একটা পুরনো বাড়ির কথা কল্পনা করুন। একজন মানুষ সেই বাড়িতে তার বাবার আমলের আসবাবপত্র, দেয়ালে টাঙানো ছবি, এমনকি ভাঙা জানালার কাঁচও অবিকল রেখে দিয়েছেন, শুধু এই কারণে যে এগুলো ‘অতীতের স্মৃতি’। তিনি বাড়িটা মেরামত করেন না। নতুন কিছু যোগ করেন না। এমনকি বাড়ির ভেতরে নতুন করে বাঁচার চেষ্টাও করেন না। তিনি শুধু অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকেন।
অন্যদিকে, আরেকজন মানুষ একই বাড়ির পুরনো কাঠামো, ভিত্তি আর স্মৃতিগুলোকে সম্মান করেন। কিন্তু সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বাড়িটাকে নতুন করে বাসযোগ্য করে তোলেন। তিনি অতীতকে ভুলে যান না। বরং সেটাকে বর্তমানের ভিত্তি বানিয়ে সামনে এগিয়ে যান। এই দুটো গল্পে রয়েছে ইতিহাস ধারন ও লালনের এক মহাজাগতিক সম্পর্ক।
ইতিহাস কোনো স্থবির দালিলিক সংকলন নয়। বরং এটি একটি বহমান প্রক্রিয়া। একটি জাতির আত্মপরিচয় ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা লুকিয়ে থাকে তার ইতিহাসের পরতে পরতে। তবে ইতিহাসের সঙ্গে কোনো জাতির সম্পর্ক কেমন হবে, তা নির্ধারিত হয় সেই জাতি ইতিহাসকে কীভাবে গ্রহণ করছে তার ওপর।
ধারণ ও লালনের পার্থক্য
ধারণ করা মানে হলো অতীতকে জমিয়ে রাখা একটা জাদুঘরের প্রদর্শনীর মতো। এটা আবেগনির্ভর, নস্টালজিক, প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়। এখানে ইতিহাস হয়ে ওঠে অস্ত্র যা কাউকে ছোট করার, কাউকে বড় করার বা বর্তমানের ব্যর্থতা ঢাকার একটা উপায়।
আর লালন করা মানে হলো ইতিহাসকে বেড়ে ওঠার সার হিসেবে ব্যবহার করা। এখানে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়। অতীতের অর্জনকে ভিত্তি বানিয়ে নতুন কিছু গড়া হয়। ইতিহাস তখন বোঝা নয়, পাথেয় হয়ে ওঠে।যখন কোনো জাতি তার ইতিহাসকে সঠিকভাবে লালন করে, তখন সে ইতিহাসটাকে অতিক্রম করে যেতে পারে। ইতিহাস তখন একটা ‘সমাপ্ত অধ্যায়’ হয়ে যায়; যেটা নিয়ে গর্ব করা যায়, অথচ তার মধ্যে বন্দী থাকতে হয় না। কিন্তু যখন ইতিহাসকে শুধু ধারন করা হয়, তখন সেটা কখনো ‘ইতিহাস’ হয়ে ওঠে না বরং বর্তমানের একটা স্থায়ী অংশ হয়ে থেকে যায়। যা প্রতিদিন নতুন করে জ্বলতে থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তব উদাহরণ
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: গর্বের ভিত্তি নাকি রাজনৈতিক অস্ত্র: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। এটা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। আত্মত্যাগ আর সাহসিকতার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কে ‘প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা’, কার অবদান বেশি, কার অবদান ইতিহাসের বইয়ে থাকবে বা বাদ যাবে- এসব নিয়ে দশকের পর দশক ধরে বিতর্ক চলছে। প্রতিটি সরকার এলে ইতিহাসের পাঠ্যবই সংশোধিত হয়। জাতীয় দিবসগুলোর গুরুত্বও ওঠানামা করে।
এখানে একটা সহজ বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। একটা পরিবারে যদি বাবা-মায়ের মধ্যে সবসময় পুরনো ঝগড়া নিয়ে সন্তানদের সামনে তর্ক চলতে থাকে, যেমন ‘তুমি তখন এটা করেছিলে’, ‘না তুমি সেটা করেছিলে’, তাহলে সেই পরিবারে বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জায়গাই থাকে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও অনেকটা এরকম। এটা যদি শুধু ‘কে সঠিক ছিল, কে ভুল’ প্রমাণের যুদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে সেটা লালন নয়, বরং একটা পুরনো ক্ষত বারবার খুঁচিয়ে তোলা।
মুক্তিযুদ্ধকে লালন করার অর্থ হবে এই ইতিহাস থেকে জাতীয় ঐক্য, ন্যায়বিচার আর আত্মমর্যাদার শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। প্রতিটি প্রজন্মকে সঠিক ও নিরপেক্ষ ইতিহাস শেখানো। কিন্তু সেটাকে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত না করা।ভাষা আন্দোলন: গর্ব থেকে অনুপ্রেরণা: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তি। প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিই, গান গাই- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি , আমি কি ভূলিতে পারি।‘ এটা একটা সুন্দর ঐতিহ্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই আন্দোলনের মূল চেতনা, অর্থাৎ মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, কি আমরা প্রকৃতপক্ষে চর্চা করি? আজকের বাংলাদেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, করপোরেট অফিসে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রতি একধরনের অবহেলা দেখা যায়, ইংরেজি মিশ্রিত ভাষার প্রতি একটা ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ মনোভাব তৈরি হয়েছে।
এখানে ‘ধারন’ মানে শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দেওয়া আর শহীদ মিনারে ভিড় করা। কিন্তু ‘লালন’ মানে হলো সারা বছর ধরে মাতৃভাষার প্রতি যত্নশীল থাকা। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলার মান বাড়ানো। ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে জীবনযাপনের অংশ বানানো।
পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস পরিবর্তনের চক্র: বাংলাদেশে প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের পাঠ্যবই পরিবর্তিত হয়; এটা একটা সুপরিচিত বাস্তবতা। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা, কোনো ব্যক্তিত্বের ভূমিকার গুরুত্ব, এমনকি কোনো তারিখের তাৎপর্যও সরকারভেদে বদলে যায়।
একজন শিক্ষার্থী যদি প্রাথমিক স্কুলে এক ধরনের ইতিহাস পড়ে, মাধ্যমিকে ভিন্ন সংস্করণ পড়ে, আর কলেজে গিয়ে দেখে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বয়ান শুনতে হচ্ছে, তাহলে তার মনে ইতিহাসের প্রতি আস্থা তৈরি হয় না। সে বিভ্রান্ত হয়। শেষপর্যন্ত ইতিহাসকে ‘সত্য অনুসন্ধানের বিষয়’ হিসেবে না দেখে ‘রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার’ হিসেবে দেখতে শেখে।
এটা লালনের বিপরীত। প্রকৃত লালন হবে ইতিহাসকে যতটা সম্ভব নিরপেক্ষভাবে, তথ্যভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করা, বিতর্কিত অংশগুলো স্বীকার করা এবং শিক্ষার্থীদের নিজে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দেওয়া যাতে তারা ইতিহাস থেকে শেখে, ইতিহাসের শিকার না হয়।
‘পুরনো হিসাব’ মেটানোর মানসিকতা: এটা শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নয়, আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনেও দেখা যায়। গ্রামের সালিশে পুরনো জমি-জমার বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, এমনকি প্রতিবেশীর সঙ্গে দশ-বিশ বছর আগের ঝগড়া এসব প্রায়ই নতুন প্রজন্মের কাছেও হস্তান্তরিত হয়। ‘তোমার দাদা আমার দাদার সঙ্গে এই অন্যায় করেছিল’ বলে নতুন প্রজন্মকে পুরনো শত্রুতা বহন করানো হয়।
এটাও একধরনের ইতিহাস ‘ধারন’ যেখানে অতীতের ক্ষত সারানো হয় না, বরং সেটা প্রজন্মান্তরে বহন করা হয়। অথচ লালন করলে হতো অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সম্পর্ক মেরামত করা, ক্ষমা ও পুনর্মিলনের পথ খোঁজা।
স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের প্রতি অবহেলা: পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ভবন, জমিদারবাড়ি, মসজিদ-মন্দিরগুলোর অনেকাংশ আজ ধ্বংসের মুখে। আমরা মুখে বলি ‘এগুলো আমাদের ঐতিহ্য’, কিন্তু বাস্তবে এগুলো সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট বিনিয়োগ বা যত্ন নেওয়া হয় না। এটাও এক ধরনের ইতিহাস ‘ধারন’ মুখে গর্ব প্রকাশ করা, কিন্তু কার্যত অবহেলা করা।
লালন করলে হতো এই স্থাপনাগুলোকে সংরক্ষণ করে পর্যটন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনের জীবন্ত অংশ বানানো, যেভাবে অনেক দেশ তাদের পুরনো শহরগুলোকে সংরক্ষণ করে আধুনিক জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।
