সংবাদ

হিমবাহ রক্ষায় ভেড়ার পশমের কম্বল, সুইজারল্যান্ডে অভিনব পরীক্ষা


সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম

হিমবাহ রক্ষায় ভেড়ার পশমের কম্বল, সুইজারল্যান্ডে অভিনব পরীক্ষা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত গলছে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ। বরফ গলার এই প্রবণতা সাময়িকভাবে ধীর করতে এবার প্রচলিত কৃত্রিম কভারের বিকল্প হিসেবে ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি বিশেষ কম্বল নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন দেশটির গবেষকেরা।

আল্পস অঞ্চলের বিভিন্ন হিমবাহে গ্রীষ্মকালে বরফের ওপর সিনথেটিক কভার বা ত্রিপল বিছিয়ে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। এসব কভার সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে এবং বরফের ওপর তাপ শোষণের পরিমাণ কমিয়ে গলন কিছুটা ধীর করে। তবে প্লাস্টিকভিত্তিক এসব উপকরণ থেকে মাইক্রোফাইবার ছড়িয়ে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ‘কিপ ইট উল’ প্রকল্প। পরিবেশবিষয়ক সংগঠন সামিট ফাউন্ডেশন ও ইউনিভার্সিটি অব লজানের যৌথ উদ্যোগে পশ্চিম সুইজারল্যান্ডের তসানফ্লেরন হিমবাহে চলছে এ পরীক্ষা। লক্ষ্য, স্থানীয়ভাবে পাওয়া ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি কভার বরফ গলার গতি কমাতে কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক তিমোথি স্টেইনার জানান, পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল কোনো উপাদান খুঁজছিলেন তারা। একই সঙ্গে দেশটিতে অব্যবহৃত পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ ভেড়ার পশমকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও এই প্রকল্পের অন্যতম বিবেচনা।

সুইজারল্যান্ডে প্রতিবছর উৎপাদিত ভেড়ার পশমের প্রায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ফেলে দেওয়া হয়। সেই অব্যবহৃত পশমকে কাজে লাগিয়ে হিমবাহ সুরক্ষার উপকরণ তৈরি করা গেলে পরিবেশগত দিক থেকে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

গত জুনে সুইস প্রতিষ্ঠান ফিসোলানের তৈরি দুটি পরীক্ষামূলক পশমের কম্বল তসানফ্লেরন হিমবাহের প্রায় ২০০ বর্গমিটার এলাকায় স্থাপন করা হয়। এরপর পুরো গ্রীষ্মজুড়ে নির্দিষ্ট বিরতিতে বরফের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। একই সময়ে প্রচলিত জিওটেক্সটাইল কভারের কার্যকারিতার সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে পশমের কম্বলের ফলাফল।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গবেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল মিলেছে। দুই সপ্তাহ পরপর নেওয়া পরিমাপ অনুযায়ী, সিনথেটিক কভারের মতোই পশমের কম্বলও বরফ গলার হার কমাতে সক্ষম হয়েছে।

পশমভিত্তিক উপকরণের স্থায়িত্ব নিয়েও আশাবাদী গবেষকেরা। ফিসোলানের কর্মকর্তা নিকলাউস সাগেসার বলেন, শুরুতে তিনি ধারণা করেছিলেন, পশমের তৈরি কম্বল হয়তো প্রয়োজনীয় স্থায়িত্ব ধরে রাখতে পারবে না। পরীক্ষার ফল দেখে সেই ধারণা বদলেছে।

গবেষণা দলের শিক্ষার্থী এলিয়ট গাফিও জানান, শুরুতে পরীক্ষার ফল নিয়ে তারা নিশ্চিত ছিলেন না। কিন্তু পাওয়া ফলাফল তাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে।

তবে গবেষকেরা এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, পশমের কম্বল জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের মোট হিমবাহ এলাকার মাত্র প্রায় ০.০২ শতাংশ এ ধরনের সুরক্ষামূলক কভার দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। ফলে বৃহৎ পরিসরে হিমবাহ গলার প্রবণতা ঠেকাতে এ পদ্ধতির সক্ষমতা সীমিত।

বিজ্ঞানীদের মতে, হিমবাহ গলার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বন্ধ করার প্রধান উপায় হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানো। আর এর জন্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ মোকাবিলা সম্ভব নয়।

অর্থাৎ, ভেড়ার পশমের কম্বল স্থানীয়ভাবে হিমবাহের বরফ গলার গতি কমাতে কার্যকর একটি পরিবেশবান্ধব বিকল্প হতে পারে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি বড় সমাধানের পরিবর্তে সীমিত পরিসরের একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হিমবাহ রক্ষায় ভেড়ার পশমের কম্বল, সুইজারল্যান্ডে অভিনব পরীক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত গলছে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ। বরফ গলার এই প্রবণতা সাময়িকভাবে ধীর করতে এবার প্রচলিত কৃত্রিম কভারের বিকল্প হিসেবে ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি বিশেষ কম্বল নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন দেশটির গবেষকেরা।

আল্পস অঞ্চলের বিভিন্ন হিমবাহে গ্রীষ্মকালে বরফের ওপর সিনথেটিক কভার বা ত্রিপল বিছিয়ে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। এসব কভার সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে এবং বরফের ওপর তাপ শোষণের পরিমাণ কমিয়ে গলন কিছুটা ধীর করে। তবে প্লাস্টিকভিত্তিক এসব উপকরণ থেকে মাইক্রোফাইবার ছড়িয়ে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ‘কিপ ইট উল’ প্রকল্প। পরিবেশবিষয়ক সংগঠন সামিট ফাউন্ডেশন ও ইউনিভার্সিটি অব লজানের যৌথ উদ্যোগে পশ্চিম সুইজারল্যান্ডের তসানফ্লেরন হিমবাহে চলছে এ পরীক্ষা। লক্ষ্য, স্থানীয়ভাবে পাওয়া ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি কভার বরফ গলার গতি কমাতে কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক তিমোথি স্টেইনার জানান, পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল কোনো উপাদান খুঁজছিলেন তারা। একই সঙ্গে দেশটিতে অব্যবহৃত পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ ভেড়ার পশমকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও এই প্রকল্পের অন্যতম বিবেচনা।

সুইজারল্যান্ডে প্রতিবছর উৎপাদিত ভেড়ার পশমের প্রায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ফেলে দেওয়া হয়। সেই অব্যবহৃত পশমকে কাজে লাগিয়ে হিমবাহ সুরক্ষার উপকরণ তৈরি করা গেলে পরিবেশগত দিক থেকে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

গত জুনে সুইস প্রতিষ্ঠান ফিসোলানের তৈরি দুটি পরীক্ষামূলক পশমের কম্বল তসানফ্লেরন হিমবাহের প্রায় ২০০ বর্গমিটার এলাকায় স্থাপন করা হয়। এরপর পুরো গ্রীষ্মজুড়ে নির্দিষ্ট বিরতিতে বরফের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। একই সময়ে প্রচলিত জিওটেক্সটাইল কভারের কার্যকারিতার সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে পশমের কম্বলের ফলাফল।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গবেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল মিলেছে। দুই সপ্তাহ পরপর নেওয়া পরিমাপ অনুযায়ী, সিনথেটিক কভারের মতোই পশমের কম্বলও বরফ গলার হার কমাতে সক্ষম হয়েছে।

পশমভিত্তিক উপকরণের স্থায়িত্ব নিয়েও আশাবাদী গবেষকেরা। ফিসোলানের কর্মকর্তা নিকলাউস সাগেসার বলেন, শুরুতে তিনি ধারণা করেছিলেন, পশমের তৈরি কম্বল হয়তো প্রয়োজনীয় স্থায়িত্ব ধরে রাখতে পারবে না। পরীক্ষার ফল দেখে সেই ধারণা বদলেছে।

গবেষণা দলের শিক্ষার্থী এলিয়ট গাফিও জানান, শুরুতে পরীক্ষার ফল নিয়ে তারা নিশ্চিত ছিলেন না। কিন্তু পাওয়া ফলাফল তাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে।

তবে গবেষকেরা এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, পশমের কম্বল জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের মোট হিমবাহ এলাকার মাত্র প্রায় ০.০২ শতাংশ এ ধরনের সুরক্ষামূলক কভার দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। ফলে বৃহৎ পরিসরে হিমবাহ গলার প্রবণতা ঠেকাতে এ পদ্ধতির সক্ষমতা সীমিত।

বিজ্ঞানীদের মতে, হিমবাহ গলার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বন্ধ করার প্রধান উপায় হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানো। আর এর জন্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ মোকাবিলা সম্ভব নয়।

অর্থাৎ, ভেড়ার পশমের কম্বল স্থানীয়ভাবে হিমবাহের বরফ গলার গতি কমাতে কার্যকর একটি পরিবেশবান্ধব বিকল্প হতে পারে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি বড় সমাধানের পরিবর্তে সীমিত পরিসরের একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত