রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকা। জমিদারি পরিচালনার সূত্রে বাংলার গ্রামীণ সমাজের যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্য, সমাজচিন্তা, অর্থনৈতিক ভাবনা এবং পল্লি পুনর্গঠনের দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তৎকালীন পূর্ববাংলার শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসর তাঁর জীবনে শুধু জমিদারির প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না; এগুলো হয়ে উঠেছিল তাঁর চিন্তা ও কর্মের পরীক্ষাগার।
১৮৮৯ সালের নভেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে জমিদারি পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে পূর্ববাংলায় আসেন রবীন্দ্রনাথ। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৮ বছর। এর আগে ১৮৭৭ ও ১৮৮০ সালে পারিবারিক সূত্রে স্বল্প সময়ের জন্য তিনি পদ্মা অঞ্চলে এসেছিলেন। কিন্তু, ১৮৮৯ সালের পর পূর্ববাংলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী ও কর্মমুখী রূপ লাভ করে। ১৮৮৯ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত তিনি কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসরে সপরিবারে বসবাস ও জমিদারি পরিচালনা করেন। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে আশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও পূর্ববাংলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়নি। ১৯০১ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে আসতেন এবং পল্লি পুনর্গঠনের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করতেন। ১৯২১ সালে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পুত্র রথীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিলেও পূর্ববাংলা বা বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সম্পূর্ণ অবসান ঘটেনি; ১৯৩৭ সালে তিনি শেষবারের মতো পতিসরে আসেন।
১৮৮৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩২ বছর বাংলাদেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সক্রিয় ও সৃষ্টিশীল সম্পর্ক ছিল। এই সময় বাংলার গ্রামীণ সমাজ ছিল নানা সংকটে জর্জরিত। কৃষির অনুন্নত পদ্ধতি, মহাজনী ঋণের বোঝা, অশিক্ষা, চিকিৎসার অভাব, বিশুদ্ধ পানির সংকট, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সামাজিক বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। রবীন্দ্রনাথ জমিদার হিসেবে শুধু রাজস্ব আদায়ের কাজ করেন নি; তিনি এই সমস্যাগুলো প্রত্যক্ষ করেন এবং ক্রমে উপলব্ধি করেন যে, গ্রামীণ মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে হলে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাঁর কাছে বাংলাদেশের পল্লি উন্নয়ন ছিল মানুষের আত্মশক্তি, আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরতা বিকাশের একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া।
২
রবীন্দ্রনাথের পল্লি পুনর্গঠন কর্মসূচির প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল কৃষি। কৃষক যে গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি, তা তিনি খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন। ফলে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আধুনিক কৃষিবিদ্যার সঙ্গে পরিচিত করানোকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৫ সালে উন্নত লোহার লাঙল ও আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের উদ্যোগ নেন। ১৯০৫ সালে উন্নত লাঙল ব্যবহারের পাশাপাশি পতিসরে আধুনিক কলের লাঙল বা ট্রাক্টর নামানোর উদ্যোগ নেন। এতে করে পুরোনো কৃষিপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে অধিক উৎপাদনশীল কৃষির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের পুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে প্রচলিত শিক্ষার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি ও পশুপালন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠান।
কৃষিকে একক ফসলনির্ভরতা থেকে বের করে আনতে উন্নত ও বিকল্প ফসলের বীজ সংগ্রহ ও বিতরণের ব্যবস্থা করেন রবীন্দ্রনাথ। তুলা, আমেরিকান ভুট্টা, আলু, চীনা বাদাম ও উন্নত পাটের বীজ কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। শিলাইদহের খোরশেদপুরে পরীক্ষামূলক কৃষিখামার স্থাপন করে নতুন কৃষিপদ্ধতি ও ফসলের কার্যকারিতা দেখানোর ব্যবস্থা করেন। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা এবং কম্পোস্ট ও অন্যান্য সার ব্যবহারের পদ্ধতিও চালু করেন রবীন্দ্রনাথ।
কৃষির সঙ্গে পশুপালন ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণকেও যুক্ত করেন তিনি। উন্নত জাতের গবাদিপশু এনে পশুর জাত উন্নয়নের চেষ্টা, ডেইরি ফার্ম স্থাপন, ধান মাড়াইয়ের যান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং তুঁত চাষ ও রেশম গুটিপোকা পালনের উদ্যোগ ছিল তাঁর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। কৃষকের আয় যেন শুধু ধান কাটার মৌসুমের ওপর নির্ভর না করে, সে জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের পথও খুঁজেছিলেন তিনি।
৩
রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন, কৃষির উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন কৃষক তার উৎপাদনের ওপর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিন্তু, মহাজনী ঋণের কারণে কৃষকের এই স্বাধীনতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। এই সমস্যা মোকাবিলায় সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তিনি।
১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ছিল রবীন্দ্রনাথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে মহাজনের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করেন তিনি। ব্যাংকের মূলধন সংকট দেখা দিলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নোবেল পুরস্কারের প্রায় পুরো অর্থ সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেন। শুধু তাই নয়, বইয়ের রয়্যালটি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া বক্তৃতা থেকে পাওয়া নয় হাজার টাকা সমবায় ব্যাংকের তহবিলে জমা দেন।
অর্থনৈতিক মুক্তির এই ধারণা শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষকের উৎপাদিত ফসল যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে কম দামে বিক্রি না হয়, তার জন্য সমবায় বিপণনের ব্যবস্থা করেন। মহাজনী ঋণের কারণে কৃষকের জমি হাতছাড়া হলে তা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেন। দুর্যোগের সময় খাদ্য ও বীজের নিরাপত্তার জন্য ধর্মগোলা বা শস্যভাণ্ডার স্থাপন করেন।
ধান, পাট ও সরিষা কাটার মৌসুমে পাইকার ও দালালরা অভাবী কৃষকদের জিম্মি করে নামমাত্র মূল্যে ফসল কিনে নিত। ১৯০৫ সালে সমবায় বিপণন ও ফড়িয়া উচ্ছেদ করে সমবায় ভাণ্ডারের মাধ্যমে কৃষকের ফসল গুদামে রেখে উপযুক্ত সময়ে বড় মোকামে বিক্রির ব্যবস্থা করেন, যাতে কৃষক সরাসরি সর্বোচ্চ লভ্যাংশ পায়।
৪
রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা ছিল মানুষের মুক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাই তাঁর পল্লি উন্নয়ন কর্মসূচির একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বিদ্যালয়, নৈশবিদ্যালয়, বৃত্তি, কারিগরি শিক্ষা ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠা। ১৮৮৯ সালে তিনি যখন পূর্ববাংলায় আসেন, তখন শিলাইদহের নদীপাড়ের গ্রামীণ মানুষের অক্ষরজ্ঞান ছিল শূন্যের কোঠায়। সবার শিক্ষা নিশ্চিত করতে ১৮৯২ সালে শিলাইদহ এম. ই. স্কুল ও অবৈতনিক পাঠশালা স্থাপন করে হিন্দু-মুসলমানসহ সমস্ত প্রজার সন্তানদের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন।
সে সময় পতিসর-কালীগ্রাম পরগনায় শত বর্গমাইলের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের কোনো বিদ্যালয় ছিল না। ফলে, কৃষকদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন দেখা ছিল অসম্ভব। এই সংকট দূর করতে ১৯০৫ সালে পতিসর মিডল ইংলিশ (এম. ই.) স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন রবীন্দ্রনাথ। মাটির দেয়াল ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি এই বিদ্যালয়টি নিজেই উদ্বোধন করেন এবং স্থানীয় দরিদ্র ছাত্রদের বেতন সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেন। ১৯১৩ সালে ‘কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বেতন মওকুফ ও বোর্ডিং সুবিধার ব্যবস্থা করেন।
শুধু শিশুশিক্ষা নয়, কর্মজীবী কৃষকদের শিক্ষার কথাও ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দিনের বেলা মাঠে কাজ করা কৃষকদের জন্য সান্ধ্য ও নৈশবিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করেন তিনি। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি হিসাব-নিকাশ, স্বাক্ষর ও ব্যবহারিক জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা ছিল। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থাও করেন রবীন্দ্রনাথ।
তাঁর শিক্ষা-ভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কর্মমুখিতা। কাঠের কাজ, তাঁত, চামড়ার কাজ ও হিসাব সংরক্ষণের মতো ব্যবহারিক বিষয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। গ্রামের মানুষকে বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত করার জন্য বই ও সংবাদপত্র পাঠের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৮৯৮ সালে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার ও সংবাদপত্র পড়ার ব্যবস্থা করেন। কাচারি ঘরে পত্রিকা ও বই এনে রাখা হতো এবং শিক্ষকরা সাধারণ মানুষদেরকে সমসাময়িক খবরাখবর পড়ে শোনাতেন।
৫
গ্রামীণ সমাজের আরেকটি বড় সংকট ছিল চিকিৎসার অভাব। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকের অভাবে সাধারণ রোগও প্রাণঘাতী হয়ে উঠত। কবিরাজি ঝাড়ফুঁক বা অপচিকিৎসায় মানুষ মারা যেত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণ প্রজাদের স্বাস্থ্যসেবার কথা চিন্তা করে ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ নিজে দেশ-বিদেশের বই পড়ে হোমিওপ্যাথিক জ্ঞান আয়ত্ত করেন এবং নৌকায় বাক্সভর্তি ওষুধ নিয়ে চর অঞ্চলের সাধারণ কৃষকদের কুঁড়েঘরে গিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেন। ১৯৯৩ সালে শিলাইদহ ও পতিসরে মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। সেখানে ডাক্তার ও চিকিৎসা সহকারীর মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেন।
কুসংস্কারের কারণে প্রজারা কলেরাকে দেবী ওলাওঠার কোপ মনে করত এবং বসন্তের টিকা নিতে ভয় পেত। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৬ কলকাতা থেকে আধুনিক ভ্যাকসিন আনিয়ে এস্টেটের কর্মীদের দ্বারা প্রজাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা তৈরি করে গণটিকাদান সম্পন্ন করেন।
স্বাস্থ্যকে তিনি কেবল হাসপাতাল বা চিকিৎসকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বিশুদ্ধ পানির জন্য কূপ ও দীঘি খনন এবং গ্রামীণ পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন। চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে একটি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ভাবনার মধ্যে আনার চেষ্টা করেন। খোলা পুকুর ও দূষিত নদীর ঘোলা জল পান করার কারণে প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও বর্ষায় জলবাহিত রোগে শত শত লোক মারা যেত। এই মহামারি রোধে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে ১৮৯৩ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের বিভিন্ন গ্রামে শতাধিক ইন্দারা (কূপ) খনন করেন এবং সংরক্ষিত দীঘি প্রস্তুত করেন।
বসতবাড়ির পাশে উন্মুক্ত মলমূত্র ত্যাগ ও অপরিচ্ছন্ন ড্রেনে মশা-মাছির উপদ্রবে রোগ বিস্তার ঘটত। এসব থেকে প্রজাসাধারণকে রক্ষায় ১৯০৫-১৯১৫ সাল পর্যন্ত হিতৈষী সভার মাধ্যমে সপ্তাহে একদিন বাধ্যতামূলক গ্রাম-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি এবং সুনির্দিষ্ট স্থানে আবর্জনা ফেলার নিয়ম চালু করে গ্রামীণ স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করেন রবীন্দ্রনাথ।
৬
রবীন্দ্রনাথের পল্লি পুনর্গঠনের ধারণার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। তিনি মনে করতেন, মানুষের উন্নয়নকে স্থায়ী করতে হলে তাদের নিজেদের সমস্যার সমাধানে তাদেরই যুক্ত করতে হবে। কারণ, সাধারণ বিরোধ নিয়ে ব্রিটিশ আদালতে মামলা করতে গিয়ে উকিল ও টাউটদের খপ্পরে পড়ে প্রজারা সর্বস্বান্ত হতো। এই দুরবস্থা থেকে সাধারণ প্রজাদের রক্ষায় ১৮৯৫ সালে প্রতিটি গ্রামে প্রজাদের নির্বাচিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে পঞ্চায়েতি সালিশ বোর্ড গঠন করেন এবং ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ গ্রামে মিটিয়ে আদালতে যাওয়ার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দেন।
রবীন্দ্রনাথ দায়িত্ব গ্রহণের আগে জমিদারি প্রশাসনের কর্মচারীরা নিরীহ কৃষকদের কাছ থেকে নজরানা, পরব ও সেলামির নামে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করত। ১৮৯০ সালে দায়িত্ব নিয়েই তিনি নির্দেশ জারি করেন যে, কোনো কর্মচারী উপরি টাকা আদায় করলে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত হবেন। বহু দুর্নীতিবাজ নায়েবকে তিনি সরাসরি বরখাস্ত করেন।
৭
কৃষির পাশাপাশি গ্রামীণ শিল্প ও কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টিও রবীন্দ্রনাথের চিন্তার অংশ ছিল। সনাতন তাঁতে সারাদিন খেটেও তাঁতিরা গামছা ছাড়া কিছু বুনতে পারত না, ফলে তীব্র দারিদ্র্যে ভুগছিল তারা। এই সংকট নিরসনে ১৯০৫ সালে উন্নত ফ্লাই-শাটল তাঁত এনে তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে শাড়ি, চাদর ও ধুতি তৈরির মতো পণ্য উৎপাদনের সুযোগ বাড়ে।
খড়ের তৈরি চাল হওয়ার কারণে সামান্য অসাবধানতায় প্রতি বছর আগুনে পুড়ে কৃষকের ঘর-বাড়ি ভস্মীভূত হতো। এই বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ব্যথিত করে তুলেছিল। সমস্যার আশু সমাধানে ১৯০৫ সালে টালির কারখানা স্থাপন করেন তিনি। সেখানে উন্নত ছাঁচ ও পোড়ানোর প্রযুক্তি ব্যাবহার করে কুমোররা আগুন-প্রতিরোধী টালি তৈরি করেন। এতে করে স্বল্প ব্যয়ে ঘর নির্মাণ করা সম্ভব হয়।
৮
রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ-অভিজ্ঞতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পরিচয়। বাংলার বাউল গান, লোকগীতি ও গ্রামীণ দর্শন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি কুষ্টিয়া-শিলাইদহের গগন হরকরা এবং লালন সাঁইজির অনুসারীদের গান ও গ্রামীণ সাহিত্য সংগ্রহ করেন এবং বিশ্ব দরবারে বাংলার পল্লীগীতি ও দর্শনকে পৌঁছে দেন।
উন্নয়নকে কেবল অর্থনীতি ও অবকাঠামোর বিষয় হিসেবে দেখেন নি রবীন্দ্রনাথ। তিনি বিশ্বাস করতেন, নিজস্ব সংস্কৃতি, জীবনবোধ ও সৃজনশীলতা যে কোনো সমাজের শক্তি ও আত্মমর্যাদার অংশ। মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
৯
বাংলাদেশ-পর্বে রবীন্দ্রনাথের গৃহীত উদ্যোগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে এগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এগুলোকে একসঙ্গে দেখলে একটি সুবিন্যাস্ত উন্নয়ন-দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষিক্ষেত্রে তিনি আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, মাটির পরীক্ষা, সেচ, পশুপালন, কৃষিযন্ত্র ও বিকল্প উৎপাদনের ওপর জোর দেন। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সমবায় ব্যাংক, বিপণন, ঋণমুক্তি ও ধর্মগোলার মাধ্যমে কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যালয়, নৈশবিদ্যালয়, বৃত্তি, কারিগরি শিক্ষা ও পাঠাগারের মাধ্যমে জ্ঞানকে গ্রামের মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে চিকিৎসালয়, টিকাদান, বিশুদ্ধ পানি ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
সামাজিক ক্ষেত্রে তিনি পঞ্চায়েত, হিতৈষী সভা, যৌথ তহবিল ও সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় অংশগ্রহণ বাড়াতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে বেগার প্রথা বন্ধ, কর্মচারীদের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি এবং দুর্যোগকালে প্রজাদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে মানবিক প্রশাসনের ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। কুটিরশিল্প ও অবকাঠামোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। আর লোকসংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতি মনোযোগের মাধ্যমে উন্নয়নের সঙ্গে সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকেও যুক্ত করেছেন।
সহায়ক গ্রন্থ:
১. রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর— পিতৃস্মৃতি, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা
২. প্রশান্তকুমার পাল— রবিজীবনী, খণ্ড ৩-৭, আনন্দ পাবলিশার্স
৩. আহমদ রফিক— রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর এবং রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ
৪. অমিতাভ চৌধুরী— জমিদার রবীন্দ্রনাথ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা
৫. শচীন্দ্রনাথ অধিকারী— শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকা। জমিদারি পরিচালনার সূত্রে বাংলার গ্রামীণ সমাজের যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্য, সমাজচিন্তা, অর্থনৈতিক ভাবনা এবং পল্লি পুনর্গঠনের দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তৎকালীন পূর্ববাংলার শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসর তাঁর জীবনে শুধু জমিদারির প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না; এগুলো হয়ে উঠেছিল তাঁর চিন্তা ও কর্মের পরীক্ষাগার।
১৮৮৯ সালের নভেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে জমিদারি পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে পূর্ববাংলায় আসেন রবীন্দ্রনাথ। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৮ বছর। এর আগে ১৮৭৭ ও ১৮৮০ সালে পারিবারিক সূত্রে স্বল্প সময়ের জন্য তিনি পদ্মা অঞ্চলে এসেছিলেন। কিন্তু, ১৮৮৯ সালের পর পূর্ববাংলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী ও কর্মমুখী রূপ লাভ করে। ১৮৮৯ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত তিনি কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসরে সপরিবারে বসবাস ও জমিদারি পরিচালনা করেন। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে আশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও পূর্ববাংলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়নি। ১৯০১ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে আসতেন এবং পল্লি পুনর্গঠনের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করতেন। ১৯২১ সালে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পুত্র রথীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিলেও পূর্ববাংলা বা বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সম্পূর্ণ অবসান ঘটেনি; ১৯৩৭ সালে তিনি শেষবারের মতো পতিসরে আসেন।
১৮৮৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩২ বছর বাংলাদেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সক্রিয় ও সৃষ্টিশীল সম্পর্ক ছিল। এই সময় বাংলার গ্রামীণ সমাজ ছিল নানা সংকটে জর্জরিত। কৃষির অনুন্নত পদ্ধতি, মহাজনী ঋণের বোঝা, অশিক্ষা, চিকিৎসার অভাব, বিশুদ্ধ পানির সংকট, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সামাজিক বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। রবীন্দ্রনাথ জমিদার হিসেবে শুধু রাজস্ব আদায়ের কাজ করেন নি; তিনি এই সমস্যাগুলো প্রত্যক্ষ করেন এবং ক্রমে উপলব্ধি করেন যে, গ্রামীণ মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে হলে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাঁর কাছে বাংলাদেশের পল্লি উন্নয়ন ছিল মানুষের আত্মশক্তি, আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরতা বিকাশের একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া।
২
রবীন্দ্রনাথের পল্লি পুনর্গঠন কর্মসূচির প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল কৃষি। কৃষক যে গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি, তা তিনি খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন। ফলে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আধুনিক কৃষিবিদ্যার সঙ্গে পরিচিত করানোকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৫ সালে উন্নত লোহার লাঙল ও আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের উদ্যোগ নেন। ১৯০৫ সালে উন্নত লাঙল ব্যবহারের পাশাপাশি পতিসরে আধুনিক কলের লাঙল বা ট্রাক্টর নামানোর উদ্যোগ নেন। এতে করে পুরোনো কৃষিপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে অধিক উৎপাদনশীল কৃষির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের পুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে প্রচলিত শিক্ষার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি ও পশুপালন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠান।
কৃষিকে একক ফসলনির্ভরতা থেকে বের করে আনতে উন্নত ও বিকল্প ফসলের বীজ সংগ্রহ ও বিতরণের ব্যবস্থা করেন রবীন্দ্রনাথ। তুলা, আমেরিকান ভুট্টা, আলু, চীনা বাদাম ও উন্নত পাটের বীজ কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। শিলাইদহের খোরশেদপুরে পরীক্ষামূলক কৃষিখামার স্থাপন করে নতুন কৃষিপদ্ধতি ও ফসলের কার্যকারিতা দেখানোর ব্যবস্থা করেন। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা এবং কম্পোস্ট ও অন্যান্য সার ব্যবহারের পদ্ধতিও চালু করেন রবীন্দ্রনাথ।
কৃষির সঙ্গে পশুপালন ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণকেও যুক্ত করেন তিনি। উন্নত জাতের গবাদিপশু এনে পশুর জাত উন্নয়নের চেষ্টা, ডেইরি ফার্ম স্থাপন, ধান মাড়াইয়ের যান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং তুঁত চাষ ও রেশম গুটিপোকা পালনের উদ্যোগ ছিল তাঁর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। কৃষকের আয় যেন শুধু ধান কাটার মৌসুমের ওপর নির্ভর না করে, সে জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের পথও খুঁজেছিলেন তিনি।
৩
রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন, কৃষির উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন কৃষক তার উৎপাদনের ওপর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিন্তু, মহাজনী ঋণের কারণে কৃষকের এই স্বাধীনতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। এই সমস্যা মোকাবিলায় সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তিনি।
১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ছিল রবীন্দ্রনাথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে মহাজনের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করেন তিনি। ব্যাংকের মূলধন সংকট দেখা দিলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নোবেল পুরস্কারের প্রায় পুরো অর্থ সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেন। শুধু তাই নয়, বইয়ের রয়্যালটি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া বক্তৃতা থেকে পাওয়া নয় হাজার টাকা সমবায় ব্যাংকের তহবিলে জমা দেন।
অর্থনৈতিক মুক্তির এই ধারণা শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষকের উৎপাদিত ফসল যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে কম দামে বিক্রি না হয়, তার জন্য সমবায় বিপণনের ব্যবস্থা করেন। মহাজনী ঋণের কারণে কৃষকের জমি হাতছাড়া হলে তা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেন। দুর্যোগের সময় খাদ্য ও বীজের নিরাপত্তার জন্য ধর্মগোলা বা শস্যভাণ্ডার স্থাপন করেন।
ধান, পাট ও সরিষা কাটার মৌসুমে পাইকার ও দালালরা অভাবী কৃষকদের জিম্মি করে নামমাত্র মূল্যে ফসল কিনে নিত। ১৯০৫ সালে সমবায় বিপণন ও ফড়িয়া উচ্ছেদ করে সমবায় ভাণ্ডারের মাধ্যমে কৃষকের ফসল গুদামে রেখে উপযুক্ত সময়ে বড় মোকামে বিক্রির ব্যবস্থা করেন, যাতে কৃষক সরাসরি সর্বোচ্চ লভ্যাংশ পায়।
৪
রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা ছিল মানুষের মুক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাই তাঁর পল্লি উন্নয়ন কর্মসূচির একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বিদ্যালয়, নৈশবিদ্যালয়, বৃত্তি, কারিগরি শিক্ষা ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠা। ১৮৮৯ সালে তিনি যখন পূর্ববাংলায় আসেন, তখন শিলাইদহের নদীপাড়ের গ্রামীণ মানুষের অক্ষরজ্ঞান ছিল শূন্যের কোঠায়। সবার শিক্ষা নিশ্চিত করতে ১৮৯২ সালে শিলাইদহ এম. ই. স্কুল ও অবৈতনিক পাঠশালা স্থাপন করে হিন্দু-মুসলমানসহ সমস্ত প্রজার সন্তানদের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন।
সে সময় পতিসর-কালীগ্রাম পরগনায় শত বর্গমাইলের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের কোনো বিদ্যালয় ছিল না। ফলে, কৃষকদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন দেখা ছিল অসম্ভব। এই সংকট দূর করতে ১৯০৫ সালে পতিসর মিডল ইংলিশ (এম. ই.) স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন রবীন্দ্রনাথ। মাটির দেয়াল ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি এই বিদ্যালয়টি নিজেই উদ্বোধন করেন এবং স্থানীয় দরিদ্র ছাত্রদের বেতন সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেন। ১৯১৩ সালে ‘কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বেতন মওকুফ ও বোর্ডিং সুবিধার ব্যবস্থা করেন।
শুধু শিশুশিক্ষা নয়, কর্মজীবী কৃষকদের শিক্ষার কথাও ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দিনের বেলা মাঠে কাজ করা কৃষকদের জন্য সান্ধ্য ও নৈশবিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করেন তিনি। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি হিসাব-নিকাশ, স্বাক্ষর ও ব্যবহারিক জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা ছিল। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থাও করেন রবীন্দ্রনাথ।
তাঁর শিক্ষা-ভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কর্মমুখিতা। কাঠের কাজ, তাঁত, চামড়ার কাজ ও হিসাব সংরক্ষণের মতো ব্যবহারিক বিষয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। গ্রামের মানুষকে বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত করার জন্য বই ও সংবাদপত্র পাঠের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৮৯৮ সালে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার ও সংবাদপত্র পড়ার ব্যবস্থা করেন। কাচারি ঘরে পত্রিকা ও বই এনে রাখা হতো এবং শিক্ষকরা সাধারণ মানুষদেরকে সমসাময়িক খবরাখবর পড়ে শোনাতেন।
৫
গ্রামীণ সমাজের আরেকটি বড় সংকট ছিল চিকিৎসার অভাব। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকের অভাবে সাধারণ রোগও প্রাণঘাতী হয়ে উঠত। কবিরাজি ঝাড়ফুঁক বা অপচিকিৎসায় মানুষ মারা যেত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণ প্রজাদের স্বাস্থ্যসেবার কথা চিন্তা করে ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ নিজে দেশ-বিদেশের বই পড়ে হোমিওপ্যাথিক জ্ঞান আয়ত্ত করেন এবং নৌকায় বাক্সভর্তি ওষুধ নিয়ে চর অঞ্চলের সাধারণ কৃষকদের কুঁড়েঘরে গিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেন। ১৯৯৩ সালে শিলাইদহ ও পতিসরে মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। সেখানে ডাক্তার ও চিকিৎসা সহকারীর মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেন।
কুসংস্কারের কারণে প্রজারা কলেরাকে দেবী ওলাওঠার কোপ মনে করত এবং বসন্তের টিকা নিতে ভয় পেত। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৬ কলকাতা থেকে আধুনিক ভ্যাকসিন আনিয়ে এস্টেটের কর্মীদের দ্বারা প্রজাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা তৈরি করে গণটিকাদান সম্পন্ন করেন।
স্বাস্থ্যকে তিনি কেবল হাসপাতাল বা চিকিৎসকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বিশুদ্ধ পানির জন্য কূপ ও দীঘি খনন এবং গ্রামীণ পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন। চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে একটি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ভাবনার মধ্যে আনার চেষ্টা করেন। খোলা পুকুর ও দূষিত নদীর ঘোলা জল পান করার কারণে প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও বর্ষায় জলবাহিত রোগে শত শত লোক মারা যেত। এই মহামারি রোধে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে ১৮৯৩ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের বিভিন্ন গ্রামে শতাধিক ইন্দারা (কূপ) খনন করেন এবং সংরক্ষিত দীঘি প্রস্তুত করেন।
বসতবাড়ির পাশে উন্মুক্ত মলমূত্র ত্যাগ ও অপরিচ্ছন্ন ড্রেনে মশা-মাছির উপদ্রবে রোগ বিস্তার ঘটত। এসব থেকে প্রজাসাধারণকে রক্ষায় ১৯০৫-১৯১৫ সাল পর্যন্ত হিতৈষী সভার মাধ্যমে সপ্তাহে একদিন বাধ্যতামূলক গ্রাম-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি এবং সুনির্দিষ্ট স্থানে আবর্জনা ফেলার নিয়ম চালু করে গ্রামীণ স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করেন রবীন্দ্রনাথ।
৬
রবীন্দ্রনাথের পল্লি পুনর্গঠনের ধারণার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। তিনি মনে করতেন, মানুষের উন্নয়নকে স্থায়ী করতে হলে তাদের নিজেদের সমস্যার সমাধানে তাদেরই যুক্ত করতে হবে। কারণ, সাধারণ বিরোধ নিয়ে ব্রিটিশ আদালতে মামলা করতে গিয়ে উকিল ও টাউটদের খপ্পরে পড়ে প্রজারা সর্বস্বান্ত হতো। এই দুরবস্থা থেকে সাধারণ প্রজাদের রক্ষায় ১৮৯৫ সালে প্রতিটি গ্রামে প্রজাদের নির্বাচিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে পঞ্চায়েতি সালিশ বোর্ড গঠন করেন এবং ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ গ্রামে মিটিয়ে আদালতে যাওয়ার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দেন।
রবীন্দ্রনাথ দায়িত্ব গ্রহণের আগে জমিদারি প্রশাসনের কর্মচারীরা নিরীহ কৃষকদের কাছ থেকে নজরানা, পরব ও সেলামির নামে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করত। ১৮৯০ সালে দায়িত্ব নিয়েই তিনি নির্দেশ জারি করেন যে, কোনো কর্মচারী উপরি টাকা আদায় করলে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত হবেন। বহু দুর্নীতিবাজ নায়েবকে তিনি সরাসরি বরখাস্ত করেন।
৭
কৃষির পাশাপাশি গ্রামীণ শিল্প ও কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টিও রবীন্দ্রনাথের চিন্তার অংশ ছিল। সনাতন তাঁতে সারাদিন খেটেও তাঁতিরা গামছা ছাড়া কিছু বুনতে পারত না, ফলে তীব্র দারিদ্র্যে ভুগছিল তারা। এই সংকট নিরসনে ১৯০৫ সালে উন্নত ফ্লাই-শাটল তাঁত এনে তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে শাড়ি, চাদর ও ধুতি তৈরির মতো পণ্য উৎপাদনের সুযোগ বাড়ে।
খড়ের তৈরি চাল হওয়ার কারণে সামান্য অসাবধানতায় প্রতি বছর আগুনে পুড়ে কৃষকের ঘর-বাড়ি ভস্মীভূত হতো। এই বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ব্যথিত করে তুলেছিল। সমস্যার আশু সমাধানে ১৯০৫ সালে টালির কারখানা স্থাপন করেন তিনি। সেখানে উন্নত ছাঁচ ও পোড়ানোর প্রযুক্তি ব্যাবহার করে কুমোররা আগুন-প্রতিরোধী টালি তৈরি করেন। এতে করে স্বল্প ব্যয়ে ঘর নির্মাণ করা সম্ভব হয়।
৮
রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ-অভিজ্ঞতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পরিচয়। বাংলার বাউল গান, লোকগীতি ও গ্রামীণ দর্শন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি কুষ্টিয়া-শিলাইদহের গগন হরকরা এবং লালন সাঁইজির অনুসারীদের গান ও গ্রামীণ সাহিত্য সংগ্রহ করেন এবং বিশ্ব দরবারে বাংলার পল্লীগীতি ও দর্শনকে পৌঁছে দেন।
উন্নয়নকে কেবল অর্থনীতি ও অবকাঠামোর বিষয় হিসেবে দেখেন নি রবীন্দ্রনাথ। তিনি বিশ্বাস করতেন, নিজস্ব সংস্কৃতি, জীবনবোধ ও সৃজনশীলতা যে কোনো সমাজের শক্তি ও আত্মমর্যাদার অংশ। মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
৯
বাংলাদেশ-পর্বে রবীন্দ্রনাথের গৃহীত উদ্যোগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে এগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এগুলোকে একসঙ্গে দেখলে একটি সুবিন্যাস্ত উন্নয়ন-দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষিক্ষেত্রে তিনি আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, মাটির পরীক্ষা, সেচ, পশুপালন, কৃষিযন্ত্র ও বিকল্প উৎপাদনের ওপর জোর দেন। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সমবায় ব্যাংক, বিপণন, ঋণমুক্তি ও ধর্মগোলার মাধ্যমে কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যালয়, নৈশবিদ্যালয়, বৃত্তি, কারিগরি শিক্ষা ও পাঠাগারের মাধ্যমে জ্ঞানকে গ্রামের মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে চিকিৎসালয়, টিকাদান, বিশুদ্ধ পানি ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
সামাজিক ক্ষেত্রে তিনি পঞ্চায়েত, হিতৈষী সভা, যৌথ তহবিল ও সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় অংশগ্রহণ বাড়াতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে বেগার প্রথা বন্ধ, কর্মচারীদের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি এবং দুর্যোগকালে প্রজাদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে মানবিক প্রশাসনের ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। কুটিরশিল্প ও অবকাঠামোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। আর লোকসংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতি মনোযোগের মাধ্যমে উন্নয়নের সঙ্গে সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকেও যুক্ত করেছেন।
সহায়ক গ্রন্থ:
১. রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর— পিতৃস্মৃতি, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা
২. প্রশান্তকুমার পাল— রবিজীবনী, খণ্ড ৩-৭, আনন্দ পাবলিশার্স
৩. আহমদ রফিক— রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর এবং রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ
৪. অমিতাভ চৌধুরী— জমিদার রবীন্দ্রনাথ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা
৫. শচীন্দ্রনাথ অধিকারী— শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ

আপনার মতামত লিখুন