সংবাদ

সাঁওতালি ভাষায় শপথ: আদিবাসী ভাষার মর্যাদার নতুন দিগন্ত


মিথুশিলাক মুরমু
মিথুশিলাক মুরমু
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

সাঁওতালি ভাষায় শপথ: আদিবাসী ভাষার মর্যাদার নতুন দিগন্ত
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বাঁকুড়ার রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষুদিরাম টুডু

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বাঁকুড়ার রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষুদিরাম টুডু। বিজেপির টিকেটে নির্বাচিত এই নেতা ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। ৯ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। দিনটির বিশেষত্ব ছিল— এ দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী পালিত হচ্ছিল। 

বঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নিজ মাতৃভাষা সাঁওতালিতে শপথ গ্রহণ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন টুডু। শপথ বাক্যের পুরো অংশ তিনি সাঁওতালি ভাষায় সাবলীলভাবে উচ্চারণ করেন। তার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজ্যের আদিবাসী সংস্কৃতি ও ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাঁওতালি ভাষায় শপথ নেয়ার সময় ময়দানে উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা থেকে উঠে আসা এই নেতার হাত ধরে আদিবাসী উন্নয়নের পথে নতুন দিশা মিলবে। 

এবারের নির্বাচনে ক্ষুদিরাম টুডু ছাড়াও ভারতীয় জনতা পার্টি থেকে রেকর্ডসংখ্যক সাঁওতাল বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— লাবসেন বাস্কে, প্রণত টুডু, ছেত্রমোহন হাঁসদা, লক্ষ্মীকান্ত সাউর, দুর্গা মুরমু, অমিয় কিস্কু, যোয়েল মুরমু, বুধরায় টুডু, মিস মায়ন মুরমু, কমলাকান্ত হাঁসদা এবং ভদ্রা হেমব্রম। আমরা বিশ্বাস করি, আগামীতে সাঁওতালি বিধায়করা সাঁওতালি ভাষাতেই শপথ গ্রহণ করবেন। 

আমরা দেখেছি, আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ড রাজ্যে ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ৮১ জন বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর ৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন বিধানসভার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বিধায়ক আঞ্চলিক ভাষায় শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনসহ ৫৫ জন হিন্দিতে শপথ গ্রহণ করেন। বাকি ২২ জন ১০টি আঞ্চলিক ভাষায় শপথ নেন। এদের মধ্যে ৫ জন হো ভাষায়, ৪ জন খোরঠা ভাষায়, ৩ জন সাঁওতালি ভাষায় এবং ২ জন আংগিকা ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। এছাড়া আরও কয়েকজন ˆমথিলী, বাংলা, মুণ্ডারী ও কুড়ুখ ভাষায় শপথপত্র পাঠ করেন। সংস্কৃত ভাষায় ৩ জন এবং উর্দু ভাষায় ১ জন শপথ নেন। 

ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে ২২টি ভাষার সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে। ভাষাগুলো হলো— অসমীয়া, বাংলা, বোড়ো, ডোগরি, গুজরাটি, হিন্দি, কন্নড়, কাশ্মীরি, কোঙ্কণি, ˆমথিলী, মালয়ালম, মণিপুরি, মারাঠি, নেপালি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, সংস্কৃত, সাঁওতালি, সিন্ধি, তামিল, তেলুগু ও উর্দু। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতে ১৯ হাজার ৫০০-এর বেশি মাতৃভাষা বা উপভাষা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২১টি প্রধান ভাষা রয়েছে, যেগুলোতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ কথা বলে। 

লোকসভায়ও সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণের নজির রয়েছে। ২০১৪ সালের ৬ জুন ময়ুরভঞ্জ থেকে নির্বাচিত রামচরণ হাঁসদা সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম থেকে উমা সরেনও সাঁওতালি ভাষাকেই বেছে নিয়েছিলেন। লাবসেন বাস্কে ২০১১ সালে মন্ত্রী হিসেবে সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে রামচরণ হাঁসদা বলেছিলেন, বোড়ো ভাষার পাশাপাশি সাঁওতালি ভাষাকেও সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আদিবাসী সাঁওতালদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। 

সাঁওতালি ভাষার উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে ৭ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে শিলিগুড়িতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মু। বিধাননগরের একটি মাঠে আন্তর্জাতিক সাঁওতালি সম্মেলনের অনুমতি না দেয়ায় তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘মমতা দিদি আমার ছোট বোনের মতো। তিনি হয়তো কোনো কারণে আমার ওপর রাগ করেছেন। এখানে এত বড় মাঠ রয়েছে, সভা করতে অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না। আসলে ইচ্ছা করেই আমাদের এই মাঠে সভা করতে দেয়া হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এ ঘটনায় তৃণমূল প্রশাসনের সমালোচনা করেছিলেন। 

কেউ কেউ মনে করছেন, সাম্প্রতিক সেই উপেক্ষার প্রতিক্রিয়াও হয়তো প্রতিফলিত হয়েছে সদ্য গঠিত মন্ত্রিসভার সদস্য ক্ষুদিরাম টুডুর শপথ গ্রহণে। 

সাঁওতালি ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন। এটি অস্ট্রোএশীয় ভাষাপরিবারের মুণ্ডা শাখার অন্তর্ভুক্ত। ভাষাবিদদের মতে, হাজার হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল থেকে অস্ট্রোএশীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পূর্ব ও মধ্য ভারতে এসে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকেই মুণ্ডা ভাষাগুলোর বিকাশ ঘটে। পরে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ভাষা আলাদা পরিচিতি লাভ করে এবং ক্রমে সাঁওতালি নামে পরিচিত হয়। 

লোকগাঁথা ও গানের ভাষায় সাঁওতালদের বর্ণমালার উল্লেখ পাওয়া গেলেও তার নির্দিষ্ট প্রমাণ দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি। আধুনিক যুগে ১৮৪৬ সালে রেভারেন্ড জে. ফিলিপস সাঁওতালি ভাষা নিয়মিতভাবে লিখে সংরক্ষণ, অনুবাদ ও ব্যাকরণ রচনার কাজ শুরু করেন। ১৮৫২ সালে তার বই ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্যা সাঁওতালি ল্যাঙ্গুয়েজ’ প্রকাশিত হয়। প্রথমদিকে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করা হলেও পরে উচ্চারণের শুদ্ধতা রক্ষায় রোমান লিপির ব্যবহার বাড়ে। 

উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে সাঁওতালি ভাষার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি বর্ণমালা উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলা, দেবনাগরী, ওড়িয়া, অলচিকি ও রোমান লিপি বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০০৩ সালে ভারতের সংসদে পাস হওয়া ৯২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে সাঁওতালি ভারতের স্বীকৃত সরকারি ভাষাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তবে সরকার ভাষাটিকে স্বীকৃতি দিলেও সরকারি লিপি কোনটি হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। 

বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ১৯২৫ সালে রঘুনাথ মুরমু উদ্ভাবিত অলচিকি বর্ণমালার প্রসার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হয়। 

আমাদের প্রত্যাশা, লেখ্য ভাষার ভিন্নতা থাকলেও কথ্য ভাষার ঐক্য অটুট থাকবে। সাঁওতালি কথ্য ভাষায় শপথ গ্রহণ সেই ঐক্যের শক্তিকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে। ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সাঁওতালি ভাষাভাষীদের মধ্যে এই ভাষা সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। আমরা সাঁওতালি ভাষার অগ্রযাত্রা কামনা করি। 

[লেখক: কলামিস্ট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


সাঁওতালি ভাষায় শপথ: আদিবাসী ভাষার মর্যাদার নতুন দিগন্ত

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বাঁকুড়ার রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষুদিরাম টুডু। বিজেপির টিকেটে নির্বাচিত এই নেতা ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। ৯ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। দিনটির বিশেষত্ব ছিল— এ দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী পালিত হচ্ছিল। 

বঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নিজ মাতৃভাষা সাঁওতালিতে শপথ গ্রহণ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন টুডু। শপথ বাক্যের পুরো অংশ তিনি সাঁওতালি ভাষায় সাবলীলভাবে উচ্চারণ করেন। তার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজ্যের আদিবাসী সংস্কৃতি ও ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাঁওতালি ভাষায় শপথ নেয়ার সময় ময়দানে উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা থেকে উঠে আসা এই নেতার হাত ধরে আদিবাসী উন্নয়নের পথে নতুন দিশা মিলবে। 

এবারের নির্বাচনে ক্ষুদিরাম টুডু ছাড়াও ভারতীয় জনতা পার্টি থেকে রেকর্ডসংখ্যক সাঁওতাল বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— লাবসেন বাস্কে, প্রণত টুডু, ছেত্রমোহন হাঁসদা, লক্ষ্মীকান্ত সাউর, দুর্গা মুরমু, অমিয় কিস্কু, যোয়েল মুরমু, বুধরায় টুডু, মিস মায়ন মুরমু, কমলাকান্ত হাঁসদা এবং ভদ্রা হেমব্রম। আমরা বিশ্বাস করি, আগামীতে সাঁওতালি বিধায়করা সাঁওতালি ভাষাতেই শপথ গ্রহণ করবেন। 

আমরা দেখেছি, আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ড রাজ্যে ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ৮১ জন বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর ৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন বিধানসভার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বিধায়ক আঞ্চলিক ভাষায় শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনসহ ৫৫ জন হিন্দিতে শপথ গ্রহণ করেন। বাকি ২২ জন ১০টি আঞ্চলিক ভাষায় শপথ নেন। এদের মধ্যে ৫ জন হো ভাষায়, ৪ জন খোরঠা ভাষায়, ৩ জন সাঁওতালি ভাষায় এবং ২ জন আংগিকা ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। এছাড়া আরও কয়েকজন ˆমথিলী, বাংলা, মুণ্ডারী ও কুড়ুখ ভাষায় শপথপত্র পাঠ করেন। সংস্কৃত ভাষায় ৩ জন এবং উর্দু ভাষায় ১ জন শপথ নেন। 

ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে ২২টি ভাষার সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে। ভাষাগুলো হলো— অসমীয়া, বাংলা, বোড়ো, ডোগরি, গুজরাটি, হিন্দি, কন্নড়, কাশ্মীরি, কোঙ্কণি, ˆমথিলী, মালয়ালম, মণিপুরি, মারাঠি, নেপালি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, সংস্কৃত, সাঁওতালি, সিন্ধি, তামিল, তেলুগু ও উর্দু। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতে ১৯ হাজার ৫০০-এর বেশি মাতৃভাষা বা উপভাষা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২১টি প্রধান ভাষা রয়েছে, যেগুলোতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ কথা বলে। 

লোকসভায়ও সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণের নজির রয়েছে। ২০১৪ সালের ৬ জুন ময়ুরভঞ্জ থেকে নির্বাচিত রামচরণ হাঁসদা সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম থেকে উমা সরেনও সাঁওতালি ভাষাকেই বেছে নিয়েছিলেন। লাবসেন বাস্কে ২০১১ সালে মন্ত্রী হিসেবে সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে রামচরণ হাঁসদা বলেছিলেন, বোড়ো ভাষার পাশাপাশি সাঁওতালি ভাষাকেও সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আদিবাসী সাঁওতালদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। 

সাঁওতালি ভাষার উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে ৭ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে শিলিগুড়িতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মু। বিধাননগরের একটি মাঠে আন্তর্জাতিক সাঁওতালি সম্মেলনের অনুমতি না দেয়ায় তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘মমতা দিদি আমার ছোট বোনের মতো। তিনি হয়তো কোনো কারণে আমার ওপর রাগ করেছেন। এখানে এত বড় মাঠ রয়েছে, সভা করতে অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না। আসলে ইচ্ছা করেই আমাদের এই মাঠে সভা করতে দেয়া হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এ ঘটনায় তৃণমূল প্রশাসনের সমালোচনা করেছিলেন। 

কেউ কেউ মনে করছেন, সাম্প্রতিক সেই উপেক্ষার প্রতিক্রিয়াও হয়তো প্রতিফলিত হয়েছে সদ্য গঠিত মন্ত্রিসভার সদস্য ক্ষুদিরাম টুডুর শপথ গ্রহণে। 

সাঁওতালি ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন। এটি অস্ট্রোএশীয় ভাষাপরিবারের মুণ্ডা শাখার অন্তর্ভুক্ত। ভাষাবিদদের মতে, হাজার হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল থেকে অস্ট্রোএশীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পূর্ব ও মধ্য ভারতে এসে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকেই মুণ্ডা ভাষাগুলোর বিকাশ ঘটে। পরে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ভাষা আলাদা পরিচিতি লাভ করে এবং ক্রমে সাঁওতালি নামে পরিচিত হয়। 

লোকগাঁথা ও গানের ভাষায় সাঁওতালদের বর্ণমালার উল্লেখ পাওয়া গেলেও তার নির্দিষ্ট প্রমাণ দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি। আধুনিক যুগে ১৮৪৬ সালে রেভারেন্ড জে. ফিলিপস সাঁওতালি ভাষা নিয়মিতভাবে লিখে সংরক্ষণ, অনুবাদ ও ব্যাকরণ রচনার কাজ শুরু করেন। ১৮৫২ সালে তার বই ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্যা সাঁওতালি ল্যাঙ্গুয়েজ’ প্রকাশিত হয়। প্রথমদিকে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করা হলেও পরে উচ্চারণের শুদ্ধতা রক্ষায় রোমান লিপির ব্যবহার বাড়ে। 

উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে সাঁওতালি ভাষার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি বর্ণমালা উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলা, দেবনাগরী, ওড়িয়া, অলচিকি ও রোমান লিপি বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০০৩ সালে ভারতের সংসদে পাস হওয়া ৯২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে সাঁওতালি ভারতের স্বীকৃত সরকারি ভাষাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তবে সরকার ভাষাটিকে স্বীকৃতি দিলেও সরকারি লিপি কোনটি হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। 

বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ১৯২৫ সালে রঘুনাথ মুরমু উদ্ভাবিত অলচিকি বর্ণমালার প্রসার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হয়। 

আমাদের প্রত্যাশা, লেখ্য ভাষার ভিন্নতা থাকলেও কথ্য ভাষার ঐক্য অটুট থাকবে। সাঁওতালি কথ্য ভাষায় শপথ গ্রহণ সেই ঐক্যের শক্তিকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে। ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সাঁওতালি ভাষাভাষীদের মধ্যে এই ভাষা সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। আমরা সাঁওতালি ভাষার অগ্রযাত্রা কামনা করি। 

[লেখক: কলামিস্ট]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত