ঢাকার রাস্তায় যানজট নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু যানজটের চরিত্র বদলেছে। আগে যেখানে বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি, রিকশা ও মোটরসাইকেল নিয়ে মূলত প্রতিযোগিতা ছিল, এখন সেখানে যোগ হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিশাল বহর। তারা কখনো প্রধান সড়কে উঠে আসছে, কখনো হঠাৎ থেমে যাত্রী তুলছে, কখনো ইউটার্ন নিচ্ছে, আবার কখনো ফুটপাতের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। ফলে রাস্তার শৃঙ্খলা আরও দুর্বল হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।
এখন তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু পরিবহনের বিষয় নয়। এটি হয়ে উঠেছে নগর পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান, সড়ক নিরাপত্তা, রাজস্ব এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
দেশে গণপরিবহন পর্যাপ্ত নয়। শহরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে অনেক সময় বাস পাওয়া যায় না। বড় বাস অলিগলিতে ঢুকতে পারে না। গ্রাম, উপজেলা কিংবা ছোট শহরে তো আধুনিক গণপরিবহনের সুযোগ আরও সীমিত। ফলে মানুষের প্রয়োজন থেকেই ছোট যানবাহনের বাজার তৈরি হয়েছে। যেখানে বাস যায় না, সেখানে রিকশা যায়। যেখানে রিকশায় দূরত্ব বেশি, সেখানে ইজিবাইক যায়। যেখানে যাত্রী কম, সেখানে বড় বাস চালানো লাভজনক নয়, কিন্তু ছোট যানবাহন চলতে পারে।
অর্থাৎ ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু যানজট তৈরি করেনি। আমাদের দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থার শূণ্যতাও পূরণ করেছে।
সমস্যা অন্য জায়গায়। প্রয়োজনের কারণে একটি পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পরও আমরা সেটিকে পরিকল্পনার মধ্যে আনিনি। যানবাহন বাড়তে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়নি। চালকরা গাড়ি চালাচ্ছেন, কিন্তু প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। গাড়ি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু উৎপাদনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে, কিন্তু চার্জিং স্টেশন কোথায় এবং কীভাবে পরিচালিত হবে, তারও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ নেই।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, দেশে ঠিক কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে দেশে ই-থ্রি-হুইলারের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। শুধু ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। সংখ্যার এই পার্থক্যকে ছোট বিষয় মনে করার কারণ নেই। যে খাতে কয়েক মিলিয়ন যানবাহন চলছে, সেই খাতের সঠিক পরিসংখ্যানই যদি রাষ্ট্রের কাছে না থাকে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে?
আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক সময় কোনো একটি বিষয়কে অবজ্ঞা করতে করতে সেটিকে বড় হতে দেয়। যখন সেটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটিকে সমস্যা হিসেবে আবিষ্কার করে। এরপর শুরু হয় অভিযান, উচ্ছেদ, নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন নীতিমালা। কিন্তু যে জায়গা থেকে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে, সেই উৎসে খুব কমই যাওয়া হয়।
ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রেও যদি শুধু চালকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়, তাহলে সমস্যার খুব সামান্য অংশই ধরা পড়বে।
একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার পেছনে আছে চালক, মালিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, স্থানীয় কারখানা, বডি নির্মাতা, ব্যাটারি বিক্রেতা, চার্জিং স্টেশন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি পুরো ইনফরমাল অর্থনীতি। এই পুরো ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে শুধু রাস্তা থেকে রিকশা সরানো অনেকটা নদীর ওপরের পানি সরিয়ে নদীর উৎস বন্ধ করার চেষ্টা করার মতো।
ঢাকার যানজটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তার যে কোনো স্থানে হঠাৎ থামলেই হয়তো বড় কোনো সমস্যা মনে হয় না। কিন্তু এমন শত শত যানবাহন যখন একই সময়ে নিজেদের মতো করে যাত্রী ওঠানামা করায়, ইউটার্ন নেয় এবং প্রধান সড়কে ঢোকে, তখন পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে। একটি ছোট অনিয়ম তখন বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
আরেকটি সমস্যা হলো, ঢাকার সড়কগুলোতে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। বাসের নিজস্ব রুট, রিকশার নিজস্ব চলাচল, মোটরসাইকেলের আলাদা গতি এবং প্রাইভেট কারের আলাদা বন্দোবস্ত প্রয়োজন। এর সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু শহরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা তৈরি হয়নি।
ফলে একই রাস্তা সবাই ব্যবহার করছে, কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে সমন্বয় করে চলছে না।
এটি শুধু যানজটের কারণ নয়, সড়ক নিরাপত্তারও বড় সমস্যা। বেশিরভাগ চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। অনেক যানবাহনের ফিটনেস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। অনেক গাড়ি স্থানীয়ভাবে তৈরি বা পরিবর্তন করা হচ্ছে। যাত্রী বহনের ক্ষমতা, ব্রেক, আলো, ব্যাটারি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণের মানও সব ক্ষেত্রে এক নয়।
এই অবস্থায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে, সেটিই স্বাভাবিক।
তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় সমস্যা সম্ভবত রাস্তা নয়, বিদ্যুৎ।
সাধারণত মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসার কথা। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা দেখছেন, প্রত্যাশিত হারে চাহিদা কমছে না। তাদের ধারণা, বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক রাতের বেলায় চার্জ দেওয়ার কারণে এই চাহিদা থেকে যাচ্ছে।
সিপিডির হিসাবে, ই-থ্রি-হুইলার খাত দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। এর পরিমাণ প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট। একটি পরিবহন খাতের জন্য এটি ছোট কোনো সংখ্যা নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এখন এমন একটি বড় ব্যবহারকারী তৈরি হয়েছে, যাকে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ পরিকল্পনার মূল আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।
আরও বড় সমস্যা হলো চার্জিং ব্যবস্থা।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এর বিপরীতে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬। এই পরিসংখ্যান সত্য হলে বিষয়টি শুধু বিদ্যুৎ চুরির নয়। এটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রমাণ।
এই অবৈধ চার্জিং ব্যবস্থার কারণে সরকার প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সিপিডি জানিয়েছে। অর্থাৎ একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ছে, বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে এবং সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
এত বড় একটি ব্যবস্থা এতদিন কীভাবে অদৃশ্য থাকল?
কয়েকটি অবৈধ দোকান বা চার্জিং পয়েন্ট একদিনে ৪৮ হাজারে পৌঁছায় না। ধীরে ধীরে তারা তৈরি হয়। মানুষ ব্যবহার করে। স্থানীয়ভাবে অনুমতি বা সমঝোতা তৈরি হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ আসে। ব্যবসা চলে। তারপর একসময় সংখ্যাটি এত বড় হয় যে রাষ্ট্রের নজরে পড়ে।
এ কারণেই শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
সরকার এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, লাইসেন্স, নির্দিষ্ট রুট, জিপিএস, জিও-ফেন্সিং এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। ঢাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে নির্দিষ্ট রঙ ও নম্বরের মাধ্যমে যানবাহন পরিচালনার পরিকল্পনাও কার্যকর হতে পারে। প্রধান সড়ক থেকে এসব যানবাহন সরিয়ে ফিডার রুটে চালানোর উদ্যোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু পরিকল্পনা কাগজে থাকলে কোনো লাভ নেই।
বাংলাদেশে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের অভাব নেই। অভাব রয়েছে নিয়মিত ও সমানভাবে তা বাস্তবায়নের। একজন রিকশাচালককে আটক করা বা তার গাড়ি জব্দ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু অনুমোদনহীন কারখানা বন্ধ করা, অবৈধ যন্ত্রাংশের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা, অবৈধ চার্জিং স্টেশন বন্ধ করা এবং এসবের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা অনেক কঠিন।
রাষ্ট্র যদি শুধু রাস্তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির ওপর আইন প্রয়োগ করে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ নয়, সেটি লোক দেখানো আইনের প্রয়োগ মাত্র।
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোন মডেলের গাড়ি তৈরি হবে, কতজন যাত্রী বহন করতে পারবে, ব্যাটারির মান কী হবে, ব্রেক ও আলো কেমন হবে, এসব নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি গাড়ির নিবন্ধন থাকতে হবে। চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফিটনেস পরীক্ষা ছাড়া কোনো যানবাহন রাস্তায় চলতে দেওয়া উচিত নয়।
চার্জিং ব্যবস্থাকেও বৈধ করতে হবে। প্রতিটি চার্জিং স্টেশনকে নিবন্ধনের আওতায় এনে বিদ্যুতের আলাদা হিসাব রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়ে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ চুরি কমবে এবং সরকার জানতে পারবে এই খাতে আসলে কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বদলে এটিকে গণপরিবহনের অংশ করা যেতে পারে। বড় বাস প্রধান সড়কে চলবে, আর ব্যাটারিচালিত ছোট যানবাহন আবাসিক এলাকা ও অলিগলি থেকে যাত্রী এনে বাস, মেট্রোরেল বা অন্যান্য বড় পরিবহনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে। এতে এগুলো মূল গণপরিবহনের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহায়ক হতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা হলে একজন যাত্রীকে পুরো যাত্রার জন্য রিকশার ওপর নির্ভর করতে হবে না। বাস বা মেট্রোরেল হবে মূল পরিবহন, আর ছোট বৈদ্যুতিক যানবাহন হবে ছোট দূরত্বের বাহন। তখন একটি বিশৃঙ্খল পরিবহন খাত ধীরে ধীরে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও আমাদের ভাবতে হবে। ব্যাটারি শেষ হয়ে হলে সেটি কোথায় যায়? নিম্নমানের ব্যাটারি, ব্যবহৃত ব্যাটারি এবং সেগুলোর বর্জ্য ভবিষ্যতে পরিবেশের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই শুধু গাড়ি নিবন্ধন করলেই হবে না। ব্যাটারি উৎপাদন, ব্যবহার, পরিবর্তন এবং পুনর্ব্যবহারের জন্যও নীতিমালা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত লড়াইটা ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে নয়। লড়াইটা আমাদের পরিকল্পনাহীনতার সঙ্গে। কয়েক মিলিয়ন ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে বোঝা হিসেবে না দেখে একটি নিয়ন্ত্রিত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তবে তার জন্য প্রয়োজন শুধু অভিযান নয়, তথ্য; শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নীতি; শুধু নীতি নয়, বাস্তবায়ন।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: প্রভাষক, ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ অ্যান্ড মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ, আইইউবিএটি]

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকার রাস্তায় যানজট নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু যানজটের চরিত্র বদলেছে। আগে যেখানে বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি, রিকশা ও মোটরসাইকেল নিয়ে মূলত প্রতিযোগিতা ছিল, এখন সেখানে যোগ হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিশাল বহর। তারা কখনো প্রধান সড়কে উঠে আসছে, কখনো হঠাৎ থেমে যাত্রী তুলছে, কখনো ইউটার্ন নিচ্ছে, আবার কখনো ফুটপাতের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। ফলে রাস্তার শৃঙ্খলা আরও দুর্বল হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।
এখন তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু পরিবহনের বিষয় নয়। এটি হয়ে উঠেছে নগর পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান, সড়ক নিরাপত্তা, রাজস্ব এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
দেশে গণপরিবহন পর্যাপ্ত নয়। শহরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে অনেক সময় বাস পাওয়া যায় না। বড় বাস অলিগলিতে ঢুকতে পারে না। গ্রাম, উপজেলা কিংবা ছোট শহরে তো আধুনিক গণপরিবহনের সুযোগ আরও সীমিত। ফলে মানুষের প্রয়োজন থেকেই ছোট যানবাহনের বাজার তৈরি হয়েছে। যেখানে বাস যায় না, সেখানে রিকশা যায়। যেখানে রিকশায় দূরত্ব বেশি, সেখানে ইজিবাইক যায়। যেখানে যাত্রী কম, সেখানে বড় বাস চালানো লাভজনক নয়, কিন্তু ছোট যানবাহন চলতে পারে।
অর্থাৎ ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু যানজট তৈরি করেনি। আমাদের দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থার শূণ্যতাও পূরণ করেছে।
সমস্যা অন্য জায়গায়। প্রয়োজনের কারণে একটি পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পরও আমরা সেটিকে পরিকল্পনার মধ্যে আনিনি। যানবাহন বাড়তে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়নি। চালকরা গাড়ি চালাচ্ছেন, কিন্তু প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। গাড়ি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু উৎপাদনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে, কিন্তু চার্জিং স্টেশন কোথায় এবং কীভাবে পরিচালিত হবে, তারও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ নেই।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, দেশে ঠিক কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে দেশে ই-থ্রি-হুইলারের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। শুধু ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। সংখ্যার এই পার্থক্যকে ছোট বিষয় মনে করার কারণ নেই। যে খাতে কয়েক মিলিয়ন যানবাহন চলছে, সেই খাতের সঠিক পরিসংখ্যানই যদি রাষ্ট্রের কাছে না থাকে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে?
আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক সময় কোনো একটি বিষয়কে অবজ্ঞা করতে করতে সেটিকে বড় হতে দেয়। যখন সেটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটিকে সমস্যা হিসেবে আবিষ্কার করে। এরপর শুরু হয় অভিযান, উচ্ছেদ, নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন নীতিমালা। কিন্তু যে জায়গা থেকে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে, সেই উৎসে খুব কমই যাওয়া হয়।
ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রেও যদি শুধু চালকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়, তাহলে সমস্যার খুব সামান্য অংশই ধরা পড়বে।
একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার পেছনে আছে চালক, মালিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, স্থানীয় কারখানা, বডি নির্মাতা, ব্যাটারি বিক্রেতা, চার্জিং স্টেশন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি পুরো ইনফরমাল অর্থনীতি। এই পুরো ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে শুধু রাস্তা থেকে রিকশা সরানো অনেকটা নদীর ওপরের পানি সরিয়ে নদীর উৎস বন্ধ করার চেষ্টা করার মতো।
ঢাকার যানজটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তার যে কোনো স্থানে হঠাৎ থামলেই হয়তো বড় কোনো সমস্যা মনে হয় না। কিন্তু এমন শত শত যানবাহন যখন একই সময়ে নিজেদের মতো করে যাত্রী ওঠানামা করায়, ইউটার্ন নেয় এবং প্রধান সড়কে ঢোকে, তখন পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে। একটি ছোট অনিয়ম তখন বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
আরেকটি সমস্যা হলো, ঢাকার সড়কগুলোতে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। বাসের নিজস্ব রুট, রিকশার নিজস্ব চলাচল, মোটরসাইকেলের আলাদা গতি এবং প্রাইভেট কারের আলাদা বন্দোবস্ত প্রয়োজন। এর সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু শহরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা তৈরি হয়নি।
ফলে একই রাস্তা সবাই ব্যবহার করছে, কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে সমন্বয় করে চলছে না।
এটি শুধু যানজটের কারণ নয়, সড়ক নিরাপত্তারও বড় সমস্যা। বেশিরভাগ চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। অনেক যানবাহনের ফিটনেস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। অনেক গাড়ি স্থানীয়ভাবে তৈরি বা পরিবর্তন করা হচ্ছে। যাত্রী বহনের ক্ষমতা, ব্রেক, আলো, ব্যাটারি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণের মানও সব ক্ষেত্রে এক নয়।
এই অবস্থায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে, সেটিই স্বাভাবিক।
তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় সমস্যা সম্ভবত রাস্তা নয়, বিদ্যুৎ।
সাধারণত মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসার কথা। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা দেখছেন, প্রত্যাশিত হারে চাহিদা কমছে না। তাদের ধারণা, বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক রাতের বেলায় চার্জ দেওয়ার কারণে এই চাহিদা থেকে যাচ্ছে।
সিপিডির হিসাবে, ই-থ্রি-হুইলার খাত দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। এর পরিমাণ প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট। একটি পরিবহন খাতের জন্য এটি ছোট কোনো সংখ্যা নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এখন এমন একটি বড় ব্যবহারকারী তৈরি হয়েছে, যাকে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ পরিকল্পনার মূল আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।
আরও বড় সমস্যা হলো চার্জিং ব্যবস্থা।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এর বিপরীতে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬। এই পরিসংখ্যান সত্য হলে বিষয়টি শুধু বিদ্যুৎ চুরির নয়। এটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রমাণ।
এই অবৈধ চার্জিং ব্যবস্থার কারণে সরকার প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সিপিডি জানিয়েছে। অর্থাৎ একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ছে, বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে এবং সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
এত বড় একটি ব্যবস্থা এতদিন কীভাবে অদৃশ্য থাকল?
কয়েকটি অবৈধ দোকান বা চার্জিং পয়েন্ট একদিনে ৪৮ হাজারে পৌঁছায় না। ধীরে ধীরে তারা তৈরি হয়। মানুষ ব্যবহার করে। স্থানীয়ভাবে অনুমতি বা সমঝোতা তৈরি হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ আসে। ব্যবসা চলে। তারপর একসময় সংখ্যাটি এত বড় হয় যে রাষ্ট্রের নজরে পড়ে।
এ কারণেই শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
সরকার এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, লাইসেন্স, নির্দিষ্ট রুট, জিপিএস, জিও-ফেন্সিং এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। ঢাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে নির্দিষ্ট রঙ ও নম্বরের মাধ্যমে যানবাহন পরিচালনার পরিকল্পনাও কার্যকর হতে পারে। প্রধান সড়ক থেকে এসব যানবাহন সরিয়ে ফিডার রুটে চালানোর উদ্যোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু পরিকল্পনা কাগজে থাকলে কোনো লাভ নেই।
বাংলাদেশে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের অভাব নেই। অভাব রয়েছে নিয়মিত ও সমানভাবে তা বাস্তবায়নের। একজন রিকশাচালককে আটক করা বা তার গাড়ি জব্দ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু অনুমোদনহীন কারখানা বন্ধ করা, অবৈধ যন্ত্রাংশের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা, অবৈধ চার্জিং স্টেশন বন্ধ করা এবং এসবের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা অনেক কঠিন।
রাষ্ট্র যদি শুধু রাস্তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির ওপর আইন প্রয়োগ করে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ নয়, সেটি লোক দেখানো আইনের প্রয়োগ মাত্র।
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোন মডেলের গাড়ি তৈরি হবে, কতজন যাত্রী বহন করতে পারবে, ব্যাটারির মান কী হবে, ব্রেক ও আলো কেমন হবে, এসব নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি গাড়ির নিবন্ধন থাকতে হবে। চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফিটনেস পরীক্ষা ছাড়া কোনো যানবাহন রাস্তায় চলতে দেওয়া উচিত নয়।
চার্জিং ব্যবস্থাকেও বৈধ করতে হবে। প্রতিটি চার্জিং স্টেশনকে নিবন্ধনের আওতায় এনে বিদ্যুতের আলাদা হিসাব রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়ে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ চুরি কমবে এবং সরকার জানতে পারবে এই খাতে আসলে কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বদলে এটিকে গণপরিবহনের অংশ করা যেতে পারে। বড় বাস প্রধান সড়কে চলবে, আর ব্যাটারিচালিত ছোট যানবাহন আবাসিক এলাকা ও অলিগলি থেকে যাত্রী এনে বাস, মেট্রোরেল বা অন্যান্য বড় পরিবহনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে। এতে এগুলো মূল গণপরিবহনের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহায়ক হতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা হলে একজন যাত্রীকে পুরো যাত্রার জন্য রিকশার ওপর নির্ভর করতে হবে না। বাস বা মেট্রোরেল হবে মূল পরিবহন, আর ছোট বৈদ্যুতিক যানবাহন হবে ছোট দূরত্বের বাহন। তখন একটি বিশৃঙ্খল পরিবহন খাত ধীরে ধীরে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও আমাদের ভাবতে হবে। ব্যাটারি শেষ হয়ে হলে সেটি কোথায় যায়? নিম্নমানের ব্যাটারি, ব্যবহৃত ব্যাটারি এবং সেগুলোর বর্জ্য ভবিষ্যতে পরিবেশের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই শুধু গাড়ি নিবন্ধন করলেই হবে না। ব্যাটারি উৎপাদন, ব্যবহার, পরিবর্তন এবং পুনর্ব্যবহারের জন্যও নীতিমালা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত লড়াইটা ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে নয়। লড়াইটা আমাদের পরিকল্পনাহীনতার সঙ্গে। কয়েক মিলিয়ন ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে বোঝা হিসেবে না দেখে একটি নিয়ন্ত্রিত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তবে তার জন্য প্রয়োজন শুধু অভিযান নয়, তথ্য; শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নীতি; শুধু নীতি নয়, বাস্তবায়ন।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: প্রভাষক, ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ অ্যান্ড মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ, আইইউবিএটি]

আপনার মতামত লিখুন