প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে কেবল সঠিক সময়ে মায়ের দুধ না পাওয়ার কারণে প্রাণ হারায় লাখ লাখ শিশু। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বিশ্বব্যাপী বুকের দুধ খাওয়ানোর অভ্যাসের হার বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে প্রতি বছর অন্তত ৮ লক্ষেরও বেশি নিষ্পাপ শিশুর অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তবে অত্যন্ত উদ্বেগের
বিষয় হলো, বাংলাদেশে জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার মাত্র
৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। এই বাস্তবতায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের টেকসই সুরক্ষায় সমন্বিত
উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন দেশের শীর্ষ স্থানীয় চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞগণ।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ মেডিকেল
বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)-এর শহীদ ডা. মিল্টন হলে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে
আয়োজিত এক সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় এসব তথ্য জানান বক্তারা। বিশ্ববিদ্যালয়টির নিওন্যাটোলজি
বিভাগ, ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগ এবং বাংলাদেশ নিওন্যাটাল ফোরাম যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানটির
আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি
হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ-এর কোষাধ্যক্ষ ডা. নাহরীন আখতার। ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন
বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. তাবাসুস পারভীন ও বাংলাদেশ নিওন্যাটাল ফোরামের সভাপতি ডা. মো.
মাহবুবুল হক যৌথভাবে এই বৈজ্ঞানিক সেশনে সভাপতিত্ব করেন। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা
করেন বিএমইউ এর নিওন্যাটোলজি বিভাগের ডা. সাদেকা চৌধুরী মনি।
মায়ের দুধ নবজাতকের
জন্য প্রকৃতির এক অমূল্য উপহার
অনুষ্ঠানে বিএমইউ-এর
নিওন্যাটাল (নবজাতক) বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. মো. আব্দুল মান্নান প্যানেল এক্সপার্ট
সেশনের মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন। সভায় ডা. সুফিয়া খাতুন, রেসিডেন্ট শিক্ষার্থী
ডা. শারমিন জাহান ও ডা. নাদিয়া শারমিন বিষয়ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে
বিএমইউ-এর কোষাধ্যক্ষ ডা. নাহরীন আখতার বলেন, "মায়ের বুকের দুধ নবজাতক ও মায়ের
জন্য এক অমূল্য উপহার। এটি একটি প্রমাণ ভিত্তিক কার্যকর উপায়, যা নবজাতকের জীবন রক্ষা
এবং সুস্থ ভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।"
আলোচকগণ বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড স্মরণ করিয়ে দিয়ে জোর দেন যে, জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। এরপর প্রথম ছয় মাস কেবল মায়ের দুধ
এবং ছয় মাস পর থেকে পরিপূরক খাবারের পাশাপাশি অন্তত দুই বছর বয়স পর্যন্ত দুধ খাওয়ানো
চালু রাখা উচিত। এটি শিশুর পুষ্টিহীনতা, কৃশতা ও স্থূলতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী সুরক্ষাবলয়
তৈরি করে।
ধসের মুখে দেশের মাতৃদুগ্ধ
পানের সূচক
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান
বিষয়ক সাময়িকী ‘দি ল্যানসেট’-এর গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বক্তারা আশঙ্কার বাণী শোনান।
তারা জানান, বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর প্রায় ১১.৬ শতাংশের
পেছনে কাজ করে অপর্যাপ্ত বা ভুল পদ্ধতিতে বুকের দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস।
বাংলাদেশে বর্তমানে
জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশে এবং
প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার নেমে এসেছে ৫৩ শতাংশে। পূর্ববর্তী তথ্য ও
হারের তুলনায় এই সূচকগুলোর এমন ধারাবাহিক অবক্ষয় অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে চিহ্নিত করেন
বিশেষজ্ঞরা। তারা সতর্ক করে বলেন, এই অবস্থার দ্রুত উত্তরণ ঘটাতে না পারলে শিশু স্বাস্থ্যের
জাতীয় অগ্রগতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
চলতি বছর ২০২৬ সালে
মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে; “টেকসই জীবনের সূচনায় বুকের দুধ
খাওয়ানো: যা কার্যকর, তা আরও শক্তিশালী করি”। বিশ্বজুড়ে প্রসূতি ও শিশুদের জন্য ‘উষ্ণ
সহায়তার শৃঙ্খল’ গড়ে তোলার ডাক দেওয়া হয়েছে এই আয়োজনের মাধ্যমে।
মা ও শিশুর সুরক্ষায়
যৌথ সামাজিক দায়বদ্ধতা
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের
মধ্যে ডা. মো. মজিবুর রহমান, ডা. তাহমিনা বেগম, ডা. সামিনা চৌধুরী ও ডা. সঞ্জয় কুমার
দে বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তারা বলেন, কোনো মা যেন একা এই যুদ্ধের মুখোমুখি না হন,
তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবীণ চিকিৎসাবিদ ডা.
তাহমিনা বেগম স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, "বুকের দুধ খাওয়ানো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয়
নয়। মায়েরা যখন দক্ষ ও সহানুভূতিশীল সহায়তা, পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক সহযোগিতা, মাতৃত্ববান্ধব
কর্মক্ষেত্র পান, তখন বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা আরও সফল ও টেকসই হয়।"
আলোচকরা জাতীয় পর্যায়ে
দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সেলিং প্রদান, শিশুবান্ধব হাসপাতাল গড়ে তোলা, মিডিয়া
ক্যাম্পেইন জোরদার এবং কর্মজীবী মায়েদের জন্য পর্যাপ্ত বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত
করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কর্মক্ষেত্রে শিশুদের দুধ খাওয়ানোর নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ
তৈরির আইনগত বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের তাগিদ দেন তারা।
পরিশেষে বিশেষজ্ঞরা
উল্লেখ করেন, পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সরকার; এই চার স্তম্ভের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই
মা ও শিশুর জন্য একটি পুষ্টিকর, নিরাপদ এবং সুন্দর ভবিষ্যতের পথ সুগম হতে পারে।

বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে কেবল সঠিক সময়ে মায়ের দুধ না পাওয়ার কারণে প্রাণ হারায় লাখ লাখ শিশু। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বিশ্বব্যাপী বুকের দুধ খাওয়ানোর অভ্যাসের হার বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে প্রতি বছর অন্তত ৮ লক্ষেরও বেশি নিষ্পাপ শিশুর অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তবে অত্যন্ত উদ্বেগের
বিষয় হলো, বাংলাদেশে জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার মাত্র
৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। এই বাস্তবতায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের টেকসই সুরক্ষায় সমন্বিত
উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন দেশের শীর্ষ স্থানীয় চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞগণ।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ মেডিকেল
বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)-এর শহীদ ডা. মিল্টন হলে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে
আয়োজিত এক সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় এসব তথ্য জানান বক্তারা। বিশ্ববিদ্যালয়টির নিওন্যাটোলজি
বিভাগ, ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগ এবং বাংলাদেশ নিওন্যাটাল ফোরাম যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানটির
আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি
হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ-এর কোষাধ্যক্ষ ডা. নাহরীন আখতার। ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন
বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. তাবাসুস পারভীন ও বাংলাদেশ নিওন্যাটাল ফোরামের সভাপতি ডা. মো.
মাহবুবুল হক যৌথভাবে এই বৈজ্ঞানিক সেশনে সভাপতিত্ব করেন। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা
করেন বিএমইউ এর নিওন্যাটোলজি বিভাগের ডা. সাদেকা চৌধুরী মনি।
মায়ের দুধ নবজাতকের
জন্য প্রকৃতির এক অমূল্য উপহার
অনুষ্ঠানে বিএমইউ-এর
নিওন্যাটাল (নবজাতক) বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. মো. আব্দুল মান্নান প্যানেল এক্সপার্ট
সেশনের মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন। সভায় ডা. সুফিয়া খাতুন, রেসিডেন্ট শিক্ষার্থী
ডা. শারমিন জাহান ও ডা. নাদিয়া শারমিন বিষয়ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে
বিএমইউ-এর কোষাধ্যক্ষ ডা. নাহরীন আখতার বলেন, "মায়ের বুকের দুধ নবজাতক ও মায়ের
জন্য এক অমূল্য উপহার। এটি একটি প্রমাণ ভিত্তিক কার্যকর উপায়, যা নবজাতকের জীবন রক্ষা
এবং সুস্থ ভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।"
আলোচকগণ বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড স্মরণ করিয়ে দিয়ে জোর দেন যে, জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। এরপর প্রথম ছয় মাস কেবল মায়ের দুধ
এবং ছয় মাস পর থেকে পরিপূরক খাবারের পাশাপাশি অন্তত দুই বছর বয়স পর্যন্ত দুধ খাওয়ানো
চালু রাখা উচিত। এটি শিশুর পুষ্টিহীনতা, কৃশতা ও স্থূলতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী সুরক্ষাবলয়
তৈরি করে।
ধসের মুখে দেশের মাতৃদুগ্ধ
পানের সূচক
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান
বিষয়ক সাময়িকী ‘দি ল্যানসেট’-এর গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বক্তারা আশঙ্কার বাণী শোনান।
তারা জানান, বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর প্রায় ১১.৬ শতাংশের
পেছনে কাজ করে অপর্যাপ্ত বা ভুল পদ্ধতিতে বুকের দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস।
বাংলাদেশে বর্তমানে
জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশে এবং
প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার নেমে এসেছে ৫৩ শতাংশে। পূর্ববর্তী তথ্য ও
হারের তুলনায় এই সূচকগুলোর এমন ধারাবাহিক অবক্ষয় অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে চিহ্নিত করেন
বিশেষজ্ঞরা। তারা সতর্ক করে বলেন, এই অবস্থার দ্রুত উত্তরণ ঘটাতে না পারলে শিশু স্বাস্থ্যের
জাতীয় অগ্রগতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
চলতি বছর ২০২৬ সালে
মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে; “টেকসই জীবনের সূচনায় বুকের দুধ
খাওয়ানো: যা কার্যকর, তা আরও শক্তিশালী করি”। বিশ্বজুড়ে প্রসূতি ও শিশুদের জন্য ‘উষ্ণ
সহায়তার শৃঙ্খল’ গড়ে তোলার ডাক দেওয়া হয়েছে এই আয়োজনের মাধ্যমে।
মা ও শিশুর সুরক্ষায়
যৌথ সামাজিক দায়বদ্ধতা
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের
মধ্যে ডা. মো. মজিবুর রহমান, ডা. তাহমিনা বেগম, ডা. সামিনা চৌধুরী ও ডা. সঞ্জয় কুমার
দে বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তারা বলেন, কোনো মা যেন একা এই যুদ্ধের মুখোমুখি না হন,
তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবীণ চিকিৎসাবিদ ডা.
তাহমিনা বেগম স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, "বুকের দুধ খাওয়ানো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয়
নয়। মায়েরা যখন দক্ষ ও সহানুভূতিশীল সহায়তা, পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক সহযোগিতা, মাতৃত্ববান্ধব
কর্মক্ষেত্র পান, তখন বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা আরও সফল ও টেকসই হয়।"
আলোচকরা জাতীয় পর্যায়ে
দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সেলিং প্রদান, শিশুবান্ধব হাসপাতাল গড়ে তোলা, মিডিয়া
ক্যাম্পেইন জোরদার এবং কর্মজীবী মায়েদের জন্য পর্যাপ্ত বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত
করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কর্মক্ষেত্রে শিশুদের দুধ খাওয়ানোর নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ
তৈরির আইনগত বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের তাগিদ দেন তারা।
পরিশেষে বিশেষজ্ঞরা
উল্লেখ করেন, পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সরকার; এই চার স্তম্ভের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই
মা ও শিশুর জন্য একটি পুষ্টিকর, নিরাপদ এবং সুন্দর ভবিষ্যতের পথ সুগম হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন