সংবাদ

চিনির ঝুঁকি: নীরব স্বাস্থ্য সংকট


শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

চিনির ঝুঁকি: নীরব স্বাস্থ্য সংকট
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতিতে চিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে

চিনি মানব খাদ্যের একটি প্রাকৃতিক উপাদান এবং এটি শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতিতে চিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে— যেমন পিঠা, মিষ্টি, পায়েস এবং বিভিন্ন উৎসবভিত্তিক খাবারে। তবে আধুনিক সময়েখাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সহজলভ্যতার কারণে চিনির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করেফ্রি সুগার—অর্থাৎ খাবারে যোগ করা চিনি, মধু, সিরাপ এবং ফলের রসে থাকা চিনি—বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও চিনি নিজে বিষ নয়, কিন্তু অতিরিক্ত এবং নিয়মিত গ্রহণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বব্যাপী গত কয়েক দশকে চিনির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত, উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত এবং কম পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারের ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহরাঞ্চলে ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, বিস্কুট, চকলেট এবং অন্যান্য মিষ্টি খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও ধীরে ধীরে এই ধরনের খাদ্যের প্রসার ঘটছে। ফলে খাদ্যাভ্যাসে একটি পরিবর্তন এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশের শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকে এবং বাজারে সহজলভ্য সস্তা মিষ্টিজাত খাবার ও পানীয় এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে শিশুদের মধ্যেদাঁতের ক্ষয় (ডেন্টালক্যারিজ) একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। মুখের ব্যাকটেরিয়া চিনি ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়া বেশি ক্যালোরিযুক্ত কিন্তু পুষ্টিহীন খাবার গ্রহণের ফলে শিশুদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধি এবং স্থুলতা বাড়তে পারে। এটি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে, ছোটবেলা থেকে অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে তা পরবর্তীতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গঠনে বাধা দেয়।

চিনি এবং মেটাবলিক রোগ যেমন টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং নন-অ্যালকোহলিকফ্যাটি লিভার ডিজিজের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ, বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় থেকে, শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করে। এই অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হয়, বিশেষ করে পেটের চারপাশে। এর ফলেইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যেখানে শরীর ইনসুলিন হরমোনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এটি ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে শত কোটি মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস এবং প্রি-ডায়াবেটিসের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশেও এই সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আরও অনেক মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জটিল, কারণ এখানে একই সঙ্গে অপুষ্টি এবং অতিপুষ্টি—দুটোই বিদ্যমান। একদিকে কিছু মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে অনেক মানুষ অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করছে। এই ‘ডাবলবার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’ জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক দেশসুগার ট্যাক্স বা চিনিযুক্ত পানিয়ের ওপর কর আরোপ করেছে। যেমন যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স এবং আরও অনেক দেশ এই নীতি গ্রহণ করেছে। এই করের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে চিনিযুক্ত পানিয় কম খেতে উৎসাহিত করা, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম চিনি ব্যবহার করতে বাধ্য করা এবং স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের কর আরোপের ফলে অনেক দেশে চিনিযুক্তপানিয়ের ব্যবহার কমেছে এবং কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে চিনির পরিমাণ কমিয়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে এই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হলে তা জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করে যে, প্রতিদিনের মোট ক্যালোরির ১০% এর কম ফ্রি সুগার থেকে আসা উচিত এবং সম্ভব হলে তা ৫% এর নিচে রাখা উচিত। এটি প্রায় ২৫ গ্রাম বা ৬ চা চামচ চিনির সমান। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই অজান্তেই এই সীমার চেয়ে বেশি চিনি গ্রহণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, মাত্র ২৫০ মিলিলিটার কোমল পানিয় বা ফলের রসেই প্রায় ২৫-৩০ গ্রাম চিনি থাকতে পারে। এর সঙ্গে যদি বিস্কুট, কেক বা অন্যান্য মিষ্টি খাবার যুক্ত হয়, তবে ˆদনিক চিনি গ্রহণ সহজেই সুপারিশকৃত সীমা অতিক্রম করে যায়।

চিনি কমানোর জন্য বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে। সম্পূর্ণ ফল খাওয়া ফলের রসের তুলনায় বেশি উপকারী, কারণ এতে ফাইবার থাকে যা রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়। এছাড়া কম বা শূন্য ক্যালোরিযুক্ত মিষ্টিকারক যেমন— স্টেভিয়া, সুক্রালোজ এবং অ্যাসপারটেম ব্যবহার করা যেতে পারে। খাদ্য শিল্পে বর্তমানে বিভিন্নফ্লেভার প্রযুক্তিব্যবহার করে কম চিনি দিয়ে একই স্বাদ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি মিষ্টতার অনুভূতি বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে কম চিনি ব্যবহার করেও গ্রহণযোগ্য স্বাদ তৈরি করা সম্ভব হয়।

এই সমস্যা সমাধানে সরকার, শিল্পখাত এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার খাদ্যের প্যাকেটে স্পষ্ট লেবেলিং বাধ্যতামূলক করতে পারে, শিশুদের লক্ষ্য করে মিষ্টিজাত খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং প্রয়োজনে সুগার ট্যাক্স চালু করতে পারে। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কম চিনি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে, শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মানুষ নিজের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, চিনি আমাদের খাদ্যের একটি অংশ হলেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান হার এই সমস্যার গুরুত্বকে তুলে ধরে। সঠিক নীতি, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব। ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

[লেখক: যুক্তরাজ্যের স্যালুটিভিয়া নামক একটি খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিতে ইনোভেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


চিনির ঝুঁকি: নীরব স্বাস্থ্য সংকট

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

চিনি মানব খাদ্যের একটি প্রাকৃতিক উপাদান এবং এটি শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতিতে চিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে— যেমন পিঠা, মিষ্টি, পায়েস এবং বিভিন্ন উৎসবভিত্তিক খাবারে। তবে আধুনিক সময়েখাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সহজলভ্যতার কারণে চিনির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করেফ্রি সুগার—অর্থাৎ খাবারে যোগ করা চিনি, মধু, সিরাপ এবং ফলের রসে থাকা চিনি—বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও চিনি নিজে বিষ নয়, কিন্তু অতিরিক্ত এবং নিয়মিত গ্রহণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বব্যাপী গত কয়েক দশকে চিনির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত, উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত এবং কম পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারের ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহরাঞ্চলে ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, বিস্কুট, চকলেট এবং অন্যান্য মিষ্টি খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও ধীরে ধীরে এই ধরনের খাদ্যের প্রসার ঘটছে। ফলে খাদ্যাভ্যাসে একটি পরিবর্তন এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশের শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকে এবং বাজারে সহজলভ্য সস্তা মিষ্টিজাত খাবার ও পানীয় এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে শিশুদের মধ্যেদাঁতের ক্ষয় (ডেন্টালক্যারিজ) একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। মুখের ব্যাকটেরিয়া চিনি ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়া বেশি ক্যালোরিযুক্ত কিন্তু পুষ্টিহীন খাবার গ্রহণের ফলে শিশুদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধি এবং স্থুলতা বাড়তে পারে। এটি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে, ছোটবেলা থেকে অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে তা পরবর্তীতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গঠনে বাধা দেয়।

চিনি এবং মেটাবলিক রোগ যেমন টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং নন-অ্যালকোহলিকফ্যাটি লিভার ডিজিজের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ, বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় থেকে, শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করে। এই অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হয়, বিশেষ করে পেটের চারপাশে। এর ফলেইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যেখানে শরীর ইনসুলিন হরমোনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এটি ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে শত কোটি মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস এবং প্রি-ডায়াবেটিসের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশেও এই সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আরও অনেক মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জটিল, কারণ এখানে একই সঙ্গে অপুষ্টি এবং অতিপুষ্টি—দুটোই বিদ্যমান। একদিকে কিছু মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে অনেক মানুষ অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করছে। এই ‘ডাবলবার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’ জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক দেশসুগার ট্যাক্স বা চিনিযুক্ত পানিয়ের ওপর কর আরোপ করেছে। যেমন যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স এবং আরও অনেক দেশ এই নীতি গ্রহণ করেছে। এই করের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে চিনিযুক্ত পানিয় কম খেতে উৎসাহিত করা, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম চিনি ব্যবহার করতে বাধ্য করা এবং স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের কর আরোপের ফলে অনেক দেশে চিনিযুক্তপানিয়ের ব্যবহার কমেছে এবং কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে চিনির পরিমাণ কমিয়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে এই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হলে তা জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করে যে, প্রতিদিনের মোট ক্যালোরির ১০% এর কম ফ্রি সুগার থেকে আসা উচিত এবং সম্ভব হলে তা ৫% এর নিচে রাখা উচিত। এটি প্রায় ২৫ গ্রাম বা ৬ চা চামচ চিনির সমান। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই অজান্তেই এই সীমার চেয়ে বেশি চিনি গ্রহণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, মাত্র ২৫০ মিলিলিটার কোমল পানিয় বা ফলের রসেই প্রায় ২৫-৩০ গ্রাম চিনি থাকতে পারে। এর সঙ্গে যদি বিস্কুট, কেক বা অন্যান্য মিষ্টি খাবার যুক্ত হয়, তবে ˆদনিক চিনি গ্রহণ সহজেই সুপারিশকৃত সীমা অতিক্রম করে যায়।

চিনি কমানোর জন্য বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে। সম্পূর্ণ ফল খাওয়া ফলের রসের তুলনায় বেশি উপকারী, কারণ এতে ফাইবার থাকে যা রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়। এছাড়া কম বা শূন্য ক্যালোরিযুক্ত মিষ্টিকারক যেমন— স্টেভিয়া, সুক্রালোজ এবং অ্যাসপারটেম ব্যবহার করা যেতে পারে। খাদ্য শিল্পে বর্তমানে বিভিন্নফ্লেভার প্রযুক্তিব্যবহার করে কম চিনি দিয়ে একই স্বাদ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি মিষ্টতার অনুভূতি বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে কম চিনি ব্যবহার করেও গ্রহণযোগ্য স্বাদ তৈরি করা সম্ভব হয়।

এই সমস্যা সমাধানে সরকার, শিল্পখাত এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার খাদ্যের প্যাকেটে স্পষ্ট লেবেলিং বাধ্যতামূলক করতে পারে, শিশুদের লক্ষ্য করে মিষ্টিজাত খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং প্রয়োজনে সুগার ট্যাক্স চালু করতে পারে। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কম চিনি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে, শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মানুষ নিজের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, চিনি আমাদের খাদ্যের একটি অংশ হলেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান হার এই সমস্যার গুরুত্বকে তুলে ধরে। সঠিক নীতি, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব। ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

[লেখক: যুক্তরাজ্যের স্যালুটিভিয়া নামক একটি খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিতে ইনোভেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত