জন্ম ও মৃত্যুর মতো মানুষের জীবনচক্রেও রয়েছে কয়েকটি স্বাভাবিক ধাপ-শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্য। যারা দীর্ঘজীবন লাভ করে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাদের অধিকাংশেরই একটি স্বপ্ন থাকে-জীবনের শেষ দিনগুলো স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে কাটিয়ে একদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে আমরা এমন সুখী পরিবারের ছবি প্রায়ই দেখি। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন।
বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ।
একদিকে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিবাচক ফল, অন্যদিকে এত বিশাল সংখ্যক প্রবীণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যাঁরা একসময় দুই হাতে সংসার সামলেছেন, প্রকৃতির নিয়মে আজ তাঁদের অনেকেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।
প্রবীণদের প্রধান সমস্যা: প্রবীণদের সমস্যা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, একাকীত্ব, আয়ের অভাব, পরনির্ভরতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, সামাজিক অবহেলা, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে থাকা, শারীরিক পরিবর্তন।
শিশুকালে যেমন সন্তানদের সার্বক্ষণিক যত্ন নিতে হয়, বার্ধক্যে এসে অনেক প্রবীণ আবার একই রকম সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করেন। হাঁটাচলা, গোসল, পোশাক পরিবর্তন, এমনকি দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজেও অন্যের সহযোগিতা লাগে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই জীবিত থাকলে একে অপরের যত্ন নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু একজনের মৃত্যু হলে অন্যজনের জীবন অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। তখন একাকীত্ব, অসহায়ত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রবীণ জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
যৌথ পরিবার ভাঙনের প্রভাব: একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সমাজের ভিত্তি। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন প্রবীণ সদস্যরা। তাঁদের মতামতই ছিল শেষ কথা। নগরায়ন, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, বিদেশমুখী অভিবাসন এবং একক পরিবারব্যবস্থার প্রসারের ফলে আজ সেই সামাজিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। প্রবীণরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। ফলে প্রবীণ সমস্যা এখন আর কেবল পারিবারিক নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জাতীয় ইস্যু।
একাকীত্ব-সবচেয়ে বড় সংকট: প্রবীণদের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত একাকীত্ব। আমরা এমন ঘটনাও দেখেছি, যেখানে একজন বৃদ্ধা নিজ বাসায় কয়েক দিন আগে মৃত্যুবরণ করে পড়ে ছিলেন, অথচ কেউ জানত না। দেশে এমন অসংখ্য পরিবার আছে যেখানে অর্থের অভাব নেই, কিন্তু সন্তানরা সবাই বিদেশে বা অন্য শহরে থাকেন। বাবা কিংবা মা একা বাসায় দিন কাটান।অসুস্থ স্বামী বা স্ত্রীকে রেখে সামান্য সময়ের জন্য বাইরে গেলেও উদ্বেগ পিছু ছাড়ে না। বাইরে যাওয়ার আগে বলা হয়-‘ফোনটা কাছে রেখো, সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।’ কিন্তু ফোন করলেই যে সবসময় সাহায্য পাওয়া যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
জীবনসঙ্গীহীন প্রবীণদের দুর্ভোগ: যাঁদের স্বামী বা স্ত্রী নেই, তাঁদের কষ্ট আরও বেশি। আমাদের প্রজন্মের অনেক পুরুষ রান্না করে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেননি। আবার অনেক প্রবীণ নারী অসুস্থ অবস্থায় একা বাইরে যেতে সাহস পান না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্বকে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর ফলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্যসেবা: বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যান্সার, বাত, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, হৃদরোগসহ নানা জটিলতা বৃদ্ধি পায়। শহরে বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকলেও গ্রামীণ অঞ্চলে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা এখনও খুব সীমিত। চিকিৎসার ব্যয়ও অধিকাংশ প্রবীণের নাগালের বাইরে।
আর্থিক অনিশ্চয়তা: অবসরের পর নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন পান। কিছু প্রবীণ সরকারি ভাতা পান। কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্য ও চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় এই সহায়তা অত্যন্ত অপ্রতুল। বর্তমানে প্রায় ৩৪.২৫ লাখ প্রবীণ মাসিক ৬৫০ টাকা বয়স্ক ভাতা পান, যা মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ।
প্রবীণ নির্যাতন: মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। একসময় যারা ছিলেন পরিবারে সম্মানিত-শ্রদ্ধেয়, আজ তারা শিকার হচ্ছেন নির্যাতনের। কখনও কর্কশ ভাষা, কখনও অবহেলা, কখনও খাবার থেকে বঞ্চিত করা, আবার কখনও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। সম্পত্তি লিখে না দেওয়ায় বাবা-মাকে নির্যাতনের ঘটনাও আমাদের সমাজে অজানা নয়।
প্রযুক্তিগত বৈষম্য: বর্তমান পৃথিবী দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, ট্রেন বা বাসের টিকিট বুকিং-সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু অধিকাংশ প্রবীণ প্রযুক্তিতে দক্ষ নন। ফলে প্রতিটি কাজেই তাঁদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া প্রতিনিয়ত কোন না কোন প্রবীণ শিকার হচ্ছে স্ক্যাম এর।
প্রবীণবান্ধব অবকাঠামোর অভাব: আমাদের শহর ও গ্রাম এখনও প্রবীণবান্ধব নয়। পার্ক কম, নিরাপদ ফুটপাত নেই, রাস্তা পারাপারে অসুবিধা, গণপরিবহনে সংরক্ষিত আসন থাকলেও অনেক সময় তরুণরা তা ব্যবহার করেন। এসব ছোট ছোট বিষয়ও প্রবীণদের জীবনকে প্রতিদিন কঠিন করে তোলে।
করণীয়: প্রবীণদের সব সমস্যা সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব না হলেও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অনেকটাই লাঘব করা যায়। একাকীত্ব দূরীকরণ, সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, প্রতিটি এলাকায় প্রবীণ ক্লাব গঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রবীণ সহায়তা নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যে জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জেরিয়াট্রিক বিভাগ এবং হাসপাতালগুলোতে প্রবীণ কর্নার চালু করা, কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় চিকিৎসা সহায়তা, এনজিও’র মাধ্যমে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত হিসাব করে এলাকার প্রবীণদের খবর নেওয়া, প্রবীণ স্বাস্থ্যবীমা চালু করা যেতে পারে।
এছাড়া আর্থিক নিরাপত্তায় বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি,
উপযোগী খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত শরীরচর্চা,
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চর্চা, কাউন্সেলিং সুবিধা প্রদান ও সামাজিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা জরুরি।
প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, প্রবীণবান্ধব নগর পরিকল্পনা, নিরাপদ ফুটপাত, সহজ রাস্তা পারাপার, র্যাম্প ও হুইলচেয়ার সুবিধা, গণপরিবহনে অগ্রাধিকারভিত্তিক আসন, রেলস্টেশনে সহায়তা কেন্দ্র ও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত পার্ক প্রতিষ্ঠা দরকার।
বৃদ্ধাশ্রম-বাস্তবতার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: একসময় ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি আমাদের কাছে নির্মম মনে হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি মানবিক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নিজ বাসায় সম্পূর্ণ একা থাকার চেয়ে সমবয়সী মানুষের সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশে থাকা, নিয়মিত চিকিৎসা পাওয়া এবং সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত হওয়া অনেক প্রবীণের জন্য অধিকতর স্বস্তিদায়ক হতে পারে। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাঁদের জন্য উন্নত সেবাকেন্দ্র রয়েছে। আবার কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করে।
অবশ্যই সবচেয়ে আদর্শ ব্যবস্থা হলো পরিবারের সঙ্গে থাকা। কিন্তু যখন সন্তানেরা কর্মব্যস্ত, বিদেশে অবস্থান করেন, অথবা প্রবীণের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, তখন বিকল্প ব্যবস্থাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন; তাঁরা জাতির অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাঁদের মেধা, শ্রম, ত্যাগ ও প্রজ্ঞার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের সমাজ গড়ে উঠেছে। তাই তাঁদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সেবা প্রদান আমাদের নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ। আমরা যদি আজ প্রবীণদের যথাযথ মর্যাদা না দিই, আগামী প্রজন্মের কাছ থেকেও সেই মর্যাদা প্রত্যাশা করা কঠিন হবে।
একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে সমাজ তার প্রবীণ নাগরিকদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেয়- তার ওপর। পরিবার, সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে একটি সত্যিকার প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ।
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল, পরিবেশ সংগঠক]

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জন্ম ও মৃত্যুর মতো মানুষের জীবনচক্রেও রয়েছে কয়েকটি স্বাভাবিক ধাপ-শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্য। যারা দীর্ঘজীবন লাভ করে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাদের অধিকাংশেরই একটি স্বপ্ন থাকে-জীবনের শেষ দিনগুলো স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে কাটিয়ে একদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে আমরা এমন সুখী পরিবারের ছবি প্রায়ই দেখি। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন।
বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ।
একদিকে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিবাচক ফল, অন্যদিকে এত বিশাল সংখ্যক প্রবীণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যাঁরা একসময় দুই হাতে সংসার সামলেছেন, প্রকৃতির নিয়মে আজ তাঁদের অনেকেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।
প্রবীণদের প্রধান সমস্যা: প্রবীণদের সমস্যা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, একাকীত্ব, আয়ের অভাব, পরনির্ভরতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, সামাজিক অবহেলা, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে থাকা, শারীরিক পরিবর্তন।
শিশুকালে যেমন সন্তানদের সার্বক্ষণিক যত্ন নিতে হয়, বার্ধক্যে এসে অনেক প্রবীণ আবার একই রকম সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করেন। হাঁটাচলা, গোসল, পোশাক পরিবর্তন, এমনকি দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজেও অন্যের সহযোগিতা লাগে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই জীবিত থাকলে একে অপরের যত্ন নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু একজনের মৃত্যু হলে অন্যজনের জীবন অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। তখন একাকীত্ব, অসহায়ত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রবীণ জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
যৌথ পরিবার ভাঙনের প্রভাব: একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সমাজের ভিত্তি। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন প্রবীণ সদস্যরা। তাঁদের মতামতই ছিল শেষ কথা। নগরায়ন, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, বিদেশমুখী অভিবাসন এবং একক পরিবারব্যবস্থার প্রসারের ফলে আজ সেই সামাজিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। প্রবীণরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। ফলে প্রবীণ সমস্যা এখন আর কেবল পারিবারিক নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জাতীয় ইস্যু।
একাকীত্ব-সবচেয়ে বড় সংকট: প্রবীণদের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত একাকীত্ব। আমরা এমন ঘটনাও দেখেছি, যেখানে একজন বৃদ্ধা নিজ বাসায় কয়েক দিন আগে মৃত্যুবরণ করে পড়ে ছিলেন, অথচ কেউ জানত না। দেশে এমন অসংখ্য পরিবার আছে যেখানে অর্থের অভাব নেই, কিন্তু সন্তানরা সবাই বিদেশে বা অন্য শহরে থাকেন। বাবা কিংবা মা একা বাসায় দিন কাটান।অসুস্থ স্বামী বা স্ত্রীকে রেখে সামান্য সময়ের জন্য বাইরে গেলেও উদ্বেগ পিছু ছাড়ে না। বাইরে যাওয়ার আগে বলা হয়-‘ফোনটা কাছে রেখো, সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।’ কিন্তু ফোন করলেই যে সবসময় সাহায্য পাওয়া যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
জীবনসঙ্গীহীন প্রবীণদের দুর্ভোগ: যাঁদের স্বামী বা স্ত্রী নেই, তাঁদের কষ্ট আরও বেশি। আমাদের প্রজন্মের অনেক পুরুষ রান্না করে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেননি। আবার অনেক প্রবীণ নারী অসুস্থ অবস্থায় একা বাইরে যেতে সাহস পান না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্বকে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর ফলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্যসেবা: বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যান্সার, বাত, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, হৃদরোগসহ নানা জটিলতা বৃদ্ধি পায়। শহরে বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকলেও গ্রামীণ অঞ্চলে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা এখনও খুব সীমিত। চিকিৎসার ব্যয়ও অধিকাংশ প্রবীণের নাগালের বাইরে।
আর্থিক অনিশ্চয়তা: অবসরের পর নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন পান। কিছু প্রবীণ সরকারি ভাতা পান। কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্য ও চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় এই সহায়তা অত্যন্ত অপ্রতুল। বর্তমানে প্রায় ৩৪.২৫ লাখ প্রবীণ মাসিক ৬৫০ টাকা বয়স্ক ভাতা পান, যা মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ।
প্রবীণ নির্যাতন: মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। একসময় যারা ছিলেন পরিবারে সম্মানিত-শ্রদ্ধেয়, আজ তারা শিকার হচ্ছেন নির্যাতনের। কখনও কর্কশ ভাষা, কখনও অবহেলা, কখনও খাবার থেকে বঞ্চিত করা, আবার কখনও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। সম্পত্তি লিখে না দেওয়ায় বাবা-মাকে নির্যাতনের ঘটনাও আমাদের সমাজে অজানা নয়।
প্রযুক্তিগত বৈষম্য: বর্তমান পৃথিবী দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, ট্রেন বা বাসের টিকিট বুকিং-সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু অধিকাংশ প্রবীণ প্রযুক্তিতে দক্ষ নন। ফলে প্রতিটি কাজেই তাঁদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া প্রতিনিয়ত কোন না কোন প্রবীণ শিকার হচ্ছে স্ক্যাম এর।
প্রবীণবান্ধব অবকাঠামোর অভাব: আমাদের শহর ও গ্রাম এখনও প্রবীণবান্ধব নয়। পার্ক কম, নিরাপদ ফুটপাত নেই, রাস্তা পারাপারে অসুবিধা, গণপরিবহনে সংরক্ষিত আসন থাকলেও অনেক সময় তরুণরা তা ব্যবহার করেন। এসব ছোট ছোট বিষয়ও প্রবীণদের জীবনকে প্রতিদিন কঠিন করে তোলে।
করণীয়: প্রবীণদের সব সমস্যা সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব না হলেও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অনেকটাই লাঘব করা যায়। একাকীত্ব দূরীকরণ, সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, প্রতিটি এলাকায় প্রবীণ ক্লাব গঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রবীণ সহায়তা নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যে জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জেরিয়াট্রিক বিভাগ এবং হাসপাতালগুলোতে প্রবীণ কর্নার চালু করা, কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় চিকিৎসা সহায়তা, এনজিও’র মাধ্যমে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত হিসাব করে এলাকার প্রবীণদের খবর নেওয়া, প্রবীণ স্বাস্থ্যবীমা চালু করা যেতে পারে।
এছাড়া আর্থিক নিরাপত্তায় বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি,
উপযোগী খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত শরীরচর্চা,
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চর্চা, কাউন্সেলিং সুবিধা প্রদান ও সামাজিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা জরুরি।
প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, প্রবীণবান্ধব নগর পরিকল্পনা, নিরাপদ ফুটপাত, সহজ রাস্তা পারাপার, র্যাম্প ও হুইলচেয়ার সুবিধা, গণপরিবহনে অগ্রাধিকারভিত্তিক আসন, রেলস্টেশনে সহায়তা কেন্দ্র ও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত পার্ক প্রতিষ্ঠা দরকার।
বৃদ্ধাশ্রম-বাস্তবতার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: একসময় ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি আমাদের কাছে নির্মম মনে হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি মানবিক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নিজ বাসায় সম্পূর্ণ একা থাকার চেয়ে সমবয়সী মানুষের সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশে থাকা, নিয়মিত চিকিৎসা পাওয়া এবং সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত হওয়া অনেক প্রবীণের জন্য অধিকতর স্বস্তিদায়ক হতে পারে। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাঁদের জন্য উন্নত সেবাকেন্দ্র রয়েছে। আবার কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করে।
অবশ্যই সবচেয়ে আদর্শ ব্যবস্থা হলো পরিবারের সঙ্গে থাকা। কিন্তু যখন সন্তানেরা কর্মব্যস্ত, বিদেশে অবস্থান করেন, অথবা প্রবীণের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, তখন বিকল্প ব্যবস্থাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন; তাঁরা জাতির অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাঁদের মেধা, শ্রম, ত্যাগ ও প্রজ্ঞার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের সমাজ গড়ে উঠেছে। তাই তাঁদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সেবা প্রদান আমাদের নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ। আমরা যদি আজ প্রবীণদের যথাযথ মর্যাদা না দিই, আগামী প্রজন্মের কাছ থেকেও সেই মর্যাদা প্রত্যাশা করা কঠিন হবে।
একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে সমাজ তার প্রবীণ নাগরিকদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেয়- তার ওপর। পরিবার, সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে একটি সত্যিকার প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ।
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল, পরিবেশ সংগঠক]

আপনার মতামত লিখুন