কেন উপমহাদেশ ইতিহাসের পেছনে তাকিয়ে থাকে
আমাদের উপমহাদেশ সাধারণত ইতিহাস ধারনের দিকে বেশির ভাগ ধাবিত থাকে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে-
ঔপনিবেশিক ক্ষত: শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, বিভাজন, দাঙ্গা- এসব এমন গভীর ক্ষত রেখে গেছে যা এখনো নিরাময় হয়নি।
রাজনৈতিক বৈধতার সংকট: নতুন রাষ্ট্রগুলো নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায়ই ইতিহাসের নির্দিষ্ট বয়ানের ওপর নির্ভর করে। যা ইতিহাসকে রাজনীতির জিম্মায় নিয়ে যায়।
শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব: ইতিহাসকে মুখস্থ করার বিষয় হিসেবে শেখানো হয়, বিশ্লেষণ করার বিষয় হিসেবে নয়।
আবেগনির্ভর জাতীয়তাবাদ: অনেক সময় যুক্তির চেয়ে আবেগ দিয়ে ইতিহাসকে ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ইতিহাসের প্রতি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়তে বাধা দেয়।
এই বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। কেউ মনে করেন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোই এর মূল কারণ। কেউ মনে করেন এটা সামাজিক-সাংস্কৃতিক মানসিকতার ফল। আবার কেউ মনে করেন সীমিত সম্পদ ও উন্নয়নের চাপে ইতিহাসচর্চা গৌণ হয়ে পড়ে।
সামনে এগোনোর পথ
ইতিহাসকে লালন করা মানে অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়। বরং সেটা এমন একটা প্রক্রিয়া, যেখানে কয়েকটি বিষয় চোখে পড়ে-
১. সত্য অনুসন্ধান অগ্রাধিকার পায়, রাজনৈতিক সুবিধা নয়। ইতিহাসবিদ, গবেষক, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া দরকার, যাতে ইতিহাস দলীয় বয়ান না হয়ে সত্যনির্ভর দলিল হয়ে ওঠে।
২. নতুন প্রজন্মকে বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি শেখানো হয়। শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়, বরং প্রশ্ন করতে শেখানো, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ বিবেচনা করতে শেখানো।
৩. অতীতের অর্জনকে বর্তমানের উন্নয়নের সাথে যুক্ত করা হয়। যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে।
৪. ক্ষমা ও পুনর্মিলনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং জাতীয় পর্যায়ে পুরনো বিরোধ চিরস্থায়ী না রেখে সমাধানের চেষ্টা করা।
৫. ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিনিয়োগ করা হয়। শুধু আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তব পরিকল্পনা ও অর্থায়নের মাধ্যমে।
জাপান তার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিগত পরাশক্তি হয়ে উঠেছে। তারা ইতিহাসকে ভুলে যায়নি, বরং সেটাকে পুনর্গঠনের প্রেরণা বানিয়েছে। জার্মানি তার নাৎসি অতীতের সাথে সরাসরি মোকাবিলা করে, সেই ইতিহাস শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে, স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়েছে, কিন্তু সেই অতীতকে বর্তমান রাজনীতির প্রতিদিনের অস্ত্র বানায়নি।
বাংলাদেশ ও এই উপমহাদেশের জন্যও একই নীতি প্রযোজ্য হতে পারে। আমাদের গর্বের ইতিহাস (মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন) ও আমাদের বেদনার ইতিহাস (দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, বিভাজন) দুটোকেই লালন করতে হবে এমনভাবে, যাতে সেগুলো আমাদের আটকে না রেখে, বরং আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।তখনই সত্যিকার অর্থে ‘ইতিহাসেরও ইতিহাস’ রচিত হবে। যেখানে অতীত একটা সমাপ্ত, সম্মানিত অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে। আর বর্তমান-ভবিষ্যৎ হবে আমাদের মনোযোগের মূল কেন্দ্র।
লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
একটা পুরনো বাড়ির কথা কল্পনা করুন। একজন মানুষ সেই বাড়িতে তার বাবার আমলের আসবাবপত্র, দেয়ালে টাঙানো ছবি, এমনকি ভাঙা জানালার কাঁচও অবিকল রেখে দিয়েছেন, শুধু এই কারণে যে এগুলো ‘অতীতের স্মৃতি’। তিনি বাড়িটা মেরামত করেন না। নতুন কিছু যোগ করেন না। এমনকি বাড়ির ভেতরে নতুন করে বাঁচার চেষ্টাও করেন না। তিনি শুধু অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকেন।
অন্যদিকে, আরেকজন মানুষ একই বাড়ির পুরনো কাঠামো, ভিত্তি আর স্মৃতিগুলোকে সম্মান করেন। কিন্তু সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বাড়িটাকে নতুন করে বাসযোগ্য করে তোলেন। তিনি অতীতকে ভুলে যান না। বরং সেটাকে বর্তমানের ভিত্তি বানিয়ে সামনে এগিয়ে যান। এই দুটো গল্পে রয়েছে ইতিহাস ধারন ও লালনের এক মহাজাগতিক সম্পর্ক।
ইতিহাস কোনো স্থবির দালিলিক সংকলন নয়। বরং এটি একটি বহমান প্রক্রিয়া। একটি জাতির আত্মপরিচয় ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা লুকিয়ে থাকে তার ইতিহাসের পরতে পরতে। তবে ইতিহাসের সঙ্গে কোনো জাতির সম্পর্ক কেমন হবে, তা নির্ধারিত হয় সেই জাতি ইতিহাসকে কীভাবে গ্রহণ করছে তার ওপর।
ধারণ ও লালনের পার্থক্য
ধারণ করা মানে হলো অতীতকে জমিয়ে রাখা একটা জাদুঘরের প্রদর্শনীর মতো। এটা আবেগনির্ভর, নস্টালজিক, প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়। এখানে ইতিহাস হয়ে ওঠে অস্ত্র যা কাউকে ছোট করার, কাউকে বড় করার বা বর্তমানের ব্যর্থতা ঢাকার একটা উপায়।
আর লালন করা মানে হলো ইতিহাসকে বেড়ে ওঠার সার হিসেবে ব্যবহার করা। এখানে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়। অতীতের অর্জনকে ভিত্তি বানিয়ে নতুন কিছু গড়া হয়। ইতিহাস তখন বোঝা নয়, পাথেয় হয়ে ওঠে।যখন কোনো জাতি তার ইতিহাসকে সঠিকভাবে লালন করে, তখন সে ইতিহাসটাকে অতিক্রম করে যেতে পারে। ইতিহাস তখন একটা ‘সমাপ্ত অধ্যায়’ হয়ে যায়; যেটা নিয়ে গর্ব করা যায়, অথচ তার মধ্যে বন্দী থাকতে হয় না। কিন্তু যখন ইতিহাসকে শুধু ধারন করা হয়, তখন সেটা কখনো ‘ইতিহাস’ হয়ে ওঠে না বরং বর্তমানের একটা স্থায়ী অংশ হয়ে থেকে যায়। যা প্রতিদিন নতুন করে জ্বলতে থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তব উদাহরণ
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: গর্বের ভিত্তি নাকি রাজনৈতিক অস্ত্র: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। এটা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। আত্মত্যাগ আর সাহসিকতার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কে ‘প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা’, কার অবদান বেশি, কার অবদান ইতিহাসের বইয়ে থাকবে বা বাদ যাবে- এসব নিয়ে দশকের পর দশক ধরে বিতর্ক চলছে। প্রতিটি সরকার এলে ইতিহাসের পাঠ্যবই সংশোধিত হয়। জাতীয় দিবসগুলোর গুরুত্বও ওঠানামা করে।
এখানে একটা সহজ বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। একটা পরিবারে যদি বাবা-মায়ের মধ্যে সবসময় পুরনো ঝগড়া নিয়ে সন্তানদের সামনে তর্ক চলতে থাকে, যেমন ‘তুমি তখন এটা করেছিলে’, ‘না তুমি সেটা করেছিলে’, তাহলে সেই পরিবারে বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জায়গাই থাকে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও অনেকটা এরকম। এটা যদি শুধু ‘কে সঠিক ছিল, কে ভুল’ প্রমাণের যুদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে সেটা লালন নয়, বরং একটা পুরনো ক্ষত বারবার খুঁচিয়ে তোলা।
মুক্তিযুদ্ধকে লালন করার অর্থ হবে এই ইতিহাস থেকে জাতীয় ঐক্য, ন্যায়বিচার আর আত্মমর্যাদার শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। প্রতিটি প্রজন্মকে সঠিক ও নিরপেক্ষ ইতিহাস শেখানো। কিন্তু সেটাকে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত না করা।ভাষা আন্দোলন: গর্ব থেকে অনুপ্রেরণা: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তি। প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিই, গান গাই- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি , আমি কি ভূলিতে পারি।‘ এটা একটা সুন্দর ঐতিহ্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই আন্দোলনের মূল চেতনা, অর্থাৎ মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, কি আমরা প্রকৃতপক্ষে চর্চা করি? আজকের বাংলাদেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, করপোরেট অফিসে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রতি একধরনের অবহেলা দেখা যায়, ইংরেজি মিশ্রিত ভাষার প্রতি একটা ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ মনোভাব তৈরি হয়েছে।
এখানে ‘ধারন’ মানে শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দেওয়া আর শহীদ মিনারে ভিড় করা। কিন্তু ‘লালন’ মানে হলো সারা বছর ধরে মাতৃভাষার প্রতি যত্নশীল থাকা। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলার মান বাড়ানো। ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে জীবনযাপনের অংশ বানানো।
পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস পরিবর্তনের চক্র: বাংলাদেশে প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের পাঠ্যবই পরিবর্তিত হয়; এটা একটা সুপরিচিত বাস্তবতা। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা, কোনো ব্যক্তিত্বের ভূমিকার গুরুত্ব, এমনকি কোনো তারিখের তাৎপর্যও সরকারভেদে বদলে যায়।
একজন শিক্ষার্থী যদি প্রাথমিক স্কুলে এক ধরনের ইতিহাস পড়ে, মাধ্যমিকে ভিন্ন সংস্করণ পড়ে, আর কলেজে গিয়ে দেখে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বয়ান শুনতে হচ্ছে, তাহলে তার মনে ইতিহাসের প্রতি আস্থা তৈরি হয় না। সে বিভ্রান্ত হয়। শেষপর্যন্ত ইতিহাসকে ‘সত্য অনুসন্ধানের বিষয়’ হিসেবে না দেখে ‘রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার’ হিসেবে দেখতে শেখে।
এটা লালনের বিপরীত। প্রকৃত লালন হবে ইতিহাসকে যতটা সম্ভব নিরপেক্ষভাবে, তথ্যভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করা, বিতর্কিত অংশগুলো স্বীকার করা এবং শিক্ষার্থীদের নিজে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দেওয়া যাতে তারা ইতিহাস থেকে শেখে, ইতিহাসের শিকার না হয়।
‘পুরনো হিসাব’ মেটানোর মানসিকতা: এটা শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নয়, আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনেও দেখা যায়। গ্রামের সালিশে পুরনো জমি-জমার বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, এমনকি প্রতিবেশীর সঙ্গে দশ-বিশ বছর আগের ঝগড়া এসব প্রায়ই নতুন প্রজন্মের কাছেও হস্তান্তরিত হয়। ‘তোমার দাদা আমার দাদার সঙ্গে এই অন্যায় করেছিল’ বলে নতুন প্রজন্মকে পুরনো শত্রুতা বহন করানো হয়।
এটাও একধরনের ইতিহাস ‘ধারন’ যেখানে অতীতের ক্ষত সারানো হয় না, বরং সেটা প্রজন্মান্তরে বহন করা হয়। অথচ লালন করলে হতো অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সম্পর্ক মেরামত করা, ক্ষমা ও পুনর্মিলনের পথ খোঁজা।
স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের প্রতি অবহেলা: পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ভবন, জমিদারবাড়ি, মসজিদ-মন্দিরগুলোর অনেকাংশ আজ ধ্বংসের মুখে। আমরা মুখে বলি ‘এগুলো আমাদের ঐতিহ্য’, কিন্তু বাস্তবে এগুলো সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট বিনিয়োগ বা যত্ন নেওয়া হয় না। এটাও এক ধরনের ইতিহাস ‘ধারন’ মুখে গর্ব প্রকাশ করা, কিন্তু কার্যত অবহেলা করা।
লালন করলে হতো এই স্থাপনাগুলোকে সংরক্ষণ করে পর্যটন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনের জীবন্ত অংশ বানানো, যেভাবে অনেক দেশ তাদের পুরনো শহরগুলোকে সংরক্ষণ করে আধুনিক জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।
কেন উপমহাদেশ ইতিহাসের পেছনে তাকিয়ে থাকে
আমাদের উপমহাদেশ সাধারণত ইতিহাস ধারনের দিকে বেশির ভাগ ধাবিত থাকে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে-
ঔপনিবেশিক ক্ষত: শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, বিভাজন, দাঙ্গা- এসব এমন গভীর ক্ষত রেখে গেছে যা এখনো নিরাময় হয়নি।
রাজনৈতিক বৈধতার সংকট: নতুন রাষ্ট্রগুলো নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায়ই ইতিহাসের নির্দিষ্ট বয়ানের ওপর নির্ভর করে। যা ইতিহাসকে রাজনীতির জিম্মায় নিয়ে যায়।
শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব: ইতিহাসকে মুখস্থ করার বিষয় হিসেবে শেখানো হয়, বিশ্লেষণ করার বিষয় হিসেবে নয়।
আবেগনির্ভর জাতীয়তাবাদ: অনেক সময় যুক্তির চেয়ে আবেগ দিয়ে ইতিহাসকে ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ইতিহাসের প্রতি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়তে বাধা দেয়।
এই বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। কেউ মনে করেন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোই এর মূল কারণ। কেউ মনে করেন এটা সামাজিক-সাংস্কৃতিক মানসিকতার ফল। আবার কেউ মনে করেন সীমিত সম্পদ ও উন্নয়নের চাপে ইতিহাসচর্চা গৌণ হয়ে পড়ে।
সামনে এগোনোর পথ
ইতিহাসকে লালন করা মানে অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়। বরং সেটা এমন একটা প্রক্রিয়া, যেখানে কয়েকটি বিষয় চোখে পড়ে-
১. সত্য অনুসন্ধান অগ্রাধিকার পায়, রাজনৈতিক সুবিধা নয়। ইতিহাসবিদ, গবেষক, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া দরকার, যাতে ইতিহাস দলীয় বয়ান না হয়ে সত্যনির্ভর দলিল হয়ে ওঠে।
২. নতুন প্রজন্মকে বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি শেখানো হয়। শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়, বরং প্রশ্ন করতে শেখানো, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ বিবেচনা করতে শেখানো।
৩. অতীতের অর্জনকে বর্তমানের উন্নয়নের সাথে যুক্ত করা হয়। যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে।
৪. ক্ষমা ও পুনর্মিলনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং জাতীয় পর্যায়ে পুরনো বিরোধ চিরস্থায়ী না রেখে সমাধানের চেষ্টা করা।
৫. ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিনিয়োগ করা হয়। শুধু আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তব পরিকল্পনা ও অর্থায়নের মাধ্যমে।
জাপান তার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিগত পরাশক্তি হয়ে উঠেছে। তারা ইতিহাসকে ভুলে যায়নি, বরং সেটাকে পুনর্গঠনের প্রেরণা বানিয়েছে। জার্মানি তার নাৎসি অতীতের সাথে সরাসরি মোকাবিলা করে, সেই ইতিহাস শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে, স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়েছে, কিন্তু সেই অতীতকে বর্তমান রাজনীতির প্রতিদিনের অস্ত্র বানায়নি।
বাংলাদেশ ও এই উপমহাদেশের জন্যও একই নীতি প্রযোজ্য হতে পারে। আমাদের গর্বের ইতিহাস (মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন) ও আমাদের বেদনার ইতিহাস (দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, বিভাজন) দুটোকেই লালন করতে হবে এমনভাবে, যাতে সেগুলো আমাদের আটকে না রেখে, বরং আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।তখনই সত্যিকার অর্থে ‘ইতিহাসেরও ইতিহাস’ রচিত হবে। যেখানে অতীত একটা সমাপ্ত, সম্মানিত অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে। আর বর্তমান-ভবিষ্যৎ হবে আমাদের মনোযোগের মূল কেন্দ্র।
লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল

আপনার মতামত লিখুন