সংবাদ

পৃথিবী বাঁচানোর লড়াইয়ে অণুজীব


প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

পৃথিবী বাঁচানোর লড়াইয়ে অণুজীব
সমুদ্রদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন সামুদ্রিক অণুজীবের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে

পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যে উপাদানগুলো মৌলিক ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে অক্সিজেন অন্যতম| স্থলভাগের বৃক্ষরাজি অক্সিজেন উৎপন্ন করলেও সিংহভাগ অক্সিজেন উৎপন্ন হয় সমুদ্রের বিভিন্ন অনুজীব থেকে| সমুদ্রে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফাইটোপ্ল্যাংকটন, অনুশৈবাল ও সালোকসংশ্লেষণকারী ব্যাকটেরিয়া যা পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি উৎপন্ন করে| এই সামুদ্রিক অনুজীবগুলো বৈশ্বিক কার্বনচক্র ও বায়ুমণ্ডলীয় ভারসাম্য রক্ষায় মৌলিক অবদান রাখে| 

অর্থাৎ, মানবসভ্যতার শ্বাস-প্রশ্বাস সরাসরি  নির্ভর করছে এক বিশাল কিন্তু অদৃশ্য জৈবসমাজের ওপর| অনুজীবের গুরুত্ব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ নয় মানবদেহ নিজেও এক জটিল অনুজীব বাস্ততন্ত্র| মানবদেহের অন্ত্র,  ত্বক, শ্বাসনালীতে বসবাসকারী ট্রিলিয়ন অনুজীব আমাদের দেহের হজম প্রক্রিয়া, ভিটামিন সংশ্লেষণ এবং রোগপ্রতিরোধের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা পালন করে| পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনেও অনুজীবের ব্যবহার ক্রমবর্ধমান| উদাহরণস্বরূপ, Elysia chlorotica নামক এক প্রজাতির সমুদ্র শামুক Vaucheria litorea  শৈবাল থেকে ক্লেরোপ্লাস্ট গ্রহণ করে সূর্যালোক ব্যবহার করে শক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম যা প্রাণিজগতে একটি ব্যতিক্রমধর্মী অভিযোজন, তবুও এটি জীববৈচিত্র্য ও জিনগত বিনিময় সম্পর্কিত গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে| 

এছাড়া Pestalotiopsis microspora নামক এক প্রজাতির ছত্রাক পলিউরেথেন ভাঙতে সক্ষম বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে| প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের অনুজীবভিত্তিক বয়োরিমিডিয়েশন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কার্যকর সমাধান দিতে পারে| একইভাবে Aedes aegypti  মশার মধ্যে Wolbachia  ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটিয়ে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণ হ্রাসের প্রচেষ্টা বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়িত হয়েছে| এতে প্রতীয়মান হয় যে অনুজীবকে কেবল রোগের উৎস হিসেবে নয়, বরং রোগনিয়ন্ত্রণের সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব| পুষ্টিচক্রেও অণুজীবের ভূমিকা রয়েছে| ব্যাকটেরিয়া ও ফাংগাস মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ ভেঙে নাইট্রোজেন, কার্বন ও ফসফরাস  পুনরায় পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়|  নাইট্রোজেন স্থিরীকরণকারী ব্যাকটেরিয়া বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেনকে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য যৌগে রূপান্তর করে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক| ফলে অনুজীব ছাড়া বস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়বে| চোখে না দেখা ক্ষুদ্র প্রাণীরা নীরবে বাঁচিয়ে রাখছে আমাদের পৃথিবী|

শৈবাল বাতাসে অক্সিজেন জোগায়, ব্যাকটেরিয়া মৃত পদার্থ পচিয়ে মাটিকে উর্বর করে, আর ফাংগাস প্রকৃতির পুনঃব্যবহার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে| পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির অগ্রগতিতে এই অনুজীবরাই আসল নেপথ্য নায়ক| তবে অনুজীবনির্ভর এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর মানবসৃষ্ট চাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে| অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ঘটাচ্ছে| সমুদ্রদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন সামুদ্রিক অণুজীবের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে| বন উজাড়  ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির উপকারী অণুজীব হ্রাস পাচ্ছে| 

এসব পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে| টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অণুজীব সম্পর্কিত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন| সমুদ্র ও মাটির বাস্ততন্ত্র সংরক্ষণ যুক্তি সংগত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার  এবং অণুজীবভিত্তিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উন্নয়ন এসব উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে| অণুজীব পৃথিবীর পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত| তাদের ভূমিকা অদৃশ্য হলেও প্রভাব সুদূরপ্রসারী| ভবিষ্যতের উন্ননয়ন কৌশলে অণুজীবকে একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত| তাহলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং উন্নয়নের ধারা সুদূরপ্রসারী হবে|


মেহনাজ মনির অথৈ

শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬


পৃথিবী বাঁচানোর লড়াইয়ে অণুজীব

প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যে উপাদানগুলো মৌলিক ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে অক্সিজেন অন্যতম| স্থলভাগের বৃক্ষরাজি অক্সিজেন উৎপন্ন করলেও সিংহভাগ অক্সিজেন উৎপন্ন হয় সমুদ্রের বিভিন্ন অনুজীব থেকে| সমুদ্রে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফাইটোপ্ল্যাংকটন, অনুশৈবাল ও সালোকসংশ্লেষণকারী ব্যাকটেরিয়া যা পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি উৎপন্ন করে| এই সামুদ্রিক অনুজীবগুলো বৈশ্বিক কার্বনচক্র ও বায়ুমণ্ডলীয় ভারসাম্য রক্ষায় মৌলিক অবদান রাখে| 

অর্থাৎ, মানবসভ্যতার শ্বাস-প্রশ্বাস সরাসরি  নির্ভর করছে এক বিশাল কিন্তু অদৃশ্য জৈবসমাজের ওপর| অনুজীবের গুরুত্ব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ নয় মানবদেহ নিজেও এক জটিল অনুজীব বাস্ততন্ত্র| মানবদেহের অন্ত্র,  ত্বক, শ্বাসনালীতে বসবাসকারী ট্রিলিয়ন অনুজীব আমাদের দেহের হজম প্রক্রিয়া, ভিটামিন সংশ্লেষণ এবং রোগপ্রতিরোধের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা পালন করে| পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনেও অনুজীবের ব্যবহার ক্রমবর্ধমান| উদাহরণস্বরূপ, Elysia chlorotica নামক এক প্রজাতির সমুদ্র শামুক Vaucheria litorea  শৈবাল থেকে ক্লেরোপ্লাস্ট গ্রহণ করে সূর্যালোক ব্যবহার করে শক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম যা প্রাণিজগতে একটি ব্যতিক্রমধর্মী অভিযোজন, তবুও এটি জীববৈচিত্র্য ও জিনগত বিনিময় সম্পর্কিত গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে| 

এছাড়া Pestalotiopsis microspora নামক এক প্রজাতির ছত্রাক পলিউরেথেন ভাঙতে সক্ষম বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে| প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের অনুজীবভিত্তিক বয়োরিমিডিয়েশন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কার্যকর সমাধান দিতে পারে| একইভাবে Aedes aegypti  মশার মধ্যে Wolbachia  ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটিয়ে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণ হ্রাসের প্রচেষ্টা বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়িত হয়েছে| এতে প্রতীয়মান হয় যে অনুজীবকে কেবল রোগের উৎস হিসেবে নয়, বরং রোগনিয়ন্ত্রণের সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব| পুষ্টিচক্রেও অণুজীবের ভূমিকা রয়েছে| ব্যাকটেরিয়া ও ফাংগাস মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ ভেঙে নাইট্রোজেন, কার্বন ও ফসফরাস  পুনরায় পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়|  নাইট্রোজেন স্থিরীকরণকারী ব্যাকটেরিয়া বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেনকে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য যৌগে রূপান্তর করে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক| ফলে অনুজীব ছাড়া বস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়বে| চোখে না দেখা ক্ষুদ্র প্রাণীরা নীরবে বাঁচিয়ে রাখছে আমাদের পৃথিবী|

শৈবাল বাতাসে অক্সিজেন জোগায়, ব্যাকটেরিয়া মৃত পদার্থ পচিয়ে মাটিকে উর্বর করে, আর ফাংগাস প্রকৃতির পুনঃব্যবহার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে| পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির অগ্রগতিতে এই অনুজীবরাই আসল নেপথ্য নায়ক| তবে অনুজীবনির্ভর এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর মানবসৃষ্ট চাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে| অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ঘটাচ্ছে| সমুদ্রদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন সামুদ্রিক অণুজীবের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে| বন উজাড়  ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির উপকারী অণুজীব হ্রাস পাচ্ছে| 

এসব পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে| টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অণুজীব সম্পর্কিত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন| সমুদ্র ও মাটির বাস্ততন্ত্র সংরক্ষণ যুক্তি সংগত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার  এবং অণুজীবভিত্তিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উন্নয়ন এসব উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে| অণুজীব পৃথিবীর পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত| তাদের ভূমিকা অদৃশ্য হলেও প্রভাব সুদূরপ্রসারী| ভবিষ্যতের উন্ননয়ন কৌশলে অণুজীবকে একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত| তাহলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং উন্নয়নের ধারা সুদূরপ্রসারী হবে|


মেহনাজ মনির অথৈ

শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত