সংবাদ

‘পার্বত্য সংকট নিরসনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা’: অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ



‘পার্বত্য সংকট নিরসনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা’: অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি ও সংকট নিরসনে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতির অভাবকে দায়ী করে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত জাতীয় নীতিমালার দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং চিটাগাং সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ (CCRSBD)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ।

সম্প্রতি ‘সংবাদ’-এর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার জাবির আহমেদ জিহাদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। পাঠকদের জন্য তাঁর সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো:

জাবির আহমেদ জিহাদ: পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতিগত অবস্থানকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: আসলে পার্বত্য নীতি বলে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী নীতি নেই। একেক সময় একেক নীতি অনুযায়ী পরিস্থিতি পরিচালনা করা হয়। সরকার পরিবর্তন হলে তারা তাদের সুবিধামতো নীতিও বদলে ফেলে। আমাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা; যেখানে পাহাড়ি ও বাঙালি সকলের অংশগ্রহণ থাকবে এবং যা পাহাড়ের মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে টেকসই সমাধান দেবে।

জাবির আহমেদ জিহাদ: পাহাড়ে বর্তমানে যে পরিচয় সংকট বা ‘আদিবাসী-সেটলার’ বিতর্ক চলছে, তা নিরসনে আপনাদের প্রস্তাব কী?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে একটি বড় পরিচয় সংকট তৈরি হয়েছে। একদল নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করছে, আবার অন্য দলকে ‘সেটলার’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নাগরিকত্বের বিষয়টি মীমাংসা করা জরুরি। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে ১০টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছি। এর মধ্যে অন্যতম হলো- পার্বত্য শান্তি চুক্তি এবং ভূমি বিষয়ক আইনগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে রিভিউ করা। এছাড়া কেবল আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।

জাবির আহমেদ জিহাদ: প্রায় ৩০ বছর আগে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তি বর্তমানে কতটা প্রাসঙ্গিক?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: শান্তি চুক্তি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে। সময়ের সাথে সাথে বাস্তবতার পরিবর্তন হয়, তাই আইন বা চুক্তিরও সংস্কার প্রয়োজন। তখনকার চুক্তি হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের সাথে। কিন্তু বর্তমানে সেখানে অনেকগুলো সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় এবং সেই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক বাঙালিরও বসবাস রয়েছে। তাই চুক্তিটি এখন সার্বজনীন কি না, তা পর্যালোচনার সময় এসেছে। পাহাড়ে বসবাসকারী সকল পক্ষ পাহাড়ি ও বাঙালি সবার মতামত বা ফিডব্যাক নিয়ে জনমতের ভিত্তিতে এটি মূল্যায়ন করা উচিত।

জাবির আহম্মেদ জিহাদ: ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নাকি আদিবাসী, এই নামকরণ নিয়ে চলমান বিতর্কের সমাধান কী হতে পারে?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: আমাদের সংবিধানে নাগরিকের পরিচয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে। সংবিধানে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘উপজাতি’ বা ‘জাতিগত সংখ্যালঘু’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। তাই কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর নামকরণের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংবিধান নির্দেশিত পথেই অগ্রসর হওয়া উচিত। সংবিধানের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করলে তা রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও শৃঙ্খলার জন্য সহায়ক হবে না।

জাবির আহম্মেদ জিহাদ: ‘পার্বত্য সমস্যাকে’ আপনারা কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেন?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: আমরা মনে করি, ‘পার্বত্য সমস্যা’ কেবল স্থানীয় কোনো বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যা। তাই কোনো ক্ষুদ্র স্বার্থ বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাধ্যমে নয়, বরং সমগ্র জাতির অংশগ্রহণ এবং একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমেই এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব।

জাবির আহম্মেদ জিহাদ: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: আপনাকে এবং ‘সংবাদ’-এর পাঠকদেরকেও ধন্যবাদ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬


‘পার্বত্য সংকট নিরসনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা’: অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি ও সংকট নিরসনে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতির অভাবকে দায়ী করে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত জাতীয় নীতিমালার দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং চিটাগাং সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ (CCRSBD)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ।

সম্প্রতি ‘সংবাদ’-এর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার জাবির আহমেদ জিহাদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। পাঠকদের জন্য তাঁর সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো:

জাবির আহমেদ জিহাদ: পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতিগত অবস্থানকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: আসলে পার্বত্য নীতি বলে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী নীতি নেই। একেক সময় একেক নীতি অনুযায়ী পরিস্থিতি পরিচালনা করা হয়। সরকার পরিবর্তন হলে তারা তাদের সুবিধামতো নীতিও বদলে ফেলে। আমাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা; যেখানে পাহাড়ি ও বাঙালি সকলের অংশগ্রহণ থাকবে এবং যা পাহাড়ের মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে টেকসই সমাধান দেবে।

জাবির আহমেদ জিহাদ: পাহাড়ে বর্তমানে যে পরিচয় সংকট বা ‘আদিবাসী-সেটলার’ বিতর্ক চলছে, তা নিরসনে আপনাদের প্রস্তাব কী?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে একটি বড় পরিচয় সংকট তৈরি হয়েছে। একদল নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করছে, আবার অন্য দলকে ‘সেটলার’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নাগরিকত্বের বিষয়টি মীমাংসা করা জরুরি। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে ১০টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছি। এর মধ্যে অন্যতম হলো- পার্বত্য শান্তি চুক্তি এবং ভূমি বিষয়ক আইনগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে রিভিউ করা। এছাড়া কেবল আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।

জাবির আহমেদ জিহাদ: প্রায় ৩০ বছর আগে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তি বর্তমানে কতটা প্রাসঙ্গিক?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: শান্তি চুক্তি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে। সময়ের সাথে সাথে বাস্তবতার পরিবর্তন হয়, তাই আইন বা চুক্তিরও সংস্কার প্রয়োজন। তখনকার চুক্তি হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের সাথে। কিন্তু বর্তমানে সেখানে অনেকগুলো সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় এবং সেই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক বাঙালিরও বসবাস রয়েছে। তাই চুক্তিটি এখন সার্বজনীন কি না, তা পর্যালোচনার সময় এসেছে। পাহাড়ে বসবাসকারী সকল পক্ষ পাহাড়ি ও বাঙালি সবার মতামত বা ফিডব্যাক নিয়ে জনমতের ভিত্তিতে এটি মূল্যায়ন করা উচিত।

জাবির আহম্মেদ জিহাদ: ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নাকি আদিবাসী, এই নামকরণ নিয়ে চলমান বিতর্কের সমাধান কী হতে পারে?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: আমাদের সংবিধানে নাগরিকের পরিচয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে। সংবিধানে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘উপজাতি’ বা ‘জাতিগত সংখ্যালঘু’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। তাই কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর নামকরণের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংবিধান নির্দেশিত পথেই অগ্রসর হওয়া উচিত। সংবিধানের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করলে তা রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও শৃঙ্খলার জন্য সহায়ক হবে না।

জাবির আহম্মেদ জিহাদ: ‘পার্বত্য সমস্যাকে’ আপনারা কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেন?

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: আমরা মনে করি, ‘পার্বত্য সমস্যা’ কেবল স্থানীয় কোনো বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যা। তাই কোনো ক্ষুদ্র স্বার্থ বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাধ্যমে নয়, বরং সমগ্র জাতির অংশগ্রহণ এবং একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমেই এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব।

জাবির আহম্মেদ জিহাদ: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ: আপনাকে এবং ‘সংবাদ’-এর পাঠকদেরকেও ধন্যবাদ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত