বাংলাদেশে আজ এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। বরং রাষ্ট্রের বহু স্তরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ এত ঘন ঘন সামনে আসছে যে সাধারণ মানুষের এক বড় অংশ এখন মনে করে, পুরো ব্যবস্থাটিই যেন ধীরে ধীরে দুর্নীতির জালে আটকে পড়েছে। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক আলোচনা, প্রশাসনিক অন্দরমহল, এমনকি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের কথাবার্তায়ও এখন একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে: রাষ্ট্র কি জনগণের জন্য কাজ করছে, নাকি একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবান্ধব চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে?
সম্প্রতি জেলা পুলিশ সুপার ও থানার ওসি বদলিকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগগুলো বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে, তা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলার শ্রেণীভেদে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের মাধ্যমে পদায়ন ও বদলি হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, ছোট জেলার ক্ষেত্রে প্রায় ২ কোটি টাকা, বি ক্যাটাগরির জেলার জন্য ৩ কোটি টাকা, প্রথম শ্রেণীর জেলার জন্য ৫ কোটি টাকা এবং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়নের ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব তথ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল, প্রশাসনিক সূত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের আলোচনায় উঠে এসেছে বলে প্রচার হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তারপরও জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, বদলি ও পদায়ন এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। যেখানে পদ মানে শুধু দায়িত্ব নয়, বরং ভবিষ্যৎ আয়ের উৎস হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফলে একটি জেলার দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে অর্থ বিনিয়োগ হলে পরে সেই অর্থ তোলার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু ক্ষেত্রে মামলা বাণিজ্য, মাদক সিন্ডিকেট, চোরাকারবারি, অবৈধ বালু উত্তোলন, ভূমি দখল, বাজার সিন্ডিকেট এবং বিভিন্ন অপরাধচক্রের সঙ্গে প্রশাসনের অসাধু অংশের যোগসাজশ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও কোথাও সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রভাব ও অর্থের শক্তিকেই বেশি কার্যকর মনে করছে। ফলে জনগণের একটি অংশের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আইনের শাসনের বদলে অদৃশ্য সিন্ডিকেটই বাস্তব নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিভিন্ন মহলে আরও আলোচনা হচ্ছে যে, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী কিছু সিন্ডিকেট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি, মূল্য বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ বহুবার সামনে এলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে জনগণের আস্থা তৈরি করা যায়নি বলে অনেকে মনে করেন। সাধারণ মানুষ প্রতিদিন দ্রব্যমূল্যের চাপের মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, অথচ ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান জবাবদিহিতা দেখা যায় না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জনগণের একাংশ এখন প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছে যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয় আগের মতো কার্যকর নেই। বরং কোথাও কোথাও এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে যে, অপরাধী চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত নয়, তারপরও এ ধরনের আলোচনা নিজেই রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার একটি বড় সংকেত।
একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত তখনই আসে, যখন জনগণ বিশ্বাস হারাতে শুরু করে। কারণ আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর না হয়, যদি প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমে যায়, যদি মানুষ মনে করে অর্থ ও ক্ষমতাই শেষ সত্য, তাহলে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধুই আলোচনা কি যথেষ্ট? যদি অভিযোগগুলো মিথ্যা হয়, তাহলে স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করতে হবে। আর যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে ক্ষমতা, পদ বা রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।
দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি রাষ্ট্র রক্ষার প্রশ্ন। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রশাসন যদি জনগণের আস্থা হারায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশ, পুরো সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
সত্যকে চাপা দিয়ে কখনো স্থিতিশীলতা তৈরি করা যায় না। বরং সত্য প্রকাশ, স্বাধীন গণমাধ্যম, জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগই একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে। আজ বাংলাদেশে সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি দূর পরবাসে, হাজার মাইল দূরে থেকেও যখন শুনতে পাই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠছে, আর সেই অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দিব্যি প্রভাব, ক্ষমতা এবং পদ ব্যবহার করে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে, তখন ভেতরে এক ধরনের গভীর অস্বস্তি, ক্ষোভ এবং অনিরাপত্তা তৈরি হয়। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সিভিল প্রশাসনের কিছু অংশও যদি এই দুর্নীতিবান্ধব সিন্ডিকেট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অস্বচ্ছ প্রভাব বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্রের ভেতরের ভারসাম্যই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে।
যেখানে আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা মানুষদের বিরুদ্ধেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, যেখানে জবাবদিহিতার পরিবর্তে প্রভাবশালী মহলের ছায়া শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যেখানে জনগণের আস্থার জায়গাগুলো একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, সেখানে সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত কার কাছে নিরাপত্তা খুঁজবে? জনগণ কি রাষ্ট্রের কাছে নিরাপদ, নাকি রাষ্ট্রই ধীরে ধীরে কিছু ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত কাঠামোতে পরিণত হচ্ছে?
একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু সেনাবাহিনী, অর্থনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি হচ্ছে জনগণের বিশ্বাস। কিন্তু যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে দুর্নীতি করেও পার পাওয়া যায়, ক্ষমতার ছত্রছায়ায় অপরাধ চাপা পড়ে যায়, আর সৎ মানুষ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত বিপজ্জনকভাবে ক্ষয় হতে শুরু করে।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, শুধু রাজনৈতিকও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে আস্থার সংকট, নৈতিকতার সংকট এবং জবাবদিহিতার সংকট। কারণ দুর্নীতি যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে, তখন সেটি শুধু অর্থ লুট করে না, সেটি মানুষের আশা ধ্বংস করে, ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে এবং পুরো সমাজকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই শক্তিশালী হতে চায়, তাহলে ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, জনগণের আস্থা রক্ষা করতে হবে। দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অপরাধী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ এবং কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া কোনো সভ্য রাষ্ট্র দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জনগণের নীরব ক্ষোভ যখন জমতে জমতে বিস্ফোরণে রূপ নেয়, তখন কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী থাকে না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন]

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬
বাংলাদেশে আজ এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। বরং রাষ্ট্রের বহু স্তরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ এত ঘন ঘন সামনে আসছে যে সাধারণ মানুষের এক বড় অংশ এখন মনে করে, পুরো ব্যবস্থাটিই যেন ধীরে ধীরে দুর্নীতির জালে আটকে পড়েছে। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক আলোচনা, প্রশাসনিক অন্দরমহল, এমনকি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের কথাবার্তায়ও এখন একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে: রাষ্ট্র কি জনগণের জন্য কাজ করছে, নাকি একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবান্ধব চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে?
সম্প্রতি জেলা পুলিশ সুপার ও থানার ওসি বদলিকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগগুলো বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে, তা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলার শ্রেণীভেদে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের মাধ্যমে পদায়ন ও বদলি হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, ছোট জেলার ক্ষেত্রে প্রায় ২ কোটি টাকা, বি ক্যাটাগরির জেলার জন্য ৩ কোটি টাকা, প্রথম শ্রেণীর জেলার জন্য ৫ কোটি টাকা এবং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়নের ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব তথ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল, প্রশাসনিক সূত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের আলোচনায় উঠে এসেছে বলে প্রচার হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তারপরও জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, বদলি ও পদায়ন এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। যেখানে পদ মানে শুধু দায়িত্ব নয়, বরং ভবিষ্যৎ আয়ের উৎস হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফলে একটি জেলার দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে অর্থ বিনিয়োগ হলে পরে সেই অর্থ তোলার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু ক্ষেত্রে মামলা বাণিজ্য, মাদক সিন্ডিকেট, চোরাকারবারি, অবৈধ বালু উত্তোলন, ভূমি দখল, বাজার সিন্ডিকেট এবং বিভিন্ন অপরাধচক্রের সঙ্গে প্রশাসনের অসাধু অংশের যোগসাজশ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও কোথাও সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রভাব ও অর্থের শক্তিকেই বেশি কার্যকর মনে করছে। ফলে জনগণের একটি অংশের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আইনের শাসনের বদলে অদৃশ্য সিন্ডিকেটই বাস্তব নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিভিন্ন মহলে আরও আলোচনা হচ্ছে যে, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী কিছু সিন্ডিকেট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি, মূল্য বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ বহুবার সামনে এলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে জনগণের আস্থা তৈরি করা যায়নি বলে অনেকে মনে করেন। সাধারণ মানুষ প্রতিদিন দ্রব্যমূল্যের চাপের মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, অথচ ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান জবাবদিহিতা দেখা যায় না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জনগণের একাংশ এখন প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছে যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয় আগের মতো কার্যকর নেই। বরং কোথাও কোথাও এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে যে, অপরাধী চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত নয়, তারপরও এ ধরনের আলোচনা নিজেই রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার একটি বড় সংকেত।
একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত তখনই আসে, যখন জনগণ বিশ্বাস হারাতে শুরু করে। কারণ আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর না হয়, যদি প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমে যায়, যদি মানুষ মনে করে অর্থ ও ক্ষমতাই শেষ সত্য, তাহলে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধুই আলোচনা কি যথেষ্ট? যদি অভিযোগগুলো মিথ্যা হয়, তাহলে স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করতে হবে। আর যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে ক্ষমতা, পদ বা রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।
দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি রাষ্ট্র রক্ষার প্রশ্ন। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রশাসন যদি জনগণের আস্থা হারায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশ, পুরো সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
সত্যকে চাপা দিয়ে কখনো স্থিতিশীলতা তৈরি করা যায় না। বরং সত্য প্রকাশ, স্বাধীন গণমাধ্যম, জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগই একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে। আজ বাংলাদেশে সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি দূর পরবাসে, হাজার মাইল দূরে থেকেও যখন শুনতে পাই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠছে, আর সেই অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দিব্যি প্রভাব, ক্ষমতা এবং পদ ব্যবহার করে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে, তখন ভেতরে এক ধরনের গভীর অস্বস্তি, ক্ষোভ এবং অনিরাপত্তা তৈরি হয়। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সিভিল প্রশাসনের কিছু অংশও যদি এই দুর্নীতিবান্ধব সিন্ডিকেট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অস্বচ্ছ প্রভাব বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্রের ভেতরের ভারসাম্যই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে।
যেখানে আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা মানুষদের বিরুদ্ধেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, যেখানে জবাবদিহিতার পরিবর্তে প্রভাবশালী মহলের ছায়া শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যেখানে জনগণের আস্থার জায়গাগুলো একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, সেখানে সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত কার কাছে নিরাপত্তা খুঁজবে? জনগণ কি রাষ্ট্রের কাছে নিরাপদ, নাকি রাষ্ট্রই ধীরে ধীরে কিছু ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত কাঠামোতে পরিণত হচ্ছে?
একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু সেনাবাহিনী, অর্থনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি হচ্ছে জনগণের বিশ্বাস। কিন্তু যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে দুর্নীতি করেও পার পাওয়া যায়, ক্ষমতার ছত্রছায়ায় অপরাধ চাপা পড়ে যায়, আর সৎ মানুষ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত বিপজ্জনকভাবে ক্ষয় হতে শুরু করে।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, শুধু রাজনৈতিকও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে আস্থার সংকট, নৈতিকতার সংকট এবং জবাবদিহিতার সংকট। কারণ দুর্নীতি যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে, তখন সেটি শুধু অর্থ লুট করে না, সেটি মানুষের আশা ধ্বংস করে, ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে এবং পুরো সমাজকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই শক্তিশালী হতে চায়, তাহলে ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, জনগণের আস্থা রক্ষা করতে হবে। দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অপরাধী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ এবং কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া কোনো সভ্য রাষ্ট্র দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জনগণের নীরব ক্ষোভ যখন জমতে জমতে বিস্ফোরণে রূপ নেয়, তখন কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী থাকে না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন]

আপনার মতামত লিখুন