সংবাদ

ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষ আসলে কতটা দূরে?


শিপন কুমার রবিদাস
শিপন কুমার রবিদাস
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম

ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষ আসলে কতটা দূরে?
দলিত সম্প্রদায় থেকেও কি সংসদ সদস্য হওয়া সম্ভব?

ভোটের দিন ভোটারদের লম্বা লাইন দেখলে সচরাচর আমরা খুশি হই। ভোটারদের স্বতঃস্ফুর্তভাবে ভোট দেয়াকে অনেকে আবার গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্রের নিয়ামক কি কেবলমাত্র ভোটারদের দীর্ঘ লাইনই? না; বরং সমাজের প্রতিটি নাগরিকের রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিতের মধ্যেই লুক্কায়িত থাকে গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য। নাগরিকের পরিচয়, শ্রেণী, ধর্ম, জাত বা পেশা নির্বিশেষে সমান সুযোগ , মর্যাদা ও ক্ষমতায়নই গণতন্ত্রের সার কথা। সংবিধান আমাদের সেই স্বপ্নই দেখায়। কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় দাঁড়ালে প্রশ্ন জাগে: ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষ ঠিক কতটা দূরে?

প্রশ্নটিকে কেবল তাত্ত্বিক নয়; বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় হিসেবেও দেখছি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে কাজ করার সুযোগ আমাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে একেবারে ভেতর থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। আমি উপলব্ধি করেছি, নির্বাচন কেবল ভোটের প্রতিযোগিতা নয়; এটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামো, বৈষম্য, প্রতিনিধিত্ব এবং নাগরিক মর্যাদারও একটি প্রতিফলন।

প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত: ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা নয়, একটি সামাজিক দায়িত্ব

গত সংসদ নির্বাচনে আমি কেবল একজন প্রার্থী ছিলাম না; আমি এমন লাখ মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতীক ছিলাম, যাদের কণ্ঠ সংসদের দরজায় পৌঁছায় না। কোনো ব্যক্তিগত পদ-পদবীর আকাক্সক্ষা থেকে আমার প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, নীতিনির্ধারণের টেবিলে আমাদের কণ্ঠস্বর না থাকলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বারবার উপেক্ষিত থেকে যায় (কখনোবা যেভাবে চাই সেভাবে উপস্থাপন করা হয় না)। দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি অনুভব করেছি, আমাদের নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু আমাদের সঙ্গে আলোচনা খুব কম হয়। একইভাবে আমাদের জন্য নীতি তৈরি হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণে আমাদের অংশগ্রহণ সীমিত। মূলত এই বাস্তবতাই আমাকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার নৈতিক শক্তি জুগিয়েছে।

আমার বারবারই মনে হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও সরকারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনুপস্থিত। ‘অন্তর্ভূক্তি’ শব্দটি মনে হয়েছে: কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নাই। সবখানেই কেমন যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার বা স্বযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়েছে। স্বাধীনতার এতটা বছর পরেও ‘যেই লাউ সেই কদু’ টাইপের ভূমিকা আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। আসলে সেই রক্তক্ষরণের ক্ষত থেকেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অদম্য ইচ্ছে। তারও আগের প্রেক্ষিত যদি উল্লেখ করতে হয়, তবে সেটি নেপালে। ২০২৪ সালে বিরতিহীনভাবে নেপালের দলিত বিষয়ক গবেষণার কাজে মধেশ প্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে ভ্রমনসহ অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছিল। কাজের অংশ হিসেবে পরিচয় হয় ‘বহুজন একতা পার্টি-নেপাল’ এর অধ্যক্ষ হরিনন্দন আম্বেদকর এবং সচিব জিতেন্দ্র রামের সঙ্গে। এর আগে অবশ্য ভারতের উত্তর প্রদেশের বহিন মায়াবতী’র নেতৃত্বাধীন ‘বহুজন সমাজ পার্টি’ ও বাবা সাহেব আম্বেদকরের আদর্শে পরিচালিক ‘রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়া (আরপিআই)’ এর বিষয়ে জানার আগ্রহের জায়গা থেকে কিছুটা ধারণা ছিল। মোদ্দাকথা, উপমহাদেশের তফসিলি, আদিবাসী, দলিতসহ অন্য অনগ্রসর অংশের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার ব্যপক আগ্রহ কাজ করে বরাবরই।

যাহোক, ললিতপুরে সাক্ষাৎকালে হরিনন্দন বাবু বাংলাদেশে দলিত আন্দোলনের বিষয়ে আমার কাছ থেকে জানতে চাইলে মোটামুটি একটা ধারণা দিই। লম্বা আলাপ শেষে তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কেবলমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। সামাজিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংগঠন দিয়ে নয়।’ এই কথাটিই বারংবার আমার মাথায় ঘুরতে থাকে। আসলেই তো, সামাজিক সংগঠন দিয়ে সামাজিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা যায়। ধর্মীয় সংগঠনের কাজ ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে আধ্যাতিকতার চর্চা। আর সাংস্কৃতিক সংগঠন সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারে ভূমিকা রাখে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া বলা চলে সব উদ্যোগই অসাড়, বৃথা। একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জায়গায় পৌঁছাতে পারলেই কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের অংশ হওয়া যায়, অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন হস্তগত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের দৃষ্টিতে আসা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিবেশি দেশ যখন তফসিলি জনগোষ্ঠীর অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, কোটা প্রবর্তন, সংখ্যালঘু কমিশন/ সেল/ মন্ত্রণালয় চলমান রেখেছে, ঠিক সেই সময়টাতে বাংলাদেশে স্বীকৃতি ও অস্তিত্ব জানান দেয়ার পর্বে আছি আমরা। সরকার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বের দাবি সেখানেই অনেকটাই সুদূর পরাহত। 

বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অনুপস্থিতি ও মহান জাতীয় সংসদে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কন্ঠস্বরের আবশ্যকতা বিবেচনায় আমি গত সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে প্রার্থী হয়েছিলাম। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমর্থনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আমাকে ‘কাস্তে’ প্রতীকে মনোয়ন দেয়। এখানে উল্লেখ করা ভালো, ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) প্রার্থী হতে বাম গণতান্ত্রিক জোটভূক্ত বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি হতে ‘কোদাল’ প্রতীকে মনোনয়ন নিয়েছিলাম। কিন্তু বগুড়ার দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলতে সংসদে যেতে চান শিপন রবিদাস’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই লাগাতার হুমকি, ভীতি প্রদর্শন ও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে থাকে একটি চক্র। এমনকি এলাকায় ‘মুচির ছোলের খুব সাহস হইছে’ বলেও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। আমার পরিবার অত্যন্ত গরীব ও ক্ষমতাহীন বিবেচনায় পরিবার থেকেই নির্বাচন না করার অনুরোধ আসে। বাধ্য হয়ে সেখানেই থেমে যেতে হয় আমাকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নিতে সক্ষম হয়েছি। গণমানুষের কাছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কন্ঠকে পৌঁছাতে পেরেছি ভেবে নিজের মধ্যে আত্মতুষ্টি কাজ করে। দিনশেষে ১ হাজার ৭৮২ জন মানুষ শত প্রতিকূলতা সত্বেও আমার ওপর ভরসা রেখেছেন, বিষয়টি আমাকে আগামীর জন্য উৎসাহ জোগায়। স্বস্তি দেয়।

নির্বাচনী মাঠ আমাকে কী শিখিয়েছে

নির্বাচনী প্রচারণায় মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার সময় আমি বাংলাদেশের আরেকটি মুখ দেখেছি। মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা এমন জনপ্রতিনিধি চায়, যিনি নির্বাচনের পরে তাদের পাশে থাকবেন। একই সঙ্গে আমি দেখেছি, সাধারণ মানুষ একজন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রার্থীকে কৌতূহল নিয়ে দেখেন। অনেকেই জানতে চেয়েছেন, ‘আপনারা কি সত্যিই নির্বাচন করেন?’, ‘দলিত সম্প্রদায় থেকেও কি সংসদ সদস্য হওয়া সম্ভব?’ এই প্রশ্নগুলো কেবল কৌতূহল নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কারণ আমাদের সমাজ এখনো এমন প্রতিনিধিত্বকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে শেখেনি।

ক্ষমতার অদৃশ্য দেয়াল

নির্বাচনের সময় আমি উপলব্ধি করেছি, ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথে কেবল ভোটই বাধা নয়। অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সাংগঠনিক শক্তি, সামাজিক নেটওয়ার্ক, গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক; এসবই ক্ষমতার বাস্তব উপাদান। একজন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রার্থীকে তাই একই সঙ্গে বহু স্তরের অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। আইন সবার জন্য সমান হতে পারে, কিন্তু বাস্তব প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমান নয়। তাছাড়া হাতেগোণা মনমাধ্যম ব্যতীত মিডিয়ার দৃষ্টি যে প্রভাবশালীর দিকেই থাকে সেটি দৃশ্যমান হয়েছে।

জাতপাতের ধারণা প্রকট

তৃণমূল পর্যায়ে জাতপাতের ধারণা প্রকট। মনোনয়ন পত্র উত্তোলনের পর যখন ধুনটে যাই। তখনই প্রস্তাব আসে, যাতে আমার প্রচারপত্রে ‘রবিদাস’ পদবী উল্লেখ না করি। তার চেয়ে বরং ‘শিপন কুমার এমএ’ লিখলে ভালো হবে বলেও পরামর্শ দেয়া হয়। তাতেই অনুমান করতে পারি, রবিদাস (চর্মকার) সম্প্রদায়ের প্রার্থীকে গ্রহণ করার মতো মানসিকতার ঘাটতি রয়েছে এখনও।

প্রতিনিধিত্বের সংকট

বাংলাদেশে দলিত, হরিজন, রবিদাস, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বেদে, চা-শ্রমিক, জেলে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বহু জনগোষ্ঠী এখনও জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব পায় না। গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্বের এই ঘাটতি শুধু একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রেরও ক্ষতি। কারণ বৈচিত্র্যহীন সিদ্ধান্ত প্রায়ই বৈচিত্র্যময় সমাজের বাস্তবতা ধারণ করতে পারে না।

সংবিধানের প্রতিশ্রুতি

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১ অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের কথা বলে। অনুচ্ছেদ ১৯ সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বৈষম্য হ্রাসের নির্দেশনা দেয়। অনুচ্ছেদ ২৭ সব নাগরিকের সমতার নিশ্চয়তা দেয় এবং অনুচ্ছেদ ২৮ বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, সাংবিধানিক সমতা কি রাজনৈতিক সমতায় রূপ নিয়েছে? যখন একজন প্রান্তিক নাগরিক নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে আর্থিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, তখন বোঝা যায় যে আইনি সমতা ও বাস্তব সমতার মধ্যে এখনও একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। দলীয় নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরে দলিত ও অন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শুধু ভোটের সময় নয়, সারা বছর তাদের নেতৃত্ব বিকাশে বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয় কমানো, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং তরুণ নেতৃত্ব তৈরির জন্য জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।

একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে; ক্ষমতার কেন্দ্র কখনো নিজে থেকে প্রান্তের মানুষের কাছে আসে না; প্রান্তের মানুষকেই সংগঠিত শক্তি, গণআন্দোলন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। আমি হয়তো নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে সংসদে পৌঁছাতে পারিনি, কিন্তু এই যাত্রা আমাকে শিখিয়েছে যে প্রান্তের মানুষের স্বপ্নকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা সম্ভব। প্রতিটি প্রচারণা, প্রতিটি গণসংযোগ, প্রতিটি সংলাপ সেই পরিবর্তনের একটি ধাপ।

এখন কী করা দরকার

বাংলাদেশকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রে পরিণত করতে হলে:

 রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

 জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি চালু করতে হবে।

 বৈষম্যবিরোধী আইন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

 প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে।

শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে একই নীতির আওতায় দেখতে হবে।

ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষের দূরত্ব কমানো কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। ক্ষমতার কেন্দ্রের প্রকৃত শক্তি তার দেয়ালের উচ্চতায় নয়; বরং তার দরজা কতটা উন্মুক্ত- সেটিতেই। আমি বিশ্বাস করি, যে দিন একজন দলিত শিশুও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারবে: ‘আমিও একদিন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হতে পারি’- সেদিনই আমরা বলতে পারব, বাংলাদেশের গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।

[লেখক: সম্পাদক, দলিত ও বঞ্চিত সমাচার ও সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, বগুড়া-৫, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬


ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষ আসলে কতটা দূরে?

প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ভোটের দিন ভোটারদের লম্বা লাইন দেখলে সচরাচর আমরা খুশি হই। ভোটারদের স্বতঃস্ফুর্তভাবে ভোট দেয়াকে অনেকে আবার গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্রের নিয়ামক কি কেবলমাত্র ভোটারদের দীর্ঘ লাইনই? না; বরং সমাজের প্রতিটি নাগরিকের রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিতের মধ্যেই লুক্কায়িত থাকে গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য। নাগরিকের পরিচয়, শ্রেণী, ধর্ম, জাত বা পেশা নির্বিশেষে সমান সুযোগ , মর্যাদা ও ক্ষমতায়নই গণতন্ত্রের সার কথা। সংবিধান আমাদের সেই স্বপ্নই দেখায়। কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় দাঁড়ালে প্রশ্ন জাগে: ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষ ঠিক কতটা দূরে?

প্রশ্নটিকে কেবল তাত্ত্বিক নয়; বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় হিসেবেও দেখছি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে কাজ করার সুযোগ আমাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে একেবারে ভেতর থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। আমি উপলব্ধি করেছি, নির্বাচন কেবল ভোটের প্রতিযোগিতা নয়; এটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামো, বৈষম্য, প্রতিনিধিত্ব এবং নাগরিক মর্যাদারও একটি প্রতিফলন।

প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত: ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা নয়, একটি সামাজিক দায়িত্ব

গত সংসদ নির্বাচনে আমি কেবল একজন প্রার্থী ছিলাম না; আমি এমন লাখ মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতীক ছিলাম, যাদের কণ্ঠ সংসদের দরজায় পৌঁছায় না। কোনো ব্যক্তিগত পদ-পদবীর আকাক্সক্ষা থেকে আমার প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, নীতিনির্ধারণের টেবিলে আমাদের কণ্ঠস্বর না থাকলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বারবার উপেক্ষিত থেকে যায় (কখনোবা যেভাবে চাই সেভাবে উপস্থাপন করা হয় না)। দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি অনুভব করেছি, আমাদের নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু আমাদের সঙ্গে আলোচনা খুব কম হয়। একইভাবে আমাদের জন্য নীতি তৈরি হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণে আমাদের অংশগ্রহণ সীমিত। মূলত এই বাস্তবতাই আমাকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার নৈতিক শক্তি জুগিয়েছে।

আমার বারবারই মনে হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও সরকারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনুপস্থিত। ‘অন্তর্ভূক্তি’ শব্দটি মনে হয়েছে: কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নাই। সবখানেই কেমন যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার বা স্বযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়েছে। স্বাধীনতার এতটা বছর পরেও ‘যেই লাউ সেই কদু’ টাইপের ভূমিকা আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। আসলে সেই রক্তক্ষরণের ক্ষত থেকেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অদম্য ইচ্ছে। তারও আগের প্রেক্ষিত যদি উল্লেখ করতে হয়, তবে সেটি নেপালে। ২০২৪ সালে বিরতিহীনভাবে নেপালের দলিত বিষয়ক গবেষণার কাজে মধেশ প্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে ভ্রমনসহ অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছিল। কাজের অংশ হিসেবে পরিচয় হয় ‘বহুজন একতা পার্টি-নেপাল’ এর অধ্যক্ষ হরিনন্দন আম্বেদকর এবং সচিব জিতেন্দ্র রামের সঙ্গে। এর আগে অবশ্য ভারতের উত্তর প্রদেশের বহিন মায়াবতী’র নেতৃত্বাধীন ‘বহুজন সমাজ পার্টি’ ও বাবা সাহেব আম্বেদকরের আদর্শে পরিচালিক ‘রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়া (আরপিআই)’ এর বিষয়ে জানার আগ্রহের জায়গা থেকে কিছুটা ধারণা ছিল। মোদ্দাকথা, উপমহাদেশের তফসিলি, আদিবাসী, দলিতসহ অন্য অনগ্রসর অংশের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার ব্যপক আগ্রহ কাজ করে বরাবরই।

যাহোক, ললিতপুরে সাক্ষাৎকালে হরিনন্দন বাবু বাংলাদেশে দলিত আন্দোলনের বিষয়ে আমার কাছ থেকে জানতে চাইলে মোটামুটি একটা ধারণা দিই। লম্বা আলাপ শেষে তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কেবলমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। সামাজিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংগঠন দিয়ে নয়।’ এই কথাটিই বারংবার আমার মাথায় ঘুরতে থাকে। আসলেই তো, সামাজিক সংগঠন দিয়ে সামাজিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা যায়। ধর্মীয় সংগঠনের কাজ ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে আধ্যাতিকতার চর্চা। আর সাংস্কৃতিক সংগঠন সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারে ভূমিকা রাখে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া বলা চলে সব উদ্যোগই অসাড়, বৃথা। একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জায়গায় পৌঁছাতে পারলেই কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের অংশ হওয়া যায়, অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন হস্তগত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের দৃষ্টিতে আসা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিবেশি দেশ যখন তফসিলি জনগোষ্ঠীর অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, কোটা প্রবর্তন, সংখ্যালঘু কমিশন/ সেল/ মন্ত্রণালয় চলমান রেখেছে, ঠিক সেই সময়টাতে বাংলাদেশে স্বীকৃতি ও অস্তিত্ব জানান দেয়ার পর্বে আছি আমরা। সরকার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বের দাবি সেখানেই অনেকটাই সুদূর পরাহত। 

বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অনুপস্থিতি ও মহান জাতীয় সংসদে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কন্ঠস্বরের আবশ্যকতা বিবেচনায় আমি গত সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে প্রার্থী হয়েছিলাম। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমর্থনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আমাকে ‘কাস্তে’ প্রতীকে মনোয়ন দেয়। এখানে উল্লেখ করা ভালো, ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) প্রার্থী হতে বাম গণতান্ত্রিক জোটভূক্ত বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি হতে ‘কোদাল’ প্রতীকে মনোনয়ন নিয়েছিলাম। কিন্তু বগুড়ার দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলতে সংসদে যেতে চান শিপন রবিদাস’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই লাগাতার হুমকি, ভীতি প্রদর্শন ও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে থাকে একটি চক্র। এমনকি এলাকায় ‘মুচির ছোলের খুব সাহস হইছে’ বলেও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। আমার পরিবার অত্যন্ত গরীব ও ক্ষমতাহীন বিবেচনায় পরিবার থেকেই নির্বাচন না করার অনুরোধ আসে। বাধ্য হয়ে সেখানেই থেমে যেতে হয় আমাকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নিতে সক্ষম হয়েছি। গণমানুষের কাছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কন্ঠকে পৌঁছাতে পেরেছি ভেবে নিজের মধ্যে আত্মতুষ্টি কাজ করে। দিনশেষে ১ হাজার ৭৮২ জন মানুষ শত প্রতিকূলতা সত্বেও আমার ওপর ভরসা রেখেছেন, বিষয়টি আমাকে আগামীর জন্য উৎসাহ জোগায়। স্বস্তি দেয়।

নির্বাচনী মাঠ আমাকে কী শিখিয়েছে

নির্বাচনী প্রচারণায় মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার সময় আমি বাংলাদেশের আরেকটি মুখ দেখেছি। মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা এমন জনপ্রতিনিধি চায়, যিনি নির্বাচনের পরে তাদের পাশে থাকবেন। একই সঙ্গে আমি দেখেছি, সাধারণ মানুষ একজন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রার্থীকে কৌতূহল নিয়ে দেখেন। অনেকেই জানতে চেয়েছেন, ‘আপনারা কি সত্যিই নির্বাচন করেন?’, ‘দলিত সম্প্রদায় থেকেও কি সংসদ সদস্য হওয়া সম্ভব?’ এই প্রশ্নগুলো কেবল কৌতূহল নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কারণ আমাদের সমাজ এখনো এমন প্রতিনিধিত্বকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে শেখেনি।

ক্ষমতার অদৃশ্য দেয়াল

নির্বাচনের সময় আমি উপলব্ধি করেছি, ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথে কেবল ভোটই বাধা নয়। অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সাংগঠনিক শক্তি, সামাজিক নেটওয়ার্ক, গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক; এসবই ক্ষমতার বাস্তব উপাদান। একজন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রার্থীকে তাই একই সঙ্গে বহু স্তরের অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। আইন সবার জন্য সমান হতে পারে, কিন্তু বাস্তব প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমান নয়। তাছাড়া হাতেগোণা মনমাধ্যম ব্যতীত মিডিয়ার দৃষ্টি যে প্রভাবশালীর দিকেই থাকে সেটি দৃশ্যমান হয়েছে।

জাতপাতের ধারণা প্রকট

তৃণমূল পর্যায়ে জাতপাতের ধারণা প্রকট। মনোনয়ন পত্র উত্তোলনের পর যখন ধুনটে যাই। তখনই প্রস্তাব আসে, যাতে আমার প্রচারপত্রে ‘রবিদাস’ পদবী উল্লেখ না করি। তার চেয়ে বরং ‘শিপন কুমার এমএ’ লিখলে ভালো হবে বলেও পরামর্শ দেয়া হয়। তাতেই অনুমান করতে পারি, রবিদাস (চর্মকার) সম্প্রদায়ের প্রার্থীকে গ্রহণ করার মতো মানসিকতার ঘাটতি রয়েছে এখনও।

প্রতিনিধিত্বের সংকট

বাংলাদেশে দলিত, হরিজন, রবিদাস, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বেদে, চা-শ্রমিক, জেলে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বহু জনগোষ্ঠী এখনও জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব পায় না। গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্বের এই ঘাটতি শুধু একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রেরও ক্ষতি। কারণ বৈচিত্র্যহীন সিদ্ধান্ত প্রায়ই বৈচিত্র্যময় সমাজের বাস্তবতা ধারণ করতে পারে না।

সংবিধানের প্রতিশ্রুতি

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১ অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের কথা বলে। অনুচ্ছেদ ১৯ সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বৈষম্য হ্রাসের নির্দেশনা দেয়। অনুচ্ছেদ ২৭ সব নাগরিকের সমতার নিশ্চয়তা দেয় এবং অনুচ্ছেদ ২৮ বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, সাংবিধানিক সমতা কি রাজনৈতিক সমতায় রূপ নিয়েছে? যখন একজন প্রান্তিক নাগরিক নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে আর্থিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, তখন বোঝা যায় যে আইনি সমতা ও বাস্তব সমতার মধ্যে এখনও একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। দলীয় নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরে দলিত ও অন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শুধু ভোটের সময় নয়, সারা বছর তাদের নেতৃত্ব বিকাশে বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয় কমানো, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং তরুণ নেতৃত্ব তৈরির জন্য জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।

একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে; ক্ষমতার কেন্দ্র কখনো নিজে থেকে প্রান্তের মানুষের কাছে আসে না; প্রান্তের মানুষকেই সংগঠিত শক্তি, গণআন্দোলন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। আমি হয়তো নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে সংসদে পৌঁছাতে পারিনি, কিন্তু এই যাত্রা আমাকে শিখিয়েছে যে প্রান্তের মানুষের স্বপ্নকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা সম্ভব। প্রতিটি প্রচারণা, প্রতিটি গণসংযোগ, প্রতিটি সংলাপ সেই পরিবর্তনের একটি ধাপ।

এখন কী করা দরকার

বাংলাদেশকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রে পরিণত করতে হলে:

 রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

 জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি চালু করতে হবে।

 বৈষম্যবিরোধী আইন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

 প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে।

শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে একই নীতির আওতায় দেখতে হবে।

ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষের দূরত্ব কমানো কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। ক্ষমতার কেন্দ্রের প্রকৃত শক্তি তার দেয়ালের উচ্চতায় নয়; বরং তার দরজা কতটা উন্মুক্ত- সেটিতেই। আমি বিশ্বাস করি, যে দিন একজন দলিত শিশুও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারবে: ‘আমিও একদিন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হতে পারি’- সেদিনই আমরা বলতে পারব, বাংলাদেশের গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।

[লেখক: সম্পাদক, দলিত ও বঞ্চিত সমাচার ও সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, বগুড়া-৫, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত