সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য অনেক আশ্চর্য জিনিস সৃষ্টি করেছেন— আকাশ, সমুদ্র, প্রেম, স্মৃতি, বিস্মৃতি এবং অবশ্যই ঘুম। তবে মানুষের দুর্ভাগ্য হলো, সে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনে করে, সেটাই সবচেয়ে বেশি হারিয়ে ফেলে। যেমন সুখের দিনে ঘুম আসে, আর দুঃসময়ে আসে দর্শন। যে রাতে মানুষের গভীর নিদ্রায় থাকার কথা, সেই রাতেই হঠাৎ সে হয়ে ওঠে সক্রেটিস, নীৎশে কিংবা নাম না-জানা কোনো গৃহপালিত দার্শনিক।
রাতেরও একটি আলাদা রাষ্ট্র আছে। দিনের পৃথিবীতে তার কোনো মন্ত্রণালয় নেই, কোনো সংসদ নেই, কোনো প্রশাসনিক কাঠামোও নেই। কিন্তু গভীর নিশীথে সে নিঃশব্দে ক্ষমতা গ্রহণ করে। তখন পৃথিবীর সকল কোলাহল পদত্যাগ করে, যুক্তি অবসরে যায়, আর মানুষের কল্পনা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বসে। সেই রাষ্ট্রে আইন খুবই অদ্ভুত। সেখানে একটি সন্দেহ হাজারটি সত্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, একটি অপবাদ হাজারটি অর্জনের চেয়ে বেশি দীর্ঘজীবী, আর একটি ভুল বোঝাবুঝি কখনো কখনো পুরো জীবনকেই জিম্মি করে রাখতে পারে।
আমি আজকাল প্রায়ই সেই রাষ্ট্রের একজন অনিচ্ছুক নাগরিক হয়ে যাই।
চোখ বন্ধ করি ঘুমের আশায়, কিন্তু ঘুম যেন আধুনিক আমলার মতো—অত্যন্ত প্রয়োজনের সময় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং চোখ বন্ধ করলেই খুলে যায় এক অদৃশ্য আদালত। সেখানে বিচার চলছে, অভিযোগপত্র পড়া হচ্ছে, সাক্ষী হাজির হচ্ছে, রায় লেখা হচ্ছে। শুধু মজার বিষয় হলো—আমি ছাড়া আর কেউ বাস্তবে উপস্থিত নেই। বিচারক আমার কল্পনা, উকিল আমার ভয়, সাক্ষী আমার স্মৃতি এবং অভিযুক্তও আমি নিজেই।
এই আদালতে সত্যের অবস্থা অনেকটা সেই ভদ্র মানুষের মতো, যে সভায় উপস্থিত থাকলেও কথা বলার সুযোগ পায় না। অন্যদিকে মিথ্যা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। সে বুক ফুলিয়ে হাঁটে, গলা খাঁকারি দিয়ে বক্তব্য দেয় এবং এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে যেন মহাবিশ্বের যাবতীয় সত্যের একমাত্র লাইসেন্স তার কাছেই সংরক্ষিত।
রাত্রির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কার্যক্রমও জমে ওঠে। মনে হয়, অসংখ্য অদৃশ্য মানুষ আমাকে অনুসরণ করছে। কেউ অভিযোগ করছে, কেউ ব্যাখ্যা চাইছে, কেউ আবার এমন সব অপরাধের দায় চাপাচ্ছে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমিই অবগত নই। আমি দৌড়াতে থাকি। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ বাস্তব শত্রুর চেয়ে কল্পিত শত্রুর কাছ থেকেই বেশি পালায়।
এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। বাইরে পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে, অথচ ভেতরে যেন মহাযুদ্ধ চলছে। জানালার ওপারে নীরবতা, কিন্তু মনের ভেতর অবিরাম শোরগোল। তখন উপলব্ধি হয়—মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কখনো অন্য মানুষের সঙ্গে নয়; নিজের ভেতরের অদৃশ্য প্রতিপক্ষের সঙ্গেই।
বর্তমান সময়ে এই অভিজ্ঞতা আরও তীব্র। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সত্য ধীরে হাঁটে আর গুজব আলোর গতিতে ছুটে চলে। সামাজিক যোগাযোগের বিস্তৃত জগতে একটি মিথ্যা মুহূর্তেই হাজার মানুষের দরজায় পৌঁছে যায়, অথচ সত্য তখনও জুতোর ফিতা বাঁধতে ব্যস্ত থাকে। ফলে অপবাদ এখন আর কেবল শব্দ নয়; এটি এক সামাজিক প্রযুক্তি, এক মানসিক অস্ত্র, যা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নিঃশব্দে ক্ষয় করে।
কিন্তু দার্শনিক সত্যটি হলো—মানুষকে যতটা না অন্যেরা বিচার করে, তার চেয়ে অনেক বেশি বিচার করে সে নিজেই। অন্যের অভিযোগ কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু নিজের মনে গড়ে ওঠা আদালত বছরের পর বছর চলতে পারে। সেই আদালতে আপিলের সুযোগ নেই, জামিনের ব্যবস্থাও নেই।
এই অবস্থায় ঘুম আর কেবল শারীরিক প্রয়োজন থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক গভীর অস্তিত্ববাদী মুক্তি। তখন নিদ্রা মানে শরীরের বিশ্রাম নয়, বরং চিন্তার অবসান। এমন একটি আশ্রয়, যেখানে কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয় না, কোনো অভিযোগের জবাব লিখতে হয় না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একটি বিষয় বুঝতে শেখে—পৃথিবীর সব মানুষের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কেউ আপনাকে ভুল বুঝবেই, কেউ আপনাকে অপছন্দ করবেই, কেউ আপনার নীরবতার মধ্যেও ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করবেই। এ যেন মানবসভ্যতার এক প্রাচীন বিনোদন।
তাই হয়তো প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো প্রতিটি যুদ্ধে অংশ না নেয়া। প্রতিটি পাথরের জবাবে আরেকটি পাথর ছুড়ে না মারা। কারণ সব যুদ্ধ জয় করা যায় না, আবার সব যুদ্ধ জয় করাও প্রয়োজন হয় না।
রাত যত গভীর হয়, এই উপলব্ধিও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয়, শান্তি আসলে কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়। শান্তি হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেয়ার শিল্প, নিজের সত্যকে ধারণ করার সাহস এবং পৃথিবীর সমস্ত ভুল ব্যাখ্যার মধ্যেও নিজের ভেতরের আলোটুকু অক্ষুণ্নœ রাখার ক্ষমতা।
ধীরে ধীরে রাত ফুরোয়। অদৃশ্য আদালতের বিচারক ক্লান্ত হন, অভিযোগকারীরা নীরব হয়ে যায়, ছায়াগুলোও সরে দাঁড়ায়। তখন মনে হয়, নিদ্রা আসলে ঘুমের অন্য নাম নয়; সে এক প্রকার ক্ষমা। নিজের প্রতি ক্ষমা, মানুষের প্রতি ক্ষমা, সময়ের প্রতি ক্ষমা। আর সেই ক্ষমার ভেতরেই মানুষ খুঁজে পায় তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়।
একটি এমন ঘুম, যেখানে কোনো অপবাদ নেই, কোনো তাড়া নেই, কোনো অদৃশ্য বিচারসভা নেই। আছে শুধু নীরবতা। আর সেই নীরবতার গভীরে, সমস্ত ক্লান্তি অতিক্রম করে, মানুষ আবার নতুন ভোরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা এখানেই—সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়, বরং কিছু প্রশ্নকে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে যেতে দেয়ার মধ্যে।
[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য অনেক আশ্চর্য জিনিস সৃষ্টি করেছেন— আকাশ, সমুদ্র, প্রেম, স্মৃতি, বিস্মৃতি এবং অবশ্যই ঘুম। তবে মানুষের দুর্ভাগ্য হলো, সে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনে করে, সেটাই সবচেয়ে বেশি হারিয়ে ফেলে। যেমন সুখের দিনে ঘুম আসে, আর দুঃসময়ে আসে দর্শন। যে রাতে মানুষের গভীর নিদ্রায় থাকার কথা, সেই রাতেই হঠাৎ সে হয়ে ওঠে সক্রেটিস, নীৎশে কিংবা নাম না-জানা কোনো গৃহপালিত দার্শনিক।
রাতেরও একটি আলাদা রাষ্ট্র আছে। দিনের পৃথিবীতে তার কোনো মন্ত্রণালয় নেই, কোনো সংসদ নেই, কোনো প্রশাসনিক কাঠামোও নেই। কিন্তু গভীর নিশীথে সে নিঃশব্দে ক্ষমতা গ্রহণ করে। তখন পৃথিবীর সকল কোলাহল পদত্যাগ করে, যুক্তি অবসরে যায়, আর মানুষের কল্পনা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বসে। সেই রাষ্ট্রে আইন খুবই অদ্ভুত। সেখানে একটি সন্দেহ হাজারটি সত্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, একটি অপবাদ হাজারটি অর্জনের চেয়ে বেশি দীর্ঘজীবী, আর একটি ভুল বোঝাবুঝি কখনো কখনো পুরো জীবনকেই জিম্মি করে রাখতে পারে।
আমি আজকাল প্রায়ই সেই রাষ্ট্রের একজন অনিচ্ছুক নাগরিক হয়ে যাই।
চোখ বন্ধ করি ঘুমের আশায়, কিন্তু ঘুম যেন আধুনিক আমলার মতো—অত্যন্ত প্রয়োজনের সময় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং চোখ বন্ধ করলেই খুলে যায় এক অদৃশ্য আদালত। সেখানে বিচার চলছে, অভিযোগপত্র পড়া হচ্ছে, সাক্ষী হাজির হচ্ছে, রায় লেখা হচ্ছে। শুধু মজার বিষয় হলো—আমি ছাড়া আর কেউ বাস্তবে উপস্থিত নেই। বিচারক আমার কল্পনা, উকিল আমার ভয়, সাক্ষী আমার স্মৃতি এবং অভিযুক্তও আমি নিজেই।
এই আদালতে সত্যের অবস্থা অনেকটা সেই ভদ্র মানুষের মতো, যে সভায় উপস্থিত থাকলেও কথা বলার সুযোগ পায় না। অন্যদিকে মিথ্যা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। সে বুক ফুলিয়ে হাঁটে, গলা খাঁকারি দিয়ে বক্তব্য দেয় এবং এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে যেন মহাবিশ্বের যাবতীয় সত্যের একমাত্র লাইসেন্স তার কাছেই সংরক্ষিত।
রাত্রির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কার্যক্রমও জমে ওঠে। মনে হয়, অসংখ্য অদৃশ্য মানুষ আমাকে অনুসরণ করছে। কেউ অভিযোগ করছে, কেউ ব্যাখ্যা চাইছে, কেউ আবার এমন সব অপরাধের দায় চাপাচ্ছে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমিই অবগত নই। আমি দৌড়াতে থাকি। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ বাস্তব শত্রুর চেয়ে কল্পিত শত্রুর কাছ থেকেই বেশি পালায়।
এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। বাইরে পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে, অথচ ভেতরে যেন মহাযুদ্ধ চলছে। জানালার ওপারে নীরবতা, কিন্তু মনের ভেতর অবিরাম শোরগোল। তখন উপলব্ধি হয়—মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কখনো অন্য মানুষের সঙ্গে নয়; নিজের ভেতরের অদৃশ্য প্রতিপক্ষের সঙ্গেই।
বর্তমান সময়ে এই অভিজ্ঞতা আরও তীব্র। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সত্য ধীরে হাঁটে আর গুজব আলোর গতিতে ছুটে চলে। সামাজিক যোগাযোগের বিস্তৃত জগতে একটি মিথ্যা মুহূর্তেই হাজার মানুষের দরজায় পৌঁছে যায়, অথচ সত্য তখনও জুতোর ফিতা বাঁধতে ব্যস্ত থাকে। ফলে অপবাদ এখন আর কেবল শব্দ নয়; এটি এক সামাজিক প্রযুক্তি, এক মানসিক অস্ত্র, যা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নিঃশব্দে ক্ষয় করে।
কিন্তু দার্শনিক সত্যটি হলো—মানুষকে যতটা না অন্যেরা বিচার করে, তার চেয়ে অনেক বেশি বিচার করে সে নিজেই। অন্যের অভিযোগ কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু নিজের মনে গড়ে ওঠা আদালত বছরের পর বছর চলতে পারে। সেই আদালতে আপিলের সুযোগ নেই, জামিনের ব্যবস্থাও নেই।
এই অবস্থায় ঘুম আর কেবল শারীরিক প্রয়োজন থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক গভীর অস্তিত্ববাদী মুক্তি। তখন নিদ্রা মানে শরীরের বিশ্রাম নয়, বরং চিন্তার অবসান। এমন একটি আশ্রয়, যেখানে কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয় না, কোনো অভিযোগের জবাব লিখতে হয় না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একটি বিষয় বুঝতে শেখে—পৃথিবীর সব মানুষের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কেউ আপনাকে ভুল বুঝবেই, কেউ আপনাকে অপছন্দ করবেই, কেউ আপনার নীরবতার মধ্যেও ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করবেই। এ যেন মানবসভ্যতার এক প্রাচীন বিনোদন।
তাই হয়তো প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো প্রতিটি যুদ্ধে অংশ না নেয়া। প্রতিটি পাথরের জবাবে আরেকটি পাথর ছুড়ে না মারা। কারণ সব যুদ্ধ জয় করা যায় না, আবার সব যুদ্ধ জয় করাও প্রয়োজন হয় না।
রাত যত গভীর হয়, এই উপলব্ধিও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয়, শান্তি আসলে কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়। শান্তি হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেয়ার শিল্প, নিজের সত্যকে ধারণ করার সাহস এবং পৃথিবীর সমস্ত ভুল ব্যাখ্যার মধ্যেও নিজের ভেতরের আলোটুকু অক্ষুণ্নœ রাখার ক্ষমতা।
ধীরে ধীরে রাত ফুরোয়। অদৃশ্য আদালতের বিচারক ক্লান্ত হন, অভিযোগকারীরা নীরব হয়ে যায়, ছায়াগুলোও সরে দাঁড়ায়। তখন মনে হয়, নিদ্রা আসলে ঘুমের অন্য নাম নয়; সে এক প্রকার ক্ষমা। নিজের প্রতি ক্ষমা, মানুষের প্রতি ক্ষমা, সময়ের প্রতি ক্ষমা। আর সেই ক্ষমার ভেতরেই মানুষ খুঁজে পায় তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়।
একটি এমন ঘুম, যেখানে কোনো অপবাদ নেই, কোনো তাড়া নেই, কোনো অদৃশ্য বিচারসভা নেই। আছে শুধু নীরবতা। আর সেই নীরবতার গভীরে, সমস্ত ক্লান্তি অতিক্রম করে, মানুষ আবার নতুন ভোরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা এখানেই—সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়, বরং কিছু প্রশ্নকে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে যেতে দেয়ার মধ্যে।
[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

আপনার মতামত লিখুন