যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, প্রকৃতির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকান, তাদের প্রতি আমার অন্যরকম ভালোবাসা। প্রকৃতিকে ভালোবাসে যে মানুষ, সে মানুষের হৃদয় সংকীর্ণ হতে পারে না। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষেরা জাগতিক হলেও স্বচ্ছ জলাশয়ে শুভ্র মেঘের ছায়া দেখে তাদের মন অপার্থিব আনন্দে ভরে ওঠে। বর্ষা শেষে প্রকৃতি যখন স্নিগ্ধ উজ্জ্বল রূপে নিজেকে সাজায়, তখন মানুষের হৃদয়-আকাশেও রুপালি রোদ্দুরের উঁকিঝুঁকি! বর্ষাবসানে প্রখর উজ্জ্বলতা নয়, মায়াময় স্নিগ্ধতা মাখা অনির্বচনীয় সৌন্দর্য নিয়ে শরৎ উপস্থিত হয়। শরতের একধরনের স্তব্ধতা আছে। স্তব্ধতার ছন্দ আছে, গান আছে, ধ্বনি আছে, শব্দ আছে। কে শুনতে পায় সে শব্দ, ধ্বনি। বাংলার কবিরা তা শুনতে পান। তারা কান পেতে রাখেন সে শব্দ শোনার জন্য। জীবনানন্দ তাই বলেন, “সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে।” শিশিরের শব্দ শুনতে হলে কান পেতে থাকতে হয়। শরৎ, বসন্তের মতো উজ্জ্বল নয়। শরৎ নববধূর মতো লজ্জায় অবনত। লজ্জাবতী গাছের পাতার মতো। সামান্য স্পর্শে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। শরৎ অনেকটা বাঙালি জীবনের মতো। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি। কখনো কাশের মতো সাদার ঢেউ খেলে যায় জীবনে, আবার নীল আকাশের মতো অনিন্দ্য সুন্দর রঙে জীবন ভরে ওঠে।
শরতের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রোমান্টিক রবীন্দ্রনাথ শরতের শান্ত, সৌম্য রূপে বিভোর হয়ে প্রকৃতিতে ভেসে বেড়াতেন। শরতের নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য তাকে নিয়ে যেত অন্য লোকে। বর্ষাবসানে ঝকঝকে প্রকৃতির আহ্বান তিনি শুনতে পেতেন। প্রকৃতির অনুষঙ্গগুলোর আগমনে তিনি পুলক বোধ করতেন। শরতের প্রতি অপার ভালোবাসা তিনি তার সঙ্গীতে, কবিতায় উন্মোচন করেছেন। তিনি যখন গীতিকবিতায় লেখেন—“শরতে আজ কোন্ অতিথি/ এল প্রাণের দ্বারে। / আনন্দগান গা রে হৃদয়, / আনন্দগান গা রে। / নীল আকাশের নীরব কথা / শিশির-ভেজা ব্যাকুলতা / বেজে উঠুক আজি তোমার / বীণার তারে তারে।” আহা, কী অদ্ভুত শরৎবন্দনা। শরতের অনিন্দ্য সুন্দর কোমল সূর্যালোকে মুগ্ধ হয়ে তিনি লিখেছেন ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।’ কী অপূর্ব বর্ণনা, মনে হয় যেন শরতের ছবি দৃশ্যমান করে তুললেন কলমের তুলি দিয়ে। এরকম বর্ণনা বাঙালি মনকে শরতের অপূর্ব রূপমাধুর্যকে অনুভব করার জন্য প্রস্তুত করেছে।
বাংলাদেশের মানুষের জীবন বসন্তের উজ্জ্বল বাহারি রঙের মতো নয়, আবার শীতের প্রকৃতির মতো রুক্ষও বলা যাবে না। তবে বাঙালি জীবনে খরতপ্ত গ্রীষ্মের পর শান্তির বারি নিয়ে আসে বর্ষা। গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পাখিরাও আশ্রয় খোঁজে গাছের ডালে। রৌদ্রের তীব্রতা এড়াতে পথেঘাটে মানুষ খোঁজে একটুখানি ছায়া। প্রচণ্ড গরমে যখন প্রশান্তির ছায়ার আশ্রয় খোঁজে সকল শ্রেণির মানুষ, তখনও গ্রীষ্মের রৌদ্রতাপ থেকে বাঁচতে ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার মতো সময় পায় না শ্রমজীবী মানুষ। অসহ্য গরমকে উপেক্ষা করে অবিচলভাবে চলতে থাকে তাদের জীবন ও জীবিকা। প্রান্তিক বাঙালির কঠিন জীবনে রূপ, রসের ধারা বইয়ে দিয়ে বর্ষা আসে, বর্ষার অপরূপ ছন্দময় বৃষ্টি অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। বর্ষাবসানে স্নিগ্ধ, সুন্দর, মার্জিত বাঙালি বধুর মতো শরৎ ঘোমটা খোলে। প্রকৃতির ঘোমটা কিন্তু ঝলমলে উজ্জ্বল বেনারসি শাড়ির মতো নয়, বাংলার কারিগরদের শিল্পিত হাতে তৈরি মার্জিত জামদানি শাড়ি। এই শিল্পিত সুন্দর ঋতুকে ভালো না বেসে থাকতে পারেননি বাংলার কবি, চিত্রশিল্পী থেকে শুরু করে সকল সৃষ্টিশীল মানুষ। শরতের স্নিগ্ধতায় মোহগ্রস্ত হয়েছিলেন মহাকবি কালিদাস। কালিদাসই প্রথম বলেছিলেন শরৎ নববধূর মতো। কী অসাধারণ উপস্থাপনা। কালিদাস বলেছিলেন, “প্রিয়তম আমার ঐ চেয়ে দেখ/ নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত”।
আমরা কী দেখেছি নববধূর মতো সমাগত শরৎকালকে। যারা আমার মতো নগরে বসবাস করেন, তাদের বর্ষা ছাড়া আর কোনো ঋতুকে দেখার সুযোগ হয় না। অন্য ঋতুগুলোকে অনুভব করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক বদ্ধ ঘরের ভেতর নৃত্য, গীত সহকারে বসন্তবরণ, বর্ষা উদযাপন কিংবা হেমন্তকালে নবান্ন উৎসবে উপস্থিত হয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার বকুলতলায় উদযাপন করা হয় প্রতি বছর শরৎ উৎসব। নাচ, গান আর আবৃত্তির মধ্য দিয়ে শরৎবন্দনায় অংশ নেন শিল্পীরা। চারুকলায় নবান্ন উদযাপিত হয়, বর্ষবরণ হয়, প্রতিটি ঋতুর আবাহন করে চারুকলার শিক্ষার্থীরা। একইভাবে সারা দেশে বিভিন্ন বদ্ধ ঘরে অথবা কৃষ্ণচূড়া, শিরীষ প্রাঙ্গণে ঋতু আবাহন ও বন্দনা করা হয়। প্রতিটি ঋতুর অপার্থিব সৌন্দর্যে স্নাত হওয়া আর বদ্ধ ঘরে কিংবা ছাদের নিচের কৃষ্ণচূড়া তলায় ঋতুকে আবাহন করার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। এভাবে অংশ নিয়ে ঋতুকে কী অনুভব করা যায় না। শুধু মাত্র ঋতুর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা যায়।
আমরা যদি প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যকে পান করতে চাই, জীবনে সুন্দরকে আবাহন করতে চাই, তাহলে বৈচিত্র্যময় ঋতুর স্পর্শ পেতে হবে। শরৎ সন্ধ্যায় আল-ধরা পথ ধরে, ডানে-বামে সামান্য সোনালি রঙের ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে একা একা হেঁটে গেলে মানুষ উদাসী হয়ে যায়। এই যে মনের ঔদাসীন্য, তা হলো শরতের সঙ্গে মনের যোগসূত্র ঘটানো। খালি পায়ে শিশিরের স্পর্শের অনুভূতি, মনের ভেতরের বাউল মানুষকে জাগিয়ে তুলে। মানুষের ভেতরের দার্শনিক মানুষ যখন জেগে ওঠে, তখন মানুষ আর অমানুষ হতে পারে না। থোকা থোকা শিউলির সৌন্দর্য পিপাসু হয়ে পড়ে। সত্য, সুন্দর তার সহযাত্রী হয়।
শরৎ মানেই শিউলি ফোটার দিন। শিউলির মধুগন্ধ ভেসে বেড়ানোর দিন। শিউলির আরেক নাম শেফালি। আগের দিনে কবিরা শেফালি নামটাই বেশি ব্যবহার করেছেন। শিউলি বা শেফালি যা-ই বলি না কেন, ফুলটি হলো বাংলার শরতের প্রতীক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আরণ্যক' উপন্যাসে শিউলির বিশাল বন ও তার তীব্র ঘ্রাণের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ সবাই বারবার শিউলির প্রশস্তি গেয়েছেন।
প্রেমের কবি, প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম সবার অলক্ষ্যে শিউলির সৌন্দর্য বিসর্জনকে দেখেছেন বিরহ জড়ানো গভীর দুঃখবোধ হিসেবে। তিনি গেয়েছেন “'তোমারি অশ্রু জলে শিউলি তলে সিক্ত শরতে/হিমানীর পরশ বুলাও ঘুম ভেঙে দাও...'। প্রেমের কবিকে শিউলির অপরূপ সৌন্দর্য অন্যরকম প্রেমাতুর করে তুলত। শারদ রাতে তিনি আকুল হয়ে উঠতেন। তার সেই অমর সঙ্গীতে শিউলির প্রতি তার ভালোবাসার মূর্তিমান হয়ে ওঠে। “শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই।” শারদ রাতে শিউলি ফুলের প্রতি তার এই আকুলতা চিরদিন প্রেমিক হৃদয়ে ঢেউ তুলে যাবে।
শরতে নদীর রূপে একধরনের স্নিগ্ধ মুগ্ধতা খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয় শান্ত মেয়ের আঁচল ওড়ে যায় শরতের নদীর ঢেউয়ের ছন্দের তালে। নদীর দু-কূল ছাপিয়ে বানের জলকে সরিয়ে দিয়ে আন্দোলিত হয় কাশবন। কাশের পেলব পাপড়িগুলো দিনমান হাওয়ায় দোলে, বাতাসে উড়ে যেতে চায়। কাশের বনের শ্বেত সমুদ্রের ঢেউ, ধ্যানমগ্ন হয়ে না দেখলে শরতের অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যকে প্রায় দেখা হয়ে ওঠে না বললেই চলে। কাশের বন, নদীর ঢেউ, সুনীল আকাশের দূরগামী মেঘ যখন দিগন্ত ছাপিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে খেলা করে, তখন বাংলার শরৎ দৃশ্যমান হয় প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষের সম্মুখে।
ফিরে আসি প্রথম কথায়, প্রকৃতিকে ভালোবাসার মানুষেরা মানুষকে ভালো না বেসে পারেন না, মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। মানুষ যদি প্রকৃতির অংশ হয়ে নিজ হাতে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তাহলে প্রকৃতির অংশ হিসাবে মানুষ কোনোভাবেই তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। প্রকৃতিকে ভালোবাসা, হৃদয় থেকে যেমন উৎসারিত হয়, একইভাবে প্রকৃতিকে ভালোবাসার গুরুত্বও বুঝিয়ে দিতে হয়।
শরতের দিনগুলোকে যেন স্বপ্নের মতোই মনে হয়। চারপাশে ছড়িয়ে থাকে অনেক স্বপ্ন। আমরা সেসব স্বপ্ন কুড়িয়ে নিয়ে ভাবতে বসি কত কিছু! শরতের এই শুভ্র রূপ পবিত্রতার প্রতীক। এই পবিত্রতা দিয়ে আমরা অমানবিক মনকে পরিবার, সমাজ, দেশ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাই আমাদের সুবর্ণ ভূমির অনেক বাইরে।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, প্রকৃতির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকান, তাদের প্রতি আমার অন্যরকম ভালোবাসা। প্রকৃতিকে ভালোবাসে যে মানুষ, সে মানুষের হৃদয় সংকীর্ণ হতে পারে না। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষেরা জাগতিক হলেও স্বচ্ছ জলাশয়ে শুভ্র মেঘের ছায়া দেখে তাদের মন অপার্থিব আনন্দে ভরে ওঠে। বর্ষা শেষে প্রকৃতি যখন স্নিগ্ধ উজ্জ্বল রূপে নিজেকে সাজায়, তখন মানুষের হৃদয়-আকাশেও রুপালি রোদ্দুরের উঁকিঝুঁকি! বর্ষাবসানে প্রখর উজ্জ্বলতা নয়, মায়াময় স্নিগ্ধতা মাখা অনির্বচনীয় সৌন্দর্য নিয়ে শরৎ উপস্থিত হয়। শরতের একধরনের স্তব্ধতা আছে। স্তব্ধতার ছন্দ আছে, গান আছে, ধ্বনি আছে, শব্দ আছে। কে শুনতে পায় সে শব্দ, ধ্বনি। বাংলার কবিরা তা শুনতে পান। তারা কান পেতে রাখেন সে শব্দ শোনার জন্য। জীবনানন্দ তাই বলেন, “সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে।” শিশিরের শব্দ শুনতে হলে কান পেতে থাকতে হয়। শরৎ, বসন্তের মতো উজ্জ্বল নয়। শরৎ নববধূর মতো লজ্জায় অবনত। লজ্জাবতী গাছের পাতার মতো। সামান্য স্পর্শে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। শরৎ অনেকটা বাঙালি জীবনের মতো। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি। কখনো কাশের মতো সাদার ঢেউ খেলে যায় জীবনে, আবার নীল আকাশের মতো অনিন্দ্য সুন্দর রঙে জীবন ভরে ওঠে।
শরতের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রোমান্টিক রবীন্দ্রনাথ শরতের শান্ত, সৌম্য রূপে বিভোর হয়ে প্রকৃতিতে ভেসে বেড়াতেন। শরতের নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য তাকে নিয়ে যেত অন্য লোকে। বর্ষাবসানে ঝকঝকে প্রকৃতির আহ্বান তিনি শুনতে পেতেন। প্রকৃতির অনুষঙ্গগুলোর আগমনে তিনি পুলক বোধ করতেন। শরতের প্রতি অপার ভালোবাসা তিনি তার সঙ্গীতে, কবিতায় উন্মোচন করেছেন। তিনি যখন গীতিকবিতায় লেখেন—“শরতে আজ কোন্ অতিথি/ এল প্রাণের দ্বারে। / আনন্দগান গা রে হৃদয়, / আনন্দগান গা রে। / নীল আকাশের নীরব কথা / শিশির-ভেজা ব্যাকুলতা / বেজে উঠুক আজি তোমার / বীণার তারে তারে।” আহা, কী অদ্ভুত শরৎবন্দনা। শরতের অনিন্দ্য সুন্দর কোমল সূর্যালোকে মুগ্ধ হয়ে তিনি লিখেছেন ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।’ কী অপূর্ব বর্ণনা, মনে হয় যেন শরতের ছবি দৃশ্যমান করে তুললেন কলমের তুলি দিয়ে। এরকম বর্ণনা বাঙালি মনকে শরতের অপূর্ব রূপমাধুর্যকে অনুভব করার জন্য প্রস্তুত করেছে।
বাংলাদেশের মানুষের জীবন বসন্তের উজ্জ্বল বাহারি রঙের মতো নয়, আবার শীতের প্রকৃতির মতো রুক্ষও বলা যাবে না। তবে বাঙালি জীবনে খরতপ্ত গ্রীষ্মের পর শান্তির বারি নিয়ে আসে বর্ষা। গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পাখিরাও আশ্রয় খোঁজে গাছের ডালে। রৌদ্রের তীব্রতা এড়াতে পথেঘাটে মানুষ খোঁজে একটুখানি ছায়া। প্রচণ্ড গরমে যখন প্রশান্তির ছায়ার আশ্রয় খোঁজে সকল শ্রেণির মানুষ, তখনও গ্রীষ্মের রৌদ্রতাপ থেকে বাঁচতে ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার মতো সময় পায় না শ্রমজীবী মানুষ। অসহ্য গরমকে উপেক্ষা করে অবিচলভাবে চলতে থাকে তাদের জীবন ও জীবিকা। প্রান্তিক বাঙালির কঠিন জীবনে রূপ, রসের ধারা বইয়ে দিয়ে বর্ষা আসে, বর্ষার অপরূপ ছন্দময় বৃষ্টি অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। বর্ষাবসানে স্নিগ্ধ, সুন্দর, মার্জিত বাঙালি বধুর মতো শরৎ ঘোমটা খোলে। প্রকৃতির ঘোমটা কিন্তু ঝলমলে উজ্জ্বল বেনারসি শাড়ির মতো নয়, বাংলার কারিগরদের শিল্পিত হাতে তৈরি মার্জিত জামদানি শাড়ি। এই শিল্পিত সুন্দর ঋতুকে ভালো না বেসে থাকতে পারেননি বাংলার কবি, চিত্রশিল্পী থেকে শুরু করে সকল সৃষ্টিশীল মানুষ। শরতের স্নিগ্ধতায় মোহগ্রস্ত হয়েছিলেন মহাকবি কালিদাস। কালিদাসই প্রথম বলেছিলেন শরৎ নববধূর মতো। কী অসাধারণ উপস্থাপনা। কালিদাস বলেছিলেন, “প্রিয়তম আমার ঐ চেয়ে দেখ/ নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত”।
আমরা কী দেখেছি নববধূর মতো সমাগত শরৎকালকে। যারা আমার মতো নগরে বসবাস করেন, তাদের বর্ষা ছাড়া আর কোনো ঋতুকে দেখার সুযোগ হয় না। অন্য ঋতুগুলোকে অনুভব করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক বদ্ধ ঘরের ভেতর নৃত্য, গীত সহকারে বসন্তবরণ, বর্ষা উদযাপন কিংবা হেমন্তকালে নবান্ন উৎসবে উপস্থিত হয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার বকুলতলায় উদযাপন করা হয় প্রতি বছর শরৎ উৎসব। নাচ, গান আর আবৃত্তির মধ্য দিয়ে শরৎবন্দনায় অংশ নেন শিল্পীরা। চারুকলায় নবান্ন উদযাপিত হয়, বর্ষবরণ হয়, প্রতিটি ঋতুর আবাহন করে চারুকলার শিক্ষার্থীরা। একইভাবে সারা দেশে বিভিন্ন বদ্ধ ঘরে অথবা কৃষ্ণচূড়া, শিরীষ প্রাঙ্গণে ঋতু আবাহন ও বন্দনা করা হয়। প্রতিটি ঋতুর অপার্থিব সৌন্দর্যে স্নাত হওয়া আর বদ্ধ ঘরে কিংবা ছাদের নিচের কৃষ্ণচূড়া তলায় ঋতুকে আবাহন করার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। এভাবে অংশ নিয়ে ঋতুকে কী অনুভব করা যায় না। শুধু মাত্র ঋতুর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা যায়।
আমরা যদি প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যকে পান করতে চাই, জীবনে সুন্দরকে আবাহন করতে চাই, তাহলে বৈচিত্র্যময় ঋতুর স্পর্শ পেতে হবে। শরৎ সন্ধ্যায় আল-ধরা পথ ধরে, ডানে-বামে সামান্য সোনালি রঙের ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে একা একা হেঁটে গেলে মানুষ উদাসী হয়ে যায়। এই যে মনের ঔদাসীন্য, তা হলো শরতের সঙ্গে মনের যোগসূত্র ঘটানো। খালি পায়ে শিশিরের স্পর্শের অনুভূতি, মনের ভেতরের বাউল মানুষকে জাগিয়ে তুলে। মানুষের ভেতরের দার্শনিক মানুষ যখন জেগে ওঠে, তখন মানুষ আর অমানুষ হতে পারে না। থোকা থোকা শিউলির সৌন্দর্য পিপাসু হয়ে পড়ে। সত্য, সুন্দর তার সহযাত্রী হয়।
শরৎ মানেই শিউলি ফোটার দিন। শিউলির মধুগন্ধ ভেসে বেড়ানোর দিন। শিউলির আরেক নাম শেফালি। আগের দিনে কবিরা শেফালি নামটাই বেশি ব্যবহার করেছেন। শিউলি বা শেফালি যা-ই বলি না কেন, ফুলটি হলো বাংলার শরতের প্রতীক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আরণ্যক' উপন্যাসে শিউলির বিশাল বন ও তার তীব্র ঘ্রাণের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ সবাই বারবার শিউলির প্রশস্তি গেয়েছেন।
প্রেমের কবি, প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম সবার অলক্ষ্যে শিউলির সৌন্দর্য বিসর্জনকে দেখেছেন বিরহ জড়ানো গভীর দুঃখবোধ হিসেবে। তিনি গেয়েছেন “'তোমারি অশ্রু জলে শিউলি তলে সিক্ত শরতে/হিমানীর পরশ বুলাও ঘুম ভেঙে দাও...'। প্রেমের কবিকে শিউলির অপরূপ সৌন্দর্য অন্যরকম প্রেমাতুর করে তুলত। শারদ রাতে তিনি আকুল হয়ে উঠতেন। তার সেই অমর সঙ্গীতে শিউলির প্রতি তার ভালোবাসার মূর্তিমান হয়ে ওঠে। “শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই।” শারদ রাতে শিউলি ফুলের প্রতি তার এই আকুলতা চিরদিন প্রেমিক হৃদয়ে ঢেউ তুলে যাবে।
শরতে নদীর রূপে একধরনের স্নিগ্ধ মুগ্ধতা খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয় শান্ত মেয়ের আঁচল ওড়ে যায় শরতের নদীর ঢেউয়ের ছন্দের তালে। নদীর দু-কূল ছাপিয়ে বানের জলকে সরিয়ে দিয়ে আন্দোলিত হয় কাশবন। কাশের পেলব পাপড়িগুলো দিনমান হাওয়ায় দোলে, বাতাসে উড়ে যেতে চায়। কাশের বনের শ্বেত সমুদ্রের ঢেউ, ধ্যানমগ্ন হয়ে না দেখলে শরতের অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যকে প্রায় দেখা হয়ে ওঠে না বললেই চলে। কাশের বন, নদীর ঢেউ, সুনীল আকাশের দূরগামী মেঘ যখন দিগন্ত ছাপিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে খেলা করে, তখন বাংলার শরৎ দৃশ্যমান হয় প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষের সম্মুখে।
ফিরে আসি প্রথম কথায়, প্রকৃতিকে ভালোবাসার মানুষেরা মানুষকে ভালো না বেসে পারেন না, মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। মানুষ যদি প্রকৃতির অংশ হয়ে নিজ হাতে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তাহলে প্রকৃতির অংশ হিসাবে মানুষ কোনোভাবেই তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। প্রকৃতিকে ভালোবাসা, হৃদয় থেকে যেমন উৎসারিত হয়, একইভাবে প্রকৃতিকে ভালোবাসার গুরুত্বও বুঝিয়ে দিতে হয়।
শরতের দিনগুলোকে যেন স্বপ্নের মতোই মনে হয়। চারপাশে ছড়িয়ে থাকে অনেক স্বপ্ন। আমরা সেসব স্বপ্ন কুড়িয়ে নিয়ে ভাবতে বসি কত কিছু! শরতের এই শুভ্র রূপ পবিত্রতার প্রতীক। এই পবিত্রতা দিয়ে আমরা অমানবিক মনকে পরিবার, সমাজ, দেশ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাই আমাদের সুবর্ণ ভূমির অনেক বাইরে।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

আপনার মতামত লিখুন