ভূমি বলতে সাধারণত পৃথিবীর উপরিভাগের কঠিন স্থলভাগকে বোঝায়। ভূমি হলো প্রকৃতির অকাতরে দান করা মাটি, জল, খনিজ ও বনজ সম্পদ। এটি মানুষের বসবাস বা উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত স্থান। অর্থনৈতিক বা আইনি সংজ্ঞায় আবাদি-অনাবাদি জমি, নদ-নদী, খাল-বিল, ঘরবাড়ি এবং মাটির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত সব কিছুকেই ভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়। এভাবেও বলা যায়, মানুষ বা প্রকৃতি কর্তৃক সরাসরি ব্যবহৃত বা উৎপাদনে সহায়তা করে—এমন প্রাকৃতিক উপাদান (মাটি, পানি, আলো) হলো ভূমি। আইনের ভাষায় ভূমি হলো আবাদি, অনাবাদি, পানিতে নিমজ্জিত এলাকা, ঘরবাড়ি এবং মাটির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত যে কোনো বস্তু (রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২ (১৬) ধারা অনুযায়ী)। প্রকৃতার্থে ভূমি হলো উৎপাদনের আদি ও মৌলিক উপাদান। এর মধ্যে মাটি ছাড়াও খনিজ, বনজ সম্পদ, জলাশয় ও জলবায়ু অন্তর্ভুক্ত।
এটা ঠিক যে, ভূমি প্রকৃতির দান, এর জোগান সীমিত। এটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা যায় না এবং এর উর্বরাশক্তিও ভিন্ন হয়। বর্তমান সভ্যতার উন্মেষের আগে আজকের মতো ভূমির মালিকানা নিয়ে এত দ্বন্দ্ব, ঝগড়া-বিবাদ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল না। সভ্যতার উষালগ্নে মানুষের সমাজব্যবস্থাকে বলা হয় আদি সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা। এই সমাজব্যবস্থায় ভূমির মালিকানার বিষয়টি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল না। মানুষ সমাজবদ্ধভাবে ভূমি ব্যবহার করত এবং ভূমির মালিকানাও ছিল সামাজিক। সময়ের ক্রমবিবর্তনে সামন্তপ্রথা, রাজতন্ত্র এবং বর্তমানে কথিত গণতন্ত্রে এসে ভূমি হয়ে গেছে ব্যক্তিগত সম্পদ। সৃষ্টি হয়েছে ব্যক্তির ভূমির মালিকানা। আর এই ভূমিকে ব্যক্তিগতভাবে কুক্ষিগত করার জন্য চলে নানা চেষ্টা। এভাবেই শুরু হয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে ভূমি হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে ভূমি বিক্রি বা দানের কার্যক্রম শুরু হয়। এই কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাষ্ট্রের নিযুক্ত ব্যক্তির অনুমোদনে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে জানিয়ে মালিকানা পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্র সব ভূমির মালিক। তাই ব্যক্তিকে ভূমির জন্য রাষ্ট্রকে কর দিতে হয়। ব্যক্তি তার ভোগ বা দখলকৃত জমির ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রকে ভূমি কর দেয়। রাষ্ট্র এই অনুমোদন প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বেশ কিছু দপ্তর সৃষ্টি করেছে। যেমন—ভূমি নিবন্ধন দপ্তর, ভূমি রাজস্ব আদায় দপ্তর, ভূমি জরিপ দপ্তরসহ নানা ধরনের বিভাগ। বর্তমানে সরকারের এই দপ্তরগুলো দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে সরকার ডিজিটাল ভূমি সেবা চালু করেছে। ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদৌ দুর্নীতি হ্রাস পাচ্ছে কি না, এর উত্তর খুবই জটিল। কারণ মার্চ ২০২৬-এর তথ্যমতে, ভূমি মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি ‘ওয়ান ডিজিটে’ (১০ শতাংশের নিচে) নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ভূমি-সংক্রান্ত দুর্নীতি কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে।
ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতির সাধারণ ক্ষেত্রগুলো হলো—
১. ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি (মিউটেশন)। ভূমি অফিসে নামজারির ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণ ও হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
২. মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান বা দলিলে কারচুপি।
৩. ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে দুর্নীতি।
৪. প্রভাবশালীদের নামে সম্পত্তি বরাদ্দ ও অবৈধ দখল।
৫. ভূমি অফিসগুলোতে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ।
এই ধরনের অনিয়ম দূর করতে সরকার ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করেছে। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে অনলাইন ভূমি কর (ই-ট্যাক্স) পোর্টালে নিবন্ধন করে ঘরে বসেই ভূমি কর পরিশোধ করা যায়। অনলাইনে হওয়ায় সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই যোগাযোগ কতটা কমেছে? এখনও অনলাইনে আবেদন করে ভূমি অফিসে ঘুরতে হয় সাধারণ মানুষকে। ডিজিটাল হলেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ সাধারণ মানুষের ডিজিটাল বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই।
ভূমি অফিসের চারপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকান। অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ডিজিটাল পদ্ধতি বোঝেন না। তাই তাদের ভূমি অফিসে যেতে হয় এবং অফিসের কর্মরত ব্যক্তিরা অনেক সময় সেবা গ্রহণকারীকে এসব দোকানে যেতে বলেন। অনেকটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মতো। ভূমি সেবাগ্রহীতারা ওই দোকানে গেলে দোকানিরা সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। গ্রামের নিরীহ মানুষ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়। ভূমি সেবা প্রদানের নামে গড়ে ওঠা এসব কম্পিউটার দোকান কার্যত দালালের কাজ করে।
ভূমি সেবায় অনিয়মের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—
১. সরকারি ফির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ দাবি। এই বিষয়টির সঙ্গে ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মীরা জড়িত। একটি ভূমি অফিসে যতজন কর্মচারী আছেন, তার চেয়ে বেশি রয়েছে দালাল। এই দালালরা ফাইল প্রসেসিং থেকে শুরু করে বাইরের কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানের মাধ্যমে ভূমি সেবার কাজ করে দেয়, যা অনিরাপদ অনলাইন সেবার রূপ নিয়েছে।
২. ভুল রেকর্ড সংশোধন বা মাঠ পরচা পেতে দীর্ঘসূত্রিতা ও অবৈধ অর্থ লেনদেন। টাকা না দিলে মিউটেশনের আবেদন খারিজ হয়ে যায়।
৩. ডিজিটাল ভূমি উন্নয়ন কর দেয়ার ক্ষেত্রেও অবৈধভাবে অর্থ আদায় করা হয়। শ্রেণী পরিবর্তনের আবেদন দীর্ঘদিন ডিসি অফিসে ঝুলে থাকে। যোগাযোগ করা হলেও কোনো কাজ হয় না। শোনা যায়, রাজশাহী অঞ্চলে প্রতিটি শ্রেণী পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতি কাঠায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এই টাকা দিলে ডিসি অফিস সহজেই কাজটি করে দেয়।
ভূমি রেজিস্ট্রেশনে অনিয়মেরও শেষ নেই। সম্প্রতি ঢাকা জেলার সাভারে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনকে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ৩ মে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৬ থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এ নির্দেশ দেয়া হয়। অফিস আদেশে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩ (খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এবং বিধি ৩ (ঘ) অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রত্যাহার করে মহাপরিদর্শক নিবন্ধন দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে দ্রুত বর্তমান দায়িত্বভার হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো ছিল—
১. দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ গ্রহণ। তাকে ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবেও উল্লেখ করা হতো।
২. সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় অল্প সময়ে তিনি ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন করেছেন।
৩. বিলাসবহুল গাড়ি, বহুতল ভবন নির্মাণ এবং বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন।
৪. ভূমি নিবন্ধনে অনিয়ম, জাল দলিল এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এটি তো সাভারের সাব-রেজিস্ট্রারের কর্মকাণ্ড, যেহেতু তিনি ধরা পড়েছেন তাই জনগণ জানতে পেরেছে। কিন্তু অজানা রয়ে গেছে আরও অনেক সাব-রেজিস্ট্রারের কুকীর্তি। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি শতাংশ জমি কেনাবেচা বা যে কোনো ধরনের দলিল করার ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারের একটি নির্দিষ্ট অবৈধ হার রয়েছে। রূপগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল করলে সরকারি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রারকে শতাংশপ্রতি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
ভূমি-সংক্রান্ত অফিসগুলো আজ দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে কর্মরতরা নিজেদের ইচ্ছামতো ঘুষের হার নির্ধারণ করেন। বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে তারা বহাল তবিয়তে টিকে আছেন।
ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়ম দূর করতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
ভূমি বলতে সাধারণত পৃথিবীর উপরিভাগের কঠিন স্থলভাগকে বোঝায়। ভূমি হলো প্রকৃতির অকাতরে দান করা মাটি, জল, খনিজ ও বনজ সম্পদ। এটি মানুষের বসবাস বা উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত স্থান। অর্থনৈতিক বা আইনি সংজ্ঞায় আবাদি-অনাবাদি জমি, নদ-নদী, খাল-বিল, ঘরবাড়ি এবং মাটির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত সব কিছুকেই ভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়। এভাবেও বলা যায়, মানুষ বা প্রকৃতি কর্তৃক সরাসরি ব্যবহৃত বা উৎপাদনে সহায়তা করে—এমন প্রাকৃতিক উপাদান (মাটি, পানি, আলো) হলো ভূমি। আইনের ভাষায় ভূমি হলো আবাদি, অনাবাদি, পানিতে নিমজ্জিত এলাকা, ঘরবাড়ি এবং মাটির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত যে কোনো বস্তু (রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২ (১৬) ধারা অনুযায়ী)। প্রকৃতার্থে ভূমি হলো উৎপাদনের আদি ও মৌলিক উপাদান। এর মধ্যে মাটি ছাড়াও খনিজ, বনজ সম্পদ, জলাশয় ও জলবায়ু অন্তর্ভুক্ত।
এটা ঠিক যে, ভূমি প্রকৃতির দান, এর জোগান সীমিত। এটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা যায় না এবং এর উর্বরাশক্তিও ভিন্ন হয়। বর্তমান সভ্যতার উন্মেষের আগে আজকের মতো ভূমির মালিকানা নিয়ে এত দ্বন্দ্ব, ঝগড়া-বিবাদ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল না। সভ্যতার উষালগ্নে মানুষের সমাজব্যবস্থাকে বলা হয় আদি সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা। এই সমাজব্যবস্থায় ভূমির মালিকানার বিষয়টি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল না। মানুষ সমাজবদ্ধভাবে ভূমি ব্যবহার করত এবং ভূমির মালিকানাও ছিল সামাজিক। সময়ের ক্রমবিবর্তনে সামন্তপ্রথা, রাজতন্ত্র এবং বর্তমানে কথিত গণতন্ত্রে এসে ভূমি হয়ে গেছে ব্যক্তিগত সম্পদ। সৃষ্টি হয়েছে ব্যক্তির ভূমির মালিকানা। আর এই ভূমিকে ব্যক্তিগতভাবে কুক্ষিগত করার জন্য চলে নানা চেষ্টা। এভাবেই শুরু হয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে ভূমি হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে ভূমি বিক্রি বা দানের কার্যক্রম শুরু হয়। এই কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাষ্ট্রের নিযুক্ত ব্যক্তির অনুমোদনে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে জানিয়ে মালিকানা পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্র সব ভূমির মালিক। তাই ব্যক্তিকে ভূমির জন্য রাষ্ট্রকে কর দিতে হয়। ব্যক্তি তার ভোগ বা দখলকৃত জমির ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রকে ভূমি কর দেয়। রাষ্ট্র এই অনুমোদন প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বেশ কিছু দপ্তর সৃষ্টি করেছে। যেমন—ভূমি নিবন্ধন দপ্তর, ভূমি রাজস্ব আদায় দপ্তর, ভূমি জরিপ দপ্তরসহ নানা ধরনের বিভাগ। বর্তমানে সরকারের এই দপ্তরগুলো দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে সরকার ডিজিটাল ভূমি সেবা চালু করেছে। ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদৌ দুর্নীতি হ্রাস পাচ্ছে কি না, এর উত্তর খুবই জটিল। কারণ মার্চ ২০২৬-এর তথ্যমতে, ভূমি মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি ‘ওয়ান ডিজিটে’ (১০ শতাংশের নিচে) নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ভূমি-সংক্রান্ত দুর্নীতি কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে।
ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতির সাধারণ ক্ষেত্রগুলো হলো—
১. ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি (মিউটেশন)। ভূমি অফিসে নামজারির ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণ ও হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
২. মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান বা দলিলে কারচুপি।
৩. ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে দুর্নীতি।
৪. প্রভাবশালীদের নামে সম্পত্তি বরাদ্দ ও অবৈধ দখল।
৫. ভূমি অফিসগুলোতে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ।
এই ধরনের অনিয়ম দূর করতে সরকার ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করেছে। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে অনলাইন ভূমি কর (ই-ট্যাক্স) পোর্টালে নিবন্ধন করে ঘরে বসেই ভূমি কর পরিশোধ করা যায়। অনলাইনে হওয়ায় সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই যোগাযোগ কতটা কমেছে? এখনও অনলাইনে আবেদন করে ভূমি অফিসে ঘুরতে হয় সাধারণ মানুষকে। ডিজিটাল হলেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ সাধারণ মানুষের ডিজিটাল বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই।
ভূমি অফিসের চারপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকান। অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ডিজিটাল পদ্ধতি বোঝেন না। তাই তাদের ভূমি অফিসে যেতে হয় এবং অফিসের কর্মরত ব্যক্তিরা অনেক সময় সেবা গ্রহণকারীকে এসব দোকানে যেতে বলেন। অনেকটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মতো। ভূমি সেবাগ্রহীতারা ওই দোকানে গেলে দোকানিরা সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। গ্রামের নিরীহ মানুষ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়। ভূমি সেবা প্রদানের নামে গড়ে ওঠা এসব কম্পিউটার দোকান কার্যত দালালের কাজ করে।
ভূমি সেবায় অনিয়মের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—
১. সরকারি ফির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ দাবি। এই বিষয়টির সঙ্গে ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মীরা জড়িত। একটি ভূমি অফিসে যতজন কর্মচারী আছেন, তার চেয়ে বেশি রয়েছে দালাল। এই দালালরা ফাইল প্রসেসিং থেকে শুরু করে বাইরের কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানের মাধ্যমে ভূমি সেবার কাজ করে দেয়, যা অনিরাপদ অনলাইন সেবার রূপ নিয়েছে।
২. ভুল রেকর্ড সংশোধন বা মাঠ পরচা পেতে দীর্ঘসূত্রিতা ও অবৈধ অর্থ লেনদেন। টাকা না দিলে মিউটেশনের আবেদন খারিজ হয়ে যায়।
৩. ডিজিটাল ভূমি উন্নয়ন কর দেয়ার ক্ষেত্রেও অবৈধভাবে অর্থ আদায় করা হয়। শ্রেণী পরিবর্তনের আবেদন দীর্ঘদিন ডিসি অফিসে ঝুলে থাকে। যোগাযোগ করা হলেও কোনো কাজ হয় না। শোনা যায়, রাজশাহী অঞ্চলে প্রতিটি শ্রেণী পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতি কাঠায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এই টাকা দিলে ডিসি অফিস সহজেই কাজটি করে দেয়।
ভূমি রেজিস্ট্রেশনে অনিয়মেরও শেষ নেই। সম্প্রতি ঢাকা জেলার সাভারে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনকে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ৩ মে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৬ থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এ নির্দেশ দেয়া হয়। অফিস আদেশে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩ (খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এবং বিধি ৩ (ঘ) অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রত্যাহার করে মহাপরিদর্শক নিবন্ধন দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে দ্রুত বর্তমান দায়িত্বভার হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো ছিল—
১. দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ গ্রহণ। তাকে ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবেও উল্লেখ করা হতো।
২. সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় অল্প সময়ে তিনি ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন করেছেন।
৩. বিলাসবহুল গাড়ি, বহুতল ভবন নির্মাণ এবং বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন।
৪. ভূমি নিবন্ধনে অনিয়ম, জাল দলিল এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এটি তো সাভারের সাব-রেজিস্ট্রারের কর্মকাণ্ড, যেহেতু তিনি ধরা পড়েছেন তাই জনগণ জানতে পেরেছে। কিন্তু অজানা রয়ে গেছে আরও অনেক সাব-রেজিস্ট্রারের কুকীর্তি। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি শতাংশ জমি কেনাবেচা বা যে কোনো ধরনের দলিল করার ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারের একটি নির্দিষ্ট অবৈধ হার রয়েছে। রূপগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল করলে সরকারি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রারকে শতাংশপ্রতি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
ভূমি-সংক্রান্ত অফিসগুলো আজ দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে কর্মরতরা নিজেদের ইচ্ছামতো ঘুষের হার নির্ধারণ করেন। বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে তারা বহাল তবিয়তে টিকে আছেন।
ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়ম দূর করতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন