সংবাদ

অধিকার চর্চায় চাই পরমতসহিষ্ণুতা


সিরাজ প্রামাণিক
সিরাজ প্রামাণিক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৯ এএম

অধিকার চর্চায় চাই পরমতসহিষ্ণুতা

মুক্তচিন্তা বা বাকস্বাধীনতা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। প্রশ্ন হলো, বাকস্বাধীনতার সীমানা কতটুকু? আর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে এর পরিণতিই বা কী?

ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু দৃষ্টান্ত

ধর্ম অবমাননা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধিতা করার কারণে অতীতে এবং বর্তমানে বহু বিতর্ক ও শাস্তির নজির রয়েছে।

কোপারনিকাসের ট্র‍্যাজেডি: পোলিশ বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাস যখন গাণিতিক সূত্রে প্রমাণ করলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন তৎকালীন খ্রিষ্টান গির্জার পাদ্রিরা বাইবেলের ব্যাখ্যার পরিপন্থী হওয়ায় তার বইটি নিষিদ্ধ করেন। ধর্মীয় যাজকদের ক্ষোভের মুখে পড়ে তাকে নির্মমভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

সালমান রুশদী প্রসঙ্গ: গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষের দিকে (মূলত ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত) ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বইটির মাধ্যমে তীব্র ধর্ম অবমাননার দায়ে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনী লেখক সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

সাম্প্রতিক পাকিস্তান ও বাংলাদেশ: সম্প্রতি ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (সা.) সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করার অপরাধে ‘তৈমুর’ নামের এক ব্যক্তিকে পাকিস্তানের সন্ত্রাস দমন আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। বাংলাদেশেও ধর্মীয় উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়ার নজির রয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনে বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা

অনেকেই মনে করেন, বাকস্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তা-ই বলা বা লেখার অবাধ লাইসেন্স। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করে।

মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (১৯৪৮): এর ১৯ নম্বর ধারায় বাকস্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হলেও ১২ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি কিংবা সম্মান ও সুনামের ওপর খেয়ালখুশিমতো আক্রমণ করা চলবে না।

মানবাধিকার কনভেনশন (১৯৬১): এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সমর্থন করার পাশাপাশি বলা হয়েছে, “বাকস্বাধীনতা ব্যক্তির মর্যাদা, জনগণের মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার প্রতি আক্রমণাত্মক হতে পারবে না।”

সুতরাং, স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে কাউকে গালি দেওয়া, বিদ্বেষ ছড়ানো বা মিথ্যাচার করা কখনোই বাকস্বাধীনতা হতে পারে না। বাকস্বাধীনতা মানে সত্য প্রকাশের অধিকার, অন্যকে আঘাত করার অস্ত্র নয়।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শাস্তি

আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ২৯৫ক): স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে লিখিত, মৌখিক বা দৃশ্যমান অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে কোনো নাগরিকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া বা অবমাননার চেষ্টা করা হলে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (ধারা ৯৯): কোনো সংবাদপত্রে রাষ্ট্রবিরোধী, নাগরিকদের মধ্যে শত্রুতা-ঘৃণা সৃষ্টিকারী বা ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাতকারী কিছু প্রকাশ করা হলে সরকার উক্ত সংবাদপত্রের সংশ্লিষ্ট কপিগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।

সাইবার/ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: ওয়েবসাইট বা যেকোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো মিথ্যা, অশ্লীল, মানহানিকর বা উসকানিমূলক তথ্য প্রকাশ ও সম্প্রচার করা হলে অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।

আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে মামলার বিধান

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা বাস্তবে আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসকে অবমাননা করে, তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এর জন্য দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে হবে।

কী করবেন এবং কোথায় মামলা করবেন?

১. থানায় এজাহার: অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য, স্ক্রিনশট বা প্রমাণাদিসহ আপনার নিকটস্থ থানায় গিয়ে এজাহার বা মামলা দায়ের করতে পারেন।

২. আদালতে সিআর মামলা: থানা যদি কোনো কারণে মামলা না নেয়, তবে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি নালিশি মামলা দায়ের করা যায়।

৩. সাইবার ক্রাইম ইউনিট: ডিজিটাল মাধ্যমে ধর্ম অবমাননা হলে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে লিখিত অভিযোগ বা অনলাইনের মাধ্যমে প্রমাণ জমা দিয়ে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

উপসংহার

পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি। নিজের অধিকার চর্চা করতে গিয়ে যেন অন্যের বিশ্বাসে আঘাত না লাগে, এই সচেতনতা আমাদের সবার থাকা উচিত।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


অধিকার চর্চায় চাই পরমতসহিষ্ণুতা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মুক্তচিন্তা বা বাকস্বাধীনতা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। প্রশ্ন হলো, বাকস্বাধীনতার সীমানা কতটুকু? আর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে এর পরিণতিই বা কী?

ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু দৃষ্টান্ত

ধর্ম অবমাননা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধিতা করার কারণে অতীতে এবং বর্তমানে বহু বিতর্ক ও শাস্তির নজির রয়েছে।

কোপারনিকাসের ট্র‍্যাজেডি: পোলিশ বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাস যখন গাণিতিক সূত্রে প্রমাণ করলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন তৎকালীন খ্রিষ্টান গির্জার পাদ্রিরা বাইবেলের ব্যাখ্যার পরিপন্থী হওয়ায় তার বইটি নিষিদ্ধ করেন। ধর্মীয় যাজকদের ক্ষোভের মুখে পড়ে তাকে নির্মমভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

সালমান রুশদী প্রসঙ্গ: গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষের দিকে (মূলত ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত) ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বইটির মাধ্যমে তীব্র ধর্ম অবমাননার দায়ে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনী লেখক সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

সাম্প্রতিক পাকিস্তান ও বাংলাদেশ: সম্প্রতি ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (সা.) সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করার অপরাধে ‘তৈমুর’ নামের এক ব্যক্তিকে পাকিস্তানের সন্ত্রাস দমন আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। বাংলাদেশেও ধর্মীয় উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়ার নজির রয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনে বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা

অনেকেই মনে করেন, বাকস্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তা-ই বলা বা লেখার অবাধ লাইসেন্স। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করে।

মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (১৯৪৮): এর ১৯ নম্বর ধারায় বাকস্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হলেও ১২ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি কিংবা সম্মান ও সুনামের ওপর খেয়ালখুশিমতো আক্রমণ করা চলবে না।

মানবাধিকার কনভেনশন (১৯৬১): এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সমর্থন করার পাশাপাশি বলা হয়েছে, “বাকস্বাধীনতা ব্যক্তির মর্যাদা, জনগণের মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার প্রতি আক্রমণাত্মক হতে পারবে না।”

সুতরাং, স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে কাউকে গালি দেওয়া, বিদ্বেষ ছড়ানো বা মিথ্যাচার করা কখনোই বাকস্বাধীনতা হতে পারে না। বাকস্বাধীনতা মানে সত্য প্রকাশের অধিকার, অন্যকে আঘাত করার অস্ত্র নয়।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শাস্তি

আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ২৯৫ক): স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে লিখিত, মৌখিক বা দৃশ্যমান অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে কোনো নাগরিকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া বা অবমাননার চেষ্টা করা হলে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (ধারা ৯৯): কোনো সংবাদপত্রে রাষ্ট্রবিরোধী, নাগরিকদের মধ্যে শত্রুতা-ঘৃণা সৃষ্টিকারী বা ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাতকারী কিছু প্রকাশ করা হলে সরকার উক্ত সংবাদপত্রের সংশ্লিষ্ট কপিগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।

সাইবার/ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: ওয়েবসাইট বা যেকোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো মিথ্যা, অশ্লীল, মানহানিকর বা উসকানিমূলক তথ্য প্রকাশ ও সম্প্রচার করা হলে অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।

আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে মামলার বিধান

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা বাস্তবে আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসকে অবমাননা করে, তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এর জন্য দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে হবে।

কী করবেন এবং কোথায় মামলা করবেন?

১. থানায় এজাহার: অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য, স্ক্রিনশট বা প্রমাণাদিসহ আপনার নিকটস্থ থানায় গিয়ে এজাহার বা মামলা দায়ের করতে পারেন।

২. আদালতে সিআর মামলা: থানা যদি কোনো কারণে মামলা না নেয়, তবে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি নালিশি মামলা দায়ের করা যায়।

৩. সাইবার ক্রাইম ইউনিট: ডিজিটাল মাধ্যমে ধর্ম অবমাননা হলে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে লিখিত অভিযোগ বা অনলাইনের মাধ্যমে প্রমাণ জমা দিয়ে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

উপসংহার

পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি। নিজের অধিকার চর্চা করতে গিয়ে যেন অন্যের বিশ্বাসে আঘাত না লাগে, এই সচেতনতা আমাদের সবার থাকা উচিত।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত