সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শই মূল ভিত্তি, মৌলবাদী রাষ্ট্র করা যাবে না: জেড আই খান পান্না


প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শই মূল ভিত্তি, মৌলবাদী রাষ্ট্র করা যাবে না: জেড আই খান পান্না
রাশেদ আহমেদ ও জেড আই খান পান্না

জেড আই খান পান্না, একজন আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সবসময় সোচ্চার থাকেন। যেকোনো অসামঞ্জস্যের বিরুদ্ধে কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের আদর্শ-উদ্দেশ্যের প্রতিফলন বর্তমানে আছে কিনা এবং চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিলো কিনা- সেসব বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ-এর বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদ। আলাপচারিতা হুবহু তুলে ধরা হলো।

রাশেদ আহমেদ: আপনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ করেছেন। তখন উদ্দেশ্য কী ছিল? কেন গিয়েছিলেন?

জেড আই খান পান্না: মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য একটা না, একাধিক ছিল। দেশটাকে স্বাধীন করা। স্বাধীন দেশে একটা শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেটা পারি নাই। এবং গণতন্ত্র আর সেক্যুলার একটা স্টেট গঠন করা। তো সেখানে সেক্যুলার স্টেট বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, এটা বাংলাদেশে ছিল, গণতন্ত্রও ছিল এবং শোষণমুক্ত সমাজ এটা আমরা পারি নাই। এটা গ্লোবাল রাজনীতির কারণে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি শোষণমুক্ত সমাজের পক্ষে ছিল না।

রাশেদ আহমেদ: মুক্তিযুদ্ধ কোথায় করেছেন?

জেড আই খান পান্না: আমি নাইন সেক্টরে। নাইন সেক্টরের মধ্যে ওই...এটা বলা হয় স্বরূপকাঠি এবং ঝালকাঠি, এর মধ্যে গাবখান চ্যানেল বলে একটা চ‍্যানেল আছে। এখন অনেকে বলে গাবখান নদী, অনেকে বলে গাবখান চ্যানেল। আসলে গাবখান চ্যানেল, ব্রিটিশরা এই খালটা খনন করছিল যাতে ঘুরিয়া না যাইতে হয়। এইখানটায় মেইনলি। তারপর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহজাহান ওমরের সঙ্গে বরাকোটায়। বরাকোটার পরে চাচুরির যুদ্ধ। এবং শাহজাহান ওমরের সঙ্গে যখন ছিলাম তখন আমি কোর্ট ইনচার্জ। কোর্ট যেটা আর্মার, এটা থাকতো আমার কাছে। তো সে তো সাংঘাতিক... বলব যে, সে তো আর্মি থেকে আসছে, যুদ্ধ বোঝে, ফিগারও সেইরকম এবং যুদ্ধের বেলা সে ছিল ভয়ঙ্কর এক... সাহসী লোক। দুই হাতে দুই রাইফেল নিয়ে ফায়ার করতে পারতো। উন্ডেড হইছে। লাইফের কোনো তোয়াক্কা করে নাই। কিন্তু আমারে নিয়ে খুব কনসার্ন ছিল। বলতো যে, “আপনার এই ক্ষীণ দেহ, এই নিয়ে আপনার যুদ্ধ দরকার নাই, আপনি আর্মস পাহারা দেন।”

রাশেদ আহমেদ: আপনি নাইন সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করলেন। শাহজাহান ওমর আপনার কমান্ডার ছিল। এখনও উনাকে কমান্ডার ডাকেন?

জেড আই খান পান্না: এখনও আমি তাকে ডাকি কমান্ডার।

রাশেদ আহমেদ: তখনকার ঘটনার দুই একটা বলেন তো।

জেড আই খান পান্না: যেমন বরাকোটায়। বরাকোটা থেকে আমরা ভানুরপাড়া হয়ে আসি সাগড়কান্দা নামে একটা জায়গা আছে সেইখানে। যেটার কিছুটা পড়ছে স্বরূপকাঠিতে কিছুটা পড়ছে ঝালকাঠিতে। সেখানে বইসা এক বিশাল যুদ্ধ হয় পাকিস্তান বাহিনীর গানবোটের সাথে। গানবোটগুলো না দেখলে বোঝা যাবে না। এর উপর রকেট শেল করেও কিছু করা যায় না। ব্যাক করে। উপরে শাহজাহান ওমর তো পাকিস্তানি আর্মি ট্রেইনড। সে ওই উপর দিক দিয়ে এমনভাবে মারতো এটা গিয়ে সাইডে না লেগে মাঝখানে পড়ত। তখন ইনজুর্ড হলো তারা। তো এই একটা আর আরেকটা হলো বরিশাল যখন দখল করে, সেটি এপ্রিলের ২৬ তারিখে।

রাশেদ আহমেদ: পাকিস্তান আর্মি দখল করে?

জেড আই খান পান্না: হ্যাঁ পাকিস্তান আর্মি। ২৬ মার্চ তো ঢাকা ক্র্যাকডাউন শুরু হয়। বরিশালের ক্র্যাকডাউনটা হয় ২৬ শে এপ্রিলে। একমাস বরিশাল মোটামুটি লিবারেটেড জোনের মতো ছিল। তখন তো ক্লাসিক্যাল ওয়ারফেয়ার বা গেরিলা ওয়ারফেয়ার সম্পর্কে আমাদের একটা ধারণা ছিল। চে গুয়েভারার বই, হো চি মিনের বই, ভিয়েতনাম ওয়ার, কম্বোডিয়ার ওয়ার এগুলো থেকে। এবং ওই মাও সে তুং-এর লং মার্চ এগুলো থেকে একটা আইডিয়া ছিল। সেই বেসিসে আমরা ২৬ শে এপ্রিলের পর আমরা যে যার অবস্থানে চলে যাই এবং এপ্রিল-মে মাসের দিকে কিছু থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে আমরা সাতজন ছিলাম। তো সেইখানে শেখেরহাট জায়গাটার নাম। সেখানে বইসা আমরা দেখি যে গানবোট আসে। গানবোট না, স্টিমারে রকেট সার্ভিস যেটা সেইটায় উপরে অনেক বালির বস্তা টস্তা দিয়ে আর্মি যায়। এটা যায় খুলনা। আবার খুলনা থেকে আসে। আমরা চিন্তা করলাম যে এটারে তো এতো পিসফুলি যাইতে দেওয়া ঠিক না। একদিন আমরা ঠিক করলাম যে সাতজনের তিনজন থাকবে নদীর ওপার, চারজন থাকবে এপার। এই দিক শেষ হলে পরে ওই দিকে আবার তিনজনে ফায়ার ওপেন করবে একত্রে। এবং সবাই একটা না একটা টার্গেট ধরবে। কেউ ধরছে হেডলাইট, কেউ ধরছে মাস্টার কেবিন, কেউ ধরছে কারো দিকে। এইভাবে যখন শুরু হইলো, বিলিভ মি, ওরা একদম পাগলের মতো উদভ্রান্ত হয়ে তারা এমনভাবে মর্টার শেলিং শুরু করলো যে আমাদের বোধহয় এক মাইল উপর থেকে এগুলো যাচ্ছে। ওরা যদি একটা গ্রেনেড থ্রো করতো আমরা কিন্তু থাকতে পারতাম না। এবং কিছুক্ষণ পরে ওরা যেভাবে হোক ওখান থেকে পালাইলো। দুদিন পরে ওরা অ্যাটাক করলো। করে একদম আশেপাশের গ্রাম পোড়ায় দিলো। ৮ আগস্ট আমরা একটা সভা করতে গেলাম। লোকাল মুক্তিবাহিনী। আমরা কাউখালীর পনা, হাবিব। হাবিব বোধহয় এখনও বেঁচে আছে। পনা বেঁচে নাই। পনা আবার বীর উত্তম শাহজাহান ওমরের বন্ধু মানুষ। ওরকম লম্বা চওড়া কিন্তু কালো। হাবিব একটা এলএমজি পেয়ে গেছিল সুন্দরবন অঞ্চলের মেজর জিয়ার কাছ থেকে। 

রাশেদ আহমেদ: কত তারিখে এটা?

জেড আই খান পান্না: আগস্ট মাসের ৮ তারিখ। অ্যাটাকের পরে আমরা দুভাগে ভাগ হয়ে গেলাম। আর হাবিব করলো কী, ও একটা ব্রাশ ফায়ার ওপেন করে ট্যট ট্যাট করে পেছন দিকে যাওয়া শুরু করলো, মানে গ্রামের ভেতর দিকে হইতেছে। পাক আর্মি ওর পেছন পেছন যাচ্ছে। তখন সন্ধ্যা নেমে আসছে। সন্ধ্যা নেমে আসার পরে পাক আর্মি তো ব্যাক করবে কিন্তু চতুর্দিক থেকে লোকজন, পুরুষ, মহিলা সবাই যার যা কিছু আছে সব নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এমনভাবে দিছে, মনে হয়েছে যেন হাজার হাজার লোক। হাজার হাজার না হইলেও মনে হয়েছে হাজার হাজার। ওরা এতে দিগভ্রান্ত হয়ে ওই রাইফেল গাছগোড়ায় রাইখা আরেক গাছে উঠছে। ১৩ জন পাক আর্মি ধরা পড়ল। এবং ওদের গ্রামবাসীরাই পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে আবার লাশ বাঁশের সাথে বাঁইধে নদীর পাড়ে রাখছে। আমরা নিষেধ করছিলাম যে তোমরা মেরো না, কে শোনে কার কথা।

রাশেদ আহমেদ: আপনি শুরুতে যেটি বলছিলেন যে একটি সেক্যুলার বাংলাদেশের জন্য, সেক্যুলার রাষ্ট্রের জন্য এবং আধুনিক একটি রাষ্ট্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। আমরা ইদানিং একটা জিনিস লক্ষ্য করি যে অনেক মানুষের মধ্যে একটা সংকীর্ণতা বাসা বেঁধেছে, যেটি সেক্যুলার নয় এবং উগ্রপন্থীদের একটি উত্থান এখানে ঘটেছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আপনি দেখবেন, ধরুন একটা ছোট ঘটনা ফেসবুকে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে বিউটি পাল, তিনি একটি প্রাইমারি স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। উনি একটি গান যুক্ত করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। সেটার বিরুদ্ধে নানা রকমভাবে নোংরা মন্তব্য করা হয়েছে। এই যে আমাদের মগজের যে পরিবর্তন, সেই পরিবর্তন কেন হলো?

জেড আই খান পান্না: আপনি কি মনে করেন যে এটা পরিবর্তন? আমি যদি বলি যে তার কাউন্টার যেটা হইছে সেটা কি আপনি ফলো করছেন? সারা বাংলাদেশের স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী তারা যে সমবেতভাবে ফেসবুকে কাঁপায় দিছে ওই গানটা গেয়ে, এইটা কি মুভমেন্ট না? আপনি কি দেখেছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একজন সো কল্ড মসজিদ করতে গেছে, একটা ইয়ং ছেলে আযহারুল নাম, সে যখন বললো যে আমি মানুষ, এক হুজুর জিজ্ঞেস করছিল...

রাশেদ আহমেদ: তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে তুমি হিন্দু?

জেড আই খান পান্না: সে উত্তর দিছে ‘নো, আমি মানুষ ফার্স্ট’। একটা বাচ্চা ছেলে একটা বয়স্ক লোকরে এই উত্তর দেয়। দিস ইজ বাংলাদেশ। ইট ইজ রিয়াল বাংলাদেশ।

রাশেদ আহমেদ: কিন্তু এই জায়গাটাকে দাবায়ে রাখা হচ্ছে, তাদের অবদমিত করা হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে করা হচ্ছে, সেটা কি আপনি লক্ষ্য করছেন?

জেড আই খান পান্না: অবশ্যই লক্ষ্য করছি যে দেশ স্বাধীন হওয়ার এতো বছর পর প্রথম সংসদে জামায়াতে ইসলামী একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে ক্ষমতায় গেছে। ক্ষমতায় নাই, কিন্তু ক্ষমতার ভাগ পাচ্ছে। যে কারণে এইটা দেখা যাচ্ছে। এবং সব জায়গায়ই আপনি দেখবেন এই সংখ্যা এরা কিন্তু সংখ্যা লঘিষ্ঠ। জামায়াতে ইসলামী বা এই ইসলামী মৌলবাদী শক্তি অ্যাপারেন্টলি মনে হয় যে বিশাল বাহিনী। এরা সংখ্যালঘু। এবং মাইনরিটি পিপল অলওয়েজ ইউনাইটেড। যে কারণে তারা যেখানেই থাকে, যেমন ঢাকার মধ্যে আপনি দেখবেন যে এই আট নম্বর আসন যেটা, এইখানে জামায়াত সংখ্যাগরিষ্ঠ। ওইখানেই ওরা থাকবে মেস বানিয়ে...

রাশেদ আহমেদ: কিন্তু তাদের দাপট তো অনেক।

জেড আই খান পান্না: এখন আপনি যদি আমার দাপট দেখতেন করাচিতে, করাচিতে আমি ছিলাম ৬৮ থেকে ৭০ পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধু যখন গেছেন বঙ্গবন্ধুর সাথে করাচির মিটিং, কুয়েটার মিটিং, পেশোয়ারের মিটিং, লাহোরের মিটিং, রওয়ালপিন্ডি মিটিং এগুলো কিন্তু অর্গানাইজ আমিই করছিলাম এবং সাথে সাথে ছিলাম।

রাশেদ আহমেদ: আমি যেই আলোচনার মধ্যে থাকতে চেয়েছি, সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের সংকীর্ণমনা, উগ্রবাদীদের একটি উত্থান হয়েছে, এটি কি রাতারাতি হয়েছে?

জেড আই খান পান্না: মৌলবাদী শক্তি সব জায়গায়ই আছে। আমেরিকাতে নাই? আছে। এখানেও আছে, আবার মায়ানমারেও আছে। কিন্তু এরা সংখ্যালঘু। সংখ্যা লঘিষ্ঠ, সংখ্যাগুরু না কখনোই। কখনো কখনো অপরচুনিটি, কৌশলগতভাবে এরা ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু আসলে কোথাও এরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় না। সাধারণ মানুষ তারা শান্তি চায়, তারা পরস্পর পরস্পরের সাথে মিলে থাকতে চায়। ভারতবর্ষের ইতিহাস যদি আপনি দেখেন এইখানে ফার্স্ট সেক্যুলার স্টেট হইলো সম্রাট আকবরের সময়। কোন ধর্মটা শাসন করছে? তার সময় ধর্ম ছিল দ্বীন-ই ইলাহি। তো উনি কি পয়গম্বর? পয়গম্বর তো না। কিন্তু এইটা করছেন কেন? টু সেটআপ অ্যান্ড কন্ট্রোল দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। তার ১২ জন স্ত্রী ছিল, তার ভিতরে ছয় জনই ছিল রাজপুত। তার মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয়তম বেগম ছিলেন যোধাবাঈ। তো এই যদি দেখি আমরা, তো তার সময় তো কোনো সমস্যা ছিল না। এবং মোঘলরা যে এত বছর শাসন করছে কোথাও তো কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয় নাই।

রাশেদ আহমেদ: আমি বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসি। একটি বিষয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, সেটির মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্র পেয়েছি, পরবর্তীতে কি দেখি?

জেড আই খান পান্না: সেক্যুলার রাষ্ট্র পেয়েছিলাম।

রাশেদ আহমেদ: পেয়েছিলাম কিন্তু সেই জায়গায় বাংলাদেশ থাকে নাই নানা কারণে বিভিন্ন সময়। আরেকটি বিষয় যে ২৪-এর একটি আন্দোলন, সেই আন্দোলনের সময় মনে হচ্ছিল একটি নতুন বাংলাদেশ নতুন কাঠামো গড়ে উঠবে। এবং সেই আন্দোলনের কিছু কিছু সময় যারা আন্দোলন করেছিল তাদের মুক্তির জন্য আপনারও সোচ্চার অবস্থান ছিল। আপনি কী দেখলেন তারপর?

জেড আই খান পান্না: আমি তাহলে তার আগে যাই। ২০০৩ সালে যখন অপারেশন ক্লিন হার্ট হয়, তারপরে কিন্তু প্রতিবাদ আমি করছিলাম। আমার কোনো রাজনৈতিক দল নাই। আমি যেটা মনে করি যে এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী, তখনই সেটা হইছে আমি একা হইলেও বলছি। ২০০৩ সালে যখন দায়মুক্তি দেয় এবং র‍্যাব গঠন করে, চার সাল থেকে কিন্তু আমি র‍্যাবের বিরোধিতা করে আসছি, স্টিল টুডে। র‍্যাব মিরপুর থেকে একজন বাম নেতাকে গ্রেপ্তার করলো, গ্রেপ্তার করার পরে উনি তার মেয়েকে বললেন যে, “মা আমি যাচ্ছি হয়তো ফিরে আসব না”। তার ডেড বডি পাওয়া যায় পরদিন কুষ্টিয়ার মাঠে। লুঙ্গি পরা অবস্থায়। মোফাখখার চৌধুরী নাম ছিল। খুলনাতে এক জজ সাহেবের এজলাস থেকে তুলে নিয়ে রাস্তায় গুলি করছে। এবং জজরাও ভয় পেয়ে গেছে যে এরা সিভিল ড্রেসে কারা। পরে শুনলো যে এরা র‍্যাবের। তো অনেকে সন্তুষ্ট হয়েছে যে ইমিডিয়েট একটা অ্যাকশন। যাদের মেরে ফেলছে তারা ছিল নো ডাউট অফ ইট যে সমাজের দুষ্কৃতকারী। কিন্তু আমার প্রশ্ন হইলো যে দুষ্কৃতকারী কি না এটা আমি, আপনি বিচার করার কেউ না। ওনলি দ্য কোর্ট। এইখানে হলো রুল অব ল-এর সেন্স। সেইটা ছেড়ে আমি বারবার খুন করার পরে তারা বলল যে না এরা খারাপ লোক। খারাপ লোক হইলেও তো এটা পারে না, আপনারা অপোজ করেন, করলো না তারা। তো আমি অপোজ করে গেছি।

রাশেদ আহমেদ: ২৪-এর পর আপনি কী দেখলেন?

জেড আই খান পান্না: ২৪-এর পরে কেন দেখব? আপনি আসেন ৯০-তে। এরশাদের পতন ছিল যে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে। তিন জোটের রূপরেখা, সেটা কি বাস্তবায়ন হয়েছে? হয় নাই। সবাই বলে যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হবে এবং এটা স্বাধীন। কোথায় স্বাধীন? কী স্বাধীন? স্বাধীন না। স্বাধীন হইলে মন-মানসিকতার দিক থেকে স্বাধীনতা থাকতে হবে। এটা কাগজে কলমে দিলে হবে না। সাবেক প্রধান বিচারপতি সম্ভবত রুহুল আমিন সাহেব উনি ওয়ান ইলেভেনের পরে ১৭ নভেম্বর ডিক্লেয়ার করলো যে এটা স্বাধীন। তারপর আইসা বিচারপতি রিফাত আহমেদ সেও বলল যে স্বাধীন, স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়ে গেল। কী হয়েছে স্বাধীনের? উনি কি স্বাধীন ছিলেন? নট অ্যাট অল। আরও একটা আপনাকে বলি, আমাদের আইনটা বুঝতে হবে। আমাদের এই আইনগুলো করছে কিন্তু ব্রিটিশরা। কখন? সিপাহী মিউটিনির পর। সিপাহী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটেই কিন্তু এই আইনগুলো। স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে কোনো আইন হয় নাই। একাত্তরের প্রেক্ষাপটে কোনো আইন হয় নাই। বা ৪৭-এর প্রেক্ষাপটে কোনো আইন হয় নাই। ভারতে অনেক জায়গায় পরিবর্তন হয়েছে। হ্যাঁ, আমাদের যেটা সর্বোচ্চ অর্জন সেটা হলো আমাদের ৭২-এর সংবিধান। এইটা হলো আমাদের একটা অর্জন। আমি বলতে পারব যে পৃথিবীর মধ্যে যতগুলো সর্বশ্রেষ্ঠ শাসনতন্ত্র আছে তার মধ্যে এই একটা। ৭২ সংবিধান।

রাশেদ আহমেদ: কোন বৈশিষ্ট্য থেকে আপনি এটা বলছেন?

জেড আই খান পান্না: এইটা বলতেছি গণতান্ত্রিক এবং সেক্যুলার, এই দুটো দিক থেকে।

রাশেদ আহমেদ: কিন্তু এখন তো এইটা পরিবর্তনের এবং বাতিলের দাবিগুলো আসছে।

জেড আই খান পান্না: যতই পরিবর্তন হোক, ধরেন আমাকেই, আপনি যতই চেষ্টা করেন আমারে কিন্তু মোহাম্মদ আলী বা গামা বানাইতে পারবেন না। আমি এই স্ট্রাকচারের ভিতরে যতটুকু হয় ততটুকুই হতে পারব। এই কাঠামোতে আপনি এটাকে কিছুতেই নন-সেক্যুলার করতে পারবেন না। বা একটা ফান্ডামেন্টালিস্ট কনস্টিটিউশন করতে পারবেন না। তাইলে প্রত্যেকটা অক্ষর চেঞ্জ করতে হবে।

রাশেদ আহমেদ: এই জন্য সংবিধান বাতিলের কথা বলা হচ্ছে।

জেড আই খান পান্না: হ্যাঁ, সংবিধান বাতিলের কথা বলছে এরা। ২৪-এর পরে এই যে ধার করা আতেলরা আসলো।

রাশেদ আহমেদ: আপনি আলী রিয়াজের কথা বলছেন?

জেড আই খান পান্না: আলী রিয়াজ, এই আজকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তারপর আরও অনেকেই যারা আছে। তো সবই দেখলাম যে এ দেশের না, বিদেশের। তারা প্রথমে টার্গেট নিলো যে ৭২-এর সংবিধান। তারা এটাও উপলব্ধি করছে যে সংবিধান থাকলে তারা তাদের পারপাসটা সার্ভ করতে পারবে না।

রাশেদ আহমেদ: পারপাসটা কী তাদের?

জেড আই খান পান্না: পারপাসটা ছিল এটারে একটা মৌলবাদী রাষ্ট্র করা। নাথিং এলস। মৌলবাদী রাষ্ট্র করা। তারপরে গ্যাঞ্জাম লেগে গেল। লাগত। ওই মায়ানমারের মতোই হতো। এদের জন্য একটা সুবিধা হতো। লং টার্মের একটা প্ল্যান। যেটার আংশিক তারা সফলও হয়েছে। তারা মার্কিনীদের সাথে তো একটা চুক্তি করছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ইলেকশন, ৯ তারিখে সাইন করছে। এত কোনো ইথিকস-এর ভেতর পড়ে না, আর ল-এর ভেতরেও পড়ে না। তিন দিনও ওয়েট করতে পারল না।

রাশেদ আহমেদ: এটা ইউনূস সরকার করল?

জেড আই খান পান্না: হ্যাঁ, ইউনূস সরকার করল।

রাশেদ আহমেদ: এটার আমাদের সুবিধা কী হবে, অসুবিধা কী হবে?

জেড আই খান পান্না: একটা লং টার্মের আমরা মার্কিনীদের সাথে অর্থনৈতিক একটা চাপের মধ্যে বা অনেকটা করদ রাজ্যের মতো, পাপেট রাষ্ট্রের মতো হয়ে গেলাম। হয় নাই এখনও, হব। আপনি দেখেন না লাতিন আমেরিকার কোনো দেশ। ভেনিজুয়েলা আর মাদুরোকে তো উঠায়ে নিয়ে গেল। এটা কোনো সভ্যতার মধ্যে পড়ে? মানলাম মাদুরো সাংঘাতিক অটোক্রেটিক, দুর্দান্ত এক নটোরিয়াস ব্যক্তি। কিন্তু আরেক দেশ থেকে সোলজার আইসা তাকে পিক করে তুলে নিয়ে যাবে? এইটা কি সভ্যতার ভিতর পড়ে? এই হচ্ছে হিস্ট্রি অব দ্য ইউএস সিভিলাইজেশন।

রাশেদ আহমেদ: আপনি ইউনূসের ১৮ মাসে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

জেড আই খান পান্না: সব কর্মকাণ্ড নিয়েই সমালোচনা করেছি। তার ইথিকস, তার ফিলোসফি, তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সবগুলোই আমার কাছে অশোভন মনে হয়েছে।

রাশেদ আহমেদ: ইথিকসটা কী?

জেড আই খান পান্না: ইথিকস হইলো শোষণ-লুণ্ঠন চালানো। সেক্যুলারিজম-এর এগেইনস্টে এবং ডেস্ট্রাকশন-এর পক্ষে। দেখেন না আপনি, ইউনূস সেখনে বসতো পিছনে কলেমা তৈয়বা লেখা ছিল। হোয়্যার এজ ইউনূস একটা দিন নামাজ পড়ছে কিনা দেখেন। অনেকে তো তার ধর্ম সম্পর্কেও প্রশ্ন করে যে সে মুসলিম কি না। সে নাকি বিয়ের সময় ইহুদি হয়ে গিয়েছিল। কী হয়েছিল, এইসব শুনি আরকি। আই হ্যাভ নো ডকুমেন্টস। ধরলাম উনি মুসলিম। কিন্তু কখনোই তো দেখি নাই নামাজ পড়তে। এইবারই দেখলাম ঈদের নামাজ পড়তে। প্রথম যে কাজটা ইউনূস করল, তার সব ইনকাম ট্যাক্সগুলো মাফ করলো। গ্রামীণফোনের টাকা মাফ করলো। টেলিকমের এইটা মাফ করলো। এগুলো কার স্বার্থে? সে চেয়ারে বসে যে এটা করছে, ইটস অ্যাবসলিউটলি ইলিগ্যাল। অ্যাবসলিউটলি ইলিগ্যাল। আপনি কোনো রাষ্ট্রীয় কোনো পদে বইসা ব্যক্তিগত কোনো সম্পদ বা ব্যবসা-বাণিজ্য চালাইতে পারেন না। কিন্তু তাই করছেন। তারপর আবার কী নিছেন? গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি। তারপর জাপানে গিয়ে ম্যানপাওয়ারের লাইসেন্স নিছেন। যেখানেই দেখতে যাই না কেন, বিশ্বাস করেন এত ঘৃণা যে এই লোকটা বলে শিক্ষিত, কিন্তু কাজ করলো সম্পূর্ণ অশিক্ষিতের মতো। অশিক্ষিতও এতখানি অন্যায় করে না।

রাশেদ আহমেদ: মার্কিনীদের সঙ্গে যেই চুক্তি, সেই চুক্তি বলা হয়, মানে তাদের যুক্তি, যে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে যে অতিরিক্ত কর বসানো হয়েছে, সেটা মিনিমাইজ করার জন্য করা হয়েছে।

জেড আই খান পান্না: এইটা বললে তো হবে না। আমি বলি আপনাকে, গার্মেন্টসটা কোথায় যায়? শুধু কি মার্কিনে? ইউরোপে যায় কি না? আমি তো বলব যে সবচেয়ে বড় মার্কেট হইলো ইউরোপ। মার্কিন না। আর মার্কিনীরা তো কাপড় কিনবে। উলঙ্গ তো থাকবে না।

রাশেদ আহমেদ: ২৪-এ তো একটি গণআন্দোলন হয়েছে, সেটা অনস্বীকার্য এবং সাধারণ মানুষ ওই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

জেড আই খান পান্না: হ্যাঁ, সাধারণ মানুষ ছিল কিন্তু ওইভাবে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ছিল না। এইটা মনে করছে সরকার করছে, এখানে একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং রাখছে। আর সরকারের ভেতরে যারা ছিল তারা ছিল আরেকটু, আমি বলব যে ট্রেইটর, কিছু ট্রেইটর ছিল ভাইটাল পোস্টগুলোতে। যে কারণে ২৪-এর এই অদ্ভুত কাণ্ডটা এইভাবে হইছে। অদ্ভুত কাণ্ড না, একটা আন্দোলন। এইভাবে হইছে।

রাশেদ আহমেদ: জনগণকে এই আন্দোলনের মধ্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

জেড আই খান পান্না: এখন ভ্রান্ত এইটা সবার কাছে। আপনি রিকশাওয়ালার কাছে জিজ্ঞেস করেন, মাঝির কাছে জিজ্ঞেস করেন, কৃষকের কাছে জিজ্ঞেস করেন, সবাই বলবে যে শেখ হাসিনার আমলে ভালো ছিল। কেন বলে?বলতে পারেন যে এইটা নেগেটিভই। হ্যাঁ, আমিও বলি যে নেগেটিভই। কিন্তু কেন বলতেছে? সেটার কারণ তো বিশ্লেষণ করবেন। ল অ্যান্ড অর্ডার-এর দিক থেকে দেখেন কী অবস্থায়।

রাশেদ আহমেদ: ২৪-এ পর দুই বছর হলো। এই দুই বছরকে যদি মূল্যায়ন করতে বলি, তাহলে কীভাবে করবেন?

জেড আই খান পান্না: একটা ভ্রান্তিকাল। একটা প্রতারণার কাল। প্রতারণার ভেতর থেকে আমরা উত্তেজিত হই। এবং আমি আশা করব যে নিশ্চয়ই এই প্রতারণা এবং ভ্রান্তি এটা অতি শিগগিরই দূর হবে।

রাশেদ আহমেদ: কীভাবে হবে? সেটির কোনো পথ আপনি দেখতে পাচ্ছেন?

জেড আই খান পান্না: গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই হবে।

রাশেদ আহমেদ: গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি নির্বাচন হয়েছে, একটি সরকার এসেছে।

জেড আই খান পান্না: একটি সরকার আসছে। এই সরকারই চিন্তাভাবনা করবে। আমি আশা করি। যদি শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাইলে তারা চিন্তাভাবনা করে পথ বের করবে। রাষ্ট্র থাকলে পর তো রাষ্ট্র ক্ষমতার থাকার প্রশ্ন। রাষ্ট্র ঠিক করতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ভিত্তিতেই।

রাশেদ আহমেদ: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে কথা বলার জন্য।

জেড আই খান পান্না: আপনাকেও ধন্যবাদ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬


মুক্তিযুদ্ধের আদর্শই মূল ভিত্তি, মৌলবাদী রাষ্ট্র করা যাবে না: জেড আই খান পান্না

প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

জেড আই খান পান্না, একজন আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সবসময় সোচ্চার থাকেন। যেকোনো অসামঞ্জস্যের বিরুদ্ধে কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের আদর্শ-উদ্দেশ্যের প্রতিফলন বর্তমানে আছে কিনা এবং চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিলো কিনা- সেসব বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ-এর বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদ। আলাপচারিতা হুবহু তুলে ধরা হলো।

রাশেদ আহমেদ: আপনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ করেছেন। তখন উদ্দেশ্য কী ছিল? কেন গিয়েছিলেন?

জেড আই খান পান্না: মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য একটা না, একাধিক ছিল। দেশটাকে স্বাধীন করা। স্বাধীন দেশে একটা শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেটা পারি নাই। এবং গণতন্ত্র আর সেক্যুলার একটা স্টেট গঠন করা। তো সেখানে সেক্যুলার স্টেট বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, এটা বাংলাদেশে ছিল, গণতন্ত্রও ছিল এবং শোষণমুক্ত সমাজ এটা আমরা পারি নাই। এটা গ্লোবাল রাজনীতির কারণে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি শোষণমুক্ত সমাজের পক্ষে ছিল না।

রাশেদ আহমেদ: মুক্তিযুদ্ধ কোথায় করেছেন?

জেড আই খান পান্না: আমি নাইন সেক্টরে। নাইন সেক্টরের মধ্যে ওই...এটা বলা হয় স্বরূপকাঠি এবং ঝালকাঠি, এর মধ্যে গাবখান চ্যানেল বলে একটা চ‍্যানেল আছে। এখন অনেকে বলে গাবখান নদী, অনেকে বলে গাবখান চ্যানেল। আসলে গাবখান চ্যানেল, ব্রিটিশরা এই খালটা খনন করছিল যাতে ঘুরিয়া না যাইতে হয়। এইখানটায় মেইনলি। তারপর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহজাহান ওমরের সঙ্গে বরাকোটায়। বরাকোটার পরে চাচুরির যুদ্ধ। এবং শাহজাহান ওমরের সঙ্গে যখন ছিলাম তখন আমি কোর্ট ইনচার্জ। কোর্ট যেটা আর্মার, এটা থাকতো আমার কাছে। তো সে তো সাংঘাতিক... বলব যে, সে তো আর্মি থেকে আসছে, যুদ্ধ বোঝে, ফিগারও সেইরকম এবং যুদ্ধের বেলা সে ছিল ভয়ঙ্কর এক... সাহসী লোক। দুই হাতে দুই রাইফেল নিয়ে ফায়ার করতে পারতো। উন্ডেড হইছে। লাইফের কোনো তোয়াক্কা করে নাই। কিন্তু আমারে নিয়ে খুব কনসার্ন ছিল। বলতো যে, “আপনার এই ক্ষীণ দেহ, এই নিয়ে আপনার যুদ্ধ দরকার নাই, আপনি আর্মস পাহারা দেন।”

রাশেদ আহমেদ: আপনি নাইন সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করলেন। শাহজাহান ওমর আপনার কমান্ডার ছিল। এখনও উনাকে কমান্ডার ডাকেন?

জেড আই খান পান্না: এখনও আমি তাকে ডাকি কমান্ডার।

রাশেদ আহমেদ: তখনকার ঘটনার দুই একটা বলেন তো।

জেড আই খান পান্না: যেমন বরাকোটায়। বরাকোটা থেকে আমরা ভানুরপাড়া হয়ে আসি সাগড়কান্দা নামে একটা জায়গা আছে সেইখানে। যেটার কিছুটা পড়ছে স্বরূপকাঠিতে কিছুটা পড়ছে ঝালকাঠিতে। সেখানে বইসা এক বিশাল যুদ্ধ হয় পাকিস্তান বাহিনীর গানবোটের সাথে। গানবোটগুলো না দেখলে বোঝা যাবে না। এর উপর রকেট শেল করেও কিছু করা যায় না। ব্যাক করে। উপরে শাহজাহান ওমর তো পাকিস্তানি আর্মি ট্রেইনড। সে ওই উপর দিক দিয়ে এমনভাবে মারতো এটা গিয়ে সাইডে না লেগে মাঝখানে পড়ত। তখন ইনজুর্ড হলো তারা। তো এই একটা আর আরেকটা হলো বরিশাল যখন দখল করে, সেটি এপ্রিলের ২৬ তারিখে।

রাশেদ আহমেদ: পাকিস্তান আর্মি দখল করে?

জেড আই খান পান্না: হ্যাঁ পাকিস্তান আর্মি। ২৬ মার্চ তো ঢাকা ক্র্যাকডাউন শুরু হয়। বরিশালের ক্র্যাকডাউনটা হয় ২৬ শে এপ্রিলে। একমাস বরিশাল মোটামুটি লিবারেটেড জোনের মতো ছিল। তখন তো ক্লাসিক্যাল ওয়ারফেয়ার বা গেরিলা ওয়ারফেয়ার সম্পর্কে আমাদের একটা ধারণা ছিল। চে গুয়েভারার বই, হো চি মিনের বই, ভিয়েতনাম ওয়ার, কম্বোডিয়ার ওয়ার এগুলো থেকে। এবং ওই মাও সে তুং-এর লং মার্চ এগুলো থেকে একটা আইডিয়া ছিল। সেই বেসিসে আমরা ২৬ শে এপ্রিলের পর আমরা যে যার অবস্থানে চলে যাই এবং এপ্রিল-মে মাসের দিকে কিছু থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে আমরা সাতজন ছিলাম। তো সেইখানে শেখেরহাট জায়গাটার নাম। সেখানে বইসা আমরা দেখি যে গানবোট আসে। গানবোট না, স্টিমারে রকেট সার্ভিস যেটা সেইটায় উপরে অনেক বালির বস্তা টস্তা দিয়ে আর্মি যায়। এটা যায় খুলনা। আবার খুলনা থেকে আসে। আমরা চিন্তা করলাম যে এটারে তো এতো পিসফুলি যাইতে দেওয়া ঠিক না। একদিন আমরা ঠিক করলাম যে সাতজনের তিনজন থাকবে নদীর ওপার, চারজন থাকবে এপার। এই দিক শেষ হলে পরে ওই দিকে আবার তিনজনে ফায়ার ওপেন করবে একত্রে। এবং সবাই একটা না একটা টার্গেট ধরবে। কেউ ধরছে হেডলাইট, কেউ ধরছে মাস্টার কেবিন, কেউ ধরছে কারো দিকে। এইভাবে যখন শুরু হইলো, বিলিভ মি, ওরা একদম পাগলের মতো উদভ্রান্ত হয়ে তারা এমনভাবে মর্টার শেলিং শুরু করলো যে আমাদের বোধহয় এক মাইল উপর থেকে এগুলো যাচ্ছে। ওরা যদি একটা গ্রেনেড থ্রো করতো আমরা কিন্তু থাকতে পারতাম না। এবং কিছুক্ষণ পরে ওরা যেভাবে হোক ওখান থেকে পালাইলো। দুদিন পরে ওরা অ্যাটাক করলো। করে একদম আশেপাশের গ্রাম পোড়ায় দিলো। ৮ আগস্ট আমরা একটা সভা করতে গেলাম। লোকাল মুক্তিবাহিনী। আমরা কাউখালীর পনা, হাবিব। হাবিব বোধহয় এখনও বেঁচে আছে। পনা বেঁচে নাই। পনা আবার বীর উত্তম শাহজাহান ওমরের বন্ধু মানুষ। ওরকম লম্বা চওড়া কিন্তু কালো। হাবিব একটা এলএমজি পেয়ে গেছিল সুন্দরবন অঞ্চলের মেজর জিয়ার কাছ থেকে। 

রাশেদ আহমেদ: কত তারিখে এটা?

জেড আই খান পান্না: আগস্ট মাসের ৮ তারিখ। অ্যাটাকের পরে আমরা দুভাগে ভাগ হয়ে গেলাম। আর হাবিব করলো কী, ও একটা ব্রাশ ফায়ার ওপেন করে ট্যট ট্যাট করে পেছন দিকে যাওয়া শুরু করলো, মানে গ্রামের ভেতর দিকে হইতেছে। পাক আর্মি ওর পেছন পেছন যাচ্ছে। তখন সন্ধ্যা নেমে আসছে। সন্ধ্যা নেমে আসার পরে পাক আর্মি তো ব্যাক করবে কিন্তু চতুর্দিক থেকে লোকজন, পুরুষ, মহিলা সবাই যার যা কিছু আছে সব নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এমনভাবে দিছে, মনে হয়েছে যেন হাজার হাজার লোক। হাজার হাজার না হইলেও মনে হয়েছে হাজার হাজার। ওরা এতে দিগভ্রান্ত হয়ে ওই রাইফেল গাছগোড়ায় রাইখা আরেক গাছে উঠছে। ১৩ জন পাক আর্মি ধরা পড়ল। এবং ওদের গ্রামবাসীরাই পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে আবার লাশ বাঁশের সাথে বাঁইধে নদীর পাড়ে রাখছে। আমরা নিষেধ করছিলাম যে তোমরা মেরো না, কে শোনে কার কথা।

রাশেদ আহমেদ: আপনি শুরুতে যেটি বলছিলেন যে একটি সেক্যুলার বাংলাদেশের জন্য, সেক্যুলার রাষ্ট্রের জন্য এবং আধুনিক একটি রাষ্ট্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। আমরা ইদানিং একটা জিনিস লক্ষ্য করি যে অনেক মানুষের মধ্যে একটা সংকীর্ণতা বাসা বেঁধেছে, যেটি সেক্যুলার নয় এবং উগ্রপন্থীদের একটি উত্থান এখানে ঘটেছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আপনি দেখবেন, ধরুন একটা ছোট ঘটনা ফেসবুকে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে বিউটি পাল, তিনি একটি প্রাইমারি স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। উনি একটি গান যুক্ত করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। সেটার বিরুদ্ধে নানা রকমভাবে নোংরা মন্তব্য করা হয়েছে। এই যে আমাদের মগজের যে পরিবর্তন, সেই পরিবর্তন কেন হলো?

জেড আই খান পান্না: আপনি কি মনে করেন যে এটা পরিবর্তন? আমি যদি বলি যে তার কাউন্টার যেটা হইছে সেটা কি আপনি ফলো করছেন? সারা বাংলাদেশের স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী তারা যে সমবেতভাবে ফেসবুকে কাঁপায় দিছে ওই গানটা গেয়ে, এইটা কি মুভমেন্ট না? আপনি কি দেখেছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একজন সো কল্ড মসজিদ করতে গেছে, একটা ইয়ং ছেলে আযহারুল নাম, সে যখন বললো যে আমি মানুষ, এক হুজুর জিজ্ঞেস করছিল...

রাশেদ আহমেদ: তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে তুমি হিন্দু?

জেড আই খান পান্না: সে উত্তর দিছে ‘নো, আমি মানুষ ফার্স্ট’। একটা বাচ্চা ছেলে একটা বয়স্ক লোকরে এই উত্তর দেয়। দিস ইজ বাংলাদেশ। ইট ইজ রিয়াল বাংলাদেশ।

রাশেদ আহমেদ: কিন্তু এই জায়গাটাকে দাবায়ে রাখা হচ্ছে, তাদের অবদমিত করা হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে করা হচ্ছে, সেটা কি আপনি লক্ষ্য করছেন?

জেড আই খান পান্না: অবশ্যই লক্ষ্য করছি যে দেশ স্বাধীন হওয়ার এতো বছর পর প্রথম সংসদে জামায়াতে ইসলামী একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে ক্ষমতায় গেছে। ক্ষমতায় নাই, কিন্তু ক্ষমতার ভাগ পাচ্ছে। যে কারণে এইটা দেখা যাচ্ছে। এবং সব জায়গায়ই আপনি দেখবেন এই সংখ্যা এরা কিন্তু সংখ্যা লঘিষ্ঠ। জামায়াতে ইসলামী বা এই ইসলামী মৌলবাদী শক্তি অ্যাপারেন্টলি মনে হয় যে বিশাল বাহিনী। এরা সংখ্যালঘু। এবং মাইনরিটি পিপল অলওয়েজ ইউনাইটেড। যে কারণে তারা যেখানেই থাকে, যেমন ঢাকার মধ্যে আপনি দেখবেন যে এই আট নম্বর আসন যেটা, এইখানে জামায়াত সংখ্যাগরিষ্ঠ। ওইখানেই ওরা থাকবে মেস বানিয়ে...

রাশেদ আহমেদ: কিন্তু তাদের দাপট তো অনেক।

জেড আই খান পান্না: এখন আপনি যদি আমার দাপট দেখতেন করাচিতে, করাচিতে আমি ছিলাম ৬৮ থেকে ৭০ পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধু যখন গেছেন বঙ্গবন্ধুর সাথে করাচির মিটিং, কুয়েটার মিটিং, পেশোয়ারের মিটিং, লাহোরের মিটিং, রওয়ালপিন্ডি মিটিং এগুলো কিন্তু অর্গানাইজ আমিই করছিলাম এবং সাথে সাথে ছিলাম।

রাশেদ আহমেদ: আমি যেই আলোচনার মধ্যে থাকতে চেয়েছি, সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের সংকীর্ণমনা, উগ্রবাদীদের একটি উত্থান হয়েছে, এটি কি রাতারাতি হয়েছে?

জেড আই খান পান্না: মৌলবাদী শক্তি সব জায়গায়ই আছে। আমেরিকাতে নাই? আছে। এখানেও আছে, আবার মায়ানমারেও আছে। কিন্তু এরা সংখ্যালঘু। সংখ্যা লঘিষ্ঠ, সংখ্যাগুরু না কখনোই। কখনো কখনো অপরচুনিটি, কৌশলগতভাবে এরা ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু আসলে কোথাও এরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় না। সাধারণ মানুষ তারা শান্তি চায়, তারা পরস্পর পরস্পরের সাথে মিলে থাকতে চায়। ভারতবর্ষের ইতিহাস যদি আপনি দেখেন এইখানে ফার্স্ট সেক্যুলার স্টেট হইলো সম্রাট আকবরের সময়। কোন ধর্মটা শাসন করছে? তার সময় ধর্ম ছিল দ্বীন-ই ইলাহি। তো উনি কি পয়গম্বর? পয়গম্বর তো না। কিন্তু এইটা করছেন কেন? টু সেটআপ অ্যান্ড কন্ট্রোল দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। তার ১২ জন স্ত্রী ছিল, তার ভিতরে ছয় জনই ছিল রাজপুত। তার মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয়তম বেগম ছিলেন যোধাবাঈ। তো এই যদি দেখি আমরা, তো তার সময় তো কোনো সমস্যা ছিল না। এবং মোঘলরা যে এত বছর শাসন করছে কোথাও তো কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয় নাই।

রাশেদ আহমেদ: আমি বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসি। একটি বিষয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, সেটির মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্র পেয়েছি, পরবর্তীতে কি দেখি?

জেড আই খান পান্না: সেক্যুলার রাষ্ট্র পেয়েছিলাম।

রাশেদ আহমেদ: পেয়েছিলাম কিন্তু সেই জায়গায় বাংলাদেশ থাকে নাই নানা কারণে বিভিন্ন সময়। আরেকটি বিষয় যে ২৪-এর একটি আন্দোলন, সেই আন্দোলনের সময় মনে হচ্ছিল একটি নতুন বাংলাদেশ নতুন কাঠামো গড়ে উঠবে। এবং সেই আন্দোলনের কিছু কিছু সময় যারা আন্দোলন করেছিল তাদের মুক্তির জন্য আপনারও সোচ্চার অবস্থান ছিল। আপনি কী দেখলেন তারপর?

জেড আই খান পান্না: আমি তাহলে তার আগে যাই। ২০০৩ সালে যখন অপারেশন ক্লিন হার্ট হয়, তারপরে কিন্তু প্রতিবাদ আমি করছিলাম। আমার কোনো রাজনৈতিক দল নাই। আমি যেটা মনে করি যে এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী, তখনই সেটা হইছে আমি একা হইলেও বলছি। ২০০৩ সালে যখন দায়মুক্তি দেয় এবং র‍্যাব গঠন করে, চার সাল থেকে কিন্তু আমি র‍্যাবের বিরোধিতা করে আসছি, স্টিল টুডে। র‍্যাব মিরপুর থেকে একজন বাম নেতাকে গ্রেপ্তার করলো, গ্রেপ্তার করার পরে উনি তার মেয়েকে বললেন যে, “মা আমি যাচ্ছি হয়তো ফিরে আসব না”। তার ডেড বডি পাওয়া যায় পরদিন কুষ্টিয়ার মাঠে। লুঙ্গি পরা অবস্থায়। মোফাখখার চৌধুরী নাম ছিল। খুলনাতে এক জজ সাহেবের এজলাস থেকে তুলে নিয়ে রাস্তায় গুলি করছে। এবং জজরাও ভয় পেয়ে গেছে যে এরা সিভিল ড্রেসে কারা। পরে শুনলো যে এরা র‍্যাবের। তো অনেকে সন্তুষ্ট হয়েছে যে ইমিডিয়েট একটা অ্যাকশন। যাদের মেরে ফেলছে তারা ছিল নো ডাউট অফ ইট যে সমাজের দুষ্কৃতকারী। কিন্তু আমার প্রশ্ন হইলো যে দুষ্কৃতকারী কি না এটা আমি, আপনি বিচার করার কেউ না। ওনলি দ্য কোর্ট। এইখানে হলো রুল অব ল-এর সেন্স। সেইটা ছেড়ে আমি বারবার খুন করার পরে তারা বলল যে না এরা খারাপ লোক। খারাপ লোক হইলেও তো এটা পারে না, আপনারা অপোজ করেন, করলো না তারা। তো আমি অপোজ করে গেছি।

রাশেদ আহমেদ: ২৪-এর পর আপনি কী দেখলেন?

জেড আই খান পান্না: ২৪-এর পরে কেন দেখব? আপনি আসেন ৯০-তে। এরশাদের পতন ছিল যে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে। তিন জোটের রূপরেখা, সেটা কি বাস্তবায়ন হয়েছে? হয় নাই। সবাই বলে যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হবে এবং এটা স্বাধীন। কোথায় স্বাধীন? কী স্বাধীন? স্বাধীন না। স্বাধীন হইলে মন-মানসিকতার দিক থেকে স্বাধীনতা থাকতে হবে। এটা কাগজে কলমে দিলে হবে না। সাবেক প্রধান বিচারপতি সম্ভবত রুহুল আমিন সাহেব উনি ওয়ান ইলেভেনের পরে ১৭ নভেম্বর ডিক্লেয়ার করলো যে এটা স্বাধীন। তারপর আইসা বিচারপতি রিফাত আহমেদ সেও বলল যে স্বাধীন, স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়ে গেল। কী হয়েছে স্বাধীনের? উনি কি স্বাধীন ছিলেন? নট অ্যাট অল। আরও একটা আপনাকে বলি, আমাদের আইনটা বুঝতে হবে। আমাদের এই আইনগুলো করছে কিন্তু ব্রিটিশরা। কখন? সিপাহী মিউটিনির পর। সিপাহী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটেই কিন্তু এই আইনগুলো। স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে কোনো আইন হয় নাই। একাত্তরের প্রেক্ষাপটে কোনো আইন হয় নাই। বা ৪৭-এর প্রেক্ষাপটে কোনো আইন হয় নাই। ভারতে অনেক জায়গায় পরিবর্তন হয়েছে। হ্যাঁ, আমাদের যেটা সর্বোচ্চ অর্জন সেটা হলো আমাদের ৭২-এর সংবিধান। এইটা হলো আমাদের একটা অর্জন। আমি বলতে পারব যে পৃথিবীর মধ্যে যতগুলো সর্বশ্রেষ্ঠ শাসনতন্ত্র আছে তার মধ্যে এই একটা। ৭২ সংবিধান।

রাশেদ আহমেদ: কোন বৈশিষ্ট্য থেকে আপনি এটা বলছেন?

জেড আই খান পান্না: এইটা বলতেছি গণতান্ত্রিক এবং সেক্যুলার, এই দুটো দিক থেকে।

রাশেদ আহমেদ: কিন্তু এখন তো এইটা পরিবর্তনের এবং বাতিলের দাবিগুলো আসছে।

জেড আই খান পান্না: যতই পরিবর্তন হোক, ধরেন আমাকেই, আপনি যতই চেষ্টা করেন আমারে কিন্তু মোহাম্মদ আলী বা গামা বানাইতে পারবেন না। আমি এই স্ট্রাকচারের ভিতরে যতটুকু হয় ততটুকুই হতে পারব। এই কাঠামোতে আপনি এটাকে কিছুতেই নন-সেক্যুলার করতে পারবেন না। বা একটা ফান্ডামেন্টালিস্ট কনস্টিটিউশন করতে পারবেন না। তাইলে প্রত্যেকটা অক্ষর চেঞ্জ করতে হবে।

রাশেদ আহমেদ: এই জন্য সংবিধান বাতিলের কথা বলা হচ্ছে।

জেড আই খান পান্না: হ্যাঁ, সংবিধান বাতিলের কথা বলছে এরা। ২৪-এর পরে এই যে ধার করা আতেলরা আসলো।

রাশেদ আহমেদ: আপনি আলী রিয়াজের কথা বলছেন?

জেড আই খান পান্না: আলী রিয়াজ, এই আজকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তারপর আরও অনেকেই যারা আছে। তো সবই দেখলাম যে এ দেশের না, বিদেশের। তারা প্রথমে টার্গেট নিলো যে ৭২-এর সংবিধান। তারা এটাও উপলব্ধি করছে যে সংবিধান থাকলে তারা তাদের পারপাসটা সার্ভ করতে পারবে না।

রাশেদ আহমেদ: পারপাসটা কী তাদের?

জেড আই খান পান্না: পারপাসটা ছিল এটারে একটা মৌলবাদী রাষ্ট্র করা। নাথিং এলস। মৌলবাদী রাষ্ট্র করা। তারপরে গ্যাঞ্জাম লেগে গেল। লাগত। ওই মায়ানমারের মতোই হতো। এদের জন্য একটা সুবিধা হতো। লং টার্মের একটা প্ল্যান। যেটার আংশিক তারা সফলও হয়েছে। তারা মার্কিনীদের সাথে তো একটা চুক্তি করছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ইলেকশন, ৯ তারিখে সাইন করছে। এত কোনো ইথিকস-এর ভেতর পড়ে না, আর ল-এর ভেতরেও পড়ে না। তিন দিনও ওয়েট করতে পারল না।

রাশেদ আহমেদ: এটা ইউনূস সরকার করল?

জেড আই খান পান্না: হ্যাঁ, ইউনূস সরকার করল।

রাশেদ আহমেদ: এটার আমাদের সুবিধা কী হবে, অসুবিধা কী হবে?

জেড আই খান পান্না: একটা লং টার্মের আমরা মার্কিনীদের সাথে অর্থনৈতিক একটা চাপের মধ্যে বা অনেকটা করদ রাজ্যের মতো, পাপেট রাষ্ট্রের মতো হয়ে গেলাম। হয় নাই এখনও, হব। আপনি দেখেন না লাতিন আমেরিকার কোনো দেশ। ভেনিজুয়েলা আর মাদুরোকে তো উঠায়ে নিয়ে গেল। এটা কোনো সভ্যতার মধ্যে পড়ে? মানলাম মাদুরো সাংঘাতিক অটোক্রেটিক, দুর্দান্ত এক নটোরিয়াস ব্যক্তি। কিন্তু আরেক দেশ থেকে সোলজার আইসা তাকে পিক করে তুলে নিয়ে যাবে? এইটা কি সভ্যতার ভিতর পড়ে? এই হচ্ছে হিস্ট্রি অব দ্য ইউএস সিভিলাইজেশন।

রাশেদ আহমেদ: আপনি ইউনূসের ১৮ মাসে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

জেড আই খান পান্না: সব কর্মকাণ্ড নিয়েই সমালোচনা করেছি। তার ইথিকস, তার ফিলোসফি, তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সবগুলোই আমার কাছে অশোভন মনে হয়েছে।

রাশেদ আহমেদ: ইথিকসটা কী?

জেড আই খান পান্না: ইথিকস হইলো শোষণ-লুণ্ঠন চালানো। সেক্যুলারিজম-এর এগেইনস্টে এবং ডেস্ট্রাকশন-এর পক্ষে। দেখেন না আপনি, ইউনূস সেখনে বসতো পিছনে কলেমা তৈয়বা লেখা ছিল। হোয়্যার এজ ইউনূস একটা দিন নামাজ পড়ছে কিনা দেখেন। অনেকে তো তার ধর্ম সম্পর্কেও প্রশ্ন করে যে সে মুসলিম কি না। সে নাকি বিয়ের সময় ইহুদি হয়ে গিয়েছিল। কী হয়েছিল, এইসব শুনি আরকি। আই হ্যাভ নো ডকুমেন্টস। ধরলাম উনি মুসলিম। কিন্তু কখনোই তো দেখি নাই নামাজ পড়তে। এইবারই দেখলাম ঈদের নামাজ পড়তে। প্রথম যে কাজটা ইউনূস করল, তার সব ইনকাম ট্যাক্সগুলো মাফ করলো। গ্রামীণফোনের টাকা মাফ করলো। টেলিকমের এইটা মাফ করলো। এগুলো কার স্বার্থে? সে চেয়ারে বসে যে এটা করছে, ইটস অ্যাবসলিউটলি ইলিগ্যাল। অ্যাবসলিউটলি ইলিগ্যাল। আপনি কোনো রাষ্ট্রীয় কোনো পদে বইসা ব্যক্তিগত কোনো সম্পদ বা ব্যবসা-বাণিজ্য চালাইতে পারেন না। কিন্তু তাই করছেন। তারপর আবার কী নিছেন? গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি। তারপর জাপানে গিয়ে ম্যানপাওয়ারের লাইসেন্স নিছেন। যেখানেই দেখতে যাই না কেন, বিশ্বাস করেন এত ঘৃণা যে এই লোকটা বলে শিক্ষিত, কিন্তু কাজ করলো সম্পূর্ণ অশিক্ষিতের মতো। অশিক্ষিতও এতখানি অন্যায় করে না।

রাশেদ আহমেদ: মার্কিনীদের সঙ্গে যেই চুক্তি, সেই চুক্তি বলা হয়, মানে তাদের যুক্তি, যে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে যে অতিরিক্ত কর বসানো হয়েছে, সেটা মিনিমাইজ করার জন্য করা হয়েছে।

জেড আই খান পান্না: এইটা বললে তো হবে না। আমি বলি আপনাকে, গার্মেন্টসটা কোথায় যায়? শুধু কি মার্কিনে? ইউরোপে যায় কি না? আমি তো বলব যে সবচেয়ে বড় মার্কেট হইলো ইউরোপ। মার্কিন না। আর মার্কিনীরা তো কাপড় কিনবে। উলঙ্গ তো থাকবে না।

রাশেদ আহমেদ: ২৪-এ তো একটি গণআন্দোলন হয়েছে, সেটা অনস্বীকার্য এবং সাধারণ মানুষ ওই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

জেড আই খান পান্না: হ্যাঁ, সাধারণ মানুষ ছিল কিন্তু ওইভাবে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ছিল না। এইটা মনে করছে সরকার করছে, এখানে একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং রাখছে। আর সরকারের ভেতরে যারা ছিল তারা ছিল আরেকটু, আমি বলব যে ট্রেইটর, কিছু ট্রেইটর ছিল ভাইটাল পোস্টগুলোতে। যে কারণে ২৪-এর এই অদ্ভুত কাণ্ডটা এইভাবে হইছে। অদ্ভুত কাণ্ড না, একটা আন্দোলন। এইভাবে হইছে।

রাশেদ আহমেদ: জনগণকে এই আন্দোলনের মধ্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

জেড আই খান পান্না: এখন ভ্রান্ত এইটা সবার কাছে। আপনি রিকশাওয়ালার কাছে জিজ্ঞেস করেন, মাঝির কাছে জিজ্ঞেস করেন, কৃষকের কাছে জিজ্ঞেস করেন, সবাই বলবে যে শেখ হাসিনার আমলে ভালো ছিল। কেন বলে?বলতে পারেন যে এইটা নেগেটিভই। হ্যাঁ, আমিও বলি যে নেগেটিভই। কিন্তু কেন বলতেছে? সেটার কারণ তো বিশ্লেষণ করবেন। ল অ্যান্ড অর্ডার-এর দিক থেকে দেখেন কী অবস্থায়।

রাশেদ আহমেদ: ২৪-এ পর দুই বছর হলো। এই দুই বছরকে যদি মূল্যায়ন করতে বলি, তাহলে কীভাবে করবেন?

জেড আই খান পান্না: একটা ভ্রান্তিকাল। একটা প্রতারণার কাল। প্রতারণার ভেতর থেকে আমরা উত্তেজিত হই। এবং আমি আশা করব যে নিশ্চয়ই এই প্রতারণা এবং ভ্রান্তি এটা অতি শিগগিরই দূর হবে।

রাশেদ আহমেদ: কীভাবে হবে? সেটির কোনো পথ আপনি দেখতে পাচ্ছেন?

জেড আই খান পান্না: গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই হবে।

রাশেদ আহমেদ: গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি নির্বাচন হয়েছে, একটি সরকার এসেছে।

জেড আই খান পান্না: একটি সরকার আসছে। এই সরকারই চিন্তাভাবনা করবে। আমি আশা করি। যদি শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাইলে তারা চিন্তাভাবনা করে পথ বের করবে। রাষ্ট্র থাকলে পর তো রাষ্ট্র ক্ষমতার থাকার প্রশ্ন। রাষ্ট্র ঠিক করতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ভিত্তিতেই।

রাশেদ আহমেদ: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে কথা বলার জন্য।

জেড আই খান পান্না: আপনাকেও ধন্যবাদ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত