সংবাদ

সরকারি ব্যাংকে এমডি 'মনোনয়নে' ও 'নিয়োগ' পদোন্নতিতে অভিন্ন নীতিমালা


আবুল কালাম আজাদ
আবুল কালাম আজাদ
প্রকাশ: ২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১১ এএম

সরকারি ব্যাংকে এমডি 'মনোনয়নে' ও 'নিয়োগ' পদোন্নতিতে অভিন্ন নীতিমালা

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোনয়ন হবে অভিন্ন নীতি মালায়।  একই প্রক্রিয়ায় উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও ব্যবস্থাপক (জিএম) মনোনয়নও দিবে সরকার।

এ লক্ষ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত নীতিমালা করেছে।  এই নীতিমালার আলোকে ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ছয়টি বিশেষায়িত ব্যাংক ও দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে মনোনয়ন ও পদোন্নতির জন্য অভিন্ন নীতিমালা ২০২৬, জারি করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ নীতিমালা জারি করে গত ২৬ জুলাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠিয়েছে।

এই নিয়ে সরকার তিন বছরের মধ্যে তিনবার ব্যাংকের এসব কর্মকর্তা মনোনয়ন, নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতিমালা পরিবর্তন করলো। তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০২৩ সালে নীতিমালা পরিবর্তন  করেছিলো। ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার এমডি, ডিএমডি ও জিএম নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতিমালা জারি করে চলতি বছরের জানুয়ারীতে।  বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এসে মাত্র ছয়মাসের ব্যবধানে পুনরায় এই নীতিমালা জারি করলো।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন কর্মকর্তা সংবাদকে নীতিমালা পরিবর্তনের বিষয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত সংবেদনশীল এজন্য ত্রুটি দেখা দিলে এবং সময়ের বিবর্তনে পরিবর্তন আনতে হয়। এ নীতিমালা জারির ক্ষেত্রেও তেমনটা হয়েছে। আগে এমডি থেকে জিএম পর্যন্ত পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত যাওয়া লাগতো। এখন এমডির নিচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিবে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি।  এটা ভালো পদক্ষেপ বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পর্যায়ের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতদিন প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন ভিন্ন নিয়মে পদোন্নতি দেওয়া হতো। এখন থেকে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের এমডি, ডিএমডি ও জিএম পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। এটা বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন তিনি।

বর্তমান নীতিমালায় পার্থক্য এমডির ক্ষেত্রে নিয়োগের স্থলে 'মনোনয়ন' শব্দ যোগ করা হয়েছে। এর আগে এমডি,  ডিএমডি ও জিএম নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগতো। এ নীতিমালার আলোকে শুধুমাত্র এমডি মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে। এছাড়া ডিএমডি ও জিএম পদোন্নতির ক্ষেত্রে মূখ্য সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি পদোন্নতি দিবে।

নতুন নীতিমালায় শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, সততা, নেতৃত্ব ও নম্বরভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

নীতিমালার আওতায় থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো হলো: সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) এবং বেসিক ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে: বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং আরেকটি বিশেষায়িত ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)।

নতুন নীতিমালায় পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির অভিজ্ঞতা, কর্মজীবনের রেকর্ড, পেশাগত দক্ষতা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতার বিস্তারিত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু চাকরির মেয়াদ নয়, একজন কর্মকর্তার সার্বিক কর্মদক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অবদানও মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে।

নীতিমালার আলোকে নম্বরভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির অভিজ্ঞতা, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), পেশাগত প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত ডিগ্রি বা সনদ, কর্মদক্ষতা এবং মৌখিক পরীক্ষার জন্য পৃথক নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

একজন প্রার্থী কত বছর চাকরি করেছেন, কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন কি না, প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন কি না, এসব বিষয়ও নম্বরের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে।

নতুন নীতিমালায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন পেশাগত যোগ্যতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ), কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএমএ), সার্টিফায়েড পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিপিএ), চার্টার্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ), এমবিএম, এমপিবি, সিসিএনএ, সিসা এবং 'অ্যাকচুয়াল সায়েন্সের' মতো পেশাগত ডিগ্রি বা সনদ থাকলে অতিরিক্ত নম্বর পাওয়া যাবে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তিত বাস্তবতায় শুধু প্রচলিত শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত দক্ষতাকেও মূল্যায়নের আওতায় আনতে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

নীতিমালায় শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি প্রার্থীর সততা, নৈতিকতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক ধারণাকেও মূল্যায়নের অংশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সম্প্রসারণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে নীতিমালা অনুযায়ী। 

নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি বা গুরুতর অভিযোগ থাকলে তা পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসবে। অর্থাৎ চাকরির রেকর্ডের পাশাপাশি সততা ও জবাবদিহিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এমডি, ডিএমডি ও জিএম প্রতিটি পদের জন্য পৃথক যোগ্যতা, চাকরির অভিজ্ঞতা এবং ন্যূনতম দায়িত্ব পালনের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। পদোন্নতির আগে প্রার্থীদের নথিপত্র যাচাই করা হবে। এরপর সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে।

এ জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রার্থীদের মূল্যায়ন করে পরিচালনা পর্ষদের কাছে সুপারিশ পাঠাবে। পরিচালনা পর্ষদ সেই সুপারিশের ভিত্তিতে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেবে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় নীতিমালায় নির্ধারিত নম্বর ও যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক থাকবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির জন্য ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করা হতো। কোথাও অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো, আবার কোথাও শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মৌখিক পরীক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। এতে একই ধরনের প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হওয়ার অভিযোগ ছিল।

নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে বলে মনে করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয় ছিল। নতুন নীতিমালা ফলে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিনির্ভরতার সুযোগ কমবে  এবং মেধা, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব তৈরির পথ আরও সুসংহত হবে। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬


সরকারি ব্যাংকে এমডি 'মনোনয়নে' ও 'নিয়োগ' পদোন্নতিতে অভিন্ন নীতিমালা

প্রকাশের তারিখ : ০২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোনয়ন হবে অভিন্ন নীতি মালায়।  একই প্রক্রিয়ায় উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও ব্যবস্থাপক (জিএম) মনোনয়নও দিবে সরকার।

এ লক্ষ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত নীতিমালা করেছে।  এই নীতিমালার আলোকে ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ছয়টি বিশেষায়িত ব্যাংক ও দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে মনোনয়ন ও পদোন্নতির জন্য অভিন্ন নীতিমালা ২০২৬, জারি করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ নীতিমালা জারি করে গত ২৬ জুলাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠিয়েছে।

এই নিয়ে সরকার তিন বছরের মধ্যে তিনবার ব্যাংকের এসব কর্মকর্তা মনোনয়ন, নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতিমালা পরিবর্তন করলো। তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০২৩ সালে নীতিমালা পরিবর্তন  করেছিলো। ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার এমডি, ডিএমডি ও জিএম নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতিমালা জারি করে চলতি বছরের জানুয়ারীতে।  বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এসে মাত্র ছয়মাসের ব্যবধানে পুনরায় এই নীতিমালা জারি করলো।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন কর্মকর্তা সংবাদকে নীতিমালা পরিবর্তনের বিষয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত সংবেদনশীল এজন্য ত্রুটি দেখা দিলে এবং সময়ের বিবর্তনে পরিবর্তন আনতে হয়। এ নীতিমালা জারির ক্ষেত্রেও তেমনটা হয়েছে। আগে এমডি থেকে জিএম পর্যন্ত পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত যাওয়া লাগতো। এখন এমডির নিচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিবে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি।  এটা ভালো পদক্ষেপ বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পর্যায়ের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতদিন প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন ভিন্ন নিয়মে পদোন্নতি দেওয়া হতো। এখন থেকে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের এমডি, ডিএমডি ও জিএম পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। এটা বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন তিনি।

বর্তমান নীতিমালায় পার্থক্য এমডির ক্ষেত্রে নিয়োগের স্থলে 'মনোনয়ন' শব্দ যোগ করা হয়েছে। এর আগে এমডি,  ডিএমডি ও জিএম নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগতো। এ নীতিমালার আলোকে শুধুমাত্র এমডি মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে। এছাড়া ডিএমডি ও জিএম পদোন্নতির ক্ষেত্রে মূখ্য সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি পদোন্নতি দিবে।

নতুন নীতিমালায় শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, সততা, নেতৃত্ব ও নম্বরভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

নীতিমালার আওতায় থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো হলো: সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) এবং বেসিক ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে: বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং আরেকটি বিশেষায়িত ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)।

নতুন নীতিমালায় পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির অভিজ্ঞতা, কর্মজীবনের রেকর্ড, পেশাগত দক্ষতা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতার বিস্তারিত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু চাকরির মেয়াদ নয়, একজন কর্মকর্তার সার্বিক কর্মদক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অবদানও মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে।

নীতিমালার আলোকে নম্বরভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির অভিজ্ঞতা, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), পেশাগত প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত ডিগ্রি বা সনদ, কর্মদক্ষতা এবং মৌখিক পরীক্ষার জন্য পৃথক নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

একজন প্রার্থী কত বছর চাকরি করেছেন, কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন কি না, প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন কি না, এসব বিষয়ও নম্বরের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে।

নতুন নীতিমালায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন পেশাগত যোগ্যতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ), কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএমএ), সার্টিফায়েড পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিপিএ), চার্টার্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ), এমবিএম, এমপিবি, সিসিএনএ, সিসা এবং 'অ্যাকচুয়াল সায়েন্সের' মতো পেশাগত ডিগ্রি বা সনদ থাকলে অতিরিক্ত নম্বর পাওয়া যাবে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তিত বাস্তবতায় শুধু প্রচলিত শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত দক্ষতাকেও মূল্যায়নের আওতায় আনতে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

নীতিমালায় শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি প্রার্থীর সততা, নৈতিকতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক ধারণাকেও মূল্যায়নের অংশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সম্প্রসারণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে নীতিমালা অনুযায়ী। 

নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি বা গুরুতর অভিযোগ থাকলে তা পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসবে। অর্থাৎ চাকরির রেকর্ডের পাশাপাশি সততা ও জবাবদিহিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এমডি, ডিএমডি ও জিএম প্রতিটি পদের জন্য পৃথক যোগ্যতা, চাকরির অভিজ্ঞতা এবং ন্যূনতম দায়িত্ব পালনের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। পদোন্নতির আগে প্রার্থীদের নথিপত্র যাচাই করা হবে। এরপর সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে।

এ জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রার্থীদের মূল্যায়ন করে পরিচালনা পর্ষদের কাছে সুপারিশ পাঠাবে। পরিচালনা পর্ষদ সেই সুপারিশের ভিত্তিতে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেবে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় নীতিমালায় নির্ধারিত নম্বর ও যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক থাকবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির জন্য ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করা হতো। কোথাও অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো, আবার কোথাও শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মৌখিক পরীক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। এতে একই ধরনের প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হওয়ার অভিযোগ ছিল।

নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে বলে মনে করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয় ছিল। নতুন নীতিমালা ফলে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিনির্ভরতার সুযোগ কমবে  এবং মেধা, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব তৈরির পথ আরও সুসংহত হবে। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত