সংবাদ

পাহাড়ের উৎসবের দিন পাবলিক পরীক্ষা?


উজ্জ্বলেন্দু চাকমা
উজ্জ্বলেন্দু চাকমা
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩০ এএম

পাহাড়ের উৎসবের দিন পাবলিক পরীক্ষা?
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বর্ষবিদায় ও নববর্ষবরণ উপলক্ষে প্রতিবছর ১১ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত নানা সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করে

প্রতিবছর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পাবলিক পরীক্ষার রুটিনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব—বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিহু, চাংক্রান ও চৈত্রসংক্রান্তির দিনগুলোতে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার রুটিনও এর ব্যতিক্রম নয়। গত ২৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রুটিনে দেখা যায়, ১৩ এপ্রিল জীববিজ্ঞান ও অর্থনীতি এবং ১৫ এপ্রিল সব ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ ১৩ এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রধান উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ দিন। ফলে পরীক্ষার্থীদের একদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক উৎসবে অংশ নেওয়ার মধ্যে বেছে নিতে হবে—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বর্ষবিদায় ও নববর্ষবরণ উপলক্ষে প্রতিবছর ১১ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত নানা সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করে। সম্প্রদায়ভেদে উৎসবের নাম ভিন্ন হলেও এর উদ্দেশ্য ও চেতনা অভিন্ন। পরিবারের সদস্যরা একত্র হন, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করেন এবং নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনাচারের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করেন। বিঝু এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক উৎসব। নাচ-গানসহ নানা আয়োজনে পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে অনেক মানুষ এতে অংশ নেন। ফলে এসব উৎসব এখন শুধু কোনো একটি জনগোষ্ঠীর বিষয় নয়; পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরই অংশ।

ঐতিহাসিকভাবেও এসব উৎসবের সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে বিঝু উৎসব উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয়, আদালত ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে ছুটি থাকত। তাই এ সময়ের ছুটিকে বিঝু ছুটি বা বিঝু উৎসবের ছুটি বলা হতো। পরবর্তী সময়ে রমজান উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি চালু হওয়ায় সেই প্রথা আর থাকেনি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সামাজিক উৎসবগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অন্তত পাঁচ দিন—১১ থেকে ১৫ এপ্রিল—সাধারণ ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি বৈচিত্র‍্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে। সেই অন্তর্ভুক্তির বাস্তব প্রতিফলন শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাতেও থাকা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসবের দিন পাবলিক পরীক্ষা নির্ধারণ করা হলে সেই অন্তর্ভুক্তির চেতনা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে এসএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ পরীক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার্থী নয়; তারাও কোনো পরিবার, সম্প্রদায় ও সংস্কৃতির অংশ।

এখনও ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগে যথেষ্ট সময় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষার রুটিনটি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। অন্তত ১১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে কোনো পাবলিক পরীক্ষা না রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের দিনগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এটি কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মানের প্রকাশ।

বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিহু, চাংক্রান, বিষু ও চৈত্রসংক্রান্তি আবহমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এসব উৎসব পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রধান উৎসবের দিনগুলোতে পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়া এবং উৎসব উপলক্ষে অন্তত পাঁচ দিনের সাধারণ ছুটি বিবেচনা করা সময়ের দাবি। রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের পাশাপাশি প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসবকে সমান মর্যাদা দেবে। ধর্ম যার যার, উৎসব হোক সবার—এই চেতনাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সভাপতি, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙ্গামাটি]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পাহাড়ের উৎসবের দিন পাবলিক পরীক্ষা?

প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

প্রতিবছর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পাবলিক পরীক্ষার রুটিনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব—বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিহু, চাংক্রান ও চৈত্রসংক্রান্তির দিনগুলোতে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার রুটিনও এর ব্যতিক্রম নয়। গত ২৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রুটিনে দেখা যায়, ১৩ এপ্রিল জীববিজ্ঞান ও অর্থনীতি এবং ১৫ এপ্রিল সব ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ ১৩ এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রধান উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ দিন। ফলে পরীক্ষার্থীদের একদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক উৎসবে অংশ নেওয়ার মধ্যে বেছে নিতে হবে—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বর্ষবিদায় ও নববর্ষবরণ উপলক্ষে প্রতিবছর ১১ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত নানা সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করে। সম্প্রদায়ভেদে উৎসবের নাম ভিন্ন হলেও এর উদ্দেশ্য ও চেতনা অভিন্ন। পরিবারের সদস্যরা একত্র হন, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করেন এবং নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনাচারের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করেন। বিঝু এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক উৎসব। নাচ-গানসহ নানা আয়োজনে পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে অনেক মানুষ এতে অংশ নেন। ফলে এসব উৎসব এখন শুধু কোনো একটি জনগোষ্ঠীর বিষয় নয়; পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরই অংশ।

ঐতিহাসিকভাবেও এসব উৎসবের সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে বিঝু উৎসব উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয়, আদালত ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে ছুটি থাকত। তাই এ সময়ের ছুটিকে বিঝু ছুটি বা বিঝু উৎসবের ছুটি বলা হতো। পরবর্তী সময়ে রমজান উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি চালু হওয়ায় সেই প্রথা আর থাকেনি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সামাজিক উৎসবগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অন্তত পাঁচ দিন—১১ থেকে ১৫ এপ্রিল—সাধারণ ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি বৈচিত্র‍্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে। সেই অন্তর্ভুক্তির বাস্তব প্রতিফলন শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাতেও থাকা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসবের দিন পাবলিক পরীক্ষা নির্ধারণ করা হলে সেই অন্তর্ভুক্তির চেতনা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে এসএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ পরীক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার্থী নয়; তারাও কোনো পরিবার, সম্প্রদায় ও সংস্কৃতির অংশ।

এখনও ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগে যথেষ্ট সময় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষার রুটিনটি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। অন্তত ১১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে কোনো পাবলিক পরীক্ষা না রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের দিনগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এটি কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মানের প্রকাশ।

বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিহু, চাংক্রান, বিষু ও চৈত্রসংক্রান্তি আবহমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এসব উৎসব পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রধান উৎসবের দিনগুলোতে পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়া এবং উৎসব উপলক্ষে অন্তত পাঁচ দিনের সাধারণ ছুটি বিবেচনা করা সময়ের দাবি। রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের পাশাপাশি প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসবকে সমান মর্যাদা দেবে। ধর্ম যার যার, উৎসব হোক সবার—এই চেতনাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সভাপতি, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙ্গামাটি]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত