সংবাদ

বাংলাদেশে কোনো নারীর কি ফাঁসি হয়েছে?


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ৭ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ পিএম

বাংলাদেশে কোনো নারীর কি ফাঁসি হয়েছে?
প্রতীকী ছবি।

দেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরে শতাধিক নারী অপরাধীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু কোনো নারীকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়নি। ফাঁসি থেকে বাঁচতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনও করতে হয়নি- কিংবা এমন দৃষ্টান্তও নেই।

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডকে সবচেয়ে কঠোর শাস্তি হিসেবে ধরা হলেও, দেশের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়নি। অথচ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৯৫ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি রয়েছেন।

সম্প্রতি রামিসা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি স্বপ্না আক্তার। এই রায় কার্যকর হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই হবে প্রথম কোনো নারীর ফাঁসি। এর আগে নিম্ন আদালত থেকে বহু নারীর ফাঁসির আদেশ এলেও তা কার্যকর হয়নি।

দেশে নারী আসামিদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে। প্রধান কারণ, উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে গেলে নারীদের ফাঁসির দণ্ড প্রায়শই কমিয়ে যাবজ্জীবন বা আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করা হয়।

শিল্পপতি লতিফুর রহমানের কন্যা শাজনীন হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এস্তেমা খাতুন মিনু ও পুলিশ কর্মকর্তা বাবা-মা হত্যার দায়ে ঐশী রহমানের ফাঁসির দণ্ড মওকুফ করে সর্বোচ্চ আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়।

ফাঁসির আসামিরা চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো নারী ফাঁসির আসামির ক্ষমা আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছায়নি। কারা কর্মকর্তাদের মতে, নারীদের মামলার কাগজপত্র সাধারণত আপিল বিভাগে আটকে থাকে। ফলে প্রক্রিয়াটি আর এগোয় না।

২০০৭ সালে কাশিমপুরে দেশের একমাত্র মহিলা কারাগার উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু দেশের অন্যান্য কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ থাকলেও সেখানে কোনো ফাঁসির মঞ্চ নির্মাণ করা হয়নি। সাবেক আইজি প্রিজন্স জাকির হাসান জানিয়েছিলেন, অতীতে কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকরের রেকর্ড না থাকায় এটি তৈরি করা হয়নি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নারীর ফাঁসি কার্যকরের খবর পাওয়া গেলেও বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। দেশের আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। বর্তমানে মিন্নির জীবন কাটছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে।

এছাড়া ২০১৯ সালের আলোচিত ফেনীর সোনাগাজী মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কামরুন্নাহার মণি ও উম্মে সুলতানা পপি কারাগারে রয়েছেন। 

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, ‘রায় হলেও মামলা শেষ হয় না। প্রথমে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়, তারপর আপিলের সুযোগ থাকে। সেখানে রায় পরিবর্তন না হলে উচ্চ আদালতে যায়। আপিলে অনেক সময় সাজা কমে, আবার আসামির খালাসও হয়ে যায়’।

নারী আসামিদের মামলার বেশিরভাগের কাগজপত্র আদালতের আপিল বিভাগে আটকে থাকায় রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন পাঠানোর সুযোগই আসে না।

কনডেম সেল: কারাগারে যেখানে ফাঁসির আসামিদের রাখা হয়, সেটাই কনডেম সেল। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদিদের জন্য আলাদা ভবন রয়েছে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কারা কর্মকর্তারা একে বলছেন, ‘জেলের ভেতর আরেকটি জেল’। নারী আসামিদের দিন কাটে বই পড়ে, নামাজ-কালাম পড়ে। এর বাইরে অন্য কোনো কাজ করতে হয় না তাদের। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সমাজে নারীদের প্রতি সহানুভূতি বা লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার প্রতি সংবেদনশীলতা ফাঁসি কার্যকরে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীকে ‘দুর্বল’, ‘আবেগপ্রবণ’ ও পুরুষের দ্বারা প্রভাবিত হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। জল্লাদের মঞ্চে একজন নারীর ঝুলন্ত দেহ দেখার ধারণাটি সমাজের গভীরে প্রোথিত ‘নারীত্বের’ ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপও একটি কারণ। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র হয়, যা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব ফেলে। ফলে ফাঁসি কার্যকরের পরিবর্তে বিকল্প শাস্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে আদালত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার রেকর্ড আছে ইরানের। ২০২৪ সালে অন্তত ৩১ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ জন নারীকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৭ জুন ২০২৬


বাংলাদেশে কোনো নারীর কি ফাঁসি হয়েছে?

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬

featured Image

দেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরে শতাধিক নারী অপরাধীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু কোনো নারীকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়নি। ফাঁসি থেকে বাঁচতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনও করতে হয়নি- কিংবা এমন দৃষ্টান্তও নেই।

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডকে সবচেয়ে কঠোর শাস্তি হিসেবে ধরা হলেও, দেশের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়নি। অথচ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৯৫ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি রয়েছেন।

সম্প্রতি রামিসা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি স্বপ্না আক্তার। এই রায় কার্যকর হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই হবে প্রথম কোনো নারীর ফাঁসি। এর আগে নিম্ন আদালত থেকে বহু নারীর ফাঁসির আদেশ এলেও তা কার্যকর হয়নি।

দেশে নারী আসামিদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে। প্রধান কারণ, উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে গেলে নারীদের ফাঁসির দণ্ড প্রায়শই কমিয়ে যাবজ্জীবন বা আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করা হয়।

শিল্পপতি লতিফুর রহমানের কন্যা শাজনীন হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এস্তেমা খাতুন মিনু ও পুলিশ কর্মকর্তা বাবা-মা হত্যার দায়ে ঐশী রহমানের ফাঁসির দণ্ড মওকুফ করে সর্বোচ্চ আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়।

ফাঁসির আসামিরা চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো নারী ফাঁসির আসামির ক্ষমা আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছায়নি। কারা কর্মকর্তাদের মতে, নারীদের মামলার কাগজপত্র সাধারণত আপিল বিভাগে আটকে থাকে। ফলে প্রক্রিয়াটি আর এগোয় না।

২০০৭ সালে কাশিমপুরে দেশের একমাত্র মহিলা কারাগার উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু দেশের অন্যান্য কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ থাকলেও সেখানে কোনো ফাঁসির মঞ্চ নির্মাণ করা হয়নি। সাবেক আইজি প্রিজন্স জাকির হাসান জানিয়েছিলেন, অতীতে কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকরের রেকর্ড না থাকায় এটি তৈরি করা হয়নি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নারীর ফাঁসি কার্যকরের খবর পাওয়া গেলেও বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। দেশের আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। বর্তমানে মিন্নির জীবন কাটছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে।

এছাড়া ২০১৯ সালের আলোচিত ফেনীর সোনাগাজী মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কামরুন্নাহার মণি ও উম্মে সুলতানা পপি কারাগারে রয়েছেন। 

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, ‘রায় হলেও মামলা শেষ হয় না। প্রথমে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়, তারপর আপিলের সুযোগ থাকে। সেখানে রায় পরিবর্তন না হলে উচ্চ আদালতে যায়। আপিলে অনেক সময় সাজা কমে, আবার আসামির খালাসও হয়ে যায়’।

নারী আসামিদের মামলার বেশিরভাগের কাগজপত্র আদালতের আপিল বিভাগে আটকে থাকায় রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন পাঠানোর সুযোগই আসে না।

কনডেম সেল: কারাগারে যেখানে ফাঁসির আসামিদের রাখা হয়, সেটাই কনডেম সেল। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদিদের জন্য আলাদা ভবন রয়েছে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কারা কর্মকর্তারা একে বলছেন, ‘জেলের ভেতর আরেকটি জেল’। নারী আসামিদের দিন কাটে বই পড়ে, নামাজ-কালাম পড়ে। এর বাইরে অন্য কোনো কাজ করতে হয় না তাদের। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সমাজে নারীদের প্রতি সহানুভূতি বা লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার প্রতি সংবেদনশীলতা ফাঁসি কার্যকরে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীকে ‘দুর্বল’, ‘আবেগপ্রবণ’ ও পুরুষের দ্বারা প্রভাবিত হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। জল্লাদের মঞ্চে একজন নারীর ঝুলন্ত দেহ দেখার ধারণাটি সমাজের গভীরে প্রোথিত ‘নারীত্বের’ ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপও একটি কারণ। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র হয়, যা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব ফেলে। ফলে ফাঁসি কার্যকরের পরিবর্তে বিকল্প শাস্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে আদালত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার রেকর্ড আছে ইরানের। ২০২৪ সালে অন্তত ৩১ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ জন নারীকে ফাঁসি দেওয়া হয়।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত