগানের লেকের পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলা শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন এক নান্দনিক মাত্রা।

লেক ও জলধারার মিতালি

চা শিল্পের নগরী শ্রীমঙ্গল ও এর চারপাশে বিস্তৃত রয়েছে অসংখ্য চা-বাগান। এসব বাগান শুধু চায়ের সবুজ সমারোহের জন্যই নয়, প্রাকৃতিক লেক, জলাশয় ও বিভিন্ন জলধারার কারণেও বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। কোথাও পাহাড়ি টিলার পাদদেশে স্বচ্ছ পানির লেক, কোথাও আবার চা-বাগানের বুক চিরে বয়ে চলেছে জলধারা। এসব জলাশয় ও জলধারা চা-বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশে যোগ করেছে ভিন্ন এক সৌন্দর্যমাত্রা।

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব লেক ও জলধারার রূপও বদলে যায়। বর্ষায় পানিতে ভরে ওঠে জলাশয়, কোথাও ফুটে ওঠে শাপলা, আবার কোথাও পানির ওপর ভেসে থাকে সবুজ পাতার সমারোহ। প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় দৃশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদেরও দারুণভাবে মুগ্ধ করে।

সবুজের বুকে লাল শাপলার মায়া

বাংলাদেশের খাল-বিল, হাওর, পুকুর ও নানা জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় শাপলা। জলজ এ ফুল দেশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে নিবিড়ভাবে। সাদা শাপলার পাশাপাশি বর্ষা ও শরৎকালে বিভিন্ন জলাশয়ে দেখা মেলে লাল শাপলার। তবে চা-বাগানের সবুজ টিলার কোলে স্বচ্ছ লেকের পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলার সৌন্দর্য যেন একটু ভিন্ন।

লাল শাপলার আরেক নাম রক্তকমল (Red Water Lily)। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea pubescens। বিশেষ করে ভোরের আলোয় ফুলের পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরবিন্দু যেন এর সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। সকালের কোমল রোদে লাল পাপড়িগুলো যখন ঝলমল করে ওঠে, তখন লেকের পানিতে তৈরি হয় এক মনোরম দৃশ্য।

সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাওর-বিল ও জলাশয়ে এ ফুলের দেখা মিললেও শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের লেকের লাল শাপলার বিশেষত্ব হলো, এখানে জলজ ফুলের সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড়, টিলা, চা-বাগান ও বনাঞ্চলের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ।

নির্জন লেক ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এ লেকে শাপলা ফুলের আধিক্য দেখা যায়। এ সময় লেকের পানিতে ফুটে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা পুরো এলাকাকে অন্য এক সৌন্দর্যে সাজিয়ে তোলে। আশপাশের এলাকার অনেক মানুষ অবসর সময়ে এ সৌন্দর্য দেখতে আসেন। কেউ ছবি তোলেন, কেউবা নীরবে উপভোগ করেন প্রকৃতির এই অপার সৃষ্টি।

উত্তর সুর তালতলার বাসিন্দা মো. আব্দুস ছোবহান বলেন, ‘চা-বাগানের উঁচু-নিচু টিলা আর লেকের মনকাড়া সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। জায়গাটি সত্যিই অসাধারণ। লেকটিকে আরও পরিকল্পিতভাবে সাজানো এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এটি মৌলভীবাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’

সৌন্দর্যের আড়ালে প্রবেশের বিধিনিষেধ

এত সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও চা-বাগানের লেকটি এখনো পর্যটকদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত নয়। চা-বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ নেই। ফলে যোগাযোগব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও পর্যটকদের আনাগোনা খুব বেশি নয়। চা-বাগানের কয়েকজন বাসিন্দা ও শ্রমিক জানান, উঁচু-নিচু টিলাভূমির কারণে লেকের আশপাশে চলাচল কিছুটা কষ্টকর। এর পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভ্রমণপিপাসু মানুষের উপস্থিতিও সীমিত।

চা-বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লেক ও আশপাশের এলাকা একটি বেসরকারি চা কোম্পানির নিজস্ব সম্পত্তি। বিভিন্ন নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাগত বিধিনিষেধের কারণে জায়গাটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে অল্পসংখ্যক প্রকৃতিপ্রেমী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ঘুরতে এলে সাধারণত তাদের বাধা দেওয়া হয় না।

শ্রীমঙ্গলের অজানা সৌন্দর্য তুলে ধরার আহ্বান

শ্রীমঙ্গলের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হ্যালো শ্রীমঙ্গল ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের কর্ণধার তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, চায়ের রাজধানী ও পর্যটননগরী হিসেবে শ্রীমঙ্গল একটি চমৎকার জনপদ। শহরটির চারপাশে রয়েছে অসংখ্য চা-বাগান, পাহাড়, উঁচু-নিচু টিলা, বনাঞ্চল, লেক, জলধারা ও নানা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের কালীঘাট রোড থেকে যাত্রা শুরু করে ফুলছড়া চা-বাগানের মধ্য দিয়ে কালীঘাট হয়ে ভারতীয় সীমান্তবর্তী হোসেনাবাদ চা-বাগান পর্যন্ত সড়কপথে এগিয়ে গেলে প্রকৃতির একের পর এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য, শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটক এই সড়কপথের সৌন্দর্য সম্পর্কে জানেন না। অথচ এই পথে রয়েছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক বিশাল ভান্ডার।’

পরিকল্পিত উদ্যোগে নতুন পর্যটন আকর্ষণ

শ্রীমঙ্গল এমনিতেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের কারণে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। এরই মধ্যে চা-বাগানের লেক, জলধারা ও পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলা প্রকৃতির আরেকটি অনন্য সৌন্দর্যের পরিচয় তুলে ধরেছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেসরকারি সম্পত্তির মালিকানা ও নিরাপত্তার বিষয়টি অক্ষুণ্ন রেখেই এ ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ এবং সীমিত পরিসরে প্রকৃতিবান্ধব পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, নিরাপদ যাতায়াত এবং নির্দিষ্ট দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে পর্যটনের নামে যেন লেকের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। শাপলা ছেঁড়া, জলাশয়ে ময়লা ফেলা কিংবা ফুল ও জলজ উদ্ভিদের ক্ষতি করা থেকে দর্শনার্থীদের বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ি গুহা, গিরিখাত ও বনে পর্যটকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

চায়ের স্বর্গরাজ্য শ্রীমঙ্গলের পরিচিত সৌন্দর্যের ভান্ডারে লেক, জলধারা আর লাল শাপলা যেন যোগ করেছে নতুন এক মাত্রা। সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে স্বচ্ছ জলরাশি আর লাল শাপলার লালিমা নীরবে মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সৌন্দর্য কখনো কখনো লোকচক্ষুর আড়ালেই সবচেয়ে বেশি মুগ্ধতা ছড়ায়।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত