ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় রোববার দুপুরে দেখা গেল সবুজ হোসেনকে।বয়স পঞ্চাশ ছুঁয়েছে। জীর্ণ পাঞ্জাবি ঘামে ভিজে গায়ে লেপ্টে আছে। দিনে দশ ঘণ্টার বেশি রিকশা চালান তিনি। কেমন আছেন, জানতে চাইলে বললেন, ‘দিন যত যাইতেছে, কষ্ট বাড়তেছে। বয়স হইছে তো। গরম আর সহ্য হয় না।’
সবুজের থেমে যাওয়া বা অবসরের কোনো সুযোগ নেই। রিকশা না চালালে ইনকাম হবে না।সংসারের জন্য চাল-ডাল নুন কেনা হবে না।তাই গরম যতই আগুন ছড়াক, সড়কে নামতেই হয়। রিকশা টানতেই হয়।
সবুজের মতোই গল্প ঢাকার প্রায় ১২ লাখ রিকশাচালকের। নতুন এক গবেষণা বলছে, এই পেশাজীবীদের শরীর ইতিমধ্যে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে। গবেষণাটি যৌথভাবে করেছে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান ডিয়েগো, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়।
গবেষণায় ঢাকার ১০০ জন পুরুষ রিকশাচালকের ওপরে বাস্তব সময়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাদের হাতে ওয়্যারেবল সেন্সর পরানো হয়, যা শরীরের তাপমাত্রা, হৃৎস্পন্দন, ঘামের প্রতিক্রিয়া ও নড়াচড়ার তথ্য নিয়েছে।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য এসিএম অন ইন্টারঅ্যাকটিভ, মোবাইল, ওয়্যারেবল অ্যান্ড ইউবিকুইটাস টেকনোলজিস’-এ।
গবেষণায় অংশ নেওয়া রিকশাচালকদের গড় বয়স ৪৮ বছর। তারা দিনে গড়ে ১০ ঘণ্টা কাজ করেন। প্রতিদিনের গড় আয় প্রায় ৭৩৭ টাকা। প্রতিটি রিকশাযাত্রার গড় সময় ১৮ দশমিক ৯ মিনিট।
তবে এই আয়ের বিনিময়ে দিতে হচ্ছে চরম মূল্য। অধিকাংশ রিকশাচালকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। বলা যায় পঞ্চম শ্রেণির নিচে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ জনের ধূমপানের অভ্যাস ছিল। ১২ জন হৃদরোগ–সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলেছেন। আর ৫১ জন নানা শারীরিক ব্যথায় ভোগেন।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাসফিকুর রহমান বলেন, ‘বৃহত্তর অর্থে, আমরা মানুষের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতার একটি “ডিজিটাল টুইন” বা ভার্চ্যুয়াল প্রতিরূপ তৈরি করতে চাই। রিকশাচালকদের নিয়ে এই গবেষণা সেই বৃহৎ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ অবস্থায় মানুষের ত্বকের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় এটি ৩৫ ডিগ্রির ওপরে থাকলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়লে রিকশাচালকদের হৃদযন্ত্রের চাপ বাড়ে। বয়স্ক চালকদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি।
শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, তাপমাত্রা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে চরম গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। যার অর্থনৈতিক ক্ষতি ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
অধিকাংশ রিকশাচালকই সপ্তাহে সাত দিন কাজ করেন। গবেষকেরা দেখেছেন, বর্তমানে অংশ নেওয়া রিকশাচালকদের ৩২ শতাংশ উচ্চ তাপঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৬-৩০ সালের মধ্যে তা ৩৭ শতাংশে এবং শতাব্দীর শেষে ৫৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
রোববার পল্টন মোড়ে কথা হয় রিকশাচালক মোস্তফার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দিনে যা আয় করি, তাতে শুধু পেট চলে। অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানোর টাকা নেই। গরমে শরীর খারাপ হলে তাও রিকশা চালাতে হয়।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সুলতান উদ্দিন খান বলেন, ‘রিকশাচালকেরা পানিস্বল্পতায় ভোগেন, বিশেষ করে দুপুরের রোদে। কোথাও পানি পান করবেন বা টয়লেট সারবেন, সেই ব্যবস্থাই নেই ঢাকায়। কিন্তু সিটি করপোরেশন এসব রিকশাচালকদের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন ফি নেয়।’
গবেষকদের মতে, এটি শুধু ‘গরম লাগা’র বিষয় নয়; এটি পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকির স্পষ্ট সংকেত। ভবিষ্যতে নগর পরিকল্পনা, কর্মঘণ্টা, বিশ্রামব্যবস্থা ও তাপ–সহনশীল অবকাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় রোববার দুপুরে দেখা গেল সবুজ হোসেনকে।বয়স পঞ্চাশ ছুঁয়েছে। জীর্ণ পাঞ্জাবি ঘামে ভিজে গায়ে লেপ্টে আছে। দিনে দশ ঘণ্টার বেশি রিকশা চালান তিনি। কেমন আছেন, জানতে চাইলে বললেন, ‘দিন যত যাইতেছে, কষ্ট বাড়তেছে। বয়স হইছে তো। গরম আর সহ্য হয় না।’
সবুজের থেমে যাওয়া বা অবসরের কোনো সুযোগ নেই। রিকশা না চালালে ইনকাম হবে না।সংসারের জন্য চাল-ডাল নুন কেনা হবে না।তাই গরম যতই আগুন ছড়াক, সড়কে নামতেই হয়। রিকশা টানতেই হয়।
সবুজের মতোই গল্প ঢাকার প্রায় ১২ লাখ রিকশাচালকের। নতুন এক গবেষণা বলছে, এই পেশাজীবীদের শরীর ইতিমধ্যে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে। গবেষণাটি যৌথভাবে করেছে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান ডিয়েগো, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়।
গবেষণায় ঢাকার ১০০ জন পুরুষ রিকশাচালকের ওপরে বাস্তব সময়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাদের হাতে ওয়্যারেবল সেন্সর পরানো হয়, যা শরীরের তাপমাত্রা, হৃৎস্পন্দন, ঘামের প্রতিক্রিয়া ও নড়াচড়ার তথ্য নিয়েছে।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য এসিএম অন ইন্টারঅ্যাকটিভ, মোবাইল, ওয়্যারেবল অ্যান্ড ইউবিকুইটাস টেকনোলজিস’-এ।
গবেষণায় অংশ নেওয়া রিকশাচালকদের গড় বয়স ৪৮ বছর। তারা দিনে গড়ে ১০ ঘণ্টা কাজ করেন। প্রতিদিনের গড় আয় প্রায় ৭৩৭ টাকা। প্রতিটি রিকশাযাত্রার গড় সময় ১৮ দশমিক ৯ মিনিট।
তবে এই আয়ের বিনিময়ে দিতে হচ্ছে চরম মূল্য। অধিকাংশ রিকশাচালকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। বলা যায় পঞ্চম শ্রেণির নিচে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ জনের ধূমপানের অভ্যাস ছিল। ১২ জন হৃদরোগ–সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলেছেন। আর ৫১ জন নানা শারীরিক ব্যথায় ভোগেন।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাসফিকুর রহমান বলেন, ‘বৃহত্তর অর্থে, আমরা মানুষের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতার একটি “ডিজিটাল টুইন” বা ভার্চ্যুয়াল প্রতিরূপ তৈরি করতে চাই। রিকশাচালকদের নিয়ে এই গবেষণা সেই বৃহৎ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ অবস্থায় মানুষের ত্বকের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় এটি ৩৫ ডিগ্রির ওপরে থাকলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়লে রিকশাচালকদের হৃদযন্ত্রের চাপ বাড়ে। বয়স্ক চালকদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি।
শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, তাপমাত্রা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে চরম গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। যার অর্থনৈতিক ক্ষতি ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
অধিকাংশ রিকশাচালকই সপ্তাহে সাত দিন কাজ করেন। গবেষকেরা দেখেছেন, বর্তমানে অংশ নেওয়া রিকশাচালকদের ৩২ শতাংশ উচ্চ তাপঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৬-৩০ সালের মধ্যে তা ৩৭ শতাংশে এবং শতাব্দীর শেষে ৫৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
রোববার পল্টন মোড়ে কথা হয় রিকশাচালক মোস্তফার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দিনে যা আয় করি, তাতে শুধু পেট চলে। অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানোর টাকা নেই। গরমে শরীর খারাপ হলে তাও রিকশা চালাতে হয়।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সুলতান উদ্দিন খান বলেন, ‘রিকশাচালকেরা পানিস্বল্পতায় ভোগেন, বিশেষ করে দুপুরের রোদে। কোথাও পানি পান করবেন বা টয়লেট সারবেন, সেই ব্যবস্থাই নেই ঢাকায়। কিন্তু সিটি করপোরেশন এসব রিকশাচালকদের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন ফি নেয়।’
গবেষকদের মতে, এটি শুধু ‘গরম লাগা’র বিষয় নয়; এটি পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকির স্পষ্ট সংকেত। ভবিষ্যতে নগর পরিকল্পনা, কর্মঘণ্টা, বিশ্রামব্যবস্থা ও তাপ–সহনশীল অবকাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

আপনার মতামত লিখুন