সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্নটি খুব সরল- একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষ থাকতে পারবেন না?
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছিল। ভিডিওতে তাকে হালকা বাতাসে আঁচল উড়িয়ে, ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’–এর সঙ্গে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে সমালোচনা, কটাক্ষ ও সামাজিক বিচারের বিষয়।
কিন্তু সেই সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে রিলস তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কেউ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ ব্যক্তিগত পরিবেশে ভিডিও করেছেন।
একটি রোমান্টিক গান এভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠবে- সম্ভবত গানটির গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবুও ১৯৮৭ সালের এক শ্রাবণে খুলনায় বসে গানটি লেখার সময় তা ভাবেননি। কিন্তু সময় কখনো কখনো শিল্পকে নতুন অর্থ দেয়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি এই শ্রাবণে হয়ে উঠেছে সামাজিক বিচারপ্রবণতার বিরুদ্ধে এক ধরনের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীক।
শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’
কুমিল্লার শিক্ষিকা লায়লা নূর পিংকি লিখেছেন, ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানের ভিডিও নিয়ে কটাক্ষের প্রসঙ্গ টেনে, শিক্ষকদের এই প্রতিবাদের ফলে মানুষ অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য কিছু নিয়ে কথা বলছে। তার ভাষায়, ডিজিটাল এই প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, অন্যায় হলে শিক্ষকেরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন।
পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা ফেরদৌস লিখেছেন, ‘এরপর শাড়ি পরেই দিব শিক্ষকের সেই ভাইরাল নাচ!’ আর চট্টগ্রামের মতলব বাজারের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিকের প্রশ্নটি আরও সরাসরি: ‘শিক্ষক যদি হাসেন, সমস্যা! সাজেন, সমস্যা! পরিপাটি থাকেন, সমস্যা! ভ্রমণে যান, সমস্যা! ছবি পোস্ট করেন, সমস্যা! তাহলে কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার অধিকারটাও জমা দিতে হবে?’
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে।
একজন শিক্ষক অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তার কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা, শালীনতা, পেশাগত সততা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো শিক্ষক আইন ভঙ্গ করলে, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করলে, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষকও আইনের ঊর্ধ্বে নন।
এখানেই মূল সমস্যাটি।
আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন এক ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করি, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছেও প্রত্যাশা করি না। শিক্ষক যেন সব সময় গম্ভীর থাকবেন, সব সময় সংযত থাকবেন, ব্যক্তিগত আনন্দ প্রকাশ করবেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করবেন না- এমন একটি অলিখিত সামাজিক বিধি যেন তৈরি হয়ে গেছে।
কিন্তু শিক্ষক কি কেবল শ্রেণিকক্ষের মানুষ?
একজন শিক্ষকেরও পরিবার আছে, বন্ধুত্ব আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে, সংস্কৃতিচর্চা আছে, আনন্দ আছে, ক্লান্তি আছে। তিনি গান শুনতে পারেন, ভ্রমণে যেতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন, সাজতে পারেন, হাসতে পারেন। এসবের কোনোটিই তাকে কম দায়িত্বশীল শিক্ষক বানায় না।
বরং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শেখাতে হলে শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য জানলেই হয় না। গান, অভিনয়, গল্প, আবৃত্তি, নৃত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড শিশুর কল্পনাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক বোধ গড়ে তোলে।
এই দ্বৈত মানসিকতা কেন?
একজন শিক্ষক যদি সংস্কৃতির মূল্য বোঝেন, সৃজনশীলতার চর্চা করেন এবং জীবনে আনন্দের জায়গা রাখেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদেরও আরও মানবিক, আত্মবিশ্বাসী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। একজন আনন্দহীন মানুষই যে ভালো শিক্ষক হবেন- এমন কোনো প্রমাণ নেই।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচার অনেক সময় আরও কঠোর হয়ে ওঠে।
একজন পুরুষ শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান করলে বা আনন্দের ভিডিও প্রকাশ করলে সেটিকে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষক একই কাজ করলে তার পোশাক, চুল, হাঁটা, হাসি কিংবা শরীরী ভাষা নিয়ে শুরু হয় নৈতিকতার আলোচনা।
একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় মন্তব্য, কটাক্ষ, চরিত্রহনন, এমনকি চাকরি হারানোর দাবি। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট কখনোই পুরো সমাজের মতামতকে প্রতিনিধিত্ব করে না।
কোনো সংবাদে যদি বলা হয়, ‘অভিভাবকদের ক্ষোভ’, ‘জনগণের দাবি’ বা ‘সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ’, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- সত্যিই কি সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা অভিযোগ করেছেন? লিখিত কোনো অভিযোগ আছে কি? অভিযোগের প্রকৃতি কী? নাকি কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ধীরে ধীরে ‘জনমত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?
বিউটি রাণী পাল হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নারী। তার ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কোনো বৈষম্য বা বিদ্বেষ হয়েছে কি না, সেটি প্রমাণ ও তদন্তের বিষয়। প্রমাণ ছাড়া কাউকে ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্য অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি কারও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তিনি সামাজিক বা পেশাগত চাপের মুখে পড়ছেন কি না, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না।
একই সঙ্গে প্রতিবাদের ভাষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যারা একজন নারী শিক্ষককে অপমান করেছেন, তাদের সমালোচনা করতে গিয়ে যদি পাল্টা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীকে একইভাবে অপমান করা হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না। এক ধরনের অসহিষ্ণুতার জবাব আরেক ধরনের অসহিষ্ণুতা দিয়ে দেওয়া যায় না।
প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ যেন আরেকটি নিপীড়নের ভাষা না হয়ে ওঠে।
তবে এই প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই যে, বহু শিক্ষক ও শিক্ষিকা নিজেদের স্বাভাবিক প্রকাশের জায়গাটি নতুন করে দাবি করেছেন।
লায়লা নূর পিংকির কথায়, ‘যেসব শিক্ষক কোনো দিন লজ্জায় ভিডিও দিতেন না, তাদের প্রতিভাও বিকশিত করে দিলেন।’ কথাটির মধ্যে রসিকতা আছে, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতাও আছে। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে আনন্দ প্রকাশ করার আগেও ভাবেন- কেউ কি তাকে বিচার করবে?
এটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।
একজন শিক্ষককে তার পেশাগত কাজের জন্য মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি শ্রেণিকক্ষে কেমন পড়ান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, দায়িত্ব কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, বিদ্যালয়ে তাঁর অবদান কী- এসব হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।
আরও বড় কথা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সামাজিক নজরদারির বস্তুতে পরিণত করা হলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। শিক্ষক সংকট, শিক্ষার মান, অবকাঠামোর ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা করার বদলে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি- কে কী পোশাক পরলেন, কীভাবে হাঁটলেন, কোন গানের সঙ্গে ভিডিও করলেন।
এটি কেবল একজন শিক্ষক বা একটি ভিডিওর সমস্যা নয়। এটি আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকারেরও প্রশ্ন।
আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রকাশ করতে ভয় পাবেন?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
একজন শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। পেশাগত দায়িত্বের জন্য একজন শিক্ষককে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তাকে সমাজের অনুমতি নিতে হবে- এমন কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারণা থাকতে পারে না।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সবার আছে, তেমনি অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্বও সবার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ভারসাম্য: স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্বও থাকবে; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু অপমান নয়; মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়।
একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?
উত্তরটি হওয়া উচিত- অবশ্যই।
শিক্ষকেরও হাসার অধিকার আছে। আনন্দ করার অধিকার আছে। গান শোনার অধিকার আছে। সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আছে। নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে বাঁচার অধিকার আছে।
একজন শিক্ষককে তার কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দিয়ে নয়, তার দীর্ঘদিনের কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক।
কারণ শিক্ষকরা রোবট নন।
নারীরাও নন।
তারা মানুষ।
আর একটি মানবিক সমাজের প্রথম শর্তই হলো- মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।
লেখক: সাংবাদিক। সংবাদ প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুলাই ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্নটি খুব সরল- একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষ থাকতে পারবেন না?
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছিল। ভিডিওতে তাকে হালকা বাতাসে আঁচল উড়িয়ে, ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’–এর সঙ্গে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে সমালোচনা, কটাক্ষ ও সামাজিক বিচারের বিষয়।
কিন্তু সেই সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে রিলস তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কেউ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ ব্যক্তিগত পরিবেশে ভিডিও করেছেন।
একটি রোমান্টিক গান এভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠবে- সম্ভবত গানটির গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবুও ১৯৮৭ সালের এক শ্রাবণে খুলনায় বসে গানটি লেখার সময় তা ভাবেননি। কিন্তু সময় কখনো কখনো শিল্পকে নতুন অর্থ দেয়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি এই শ্রাবণে হয়ে উঠেছে সামাজিক বিচারপ্রবণতার বিরুদ্ধে এক ধরনের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীক।
শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’
কুমিল্লার শিক্ষিকা লায়লা নূর পিংকি লিখেছেন, ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানের ভিডিও নিয়ে কটাক্ষের প্রসঙ্গ টেনে, শিক্ষকদের এই প্রতিবাদের ফলে মানুষ অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য কিছু নিয়ে কথা বলছে। তার ভাষায়, ডিজিটাল এই প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, অন্যায় হলে শিক্ষকেরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন।
পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা ফেরদৌস লিখেছেন, ‘এরপর শাড়ি পরেই দিব শিক্ষকের সেই ভাইরাল নাচ!’ আর চট্টগ্রামের মতলব বাজারের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিকের প্রশ্নটি আরও সরাসরি: ‘শিক্ষক যদি হাসেন, সমস্যা! সাজেন, সমস্যা! পরিপাটি থাকেন, সমস্যা! ভ্রমণে যান, সমস্যা! ছবি পোস্ট করেন, সমস্যা! তাহলে কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার অধিকারটাও জমা দিতে হবে?’
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে।
একজন শিক্ষক অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তার কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা, শালীনতা, পেশাগত সততা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো শিক্ষক আইন ভঙ্গ করলে, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করলে, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষকও আইনের ঊর্ধ্বে নন।
এখানেই মূল সমস্যাটি।
আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন এক ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করি, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছেও প্রত্যাশা করি না। শিক্ষক যেন সব সময় গম্ভীর থাকবেন, সব সময় সংযত থাকবেন, ব্যক্তিগত আনন্দ প্রকাশ করবেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করবেন না- এমন একটি অলিখিত সামাজিক বিধি যেন তৈরি হয়ে গেছে।
কিন্তু শিক্ষক কি কেবল শ্রেণিকক্ষের মানুষ?
একজন শিক্ষকেরও পরিবার আছে, বন্ধুত্ব আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে, সংস্কৃতিচর্চা আছে, আনন্দ আছে, ক্লান্তি আছে। তিনি গান শুনতে পারেন, ভ্রমণে যেতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন, সাজতে পারেন, হাসতে পারেন। এসবের কোনোটিই তাকে কম দায়িত্বশীল শিক্ষক বানায় না।
বরং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শেখাতে হলে শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য জানলেই হয় না। গান, অভিনয়, গল্প, আবৃত্তি, নৃত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড শিশুর কল্পনাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক বোধ গড়ে তোলে।
এই দ্বৈত মানসিকতা কেন?
একজন শিক্ষক যদি সংস্কৃতির মূল্য বোঝেন, সৃজনশীলতার চর্চা করেন এবং জীবনে আনন্দের জায়গা রাখেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদেরও আরও মানবিক, আত্মবিশ্বাসী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। একজন আনন্দহীন মানুষই যে ভালো শিক্ষক হবেন- এমন কোনো প্রমাণ নেই।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচার অনেক সময় আরও কঠোর হয়ে ওঠে।
একজন পুরুষ শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান করলে বা আনন্দের ভিডিও প্রকাশ করলে সেটিকে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষক একই কাজ করলে তার পোশাক, চুল, হাঁটা, হাসি কিংবা শরীরী ভাষা নিয়ে শুরু হয় নৈতিকতার আলোচনা।
একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় মন্তব্য, কটাক্ষ, চরিত্রহনন, এমনকি চাকরি হারানোর দাবি। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট কখনোই পুরো সমাজের মতামতকে প্রতিনিধিত্ব করে না।
কোনো সংবাদে যদি বলা হয়, ‘অভিভাবকদের ক্ষোভ’, ‘জনগণের দাবি’ বা ‘সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ’, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- সত্যিই কি সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা অভিযোগ করেছেন? লিখিত কোনো অভিযোগ আছে কি? অভিযোগের প্রকৃতি কী? নাকি কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ধীরে ধীরে ‘জনমত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?
বিউটি রাণী পাল হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নারী। তার ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কোনো বৈষম্য বা বিদ্বেষ হয়েছে কি না, সেটি প্রমাণ ও তদন্তের বিষয়। প্রমাণ ছাড়া কাউকে ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্য অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি কারও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তিনি সামাজিক বা পেশাগত চাপের মুখে পড়ছেন কি না, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না।
একই সঙ্গে প্রতিবাদের ভাষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যারা একজন নারী শিক্ষককে অপমান করেছেন, তাদের সমালোচনা করতে গিয়ে যদি পাল্টা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীকে একইভাবে অপমান করা হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না। এক ধরনের অসহিষ্ণুতার জবাব আরেক ধরনের অসহিষ্ণুতা দিয়ে দেওয়া যায় না।
প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ যেন আরেকটি নিপীড়নের ভাষা না হয়ে ওঠে।
তবে এই প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই যে, বহু শিক্ষক ও শিক্ষিকা নিজেদের স্বাভাবিক প্রকাশের জায়গাটি নতুন করে দাবি করেছেন।
লায়লা নূর পিংকির কথায়, ‘যেসব শিক্ষক কোনো দিন লজ্জায় ভিডিও দিতেন না, তাদের প্রতিভাও বিকশিত করে দিলেন।’ কথাটির মধ্যে রসিকতা আছে, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতাও আছে। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে আনন্দ প্রকাশ করার আগেও ভাবেন- কেউ কি তাকে বিচার করবে?
এটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।
একজন শিক্ষককে তার পেশাগত কাজের জন্য মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি শ্রেণিকক্ষে কেমন পড়ান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, দায়িত্ব কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, বিদ্যালয়ে তাঁর অবদান কী- এসব হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।
আরও বড় কথা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সামাজিক নজরদারির বস্তুতে পরিণত করা হলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। শিক্ষক সংকট, শিক্ষার মান, অবকাঠামোর ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা করার বদলে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি- কে কী পোশাক পরলেন, কীভাবে হাঁটলেন, কোন গানের সঙ্গে ভিডিও করলেন।
এটি কেবল একজন শিক্ষক বা একটি ভিডিওর সমস্যা নয়। এটি আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকারেরও প্রশ্ন।
আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রকাশ করতে ভয় পাবেন?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
একজন শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। পেশাগত দায়িত্বের জন্য একজন শিক্ষককে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তাকে সমাজের অনুমতি নিতে হবে- এমন কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারণা থাকতে পারে না।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সবার আছে, তেমনি অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্বও সবার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ভারসাম্য: স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্বও থাকবে; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু অপমান নয়; মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়।
একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?
উত্তরটি হওয়া উচিত- অবশ্যই।
শিক্ষকেরও হাসার অধিকার আছে। আনন্দ করার অধিকার আছে। গান শোনার অধিকার আছে। সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আছে। নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে বাঁচার অধিকার আছে।
একজন শিক্ষককে তার কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দিয়ে নয়, তার দীর্ঘদিনের কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক।
কারণ শিক্ষকরা রোবট নন।
নারীরাও নন।
তারা মানুষ।
আর একটি মানবিক সমাজের প্রথম শর্তই হলো- মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।
লেখক: সাংবাদিক। সংবাদ প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

আপনার মতামত লিখুন