আসন্ন
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে
রেখে সারা দেশে গবাদি
পশু লুট ও ডাকাতির
ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ
করে রাজশাহী ও কুমিল্লা অঞ্চলে
খামারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে
গরু লুটের হিড়িক পড়েছে। চরাঞ্চল থেকে শুরু করে
ব্যস্ততম মহাসড়ক; কোথাও নিরাপদ নন পশু মালিকরা।
গত সোমবার রাজশাহী বিভাগের লালপুর ও বাঘা থানার
সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল থেকে একদল সশস্ত্র
দুর্বৃত্ত রাখালদের জিম্মি করে ১৭৬টি গরু
লুট করে নিয়ে যাওয়ার
চেষ্টা করে। তবে গোপন
সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে গরুগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের
কুমিল্লা অংশে ট্রাক থামিয়ে
এবং খামারে হানা দিয়ে একের
পর এক গরু লুটের
ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ
করছে।
চরাঞ্চলে
ফিল্মি কায়দায় লুট: পুলিশের ধাওয়ায় রক্ষা পেল ১৭৬ গরু
রাজশাহীর
বাঘা ও নাটোরের লালপুর
সীমান্ত সংলগ্ন চরাঞ্চলে গত সোমবার এক
দুর্ধর্ষ লুটের ঘটনা ঘটে। পুলিশ
ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, এদিন
বিকেল ৩টার দিকে বাঘা
থানাধীন পলাশী ফতেহপুর চরের ‘ছয়ছাম মাঠ’ থেকে একদল
সশস্ত্র দুর্বৃত্ত রাখালদের মারধর করে এক বিশাল
গরুর পাল তাড়িয়ে নিয়ে
যাচ্ছিল। দুর্বৃত্তরা গরুগুলো লালপুর থানাধীন রাইটা খেয়াঘাট এলাকা দিয়ে নদী পার
করে কুষ্টিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়ার
পরিকল্পনা করেছিল।
সংবাদ
পাওয়া মাত্রই লালপুর থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশের
একটি চৌকস দল মোটরসাইকেল
যোগে দুর্গম চরাঞ্চলে অভিযানে নামে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে এবং
ধাওয়ার মুখে পড়ে দুর্বৃত্তরা
গরুগুলো ফেলে পালিয়ে যায়।
সন্ধ্যা নাগাদ পুলিশ ১৭৬টি বিভিন্ন বয়সী গরু উদ্ধার
করে। উদ্ধারকৃত গরুর মধ্যে বাঘার
পলাশী ফতেহপুর গ্রামের খামারী শওকতের ৮০টি, জামালের ২৭টি, আসাদুল ইসলামের ১৬টি, আনোয়ারুল প্রামাণিকের ২০টি, জনি প্রামাণিকের ২০টি
এবং কামালের ১৩টি গরু রয়েছে।
উদ্ধার শেষে গরুগুলো প্রকৃত
মালিকদের জিম্মায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
খামারীরা
জানান, তারা চরে গরু
চরাচ্ছিলেন, এমন সময় হঠাৎ
একদল সন্ত্রাসী তাদের ওপর চড়াও হয়
এবং অস্ত্রের মুখে গরুগুলো নিয়ে
যায়। এমনকি এক মালিকের কাছে
মোবাইল ফোনে মুক্তিপণও দাবি
করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের
একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, "রাজশাহীর লালপুর এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী মনতাজ বাহিনীর সহযোগীরা এই লুটের সঙ্গে
জড়িত। যদি দ্রুত উদ্ধার
করা না যেত, তবে
তারা নদী পার করে
কুষ্টিয়ার মিরপুর বা দৌলতপুর এলাকায়
নিয়ে ট্রাকযোগে বিক্রি করে দিত।"
লালপুর
ও বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত
কর্মকর্তারা (ওসি) মুঠোফোনে জানান,
"গরু উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে আমরা
গভীর তদন্ত করছি। আপাতত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। রাখালরা
ভয়ে মামলা করতে না চাইলেও
পুলিশ বাদী হয়ে আইনি
ব্যবস্থা নেবে। চরের সীমানা বা
পূর্ব কোনো বিরোধ আছে
কি না, তাও খতিয়ে
দেখা হচ্ছে।"
মহাসড়কে
মরণফাঁদ: ট্রাক থামিয়ে চালককে কুপিয়ে লুট
রাজশাহীর
চরাঞ্চলে পুলিশ সফল হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিত্র ভিন্ন। কুমিল্লা এলাকায় মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে গরু লুটের
ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত
বৃহস্পতিবার (৭ মে) ভোরে
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মহাসড়কে গাছ ফেলে ট্রাক
থামিয়ে ১০টি গরু লুট
করে ডাকাত দল। এসময় ডাকাতদের
রামদার কোপে ট্রাক চালক
আকরাম হোসেন ও তার সহকারী
গুরুতর আহত হন।
আহত
চালক আকরাম হোসেন বলেন, "ডাকাতদল দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমাকে কুপিয়ে
ট্রাকটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। আমরা
রাজশাহীর চারঘাট থেকে গরু নিয়ে
চট্টগ্রামের মদিনাঘাট যাচ্ছিলাম। ভোরে ৮-১০
জনের একটি দল পিকআপ
দিয়ে আমাদের পথ রোধ করে।"
পরে ডাকাতরা চালক ও সহকারীকে
গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে ১৩ লাখ
টাকা মূল্যের ১০টি গরু নিয়ে
চম্পট দেয়।
চৌদ্দগ্রাম
থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফ
হোসাইন বলেন, "চালকের ভাষ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ
বিশ্লেষণ করে আমরা তদন্ত
করছি। এটি ডাকাতি নাকি
অন্য কিছু—সব বিষয়
মাথায় রেখেই অভিযান অব্যাহত আছে। দ্রুতই চক্রটিকে
আইনের আওতায় আনা হবে।"
পুলিশের
ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: ভুক্তভোগীদের চাপা ক্ষোভ
মহাসড়কে
ডাকাতির ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ
করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। গত
বছরের একটি ঘটনার কথা
স্মরণ করে ট্রাকচালক মো.
রুকনুজ্জামান অভিযোগ করেন, তার ট্রাকটি দাউদকান্দি
এলাকায় ডাকাতদের কবলে পড়েছিল। ৫
কিলোমিটার যাওয়ার পর ডাকাতরা তাকে
মারধর করে বেঁধে ফেলে
এবং ৬টি গরু লুট
করে।
রুকনুজ্জামান
বলেন, "ডাকাতি হওয়ার মাত্র দুই মিনিট পর
পুলিশের একটি সিএনজি সেই
পথ দিয়ে যাচ্ছিল। আমরা
বারবার অনুরোধ করলেও তারা এলাকাটি তাদের
নয় বলে এড়িয়ে যান।"
একই
ঘটনার সাক্ষী গরুর মালিক মোখলেছুর
রহমান জানান, "ছিনতাইকারীরা মাত্র কয়েক হাত দূরে
থাকতেই পুলিশের পোশাক পরা লোক দেখে
আমরা চিৎকার করেছি। কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি।
পরে কাছে গেলে তারা
জানায় এটা তাদের সীমানাভুক্ত
এলাকা না।" এমন অসহযোগিতার কারণে
অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে
বলে দাবি খামারীদের।
মাদ্রাসা
ও খামারে হানা: পিস্তল ঠেকিয়ে লুটতরাজ
শুধু
মহাসড়ক নয়, গ্রামের ভেতর
গড়ে ওঠা খামারেও হানা
দিচ্ছে সশস্ত্র ডাকাতরা। কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার আজগরা ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসার এতিমখানায়
তিন মাসের ব্যবধানে দুই দফায় ১২টি
দুধের গরু লুট হয়েছে,
যার মূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা।
মাদ্রাসার
শিক্ষক ইমরান হোসাইন বলেন, "গত বছর ৩১
অক্টোবর ভোরে ডাকাতরা পিস্তল
ঠেকিয়ে আমাদের জিম্মি করে ৫টি গরু
নিয়ে যায়। আমাদের মারধর
করে মোবাইল ফোনও কেড়ে নেয়
তারা।"
অনুরূপ
ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে। সেখানে একটি ইটভাটার ভেতরের
খামারে ৩ প্রহরীকে বেঁধে
১০টি গরু লুট করা
হয়। খামার মালিক আনোয়ার হোসাইন আক্ষেপ করে বলেন, "১০-১৫ জন মুখোশধারী
ডাকাত পিস্তল ও হকিস্টিক নিয়ে
এসে বিদেশি জাতের সাতটি গাভীসহ মোট ১০টি পশু
নিয়ে গেছে। আমার প্রায় ২৫
লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।"
ফেসবুকে
ভাইরাল গরু চুরির ভিডিও: সিসিটিভি ফুটেজেও থামছে না অপরাধ
প্রযুক্তির
ব্যবহার বাড়লেও থামছে না এই অপরাধচক্র।
চলতি বছরের ১ মার্চ চৌদ্দগ্রামের
বসন্তপুর এলাকায় এক খামারের কর্মচারীদের
হাত-পা বেঁধে ৫টি
গরু চুরির সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ফুটেজে দেখা
যায়, মাথায় গামছা বাঁধা চোররা বৃদ্ধ কর্মচারীকে ভয় দেখিয়ে দড়ি
দিয়ে বেঁধে একে একে গরুগুলো
নিয়ে যাচ্ছে।
খামার
মালিক হানিফ মিয়া বলেন, "রোজার
আগের দিন রাত ৩টার
দিকে তারা হানা দেয়।
আমার সাড়ে ৮ লাখ
টাকার গরু নিয়ে গেছে।"
আসন্ন
কোরবানী ঈদকে কেন্দ্র করে
পশুর এই বিশাল বাজারকে
লক্ষ্য করে সক্রিয় হয়ে
উঠেছে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। খামারীরা বলছেন, চরাঞ্চল থেকে শুরু করে
মহাসড়ক পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত
না করলে বড় ধরণের
লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।
পুলিশ কর্মকর্তারা যদিও নিরাপত্তার আশ্বাস
দিচ্ছেন, তবে মাঠ পর্যায়ের
বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
খামারীদের দাবি, শুধু উদ্ধারের তৎপরতা
নয়, বরং অপরাধ ঘটার
আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। চরাঞ্চলে
নিয়মিত টহল এবং মহাসড়কে
পুলিশের কুইক রেসপন্স টিম
সক্রিয় থাকলে এসব দুঃসাহসিক লুটতরাজ
নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬
আসন্ন
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে
রেখে সারা দেশে গবাদি
পশু লুট ও ডাকাতির
ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ
করে রাজশাহী ও কুমিল্লা অঞ্চলে
খামারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে
গরু লুটের হিড়িক পড়েছে। চরাঞ্চল থেকে শুরু করে
ব্যস্ততম মহাসড়ক; কোথাও নিরাপদ নন পশু মালিকরা।
গত সোমবার রাজশাহী বিভাগের লালপুর ও বাঘা থানার
সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল থেকে একদল সশস্ত্র
দুর্বৃত্ত রাখালদের জিম্মি করে ১৭৬টি গরু
লুট করে নিয়ে যাওয়ার
চেষ্টা করে। তবে গোপন
সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে গরুগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের
কুমিল্লা অংশে ট্রাক থামিয়ে
এবং খামারে হানা দিয়ে একের
পর এক গরু লুটের
ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ
করছে।
চরাঞ্চলে
ফিল্মি কায়দায় লুট: পুলিশের ধাওয়ায় রক্ষা পেল ১৭৬ গরু
রাজশাহীর
বাঘা ও নাটোরের লালপুর
সীমান্ত সংলগ্ন চরাঞ্চলে গত সোমবার এক
দুর্ধর্ষ লুটের ঘটনা ঘটে। পুলিশ
ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, এদিন
বিকেল ৩টার দিকে বাঘা
থানাধীন পলাশী ফতেহপুর চরের ‘ছয়ছাম মাঠ’ থেকে একদল
সশস্ত্র দুর্বৃত্ত রাখালদের মারধর করে এক বিশাল
গরুর পাল তাড়িয়ে নিয়ে
যাচ্ছিল। দুর্বৃত্তরা গরুগুলো লালপুর থানাধীন রাইটা খেয়াঘাট এলাকা দিয়ে নদী পার
করে কুষ্টিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়ার
পরিকল্পনা করেছিল।
সংবাদ
পাওয়া মাত্রই লালপুর থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশের
একটি চৌকস দল মোটরসাইকেল
যোগে দুর্গম চরাঞ্চলে অভিযানে নামে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে এবং
ধাওয়ার মুখে পড়ে দুর্বৃত্তরা
গরুগুলো ফেলে পালিয়ে যায়।
সন্ধ্যা নাগাদ পুলিশ ১৭৬টি বিভিন্ন বয়সী গরু উদ্ধার
করে। উদ্ধারকৃত গরুর মধ্যে বাঘার
পলাশী ফতেহপুর গ্রামের খামারী শওকতের ৮০টি, জামালের ২৭টি, আসাদুল ইসলামের ১৬টি, আনোয়ারুল প্রামাণিকের ২০টি, জনি প্রামাণিকের ২০টি
এবং কামালের ১৩টি গরু রয়েছে।
উদ্ধার শেষে গরুগুলো প্রকৃত
মালিকদের জিম্মায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
খামারীরা
জানান, তারা চরে গরু
চরাচ্ছিলেন, এমন সময় হঠাৎ
একদল সন্ত্রাসী তাদের ওপর চড়াও হয়
এবং অস্ত্রের মুখে গরুগুলো নিয়ে
যায়। এমনকি এক মালিকের কাছে
মোবাইল ফোনে মুক্তিপণও দাবি
করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের
একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, "রাজশাহীর লালপুর এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী মনতাজ বাহিনীর সহযোগীরা এই লুটের সঙ্গে
জড়িত। যদি দ্রুত উদ্ধার
করা না যেত, তবে
তারা নদী পার করে
কুষ্টিয়ার মিরপুর বা দৌলতপুর এলাকায়
নিয়ে ট্রাকযোগে বিক্রি করে দিত।"
লালপুর
ও বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত
কর্মকর্তারা (ওসি) মুঠোফোনে জানান,
"গরু উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে আমরা
গভীর তদন্ত করছি। আপাতত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। রাখালরা
ভয়ে মামলা করতে না চাইলেও
পুলিশ বাদী হয়ে আইনি
ব্যবস্থা নেবে। চরের সীমানা বা
পূর্ব কোনো বিরোধ আছে
কি না, তাও খতিয়ে
দেখা হচ্ছে।"
মহাসড়কে
মরণফাঁদ: ট্রাক থামিয়ে চালককে কুপিয়ে লুট
রাজশাহীর
চরাঞ্চলে পুলিশ সফল হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিত্র ভিন্ন। কুমিল্লা এলাকায় মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে গরু লুটের
ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত
বৃহস্পতিবার (৭ মে) ভোরে
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মহাসড়কে গাছ ফেলে ট্রাক
থামিয়ে ১০টি গরু লুট
করে ডাকাত দল। এসময় ডাকাতদের
রামদার কোপে ট্রাক চালক
আকরাম হোসেন ও তার সহকারী
গুরুতর আহত হন।
আহত
চালক আকরাম হোসেন বলেন, "ডাকাতদল দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমাকে কুপিয়ে
ট্রাকটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। আমরা
রাজশাহীর চারঘাট থেকে গরু নিয়ে
চট্টগ্রামের মদিনাঘাট যাচ্ছিলাম। ভোরে ৮-১০
জনের একটি দল পিকআপ
দিয়ে আমাদের পথ রোধ করে।"
পরে ডাকাতরা চালক ও সহকারীকে
গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে ১৩ লাখ
টাকা মূল্যের ১০টি গরু নিয়ে
চম্পট দেয়।
চৌদ্দগ্রাম
থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফ
হোসাইন বলেন, "চালকের ভাষ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ
বিশ্লেষণ করে আমরা তদন্ত
করছি। এটি ডাকাতি নাকি
অন্য কিছু—সব বিষয়
মাথায় রেখেই অভিযান অব্যাহত আছে। দ্রুতই চক্রটিকে
আইনের আওতায় আনা হবে।"
পুলিশের
ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: ভুক্তভোগীদের চাপা ক্ষোভ
মহাসড়কে
ডাকাতির ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ
করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। গত
বছরের একটি ঘটনার কথা
স্মরণ করে ট্রাকচালক মো.
রুকনুজ্জামান অভিযোগ করেন, তার ট্রাকটি দাউদকান্দি
এলাকায় ডাকাতদের কবলে পড়েছিল। ৫
কিলোমিটার যাওয়ার পর ডাকাতরা তাকে
মারধর করে বেঁধে ফেলে
এবং ৬টি গরু লুট
করে।
রুকনুজ্জামান
বলেন, "ডাকাতি হওয়ার মাত্র দুই মিনিট পর
পুলিশের একটি সিএনজি সেই
পথ দিয়ে যাচ্ছিল। আমরা
বারবার অনুরোধ করলেও তারা এলাকাটি তাদের
নয় বলে এড়িয়ে যান।"
একই
ঘটনার সাক্ষী গরুর মালিক মোখলেছুর
রহমান জানান, "ছিনতাইকারীরা মাত্র কয়েক হাত দূরে
থাকতেই পুলিশের পোশাক পরা লোক দেখে
আমরা চিৎকার করেছি। কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি।
পরে কাছে গেলে তারা
জানায় এটা তাদের সীমানাভুক্ত
এলাকা না।" এমন অসহযোগিতার কারণে
অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে
বলে দাবি খামারীদের।
মাদ্রাসা
ও খামারে হানা: পিস্তল ঠেকিয়ে লুটতরাজ
শুধু
মহাসড়ক নয়, গ্রামের ভেতর
গড়ে ওঠা খামারেও হানা
দিচ্ছে সশস্ত্র ডাকাতরা। কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার আজগরা ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসার এতিমখানায়
তিন মাসের ব্যবধানে দুই দফায় ১২টি
দুধের গরু লুট হয়েছে,
যার মূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা।
মাদ্রাসার
শিক্ষক ইমরান হোসাইন বলেন, "গত বছর ৩১
অক্টোবর ভোরে ডাকাতরা পিস্তল
ঠেকিয়ে আমাদের জিম্মি করে ৫টি গরু
নিয়ে যায়। আমাদের মারধর
করে মোবাইল ফোনও কেড়ে নেয়
তারা।"
অনুরূপ
ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে। সেখানে একটি ইটভাটার ভেতরের
খামারে ৩ প্রহরীকে বেঁধে
১০টি গরু লুট করা
হয়। খামার মালিক আনোয়ার হোসাইন আক্ষেপ করে বলেন, "১০-১৫ জন মুখোশধারী
ডাকাত পিস্তল ও হকিস্টিক নিয়ে
এসে বিদেশি জাতের সাতটি গাভীসহ মোট ১০টি পশু
নিয়ে গেছে। আমার প্রায় ২৫
লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।"
ফেসবুকে
ভাইরাল গরু চুরির ভিডিও: সিসিটিভি ফুটেজেও থামছে না অপরাধ
প্রযুক্তির
ব্যবহার বাড়লেও থামছে না এই অপরাধচক্র।
চলতি বছরের ১ মার্চ চৌদ্দগ্রামের
বসন্তপুর এলাকায় এক খামারের কর্মচারীদের
হাত-পা বেঁধে ৫টি
গরু চুরির সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ফুটেজে দেখা
যায়, মাথায় গামছা বাঁধা চোররা বৃদ্ধ কর্মচারীকে ভয় দেখিয়ে দড়ি
দিয়ে বেঁধে একে একে গরুগুলো
নিয়ে যাচ্ছে।
খামার
মালিক হানিফ মিয়া বলেন, "রোজার
আগের দিন রাত ৩টার
দিকে তারা হানা দেয়।
আমার সাড়ে ৮ লাখ
টাকার গরু নিয়ে গেছে।"
আসন্ন
কোরবানী ঈদকে কেন্দ্র করে
পশুর এই বিশাল বাজারকে
লক্ষ্য করে সক্রিয় হয়ে
উঠেছে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। খামারীরা বলছেন, চরাঞ্চল থেকে শুরু করে
মহাসড়ক পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত
না করলে বড় ধরণের
লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।
পুলিশ কর্মকর্তারা যদিও নিরাপত্তার আশ্বাস
দিচ্ছেন, তবে মাঠ পর্যায়ের
বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
খামারীদের দাবি, শুধু উদ্ধারের তৎপরতা
নয়, বরং অপরাধ ঘটার
আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। চরাঞ্চলে
নিয়মিত টহল এবং মহাসড়কে
পুলিশের কুইক রেসপন্স টিম
সক্রিয় থাকলে এসব দুঃসাহসিক লুটতরাজ
নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

আপনার মতামত লিখুন