সংবাদ

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে অজান্তেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিডনি


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:২০ পিএম

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে অজান্তেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিডনি

বর্তমান সময়ে কিডনি বিকল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। চিকিসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিডনি রোগের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো রোগীদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশেরই এই দুটি সমস্যার একটি বা দুটিই বিদ্যমান থাকে।

বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১০ থেকে ১১ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগীদের মধ্যে ধীরে ধীরে অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে শুরু করে, যার মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই দুটি রোগ একসঙ্গে থাকলে কিডনির ক্ষতি আরও দ্রুত হয়, ফলে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন তাড়াতাড়ি দেখা দেয়। পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিওর ও স্ট্রোকের সম্ভাবনাও বহুগুণে বেড়ে যায়।

ডায়াবেটিসের ক্ষতিকর প্রভাব

টাইপ-১ ডায়াবেটিস তুলনামূলক কম দেখা যায় এবং এটি সাধারণত কম বয়সেই হয়। অন্যদিকে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে এবং এটি উচ্চ রক্তচাপ ও অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের সঙ্গে মিলে মেটাবলিক সিন্ড্রোম তৈরি করে। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে মূলত তিনটি বড় সমস্যা দেখা দেয়: হাত-পায়ের স্নায়ু দুর্বল হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের সঙ্গে প্রোটিন বের হওয়ার মাধ্যমে কিডনির ক্ষতি শুরু হওয়া, এবং চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। চিকিসকরা বলছেন, শুধু রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করলেই চলবে না, রক্তনালিতে চর্বি জমার ঝুঁকিও কমাতে হবে সামগ্রিকভাবে।

উচ্চ রক্তচাপের অদৃশ্য বিপদ

উচ্চ রক্তচাপ একাই কিডনি, চোখ ও হৃদযন্ত্রের জন্য আলাদা একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বংশগত প্রবণতা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ এবং মানসিক চাপ এর প্রধান কারণ। ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ যুক্ত হলে কিডনির ক্ষতি দ্বিগুণ হারে বাড়তে থাকে। অনেক সময় কিডনি রোগ শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরই উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে, যা মূলত কিডনি বিকল হওয়ার একটি লক্ষণ।

তিন রোগ একসঙ্গে দেখা দিলে

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অবহেলা করলে ক্রনিক কিডনি রোগ অতি দ্রুত শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। এই ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ অত্যাবশ্যক। কম বয়সে এই রোগগুলো দেখা দিলে আয়ু ও কর্মক্ষমতা উভয়ই মারাত্মকভাবে কমে যায়। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রনিক কিডনি রোগীর সংখ্যা ভয়াবহ গতিতে বাড়ছে।

প্রতিরোধে কী করণীয়

৩৫ বছরের বেশি বয়সি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত মেটাবলিক স্ক্রিনিং করানো উচিত। বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, লিপিড প্রোফাইল এবং কিডনি, হার্ট ও লিভারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা জরুরি। পরিবারে ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে, বা ঘন ঘন সংক্রমণ, অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা স্থূলতা থাকা নারীদের, বিশেষত যারা মা হওয়ার পরিকল্পনা করছেন, কম বয়স থেকেই স্ক্রিনিং করানো উচিত।

সুরক্ষার উপায়

শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি — পুরুষের কোমরের মাপ ৯০ সেন্টিমিটার এবং নারীর ৮০ সেন্টিমিটারের নিচে রাখা ভালো, এবং বিএমআই ২৩ থেকে ২৫-এর মধ্যে রাখা উচিত। খাবারে লবণ কমানো, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা প্রয়োজন। হৃদরোগে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে এবং কিডনির ক্ষতি ধীর করতে ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আধুনিক ওষুধ যেমন SGLT2 ইনহিবিটরস এবং GLP-1 রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে কিডনি সুরক্ষায় বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এর পাশাপাশি চিকিসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের ওষুধ নিয়মিত সেবন করা জরুরি।

 

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগের এই ত্রিমুখী ঝুঁকি থেকে বাঁচতে দরকার সমন্বিত সচেতনতা এবং সময়মতো রোগ নির্ণয়। নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনই হতে পারে এর সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬


ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে অজান্তেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিডনি

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬

featured Image

বর্তমান সময়ে কিডনি বিকল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। চিকিসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিডনি রোগের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো রোগীদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশেরই এই দুটি সমস্যার একটি বা দুটিই বিদ্যমান থাকে।

বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১০ থেকে ১১ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগীদের মধ্যে ধীরে ধীরে অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে শুরু করে, যার মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই দুটি রোগ একসঙ্গে থাকলে কিডনির ক্ষতি আরও দ্রুত হয়, ফলে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন তাড়াতাড়ি দেখা দেয়। পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিওর ও স্ট্রোকের সম্ভাবনাও বহুগুণে বেড়ে যায়।

ডায়াবেটিসের ক্ষতিকর প্রভাব

টাইপ-১ ডায়াবেটিস তুলনামূলক কম দেখা যায় এবং এটি সাধারণত কম বয়সেই হয়। অন্যদিকে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে এবং এটি উচ্চ রক্তচাপ ও অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের সঙ্গে মিলে মেটাবলিক সিন্ড্রোম তৈরি করে। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে মূলত তিনটি বড় সমস্যা দেখা দেয়: হাত-পায়ের স্নায়ু দুর্বল হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের সঙ্গে প্রোটিন বের হওয়ার মাধ্যমে কিডনির ক্ষতি শুরু হওয়া, এবং চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। চিকিসকরা বলছেন, শুধু রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করলেই চলবে না, রক্তনালিতে চর্বি জমার ঝুঁকিও কমাতে হবে সামগ্রিকভাবে।

উচ্চ রক্তচাপের অদৃশ্য বিপদ

উচ্চ রক্তচাপ একাই কিডনি, চোখ ও হৃদযন্ত্রের জন্য আলাদা একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বংশগত প্রবণতা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ এবং মানসিক চাপ এর প্রধান কারণ। ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ যুক্ত হলে কিডনির ক্ষতি দ্বিগুণ হারে বাড়তে থাকে। অনেক সময় কিডনি রোগ শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরই উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে, যা মূলত কিডনি বিকল হওয়ার একটি লক্ষণ।

তিন রোগ একসঙ্গে দেখা দিলে

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অবহেলা করলে ক্রনিক কিডনি রোগ অতি দ্রুত শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। এই ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ অত্যাবশ্যক। কম বয়সে এই রোগগুলো দেখা দিলে আয়ু ও কর্মক্ষমতা উভয়ই মারাত্মকভাবে কমে যায়। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রনিক কিডনি রোগীর সংখ্যা ভয়াবহ গতিতে বাড়ছে।

প্রতিরোধে কী করণীয়

৩৫ বছরের বেশি বয়সি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত মেটাবলিক স্ক্রিনিং করানো উচিত। বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, লিপিড প্রোফাইল এবং কিডনি, হার্ট ও লিভারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা জরুরি। পরিবারে ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে, বা ঘন ঘন সংক্রমণ, অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা স্থূলতা থাকা নারীদের, বিশেষত যারা মা হওয়ার পরিকল্পনা করছেন, কম বয়স থেকেই স্ক্রিনিং করানো উচিত।

সুরক্ষার উপায়

শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি — পুরুষের কোমরের মাপ ৯০ সেন্টিমিটার এবং নারীর ৮০ সেন্টিমিটারের নিচে রাখা ভালো, এবং বিএমআই ২৩ থেকে ২৫-এর মধ্যে রাখা উচিত। খাবারে লবণ কমানো, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা প্রয়োজন। হৃদরোগে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে এবং কিডনির ক্ষতি ধীর করতে ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আধুনিক ওষুধ যেমন SGLT2 ইনহিবিটরস এবং GLP-1 রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে কিডনি সুরক্ষায় বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এর পাশাপাশি চিকিসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের ওষুধ নিয়মিত সেবন করা জরুরি।

 

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগের এই ত্রিমুখী ঝুঁকি থেকে বাঁচতে দরকার সমন্বিত সচেতনতা এবং সময়মতো রোগ নির্ণয়। নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনই হতে পারে এর সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত