হেমন্তের সন্ধ্যা গ্রাম বাংলায় নেমে আসে খুব ধীরে, অতি ধীরে| যেন ক্লান্ত কোনো বৃদ্ধা আঙুলে আঙুলে আলো গুনে একেকটি দিন ভাঁজ করে রাখে নরম অন্ধকারের বাক্সে| মনে হয় আকাশের বিশাল নীল চাদরটি কেউ অদৃশ্য নিঃশ্বাসে গুটিয়ে নিচ্ছে ধীরে ধীরে; যেন বহুদিনের ব্যবহৃত স্বপ্ন কেউ যত্নে তুলে রাখছে সময়ের পুরোনো আলমারিতে|
সেদিনও ঠিক তেমনই সন্ধ্যা নেমেছিল| পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আলোটা নিভে যাওয়ার আগে ধানের ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছিল সোনালি আগুনের মতো| দূরের তালগাছগুলো স্থির দাঁড়িয়ে ছিলো যেন বহু শতাব্দী ধরে তারা এই গ্রামের সমস্ত ইতিহাস নীরবে দেখছে| বাতাসে শুকনো ধানের গন্ধ এগিয়ে আসছে| এই গন্ধ এমন যেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসা কোনো প্রাচীন স্মৃতি|
সুদীপ সেই সময় দাঁড়িয়ে ছিল গ্রামের শেষ প্রান্তের বাঁশ বাগানের ধারে| তার হাতে একটি টর্চ আর একটি টেন্ডা| টেন্ডাটা অনেক পুরোনো লোহার চিকন শিক দিয়ে তৈরি| তার বাবা একসময় এই টেন্ডা দিয়ে মাছ শিকার করতেন| বাবা এখন আর বেঁচে নেই| কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো— রাতে যখন সে বিলে নামে, তখন তার মনে হয় যেন বাবা কোথাও খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছেন| হয়তো বাতাসে| হয়তো জলের মধ্যে|
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ছেলে মৃদুল| একই গ্রামে, একই বাড়িতে থাকে সে| মৃদুলের চোখে অদ্ভুত আলো| ভয় আছে| কৌতূহল আছে| সে ফিসফিস করে বলল—
“দাদা, আজ কি সত্যিই কুয়াশার বিলে যাবেন?”
সুদীপ একটু হাসল|
“কেন? ভয় লাগছে তোর?”
মৃদুল মাথা নাড়ল|
“গ্রামের সবাই তো বলে ওই বিলে রাত ভালো না| দাদা, তুই বিশ্বাস করবি কি করবি না জানি না— কিন্তু রাত হলে ওই বিলটা আর বিল থাকে না; বিলটা যেন পুরোনো কোনো অভিশাপ| জলের ছদ্মবেশে শুয়ে থাকে কেউ| যেন ছদ্মবেশটাই কারো জন্য অপেক্ষা করে|”
সুদীপ কোনো উত্তর দিল না| সে শুধু আকাশের দিকে তাকাল|
তারার আলো তখন একে একে ফুটে উঠছে| মনে মনে বিড়বিড় করছে, মানুষ যত বড় শহরই বানাক না কেন, এই আকাশের সামনে সে সবসময়ই ছোট, তুচ্ছও হয়তো| এই সত্যটা শহরে বোঝা যায় না| শুধু গ্রামের রাতে বোঝা যায়|
কুয়াাশার বিল গ্রাম থেকে বেশ দূরে| সেখানে যেতে হলে ধানের ক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে হয়, তারপর সরু কাঁচা রাস্তা ধরে আরও অনেকটা পথ যেতে হয়| পথে মানুষের দেখা খুব কম মেলে| মাঝে মাঝে দূরে কোনো কুকুর ডাকলে মনে হয় এই পৃথিবীতে এখনও জীবনের চিহ্ন আছে| নইলে চারদিকে এমন নিঃসঙ্গতা মেলে থাকে যেন মনে হয় এই পৃথিবীতে শুধু রাত আর বাতাস আছে|
হাঁটতে হাঁটতে সুদীপের মনে পড়ল বাবার কথা| বাবা একবার বলেছিলেন— “মানুষ রাতে জলে নামে কেন জানিস?”
সুদীপ তখন ছোট ছিল| সে উত্তর দিতে পারেনি| বাবা নিজেই বলেছিলেন— “কারণ মানুষের ভিতরেও একটা অন্ধকার বিল আছে| সেই বিলে না নামলে মানুষ নিজেরে চিনতে পারে না|”
সেদিন কথাটা সে বুঝতে পারেনি| আজ অনেক বছর পরে সেই কথাটা তার মনে পড়ল|
মনে হলো— হয়তো আজ সে সেই অন্ধকার বিলেই নামতে যাচ্ছে|
কুয়াশার বিলের কাছে পৌঁছতেই বাতাসের গন্ধ বদলে গেল| এখানে মাটির গন্ধের সাথে জলের আর্দ্রতা মিশে আছে| বিলের জল তখন হয়ে আছে স্থির|
এমন স্থির যেন মনে হয়— পৃথিবীর সমস্ত সময় এখানে এসে থেমে গেছে| সুদীপ টর্চের আলো ফেলল জলের উপর| হঠাৎ জলের নিচে একটা ছায়া নড়ে উঠলো| একটা বড় শিং মাছ| সে ধীরে ধীরে টেন্ডা তুলল| তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু তখন সতর্ক|
তারপর—
ঝপাৎ!
জল ছিটকে উঠল| মাছটা টেন্ডার মধ্যে আটকে ছটফট করতে লাগল| মৃদুল আনন্দে চিৎকার করে উঠল— “দাদা! কি মাছ ধরছেন!”
সুদীপ মৃদু হাসল| কিন্তু তার চোখ তখনও জলের দিকে| কারণ প্রকৃত শিকারীর চোখ কখনও বিশ্রাম নেয় না| রাত ধীরে ধীরে গভীর হতে লাগল| বিলের উপর কুয়াশা নামতে শুরু করলো| কুয়াশা যখন জলের উপর ভাসে তখন পৃথিবীটা অন্যরকম লাগে| মনে হয়- মানুষ যেন বাস্তবের মধ্যে নয়, কোনো স্বপ্নের ভিতর হাঁটছে|
সুদীপ আরও কয়েকটি মাছ ধরল| হঠাৎ তার মনে হলো কেউ যেন দূর থেকে তাকিয়ে আছে| সে টর্চ ঘুরিয়ে চারদিকে তাকাল| কেউ নেই| শুধু কুয়াশা| আর নিঃশব্দ জল| ঠিক তখনই তার হাত মৃদুল শক্ত করে ধরল: “দাদা”
তার গলায় ভয়|
“ওইটা কী?”
সুদীপ তাকাল|
বিলের মাঝখানে একটা আলো জ্বলছে|
ক্ষুদ্র আলো|
যেন জলের উপর ভাসমান কোনো হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি|
সুদীপের মনে পড়লো গ্রামের গল্প|
“লোকেরা বলে— এই বিলে বহু বছর আগে এক জেলে ডুবে মারা গিয়েছিল| তারপর থেকে মাঝে মাঝে রাতে একটা আলো দেখা যায়| কেউ বলে ওটা ‘মরা আত্মা’| কেউ বলে ‘জলের আগুন’| কেউ আবার বলে— ‘ওটা মানুষের ভেতরের ভয়’|
ততক্ষণে ওদের অনেক মাছ শিকার করা হয়ে গেছে| রাত গড়াতে লাগলো, আলোর দিকে|
“চলেন দাদা, বাড়ি ফিরে যাই|”
কিন্তু সুদীপের চোখে তখনও কৌতূহলের আগুন|
সে ধীরে ধীরে জলের মধ্যে নামল| জল ঠাণ্ডা| কোমর পর্যন্ত উঠে এল| কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠছে| আলোটা এখন খুব কাছে| তারপর সে দেখলো— ওটা কোনো ভূতের আলো নয়| একটা পুরোনো নৌকা| নৌকার ওপর বসে আছে একজন মানুষ| বয়স্ক| তার হাতে একটা লণ্ঠন| বৃদ্ধ ধীরে বললেন— “অনেক দিন পরে কেউ এদিকে এল|” তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত| মনে হয় যেন খুব দূর থেকে ভেসে আসছে|
সুদীপ বলল—
“আপনি এখানে থাকেন?”
বৃদ্ধ একটু হাসলেন|
“মানুষ কোথায় থাকে বলো তো?”
তিনি আকাশের দিকে তাকালেন|
“যেখানে তার স্মৃতি থাকে| মানুষ আসলে সেখানেই থাকে|”
কিছুক্ষণ নীরবতা| কুয়াাশার মধ্যে লণ্ঠনের আলো কাঁপছে| বিলের জল নিঃশব্দ| বৃদ্ধ আবার বললেন— “তুমি মাছ ধরতে এসেছ| কিন্তু একদিন বুঝবে— মানুষ মাছ ধরতে আসে না| সে আসে তার নিজের ভিতরের অন্ধকার দেখতে|”
সুদীপের মনে হলো— এই কথাগুলো সে আগে কোথাও শুনেছে| হয়তো বাবার মুখে| হয়তো নিজের ভিতরে|
হঠাৎ বাতাস বইল| কুয়াশা সরে গেল| সুদীপ আবার তাকাল নৌকার দিকে| কিন্তু, নৌকা নেই| বৃদ্ধও নেই| শুধু বিলের নিঃশব্দ জল| আর দূরের আকাশে ফিকে হয়ে আসা তারা|
ভোরের আলো ধীরে ধীরে আকাশে উঠতে লাগল| মৃদুল বলল—
“দাদা, আমরা কি সত্যিই কাউকে দেখেছিলাম?”
সুদীপ কোনো উত্তর দিল না| কারণ সে নিজেও নিশ্চিত নয়!
ক্ষাণিক পর, হঠাৎ বাতাস উঠল| কুয়াশা সরে গেল| নৌকা নেই|
বৃদ্ধ নেই| এটা আবার কল্পনা করলো মৃদুল, শুধু জল|
মৃদুল দৌঁড়ে এসে বলল— “দাদা, উনি কোথায় গেলেন?”
সুদীপ আবারও অনেকক্ষণ চুপ করে রইল| তারপর ধীরে বলল— “যেখান থেকে এসেছিলেন, সেখানে|”
“কোথা থেকে? ”
সুদীপ নিজের বুকের দিকে আঙুল রাখল— “এখান থেকে|”
ভোরের আলো ফুটে উঠছে সূর্যমুখী ফুলের মতন করে| ধানের উপর শিশির ঝিলমিল করছে| মৃদুল আবার বলল—
“দাদা, আমরা কি সত্যিই কাউকে দেখেছিলাম?”
সুদীপ একটু হেসে বললো—
“তুই কী দেখেছিস?”
“আমি জানি না|”
“তাহলেই ঠিক দেখেছিস|”
মৃদুল অবাক হয়ে বললো:
“তার মানে?”
“যে জিনিসকে ভাষায় ধরা যায় না, কেবল ভাবে ধরা যায়; সেইটাই সত্যি|”
সুদীপ আকাশের দিকে তাকাল| তার চোখে আর আগের সেই খোঁজ নেই| সে ধীওে ধীরে বলল—
“মৃদুল মানুষ হারায় না রে|”
“তাহলে?”
“সে শুধু বদলায়| অন্ধকার থেকে আলোয় যায়|”
মৃদুল চুপ করে রইল| দূরে কুয়াশার বিল| নিঃশব্দে যেন হাসছে|
কিছু ঘটনা আছে— যেগুলো সত্যি কি মিথ্যা তা বোঝা যায় না| তবে সেই রাতের পর থেকে যখনই সে কোনো বিলে মাছ ধরতে যায়— তার মনে হয়, মানুষ শুধু মাছ ধরতে যায় না| সে যায় নিজের ভিতর গভীর জল দেখতে| আর কখনও কখনও— সেই গভীর জলের মধ্যেই মানুষ তার সত্যিকারের মুখ দেখতে পায়| ভোরের আলো আস্তে আস্তে আকাশের কোণে ফুলের পাপড়ির মতো ফুটে উঠছে, যেন নিঃশব্দ হাতে কেউ আকাশের নীল কাপড়কে ধীরে ধীরে আঁচড়াচ্ছে| কুয়াশার বিল তখনও নিস্তব্ধ, মৃদু কুয়াশার ঘ্রাণে ঢাকা অন্ধকার রাতের সমস্ত গোপন কথাবার্তাকে চুপচাপ ভিজিয়ে রাখছে| শুধু জলের নরম ঢেউ, ধীরে ধীরে, পলকগুলোর মধ্য দিয়ে ক্ষণিকের স্মৃতি ছড়িয়ে দেয় মাটির গন্ধ, অতীতের নিঃশ্বাস, হারানো চোখের আলো| সুদীপ দাঁঢ়িয়ে আছে বিলের ধারে| তার হাতে আর টর্চ নেই| তার বারবার মনে হচ্ছে— টেন্ডা, নৌকা, মাছ সব কিছুরই এখন কোনো মানে নেই| রাতের শিকার আর খাদ্যের সন্ধান সব কিছু মিলিয়ে গেছে তার ভেতরের অন্ধকারে| শুধু বাকি আছে এক অন্তর্দৃষ্টি, এক অদৃশ্য আলো, যা জলের গভীরে এবং তার মনেই একসাথে জ্বলছে| সুদীপ বুঝতে পারছে বিল কেবল জল নয়| বিল মানুষের ভিতরের অন্ধকার, যেখানে জমে থাকে সব স্মৃতি, ভুল, ভালোবাসা, অপরাধবোধ| এই অচেনা জলে কেউ ডুবে যায়, কেউ নিজেকে খুঁজে পায়| এখানেই জন্ম হয় নতুন নীরব, অস্পর্শযোগ্য, চিরন্তন আলো|
দূরে হঠাৎ দেখা দিল সেই ছোট্ট আলো| প্রতীকবিহীন, অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত| নসু মাঝি, বৃদ্ধ, কুয়াশায় মিলিয়ে যেন এক হয়ে ভাসছে বিলের কুয়াশার গভীরে| আলো ধীরে ধীরে জলের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে যেন বাতাসের হিমশীতল হাত সব দৃষ্টিশক্তিকে স্পর্শ করছে| প্রায় যেন সকল আলো এসে বলছে— “মানুষ যা হারায়, সেটাই তাকে ফিরিয়ে আনে| মানুষ যা খুঁজে পায়, সেটাই তাকে হারায়|”
সুদীপের বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা জেগে উঠল| হঠাৎ বুঝতে পারল জীবনে কোনো সত্যিকারের জয় নেই| শুধু উপলব্ধি আছে| শুধু বোঝার প্রক্রিয়া| আর সেই বোঝার মধ্যেই জ্বলছে মানুষ|
সুদীপ নেমে দাঁড়াল জলের ধারে| তার পায়ের ছোঁয়ায় জল নরম হয়ে উঠল, শীতল, অথচ প্রাণঘাতী নিঃশব্দ| কিন্তু চোখ জুড়ে কুয়াশার মধ্যে আটকে থাকা আলোতে| একটি মুহূর্ত, যে মুহূর্তে কালো ও সাদা যেন এক হয়ে যাচ্ছে| সুদীপ বুঝলো, যে আলো তাকে ডেকেছিল, তা তার নিজের ভেতরের আলো| নসু মাঝি, বৃদ্ধ, কুয়াশা সবই মিলিয়ে এক চূড়ান্ত সত্য প্রকাশ করল|
জীবন একটি বিল| মানুষ সেই বিলের জলে ভেসে যায়| ভেসে যাওয়া মানেই হারানো নয়| ভেসে যাওয়া মানেই খুঁজে পাওয়া| সুদীপ গভীর নিশ্বাস নিল| এখন সে আর ভয় পায় না| ভয় সর্বদা মানুষের ভেতরে জন্ম নেয়| আলো মানুষের ভিতরেই জন্মায়| মানুষ যতই তাকায় বাইরে, তাতে ভেতরের আলো জ্বলে না, কিছুই দেখা যায় না|
জলের ওপর ছায়ার মতো কুয়াাশা ধীরে ধীরে সরছে| আকাশে সূর্য উদিত হচ্ছে, তার প্রথম সোনালি রশ্মি শিশিরবিন্দুগুলোর ওপর পড়ছে| প্রতিটি শিশিরবিন্দু যেন মাটির ওপর জ্বলছে এক নক্ষত্রের মতো| সকল তারা ম্লান হয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে বিলের আয়নায় মিলছে| কিন্তু মানুষের ভিতরে বিলের নিচে আলো জ্বলছে| নীরব, চিরন্তন, এক অব্যক্ত অনুভূতি— যা কেউ স্পর্শ করতে পারে না, কিন্তু প্রত্যেকেই অনুভব করে|
সুদীপ ধীরে ধীরে ফিরে গেল গ্রামের দিকে| মৃদুুল তার পাশে হাঁটছে| কিন্তু সেই মৃদুলের চোখেও নতুন কিছু জেগেছে— একটি অদ্ভুত, অজানা জিজ্ঞাসা| প্রশ্ন, যা হয়তো জীবনের শেষ পর্যন্ত উত্তর পাবে না| হাঁটতে হাঁটতে পা ভিজে যাচ্ছে| তবু মনে হচ্ছে হাঁটা হচ্ছে না| গ্রামে যখন তারা পৌঁছে, দেখে ধানক্ষেতে প্রচুর শিশির জমেছে| প্রতিটি শিশিরবিন্দু যেন মাটির ওপর জ্বলে থাকা এক নক্ষত্র| সুদীপ হঠাৎ থেমে দাঁড়াল| তার মনে হলো— মানুষ যেমন নদীর মতো, তেমনি বিলের মতোও| জলের নিচে সব স্মৃতি, সব ভুল, সব ভালোবাসা ভেসে থাকে| আর যে মানুষ সেই জল থেকে মুখ তুলে দেখে, সে আর আগের মানুষ থাকে না| সে হয় আলো নিজের ভিতরের আলো| একটি নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস|
সুদীপ চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে বলল— ভোরের আলো ধীরে ধীরে আকাশের গায়ে ফুটে উঠছে— যেন কেউ নীল কাগজে সোনালি অক্ষরে নতুন দিনের নাম লিখছে| কুয়াশার বিল তখনও নিস্তব্ধ| জলের ওপর হালকা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা— মনে হয়, রাত তার সব গোপন কথা এখনো পুরোপুরি সরিয়ে নেয়নি| সুদীপ চুপ করে দাঁড়িয়ে|
মৃদুল ধীরে বলল— “দাদা, তুমি চুপ করে আছো কেন?”
সুদীপ একটু হাসল, কিন্তু সেই হাসি যেন দূরের—
“চুপ না থাকলে সব কথা শোনা যায় না রে!”
“কী কথা?”
সুদীপ জলের দিকে তাকাল—
“এই যে জল, এই যে কুয়াশা এরা চুপিচুপি কথা বলে!”
মৃদুল হেসে ফেলল—
“জল আবার কথা বলে নাকি?”
“শোনার কান থাকলে সবই বলে|”
তারপর একটু নীরবতা বয়ে গেল বাতাসের কানে কানে|
মৃদুল আবার বলল—
“দাদা, ওই মানুষটা সত্যি ছিল?”
সুদীপ এবার সরাসরি তাকাল তার দিকে—
“তুই কী ভাবছিস?”
“আমি বুঝতে পারছি না|”
“যা বোঝা যায় না সেটাকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি মনে রাখে|”
মৃদুল স্তব্ধ হয়ে যায়|
সুদীপ ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল|
ধানের উপর শিশির জমেছে| প্রতিটি বিন্দুতে ভোরের আলো কাঁপছে| হঠাৎ সে থেমে গেল|
“মৃদুল...”
“হ্যাঁ দাদা?”
“তুই কখনো নিজেকে দেখেছিস?”
মৃদুল অবাক হয়, এ কথা শুনে—
“নিজেকে? আয়নায়?”
সুদীপ মাথা নাড়ল—
“না| আয়নায় না| ভিতরে|”
“ভিতরে আবার কীভাবে দেখা যায়?”
সুদীপ একটু চুপ করে থেকে বলল—
“যখন মানুষ ভয় পায়, যখন একা থাকে,
যখন চারপাশে কেউ থাকে না—
তখন ভিতরের মানুষটা সামনে আসে|”
মৃদুল ধীরে বলল—
“তাহলে কাল রাতে|”
“হ্যাঁ”, সুদীপ বলল|
“আমরা শুধু বিলে নামিনি— আমরা নিজেদের ভিতরেও নেমেছিলাম|”
দূরে কুয়াশার বিল ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে|
মৃদুল আবার জিজ্ঞেস করল— “দাদা, ভয়টা কি তবে মিথ্যে?”
সুদীপ হো হো করে হসে উঠল— “ভয় কখনো মিথ্যে না রে| ভয়ই মানুষকে সত্যির সামনে দাঁড় করায়|”
“আর আলো?”
“আলো?”
সুদীপ আকাশের দিকে তাকাল| সূর্যের প্রথম রশ্মিটা ধানের ওপর আলতো করে এসে পড়ছে|
“আলো বাইরে না ভিতরে জন্মায়|”
একটু পরে সুদীপ আবার থেমে দাঁড়াল| তার চোখে অদ্ভুত শান্তি| সে ধীরে ধীরে বলল—
“মৃদুল, মানুষ হারায় না|”
“তাহলে?”
“সে বদলায়| যেমন রাত বদলে ভোর হয়— তেমনি অন্ধকার বদলে আলো হয়|”
মৃদুল আর কিছু বলল না| সে শুধু তাকিয়ে রইল সুদীপের দিকে— যেন নতুন করে তাকে চিনছে|
সুদীপ চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত| তার ঠোঁট নড়ল|
“আমি দেখেছি, আমি বুঝেছি”
মৃদুল কাছে এসে দাঁড়াল— “কী বুঝেছ দাদা?”
সুদীপ ধীরে বলল— “এই বিল কেবল জল না| এটা মানুষের মন|”
“মন?”
“হ্যাঁ, যেখানে সব জমে থাকে— ভালোবাসা, ভয়, ভুল, স্মৃতি”
আরেকবার একটু থেমে সুদীপ বললো— “আর যে একবার সেই জলে নিজের মুখ দেখে সে আর আগের মানুষ থাকে না|”
দূরে সূর্য উঠেছে| কুয়াশা সরে যাচ্ছে| কিন্তু কোথাও খুব গভীরে... একটি আলো জ্বলছে| নিঃশব্দ| অস্পৃশ্য| দূরে কুয়াশার বিল এখানো নিঃশব্দ| তবু মনে হয়— সে এখনো অপেক্ষা করছে| কারণ— প্রতিটি মানুষ একদিন সেই বিলে নামবে| এবং যে একবার নামে— সে আর কখনো সম্পূর্ণ ফিরে আসে না|

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬
হেমন্তের সন্ধ্যা গ্রাম বাংলায় নেমে আসে খুব ধীরে, অতি ধীরে| যেন ক্লান্ত কোনো বৃদ্ধা আঙুলে আঙুলে আলো গুনে একেকটি দিন ভাঁজ করে রাখে নরম অন্ধকারের বাক্সে| মনে হয় আকাশের বিশাল নীল চাদরটি কেউ অদৃশ্য নিঃশ্বাসে গুটিয়ে নিচ্ছে ধীরে ধীরে; যেন বহুদিনের ব্যবহৃত স্বপ্ন কেউ যত্নে তুলে রাখছে সময়ের পুরোনো আলমারিতে|
সেদিনও ঠিক তেমনই সন্ধ্যা নেমেছিল| পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আলোটা নিভে যাওয়ার আগে ধানের ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছিল সোনালি আগুনের মতো| দূরের তালগাছগুলো স্থির দাঁড়িয়ে ছিলো যেন বহু শতাব্দী ধরে তারা এই গ্রামের সমস্ত ইতিহাস নীরবে দেখছে| বাতাসে শুকনো ধানের গন্ধ এগিয়ে আসছে| এই গন্ধ এমন যেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসা কোনো প্রাচীন স্মৃতি|
সুদীপ সেই সময় দাঁড়িয়ে ছিল গ্রামের শেষ প্রান্তের বাঁশ বাগানের ধারে| তার হাতে একটি টর্চ আর একটি টেন্ডা| টেন্ডাটা অনেক পুরোনো লোহার চিকন শিক দিয়ে তৈরি| তার বাবা একসময় এই টেন্ডা দিয়ে মাছ শিকার করতেন| বাবা এখন আর বেঁচে নেই| কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো— রাতে যখন সে বিলে নামে, তখন তার মনে হয় যেন বাবা কোথাও খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছেন| হয়তো বাতাসে| হয়তো জলের মধ্যে|
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ছেলে মৃদুল| একই গ্রামে, একই বাড়িতে থাকে সে| মৃদুলের চোখে অদ্ভুত আলো| ভয় আছে| কৌতূহল আছে| সে ফিসফিস করে বলল—
“দাদা, আজ কি সত্যিই কুয়াশার বিলে যাবেন?”
সুদীপ একটু হাসল|
“কেন? ভয় লাগছে তোর?”
মৃদুল মাথা নাড়ল|
“গ্রামের সবাই তো বলে ওই বিলে রাত ভালো না| দাদা, তুই বিশ্বাস করবি কি করবি না জানি না— কিন্তু রাত হলে ওই বিলটা আর বিল থাকে না; বিলটা যেন পুরোনো কোনো অভিশাপ| জলের ছদ্মবেশে শুয়ে থাকে কেউ| যেন ছদ্মবেশটাই কারো জন্য অপেক্ষা করে|”
সুদীপ কোনো উত্তর দিল না| সে শুধু আকাশের দিকে তাকাল|
তারার আলো তখন একে একে ফুটে উঠছে| মনে মনে বিড়বিড় করছে, মানুষ যত বড় শহরই বানাক না কেন, এই আকাশের সামনে সে সবসময়ই ছোট, তুচ্ছও হয়তো| এই সত্যটা শহরে বোঝা যায় না| শুধু গ্রামের রাতে বোঝা যায়|
কুয়াাশার বিল গ্রাম থেকে বেশ দূরে| সেখানে যেতে হলে ধানের ক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে হয়, তারপর সরু কাঁচা রাস্তা ধরে আরও অনেকটা পথ যেতে হয়| পথে মানুষের দেখা খুব কম মেলে| মাঝে মাঝে দূরে কোনো কুকুর ডাকলে মনে হয় এই পৃথিবীতে এখনও জীবনের চিহ্ন আছে| নইলে চারদিকে এমন নিঃসঙ্গতা মেলে থাকে যেন মনে হয় এই পৃথিবীতে শুধু রাত আর বাতাস আছে|
হাঁটতে হাঁটতে সুদীপের মনে পড়ল বাবার কথা| বাবা একবার বলেছিলেন— “মানুষ রাতে জলে নামে কেন জানিস?”
সুদীপ তখন ছোট ছিল| সে উত্তর দিতে পারেনি| বাবা নিজেই বলেছিলেন— “কারণ মানুষের ভিতরেও একটা অন্ধকার বিল আছে| সেই বিলে না নামলে মানুষ নিজেরে চিনতে পারে না|”
সেদিন কথাটা সে বুঝতে পারেনি| আজ অনেক বছর পরে সেই কথাটা তার মনে পড়ল|
মনে হলো— হয়তো আজ সে সেই অন্ধকার বিলেই নামতে যাচ্ছে|
কুয়াশার বিলের কাছে পৌঁছতেই বাতাসের গন্ধ বদলে গেল| এখানে মাটির গন্ধের সাথে জলের আর্দ্রতা মিশে আছে| বিলের জল তখন হয়ে আছে স্থির|
এমন স্থির যেন মনে হয়— পৃথিবীর সমস্ত সময় এখানে এসে থেমে গেছে| সুদীপ টর্চের আলো ফেলল জলের উপর| হঠাৎ জলের নিচে একটা ছায়া নড়ে উঠলো| একটা বড় শিং মাছ| সে ধীরে ধীরে টেন্ডা তুলল| তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু তখন সতর্ক|
তারপর—
ঝপাৎ!
জল ছিটকে উঠল| মাছটা টেন্ডার মধ্যে আটকে ছটফট করতে লাগল| মৃদুল আনন্দে চিৎকার করে উঠল— “দাদা! কি মাছ ধরছেন!”
সুদীপ মৃদু হাসল| কিন্তু তার চোখ তখনও জলের দিকে| কারণ প্রকৃত শিকারীর চোখ কখনও বিশ্রাম নেয় না| রাত ধীরে ধীরে গভীর হতে লাগল| বিলের উপর কুয়াশা নামতে শুরু করলো| কুয়াশা যখন জলের উপর ভাসে তখন পৃথিবীটা অন্যরকম লাগে| মনে হয়- মানুষ যেন বাস্তবের মধ্যে নয়, কোনো স্বপ্নের ভিতর হাঁটছে|
সুদীপ আরও কয়েকটি মাছ ধরল| হঠাৎ তার মনে হলো কেউ যেন দূর থেকে তাকিয়ে আছে| সে টর্চ ঘুরিয়ে চারদিকে তাকাল| কেউ নেই| শুধু কুয়াশা| আর নিঃশব্দ জল| ঠিক তখনই তার হাত মৃদুল শক্ত করে ধরল: “দাদা”
তার গলায় ভয়|
“ওইটা কী?”
সুদীপ তাকাল|
বিলের মাঝখানে একটা আলো জ্বলছে|
ক্ষুদ্র আলো|
যেন জলের উপর ভাসমান কোনো হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি|
সুদীপের মনে পড়লো গ্রামের গল্প|
“লোকেরা বলে— এই বিলে বহু বছর আগে এক জেলে ডুবে মারা গিয়েছিল| তারপর থেকে মাঝে মাঝে রাতে একটা আলো দেখা যায়| কেউ বলে ওটা ‘মরা আত্মা’| কেউ বলে ‘জলের আগুন’| কেউ আবার বলে— ‘ওটা মানুষের ভেতরের ভয়’|
ততক্ষণে ওদের অনেক মাছ শিকার করা হয়ে গেছে| রাত গড়াতে লাগলো, আলোর দিকে|
“চলেন দাদা, বাড়ি ফিরে যাই|”
কিন্তু সুদীপের চোখে তখনও কৌতূহলের আগুন|
সে ধীরে ধীরে জলের মধ্যে নামল| জল ঠাণ্ডা| কোমর পর্যন্ত উঠে এল| কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠছে| আলোটা এখন খুব কাছে| তারপর সে দেখলো— ওটা কোনো ভূতের আলো নয়| একটা পুরোনো নৌকা| নৌকার ওপর বসে আছে একজন মানুষ| বয়স্ক| তার হাতে একটা লণ্ঠন| বৃদ্ধ ধীরে বললেন— “অনেক দিন পরে কেউ এদিকে এল|” তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত| মনে হয় যেন খুব দূর থেকে ভেসে আসছে|
সুদীপ বলল—
“আপনি এখানে থাকেন?”
বৃদ্ধ একটু হাসলেন|
“মানুষ কোথায় থাকে বলো তো?”
তিনি আকাশের দিকে তাকালেন|
“যেখানে তার স্মৃতি থাকে| মানুষ আসলে সেখানেই থাকে|”
কিছুক্ষণ নীরবতা| কুয়াাশার মধ্যে লণ্ঠনের আলো কাঁপছে| বিলের জল নিঃশব্দ| বৃদ্ধ আবার বললেন— “তুমি মাছ ধরতে এসেছ| কিন্তু একদিন বুঝবে— মানুষ মাছ ধরতে আসে না| সে আসে তার নিজের ভিতরের অন্ধকার দেখতে|”
সুদীপের মনে হলো— এই কথাগুলো সে আগে কোথাও শুনেছে| হয়তো বাবার মুখে| হয়তো নিজের ভিতরে|
হঠাৎ বাতাস বইল| কুয়াশা সরে গেল| সুদীপ আবার তাকাল নৌকার দিকে| কিন্তু, নৌকা নেই| বৃদ্ধও নেই| শুধু বিলের নিঃশব্দ জল| আর দূরের আকাশে ফিকে হয়ে আসা তারা|
ভোরের আলো ধীরে ধীরে আকাশে উঠতে লাগল| মৃদুল বলল—
“দাদা, আমরা কি সত্যিই কাউকে দেখেছিলাম?”
সুদীপ কোনো উত্তর দিল না| কারণ সে নিজেও নিশ্চিত নয়!
ক্ষাণিক পর, হঠাৎ বাতাস উঠল| কুয়াশা সরে গেল| নৌকা নেই|
বৃদ্ধ নেই| এটা আবার কল্পনা করলো মৃদুল, শুধু জল|
মৃদুল দৌঁড়ে এসে বলল— “দাদা, উনি কোথায় গেলেন?”
সুদীপ আবারও অনেকক্ষণ চুপ করে রইল| তারপর ধীরে বলল— “যেখান থেকে এসেছিলেন, সেখানে|”
“কোথা থেকে? ”
সুদীপ নিজের বুকের দিকে আঙুল রাখল— “এখান থেকে|”
ভোরের আলো ফুটে উঠছে সূর্যমুখী ফুলের মতন করে| ধানের উপর শিশির ঝিলমিল করছে| মৃদুল আবার বলল—
“দাদা, আমরা কি সত্যিই কাউকে দেখেছিলাম?”
সুদীপ একটু হেসে বললো—
“তুই কী দেখেছিস?”
“আমি জানি না|”
“তাহলেই ঠিক দেখেছিস|”
মৃদুল অবাক হয়ে বললো:
“তার মানে?”
“যে জিনিসকে ভাষায় ধরা যায় না, কেবল ভাবে ধরা যায়; সেইটাই সত্যি|”
সুদীপ আকাশের দিকে তাকাল| তার চোখে আর আগের সেই খোঁজ নেই| সে ধীওে ধীরে বলল—
“মৃদুল মানুষ হারায় না রে|”
“তাহলে?”
“সে শুধু বদলায়| অন্ধকার থেকে আলোয় যায়|”
মৃদুল চুপ করে রইল| দূরে কুয়াশার বিল| নিঃশব্দে যেন হাসছে|
কিছু ঘটনা আছে— যেগুলো সত্যি কি মিথ্যা তা বোঝা যায় না| তবে সেই রাতের পর থেকে যখনই সে কোনো বিলে মাছ ধরতে যায়— তার মনে হয়, মানুষ শুধু মাছ ধরতে যায় না| সে যায় নিজের ভিতর গভীর জল দেখতে| আর কখনও কখনও— সেই গভীর জলের মধ্যেই মানুষ তার সত্যিকারের মুখ দেখতে পায়| ভোরের আলো আস্তে আস্তে আকাশের কোণে ফুলের পাপড়ির মতো ফুটে উঠছে, যেন নিঃশব্দ হাতে কেউ আকাশের নীল কাপড়কে ধীরে ধীরে আঁচড়াচ্ছে| কুয়াশার বিল তখনও নিস্তব্ধ, মৃদু কুয়াশার ঘ্রাণে ঢাকা অন্ধকার রাতের সমস্ত গোপন কথাবার্তাকে চুপচাপ ভিজিয়ে রাখছে| শুধু জলের নরম ঢেউ, ধীরে ধীরে, পলকগুলোর মধ্য দিয়ে ক্ষণিকের স্মৃতি ছড়িয়ে দেয় মাটির গন্ধ, অতীতের নিঃশ্বাস, হারানো চোখের আলো| সুদীপ দাঁঢ়িয়ে আছে বিলের ধারে| তার হাতে আর টর্চ নেই| তার বারবার মনে হচ্ছে— টেন্ডা, নৌকা, মাছ সব কিছুরই এখন কোনো মানে নেই| রাতের শিকার আর খাদ্যের সন্ধান সব কিছু মিলিয়ে গেছে তার ভেতরের অন্ধকারে| শুধু বাকি আছে এক অন্তর্দৃষ্টি, এক অদৃশ্য আলো, যা জলের গভীরে এবং তার মনেই একসাথে জ্বলছে| সুদীপ বুঝতে পারছে বিল কেবল জল নয়| বিল মানুষের ভিতরের অন্ধকার, যেখানে জমে থাকে সব স্মৃতি, ভুল, ভালোবাসা, অপরাধবোধ| এই অচেনা জলে কেউ ডুবে যায়, কেউ নিজেকে খুঁজে পায়| এখানেই জন্ম হয় নতুন নীরব, অস্পর্শযোগ্য, চিরন্তন আলো|
দূরে হঠাৎ দেখা দিল সেই ছোট্ট আলো| প্রতীকবিহীন, অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত| নসু মাঝি, বৃদ্ধ, কুয়াশায় মিলিয়ে যেন এক হয়ে ভাসছে বিলের কুয়াশার গভীরে| আলো ধীরে ধীরে জলের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে যেন বাতাসের হিমশীতল হাত সব দৃষ্টিশক্তিকে স্পর্শ করছে| প্রায় যেন সকল আলো এসে বলছে— “মানুষ যা হারায়, সেটাই তাকে ফিরিয়ে আনে| মানুষ যা খুঁজে পায়, সেটাই তাকে হারায়|”
সুদীপের বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা জেগে উঠল| হঠাৎ বুঝতে পারল জীবনে কোনো সত্যিকারের জয় নেই| শুধু উপলব্ধি আছে| শুধু বোঝার প্রক্রিয়া| আর সেই বোঝার মধ্যেই জ্বলছে মানুষ|
সুদীপ নেমে দাঁড়াল জলের ধারে| তার পায়ের ছোঁয়ায় জল নরম হয়ে উঠল, শীতল, অথচ প্রাণঘাতী নিঃশব্দ| কিন্তু চোখ জুড়ে কুয়াশার মধ্যে আটকে থাকা আলোতে| একটি মুহূর্ত, যে মুহূর্তে কালো ও সাদা যেন এক হয়ে যাচ্ছে| সুদীপ বুঝলো, যে আলো তাকে ডেকেছিল, তা তার নিজের ভেতরের আলো| নসু মাঝি, বৃদ্ধ, কুয়াশা সবই মিলিয়ে এক চূড়ান্ত সত্য প্রকাশ করল|
জীবন একটি বিল| মানুষ সেই বিলের জলে ভেসে যায়| ভেসে যাওয়া মানেই হারানো নয়| ভেসে যাওয়া মানেই খুঁজে পাওয়া| সুদীপ গভীর নিশ্বাস নিল| এখন সে আর ভয় পায় না| ভয় সর্বদা মানুষের ভেতরে জন্ম নেয়| আলো মানুষের ভিতরেই জন্মায়| মানুষ যতই তাকায় বাইরে, তাতে ভেতরের আলো জ্বলে না, কিছুই দেখা যায় না|
জলের ওপর ছায়ার মতো কুয়াাশা ধীরে ধীরে সরছে| আকাশে সূর্য উদিত হচ্ছে, তার প্রথম সোনালি রশ্মি শিশিরবিন্দুগুলোর ওপর পড়ছে| প্রতিটি শিশিরবিন্দু যেন মাটির ওপর জ্বলছে এক নক্ষত্রের মতো| সকল তারা ম্লান হয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে বিলের আয়নায় মিলছে| কিন্তু মানুষের ভিতরে বিলের নিচে আলো জ্বলছে| নীরব, চিরন্তন, এক অব্যক্ত অনুভূতি— যা কেউ স্পর্শ করতে পারে না, কিন্তু প্রত্যেকেই অনুভব করে|
সুদীপ ধীরে ধীরে ফিরে গেল গ্রামের দিকে| মৃদুুল তার পাশে হাঁটছে| কিন্তু সেই মৃদুলের চোখেও নতুন কিছু জেগেছে— একটি অদ্ভুত, অজানা জিজ্ঞাসা| প্রশ্ন, যা হয়তো জীবনের শেষ পর্যন্ত উত্তর পাবে না| হাঁটতে হাঁটতে পা ভিজে যাচ্ছে| তবু মনে হচ্ছে হাঁটা হচ্ছে না| গ্রামে যখন তারা পৌঁছে, দেখে ধানক্ষেতে প্রচুর শিশির জমেছে| প্রতিটি শিশিরবিন্দু যেন মাটির ওপর জ্বলে থাকা এক নক্ষত্র| সুদীপ হঠাৎ থেমে দাঁড়াল| তার মনে হলো— মানুষ যেমন নদীর মতো, তেমনি বিলের মতোও| জলের নিচে সব স্মৃতি, সব ভুল, সব ভালোবাসা ভেসে থাকে| আর যে মানুষ সেই জল থেকে মুখ তুলে দেখে, সে আর আগের মানুষ থাকে না| সে হয় আলো নিজের ভিতরের আলো| একটি নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস|
সুদীপ চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে বলল— ভোরের আলো ধীরে ধীরে আকাশের গায়ে ফুটে উঠছে— যেন কেউ নীল কাগজে সোনালি অক্ষরে নতুন দিনের নাম লিখছে| কুয়াশার বিল তখনও নিস্তব্ধ| জলের ওপর হালকা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা— মনে হয়, রাত তার সব গোপন কথা এখনো পুরোপুরি সরিয়ে নেয়নি| সুদীপ চুপ করে দাঁড়িয়ে|
মৃদুল ধীরে বলল— “দাদা, তুমি চুপ করে আছো কেন?”
সুদীপ একটু হাসল, কিন্তু সেই হাসি যেন দূরের—
“চুপ না থাকলে সব কথা শোনা যায় না রে!”
“কী কথা?”
সুদীপ জলের দিকে তাকাল—
“এই যে জল, এই যে কুয়াশা এরা চুপিচুপি কথা বলে!”
মৃদুল হেসে ফেলল—
“জল আবার কথা বলে নাকি?”
“শোনার কান থাকলে সবই বলে|”
তারপর একটু নীরবতা বয়ে গেল বাতাসের কানে কানে|
মৃদুল আবার বলল—
“দাদা, ওই মানুষটা সত্যি ছিল?”
সুদীপ এবার সরাসরি তাকাল তার দিকে—
“তুই কী ভাবছিস?”
“আমি বুঝতে পারছি না|”
“যা বোঝা যায় না সেটাকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি মনে রাখে|”
মৃদুল স্তব্ধ হয়ে যায়|
সুদীপ ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল|
ধানের উপর শিশির জমেছে| প্রতিটি বিন্দুতে ভোরের আলো কাঁপছে| হঠাৎ সে থেমে গেল|
“মৃদুল...”
“হ্যাঁ দাদা?”
“তুই কখনো নিজেকে দেখেছিস?”
মৃদুল অবাক হয়, এ কথা শুনে—
“নিজেকে? আয়নায়?”
সুদীপ মাথা নাড়ল—
“না| আয়নায় না| ভিতরে|”
“ভিতরে আবার কীভাবে দেখা যায়?”
সুদীপ একটু চুপ করে থেকে বলল—
“যখন মানুষ ভয় পায়, যখন একা থাকে,
যখন চারপাশে কেউ থাকে না—
তখন ভিতরের মানুষটা সামনে আসে|”
মৃদুল ধীরে বলল—
“তাহলে কাল রাতে|”
“হ্যাঁ”, সুদীপ বলল|
“আমরা শুধু বিলে নামিনি— আমরা নিজেদের ভিতরেও নেমেছিলাম|”
দূরে কুয়াশার বিল ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে|
মৃদুল আবার জিজ্ঞেস করল— “দাদা, ভয়টা কি তবে মিথ্যে?”
সুদীপ হো হো করে হসে উঠল— “ভয় কখনো মিথ্যে না রে| ভয়ই মানুষকে সত্যির সামনে দাঁড় করায়|”
“আর আলো?”
“আলো?”
সুদীপ আকাশের দিকে তাকাল| সূর্যের প্রথম রশ্মিটা ধানের ওপর আলতো করে এসে পড়ছে|
“আলো বাইরে না ভিতরে জন্মায়|”
একটু পরে সুদীপ আবার থেমে দাঁড়াল| তার চোখে অদ্ভুত শান্তি| সে ধীরে ধীরে বলল—
“মৃদুল, মানুষ হারায় না|”
“তাহলে?”
“সে বদলায়| যেমন রাত বদলে ভোর হয়— তেমনি অন্ধকার বদলে আলো হয়|”
মৃদুল আর কিছু বলল না| সে শুধু তাকিয়ে রইল সুদীপের দিকে— যেন নতুন করে তাকে চিনছে|
সুদীপ চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত| তার ঠোঁট নড়ল|
“আমি দেখেছি, আমি বুঝেছি”
মৃদুল কাছে এসে দাঁড়াল— “কী বুঝেছ দাদা?”
সুদীপ ধীরে বলল— “এই বিল কেবল জল না| এটা মানুষের মন|”
“মন?”
“হ্যাঁ, যেখানে সব জমে থাকে— ভালোবাসা, ভয়, ভুল, স্মৃতি”
আরেকবার একটু থেমে সুদীপ বললো— “আর যে একবার সেই জলে নিজের মুখ দেখে সে আর আগের মানুষ থাকে না|”
দূরে সূর্য উঠেছে| কুয়াশা সরে যাচ্ছে| কিন্তু কোথাও খুব গভীরে... একটি আলো জ্বলছে| নিঃশব্দ| অস্পৃশ্য| দূরে কুয়াশার বিল এখানো নিঃশব্দ| তবু মনে হয়— সে এখনো অপেক্ষা করছে| কারণ— প্রতিটি মানুষ একদিন সেই বিলে নামবে| এবং যে একবার নামে— সে আর কখনো সম্পূর্ণ ফিরে আসে না|

আপনার মতামত লিখুন