সংবাদ

কারাগারে চিন্তার স্বাধীনতা


খালেদ জলিল আকন্দ
খালেদ জলিল আকন্দ
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

কারাগারে চিন্তার স্বাধীনতা

 মানুষ কারাগারে যায় শাস্তি প্রাপ্ত হয়ে। শাস্তির চারটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো

১. প্রতিশোধ: এটি সবচেয়ে পুরনো ধারণা। এখানে বলা হয়, অপরাধী তার কৃতকর্মের জন্য সমান বা উপযুক্ত মাত্রার কষ্ট ভোগ করবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিশোধের অনুভূতি আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা।

২. প্রতিরোধ: এই উদ্দেশে অপরাধ ও তার শাস্তি অন্য লোকেদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। শাস্তির কঠোরতা দেখে সাধারণ মানুষ অপরাধ করতে ভয় পায়। এটিকে আবার দুই ভাগেও ভাগ করা যায়

সাধারণ প্রতিরোধ: সমাজের সবাই যেন অপরাধ না করে।

বিশেষ প্রতিরোধ: নির্দিষ্ট অপরাধী যেন পুনরায় অপরাধ না করে।

৩. অপসারণ: এখানে মূল লক্ষ্য অপরাধীকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা, যাতে সে তখন আর কোনো ক্ষতি করতে না পারে। জেলখানায় বন্দী করা বা মৃত্যুদণ্ড এর উদাহরণ।

৪. সংশোধন: এটি হচ্ছে আধুনিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। শাস্তির মাধ্যমে অপরাধীকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ করে দিয়ে উপযোগী নাগরিক হিসেবে সমাজে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের জেলখানায় বই পড়ার অনুমতি দেয়াটাও সংশোধন প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থা তাত্ত্বিকভাবে ‘সংশোধন-এর ওপরে গুরুত্ব দিলেও বাস্তবে আসলে কতটা কাজ করে তা ভেবে দেখার বিষয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো নেলুফার ইয়াসমিন-এর ÔRecidivism of Prisoners in Bangladesh: Trends and CausesÕ (২০২২)। (ইয়াসমিন ও মৌ, ২০২২)-এর মতে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে, ভারতের বন্দীদের পুনরায় অপরাধের হার (Recidivism Rate) ২০১৩ সালে ৭.২% থেকে ২০১৪ সালে বেড়ে ৭.৮% হয় (রাইজ ফর ইন্ডিয়া, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)। পাকিস্তানে বন্দীদের এই হার ২০১২ সালে ছিল ২৬.৩% এবং ২০১৩ সালে ২৬.৮% (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ২০১৪)। বাংলাদেশে কারাবন্দী জনসংখ্যার প্রবণতা হলো: ২০১২ সালে ৪৪%, ২০১৪ সালে ৪২% এবং ২০১৬ সালে ৪৫%। মোট জনসংখ্যার তুলনায় কারাবন্দীর হার ২০০৩ সালে ছিল ৬১.১%, ২০১০ সালে ৭৩.২%, ২০১৫ সালে ৭৩.৮% এবং ২০১৭ সালে ৭৭.৭% (ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ, ডিসেম্বর ২০১৭)। সুতরাং, বাংলাদেশে বন্দীর হার দিন দিন বাড়ছে, যা আমাদের জন্য একটি সমস্যা এবং আমাদের দেশের জন্য একটি জ্বলন্ত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।’

একাডেমিক জার্নালগুলোতে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায় যে, পুনর্বাসনমূলক বিচার পুনরায় অপরাধের হার কার্যকরভাবে কমাতে পারে। এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আসা যাক। কারাগারে চিন্তার স্বাধীনতার বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারাগারে বন্দীদের চিন্তার স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার, যা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এর প্রয়োগ সীমিত কিনা তা খুঁজে দেখা উচিত। কারাগারে জ্ঞানচর্চার বিধান থাকলেও এর মান নির্ভর করে বন্দীর শ্রেণীর ওপর।

প্রথম শ্রেণীর বন্দী: কাশিমপুর কারাগারের মতো জেলগুলোতে তাদের জন্য আলাদা লাইব্রেরি রয়েছে।

সাধারণ বন্দী: লাইব্রেরি থাকলেও সংগ্রহ সীমিত। বেশিরভাগ সময়ই বইগুলো পুরনো, মানসম্মত নয়।

এছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা ও সেই স্বাধীন চিন্তাকে বিকাশের ও প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা ঠিক কতটা আছে তা খুঁজে দেখা দরকার।

বর্তমান বিশ্বে, মুক্ত ইন্টারনেট ও অও তো দূরের কথা, বেশিরভাগ জেলখানাতেই মৌলিক ডিজিটাল অ্যাক্সেস আজও সীমিত।

তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রিয়ার কিছু কারাগার নিয়ন্ত্রিত ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশে অও ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র (ম্যাসাচুসেটস): ইন্টারনেট ছাড়াই কঠোর নিয়ন্ত্রিত ট্যাবলেটে চ্যাটবট ও অও রিজিউম বিল্ডার ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যা কর্মসংস্থানের জন্য সহায়ক।

চীন (গুয়াংসি ও গুয়াংজু): জেল কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিবেশে VR রিলিজ ট্রেনিং (গাড়ি ও ট্রেনের টিকেট কেনা শেখানো) চালু করেছে।

অস্ট্রিয়া (স্টার্ন প্রকল্প): ২০২৫-২৭ সালের এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ন্ত্রিত ভিডিও কল ও নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে অ্যাক্সেস দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে কারাগারগুলোতে বন্দীদের জন্য সীমিত মাত্রায় হলেও ডিজিটাল অ্যাক্সেস দেয়া কি সময়ের দাবি নয়? ভেবে দেখার বিষয়। অও চ্যাটবট বন্দীর শিক্ষাগত যোগ্যতার স্তর অনুযায়ী ব্যক্তিগত টিউটর হিসেবে কাজ করতে পারে, যা বন্দীর পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া তো উপায় নেই। আর বর্তমান পৃথিবীতে অও কে ছাড়া থাকার অর্থই হলো পৃথিবীর গতি থেকে পিছিয়ে পড়া। আর কারাবন্দীদের পজিটিভ এনগেইজমেন্ট ও জরুরি। আপনি তাকে শারীরিক ভাবে বন্দী করতে পারেন কিন্তু মানসিক ভাবে তো নয়। এবং বন্দীদের মানসিক প্রশান্তি ও বিকাশ বিঘ্নিত হলে শাস্তি প্রদানের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

[লেখক: প্রভাষক (দর্শন), বকশীগঞ্জ সরকারি কিয়ামত উল্লাহ কলেজ, জামালপুর]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬


কারাগারে চিন্তার স্বাধীনতা

প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬

featured Image

 মানুষ কারাগারে যায় শাস্তি প্রাপ্ত হয়ে। শাস্তির চারটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো

১. প্রতিশোধ: এটি সবচেয়ে পুরনো ধারণা। এখানে বলা হয়, অপরাধী তার কৃতকর্মের জন্য সমান বা উপযুক্ত মাত্রার কষ্ট ভোগ করবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিশোধের অনুভূতি আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা।

২. প্রতিরোধ: এই উদ্দেশে অপরাধ ও তার শাস্তি অন্য লোকেদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। শাস্তির কঠোরতা দেখে সাধারণ মানুষ অপরাধ করতে ভয় পায়। এটিকে আবার দুই ভাগেও ভাগ করা যায়

সাধারণ প্রতিরোধ: সমাজের সবাই যেন অপরাধ না করে।

বিশেষ প্রতিরোধ: নির্দিষ্ট অপরাধী যেন পুনরায় অপরাধ না করে।

৩. অপসারণ: এখানে মূল লক্ষ্য অপরাধীকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা, যাতে সে তখন আর কোনো ক্ষতি করতে না পারে। জেলখানায় বন্দী করা বা মৃত্যুদণ্ড এর উদাহরণ।

৪. সংশোধন: এটি হচ্ছে আধুনিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। শাস্তির মাধ্যমে অপরাধীকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ করে দিয়ে উপযোগী নাগরিক হিসেবে সমাজে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের জেলখানায় বই পড়ার অনুমতি দেয়াটাও সংশোধন প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থা তাত্ত্বিকভাবে ‘সংশোধন-এর ওপরে গুরুত্ব দিলেও বাস্তবে আসলে কতটা কাজ করে তা ভেবে দেখার বিষয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো নেলুফার ইয়াসমিন-এর ÔRecidivism of Prisoners in Bangladesh: Trends and CausesÕ (২০২২)। (ইয়াসমিন ও মৌ, ২০২২)-এর মতে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে, ভারতের বন্দীদের পুনরায় অপরাধের হার (Recidivism Rate) ২০১৩ সালে ৭.২% থেকে ২০১৪ সালে বেড়ে ৭.৮% হয় (রাইজ ফর ইন্ডিয়া, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)। পাকিস্তানে বন্দীদের এই হার ২০১২ সালে ছিল ২৬.৩% এবং ২০১৩ সালে ২৬.৮% (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ২০১৪)। বাংলাদেশে কারাবন্দী জনসংখ্যার প্রবণতা হলো: ২০১২ সালে ৪৪%, ২০১৪ সালে ৪২% এবং ২০১৬ সালে ৪৫%। মোট জনসংখ্যার তুলনায় কারাবন্দীর হার ২০০৩ সালে ছিল ৬১.১%, ২০১০ সালে ৭৩.২%, ২০১৫ সালে ৭৩.৮% এবং ২০১৭ সালে ৭৭.৭% (ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ, ডিসেম্বর ২০১৭)। সুতরাং, বাংলাদেশে বন্দীর হার দিন দিন বাড়ছে, যা আমাদের জন্য একটি সমস্যা এবং আমাদের দেশের জন্য একটি জ্বলন্ত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।’

একাডেমিক জার্নালগুলোতে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায় যে, পুনর্বাসনমূলক বিচার পুনরায় অপরাধের হার কার্যকরভাবে কমাতে পারে। এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আসা যাক। কারাগারে চিন্তার স্বাধীনতার বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারাগারে বন্দীদের চিন্তার স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার, যা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এর প্রয়োগ সীমিত কিনা তা খুঁজে দেখা উচিত। কারাগারে জ্ঞানচর্চার বিধান থাকলেও এর মান নির্ভর করে বন্দীর শ্রেণীর ওপর।

প্রথম শ্রেণীর বন্দী: কাশিমপুর কারাগারের মতো জেলগুলোতে তাদের জন্য আলাদা লাইব্রেরি রয়েছে।

সাধারণ বন্দী: লাইব্রেরি থাকলেও সংগ্রহ সীমিত। বেশিরভাগ সময়ই বইগুলো পুরনো, মানসম্মত নয়।

এছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা ও সেই স্বাধীন চিন্তাকে বিকাশের ও প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা ঠিক কতটা আছে তা খুঁজে দেখা দরকার।

বর্তমান বিশ্বে, মুক্ত ইন্টারনেট ও অও তো দূরের কথা, বেশিরভাগ জেলখানাতেই মৌলিক ডিজিটাল অ্যাক্সেস আজও সীমিত।

তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রিয়ার কিছু কারাগার নিয়ন্ত্রিত ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশে অও ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র (ম্যাসাচুসেটস): ইন্টারনেট ছাড়াই কঠোর নিয়ন্ত্রিত ট্যাবলেটে চ্যাটবট ও অও রিজিউম বিল্ডার ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যা কর্মসংস্থানের জন্য সহায়ক।

চীন (গুয়াংসি ও গুয়াংজু): জেল কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিবেশে VR রিলিজ ট্রেনিং (গাড়ি ও ট্রেনের টিকেট কেনা শেখানো) চালু করেছে।

অস্ট্রিয়া (স্টার্ন প্রকল্প): ২০২৫-২৭ সালের এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ন্ত্রিত ভিডিও কল ও নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে অ্যাক্সেস দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে কারাগারগুলোতে বন্দীদের জন্য সীমিত মাত্রায় হলেও ডিজিটাল অ্যাক্সেস দেয়া কি সময়ের দাবি নয়? ভেবে দেখার বিষয়। অও চ্যাটবট বন্দীর শিক্ষাগত যোগ্যতার স্তর অনুযায়ী ব্যক্তিগত টিউটর হিসেবে কাজ করতে পারে, যা বন্দীর পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া তো উপায় নেই। আর বর্তমান পৃথিবীতে অও কে ছাড়া থাকার অর্থই হলো পৃথিবীর গতি থেকে পিছিয়ে পড়া। আর কারাবন্দীদের পজিটিভ এনগেইজমেন্ট ও জরুরি। আপনি তাকে শারীরিক ভাবে বন্দী করতে পারেন কিন্তু মানসিক ভাবে তো নয়। এবং বন্দীদের মানসিক প্রশান্তি ও বিকাশ বিঘ্নিত হলে শাস্তি প্রদানের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

[লেখক: প্রভাষক (দর্শন), বকশীগঞ্জ সরকারি কিয়ামত উল্লাহ কলেজ, জামালপুর]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত