সংবাদ

নীরব মহামারি হাইপারটেনশন


সমীর কুমার সাহা
সমীর কুমার সাহা
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম

নীরব মহামারি হাইপারটেনশন
উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’

১৭ মে বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘Controlling Hypertension Together ’। বিশ্ব হাইপারটেনশন লীগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই আহ্বান স্পষ্ট করে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পরিবারের সমন্বিত দায়। 

নীরব ঘাতক: পরিসংখ্যান যা বলছে

উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট কিলার’। কারণ উপসর্গ ছাড়াই এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল ও অন্ধত্বের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ১৪০ কোটি মানুষ হাইপারটেনশনে আক্রান্ত। এর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে। বাকি ৭৫ শতাংশ হয় শনাক্তের বাইরে, নয়তো চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনার বাইরে। 

বৈশ্বিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। মোট আক্রান্তের তিন-চতুর্থাংশ বাস করেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। এসব দেশে রোগ শনাক্তকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। তথ্য বলছে, বিশ্বে মোট মৃত্যুর ১৩ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। ইস্কেমিক হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ৪৫ শতাংশ এবং স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর ৫২ শতাংশের নেপথ্যে এই একটিই কারণ। 

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: সংকটের বহুমাত্রিকতা

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ এখন অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সংকট। মেটা-অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ হাইপারটেনশনে ভুগছেন। শহরাঞ্চলে এই হার ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন আক্রান্ত। সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্যে। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী আক্রান্তদের ৫৪ শতাংশ জানেন না যে তাদের রক্তচাপ বেশি। যারা জানেন এবং ওষুধ নিচ্ছেন, তাদের ৬৭ শতাংশের রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ৬৭-৬৮ শতাংশ ঘটছে অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে ১৫-২০ শতাংশ মৃত্যুর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণ হাইপারটেনশন-জনিত জটিলতা। দ্রুত নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ এই সংকটকে তীব্র করছে। 


ঝুঁকির কাঠামো ও আমাদের দুর্বলতা

হাইপারটেনশনের ঝুঁকি দুই ধরনের। বয়স ও বংশগতি অপরিবর্তনীয়। কিন্তু আচরণগত ঝুঁকি পরিবর্তনযোগ্য। বাংলাদেশে দৈনিক লবণ গ্রহণের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৫ গ্রামের প্রায় দ্বিগুণ। ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত খাবার ও রেস্তরাঁর খাবারে লুকানো সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনক। 

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তামাক ব্যবহার, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় যতটা প্রস্তুত, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ততটা নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে নিয়মিত স্ক্রিনিং, রোগী ফলোআপ ও সাশ্রয়ী ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি স্পষ্ট। 


সমাধানের পথ: বহুখাতভিত্তিক সমন্বয়

Controlling Hypertension Together’ প্রতিপাদ্যের বাস্তবায়নে চারটি স্তরে কাজ জরুরি। 

১. রাষ্ট্রীয় নীতি: প্রক্রিয়াজাত খাবারে সোডিয়ামের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণের মতো খাদ্যপণ্যের মোড়কে ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। জাতীয় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে হাইপারটেনশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

২. স্বাস্থ্যব্যবস্থা: কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩০ বছর বয়সের পর সবার জন্য বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। PEN প্রোটোকল অনুযায়ী চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধের সরবরাহ বাড়াতে হবে। 

৩. সামাজিক সচেতনতা: শিক্ষা কার্যক্রমে খাদ্য ও জীবনাচার বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করতে হবে। কর্মস্থলে, মসজিদে, মন্দিরে নিয়মিত স্বাস্থ্য ক্যাম্প আয়োজন করে স্ক্রিনিংয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। 

৪. ব্যক্তি ও পরিবার: প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ পরিহার, ধূমপান বর্জন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবনই আপাতত সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। 

উপসংহার: 

উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা সহজ, চিকিৎসা সাশ্রয়ী। প্রধান বাধা সচেতনতার অভাব ও অবহেলা। ‘আমার কিছু হবে না’ এই আত্মঘাতী মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। 

বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবসে নাগরিক হিসেবে অঙ্গীকার হোক, আজই নিজের ও পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের রক্তচাপ মাপব। রাষ্ট্র হিসেবে অঙ্গীকার হোক, আমরা নীতি ও বাজেটে হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেবো। কারণ নীরব ঘাতককে রুখতে হলে সোচ্চার হতে হবে এখনই। 

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


নীরব মহামারি হাইপারটেনশন

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

১৭ মে বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘Controlling Hypertension Together ’। বিশ্ব হাইপারটেনশন লীগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই আহ্বান স্পষ্ট করে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পরিবারের সমন্বিত দায়। 

নীরব ঘাতক: পরিসংখ্যান যা বলছে

উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট কিলার’। কারণ উপসর্গ ছাড়াই এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল ও অন্ধত্বের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ১৪০ কোটি মানুষ হাইপারটেনশনে আক্রান্ত। এর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে। বাকি ৭৫ শতাংশ হয় শনাক্তের বাইরে, নয়তো চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনার বাইরে। 

বৈশ্বিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। মোট আক্রান্তের তিন-চতুর্থাংশ বাস করেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। এসব দেশে রোগ শনাক্তকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। তথ্য বলছে, বিশ্বে মোট মৃত্যুর ১৩ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। ইস্কেমিক হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ৪৫ শতাংশ এবং স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর ৫২ শতাংশের নেপথ্যে এই একটিই কারণ। 

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: সংকটের বহুমাত্রিকতা

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ এখন অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সংকট। মেটা-অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ হাইপারটেনশনে ভুগছেন। শহরাঞ্চলে এই হার ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন আক্রান্ত। সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্যে। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী আক্রান্তদের ৫৪ শতাংশ জানেন না যে তাদের রক্তচাপ বেশি। যারা জানেন এবং ওষুধ নিচ্ছেন, তাদের ৬৭ শতাংশের রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ৬৭-৬৮ শতাংশ ঘটছে অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে ১৫-২০ শতাংশ মৃত্যুর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণ হাইপারটেনশন-জনিত জটিলতা। দ্রুত নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ এই সংকটকে তীব্র করছে। 


ঝুঁকির কাঠামো ও আমাদের দুর্বলতা

হাইপারটেনশনের ঝুঁকি দুই ধরনের। বয়স ও বংশগতি অপরিবর্তনীয়। কিন্তু আচরণগত ঝুঁকি পরিবর্তনযোগ্য। বাংলাদেশে দৈনিক লবণ গ্রহণের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৫ গ্রামের প্রায় দ্বিগুণ। ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত খাবার ও রেস্তরাঁর খাবারে লুকানো সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনক। 

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তামাক ব্যবহার, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় যতটা প্রস্তুত, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ততটা নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে নিয়মিত স্ক্রিনিং, রোগী ফলোআপ ও সাশ্রয়ী ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি স্পষ্ট। 


সমাধানের পথ: বহুখাতভিত্তিক সমন্বয়

Controlling Hypertension Together’ প্রতিপাদ্যের বাস্তবায়নে চারটি স্তরে কাজ জরুরি। 

১. রাষ্ট্রীয় নীতি: প্রক্রিয়াজাত খাবারে সোডিয়ামের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণের মতো খাদ্যপণ্যের মোড়কে ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। জাতীয় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে হাইপারটেনশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

২. স্বাস্থ্যব্যবস্থা: কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩০ বছর বয়সের পর সবার জন্য বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। PEN প্রোটোকল অনুযায়ী চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধের সরবরাহ বাড়াতে হবে। 

৩. সামাজিক সচেতনতা: শিক্ষা কার্যক্রমে খাদ্য ও জীবনাচার বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করতে হবে। কর্মস্থলে, মসজিদে, মন্দিরে নিয়মিত স্বাস্থ্য ক্যাম্প আয়োজন করে স্ক্রিনিংয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। 

৪. ব্যক্তি ও পরিবার: প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ পরিহার, ধূমপান বর্জন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবনই আপাতত সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। 

উপসংহার: 

উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা সহজ, চিকিৎসা সাশ্রয়ী। প্রধান বাধা সচেতনতার অভাব ও অবহেলা। ‘আমার কিছু হবে না’ এই আত্মঘাতী মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। 

বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবসে নাগরিক হিসেবে অঙ্গীকার হোক, আজই নিজের ও পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের রক্তচাপ মাপব। রাষ্ট্র হিসেবে অঙ্গীকার হোক, আমরা নীতি ও বাজেটে হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেবো। কারণ নীরব ঘাতককে রুখতে হলে সোচ্চার হতে হবে এখনই। 

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত