সংবাদ

ফল ও সবজি রপ্তানিতে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ


রেজাউল করিম খোকন
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

ফল ও সবজি রপ্তানিতে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
সবজি রপ্তানি বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে

বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে লাউ, কুমড়া, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, বরবটি, শিম ও টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত শুরু হওয়ায় ওই অঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছিল। এতে সবজি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু হয়েছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের সবজির বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা প্রতিযোগী দেশের ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। 

শীত মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে দিনে ৩৫-৪০ টন সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি হয়। বর্তমানে ১৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সবজি রপ্তানি করছে। সবজির পাশাপাশি মৌসুমি ফলমূলও রপ্তানি হচ্ছে। 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের সবজি। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৮ কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ইউএইতে ৯৯ লাখ ডলার, কাতারে ৪১ লাখ ডলার ও কুয়েতে ৩১ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর বাইরে যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, ইতালিতে ৩৬ লাখ ও কানাডায় ২৩ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। 

শীত মৌসুমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কিছু শাকসবজি উৎপাদন হয়। তবে গ্রীষ্মকালে তাদের উৎপাদন থাকে না বলে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির চাহিদা চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। আকাশপথ বন্ধ থাকলেও তাদের জন্য তেমন সমস্যা হয় না। কারণ মুম্বাই থেকে তিন দিনেই মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পৌঁছে যায়। আর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাঠালে ২৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। 

বাংলাদেশ ১৯৭৩ সাল থেকে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু করে। প্রথম বাজার ছিল যুক্তরাজ্য। তখন ১ হাজার ৭০০ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যকরণের উদ্দেশে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তাজা শাকসবজি, ফলমূল, পান ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের একমাত্র সংগঠন। বর্তমানে এ সংস্থার ৫শ’ সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন নিয়মিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাজা ফল ও সবজি রপ্তানি করছেন। 

বাংলাদেশ থেকে নানা ধরনের ফলমূল ও সবজি রপ্তানি হয়ে থাকে। এশিয়ান ফল, সবজি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। করলা, বেগুন, লাউ, ঢ্যাঁড়শ, বরবটি, কাঁচামরিচ, কাঁচা পেঁপে, পালংশাক, পটল, কাঁচকলা, মুলা, ঝিঙা, কচু, চিচিঙ্গা, কচুর লতি, মিষ্টি আলু, চালকুমড়া, তেজপাতা, কলার ফুল ও ফুলকপিসহ আরও অনেক সবজি এবং কাঁঠাল, আনারস, লিচু, আম, কামরাঙা, ড্রাগন ফল, আমড়া, খেজুর, আমলকি, জলপাই ও বিভিন্ন জাতের লেবু রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। পানপাতা, ধনেপাতা ও অনুরূপ পণ্যও বিদেশে যাচ্ছে। 

যদিও ২০১২ সালের দিকে ইউরোপ ছিল সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। ইইউভিত্তিক অঞ্চলগুলো বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক অঞ্চল। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও কুয়েতে সর্বাধিক পরিমাণে তাজা শাকসবজি ও ফল রপ্তানি করা হয়। তবে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ এখনও অল্প পরিমাণে তাজা সবজি ও ফল রপ্তানি করছে। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে মূলত কানাডায় বাংলাদেশের শাকসবজি রপ্তানি হয়। 

আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী উন্নতমানের শাকসবজি, ফলমূল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে এবং রপ্তানি বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, কৃষক ও উদ্যানচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। এতে গ্রামীণ আয় বাড়ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। 

সম্প্রতি পার্বত্য বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাহাড়ি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে উদ্যোক্তা ও চাষিদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আম, আনারস, কমলা, কলা, কফি, কাঁঠাল, কাজুবাদাম, ড্রাগন ফল ও পেঁপেসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। তাজা ফলমূলের পাশাপাশি শুকনো ফল, ফলের চিপস ও জুস প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমেও নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। 

তবে ফল ও সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। ভরা মৌসুমে রপ্তানির জন্য পর্যাপ্ত কার্গো সুবিধা নেই। প্রতিযোগী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের তুলনায় বিদেশি উড়োজাহাজের ভাড়া বেশি। উৎপাদন পর্যায় থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত কার্যকর শীতল চেইন ব্যবস্থা না থাকায় পণ্যের সতেজতা কমে যায়। পচনশীল পণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষ এয়ার কার্গো উড়োজাহাজও নেই। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং উপকরণের শিল্প এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। 

বর্তমানে আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রয়োজন ৬০০-৭০০ টন পণ্য। কিন্তু দৈনিক গড় রপ্তানি হচ্ছে মাত্র ২০০-২৫০ টন। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও মূলত জাতিগত বা এথনিক বাজারকেন্দ্রিক। বিশ্বের উচ্চমূল্যের বাজারে এখনও শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফাইটোস্যানিটারি ও মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধান আরোপ করেছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রেও বড় সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় ইরাডিকেশন ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি শুরু করা যায়নি। তবে এ বিষয়ে কাজ চলছে। 

বাংলাদেশের কৃষিখাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হর্টিকালচার। ফল, সবজি, ফুল, মসলা ও ওষুধি গাছের চাষ এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। উর্বর মাটি, অনুকূল জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে দেশে হর্টিকালচার ফসলের উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ফল ও সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টনের বেশি ফল উৎপাদিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১০০-১৫০ কোটি টাকার ফল ও সবজি রপ্তানি করা হচ্ছে। 

বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানি বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে হলে গুণগত মান উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি। গ্লোবাল গ্যাপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানদণ্ড মেনে উৎপাদন বাড়াতে হবে। ˆজব ও নিরাপদ ফল উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে এ খাতকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু দেশীয় চাহিদাই পূরণ করবে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। 

[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


ফল ও সবজি রপ্তানিতে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে লাউ, কুমড়া, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, বরবটি, শিম ও টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত শুরু হওয়ায় ওই অঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছিল। এতে সবজি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু হয়েছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের সবজির বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা প্রতিযোগী দেশের ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। 

শীত মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে দিনে ৩৫-৪০ টন সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি হয়। বর্তমানে ১৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সবজি রপ্তানি করছে। সবজির পাশাপাশি মৌসুমি ফলমূলও রপ্তানি হচ্ছে। 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের সবজি। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৮ কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ইউএইতে ৯৯ লাখ ডলার, কাতারে ৪১ লাখ ডলার ও কুয়েতে ৩১ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর বাইরে যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, ইতালিতে ৩৬ লাখ ও কানাডায় ২৩ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। 

শীত মৌসুমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কিছু শাকসবজি উৎপাদন হয়। তবে গ্রীষ্মকালে তাদের উৎপাদন থাকে না বলে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির চাহিদা চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। আকাশপথ বন্ধ থাকলেও তাদের জন্য তেমন সমস্যা হয় না। কারণ মুম্বাই থেকে তিন দিনেই মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পৌঁছে যায়। আর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাঠালে ২৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। 

বাংলাদেশ ১৯৭৩ সাল থেকে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু করে। প্রথম বাজার ছিল যুক্তরাজ্য। তখন ১ হাজার ৭০০ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যকরণের উদ্দেশে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তাজা শাকসবজি, ফলমূল, পান ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের একমাত্র সংগঠন। বর্তমানে এ সংস্থার ৫শ’ সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন নিয়মিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাজা ফল ও সবজি রপ্তানি করছেন। 

বাংলাদেশ থেকে নানা ধরনের ফলমূল ও সবজি রপ্তানি হয়ে থাকে। এশিয়ান ফল, সবজি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। করলা, বেগুন, লাউ, ঢ্যাঁড়শ, বরবটি, কাঁচামরিচ, কাঁচা পেঁপে, পালংশাক, পটল, কাঁচকলা, মুলা, ঝিঙা, কচু, চিচিঙ্গা, কচুর লতি, মিষ্টি আলু, চালকুমড়া, তেজপাতা, কলার ফুল ও ফুলকপিসহ আরও অনেক সবজি এবং কাঁঠাল, আনারস, লিচু, আম, কামরাঙা, ড্রাগন ফল, আমড়া, খেজুর, আমলকি, জলপাই ও বিভিন্ন জাতের লেবু রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। পানপাতা, ধনেপাতা ও অনুরূপ পণ্যও বিদেশে যাচ্ছে। 

যদিও ২০১২ সালের দিকে ইউরোপ ছিল সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। ইইউভিত্তিক অঞ্চলগুলো বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক অঞ্চল। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও কুয়েতে সর্বাধিক পরিমাণে তাজা শাকসবজি ও ফল রপ্তানি করা হয়। তবে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ এখনও অল্প পরিমাণে তাজা সবজি ও ফল রপ্তানি করছে। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে মূলত কানাডায় বাংলাদেশের শাকসবজি রপ্তানি হয়। 

আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী উন্নতমানের শাকসবজি, ফলমূল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে এবং রপ্তানি বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, কৃষক ও উদ্যানচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। এতে গ্রামীণ আয় বাড়ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। 

সম্প্রতি পার্বত্য বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাহাড়ি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে উদ্যোক্তা ও চাষিদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আম, আনারস, কমলা, কলা, কফি, কাঁঠাল, কাজুবাদাম, ড্রাগন ফল ও পেঁপেসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। তাজা ফলমূলের পাশাপাশি শুকনো ফল, ফলের চিপস ও জুস প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমেও নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। 

তবে ফল ও সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। ভরা মৌসুমে রপ্তানির জন্য পর্যাপ্ত কার্গো সুবিধা নেই। প্রতিযোগী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের তুলনায় বিদেশি উড়োজাহাজের ভাড়া বেশি। উৎপাদন পর্যায় থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত কার্যকর শীতল চেইন ব্যবস্থা না থাকায় পণ্যের সতেজতা কমে যায়। পচনশীল পণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষ এয়ার কার্গো উড়োজাহাজও নেই। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং উপকরণের শিল্প এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। 

বর্তমানে আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রয়োজন ৬০০-৭০০ টন পণ্য। কিন্তু দৈনিক গড় রপ্তানি হচ্ছে মাত্র ২০০-২৫০ টন। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও মূলত জাতিগত বা এথনিক বাজারকেন্দ্রিক। বিশ্বের উচ্চমূল্যের বাজারে এখনও শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফাইটোস্যানিটারি ও মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধান আরোপ করেছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রেও বড় সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় ইরাডিকেশন ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি শুরু করা যায়নি। তবে এ বিষয়ে কাজ চলছে। 

বাংলাদেশের কৃষিখাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হর্টিকালচার। ফল, সবজি, ফুল, মসলা ও ওষুধি গাছের চাষ এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। উর্বর মাটি, অনুকূল জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে দেশে হর্টিকালচার ফসলের উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ফল ও সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টনের বেশি ফল উৎপাদিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১০০-১৫০ কোটি টাকার ফল ও সবজি রপ্তানি করা হচ্ছে। 

বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানি বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে হলে গুণগত মান উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি। গ্লোবাল গ্যাপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানদণ্ড মেনে উৎপাদন বাড়াতে হবে। ˆজব ও নিরাপদ ফল উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে এ খাতকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু দেশীয় চাহিদাই পূরণ করবে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। 

[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত