সংবাদ

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাই খামারভিত্তিক কৌশল


কে বি এম সাইফুল ইসলাম
কে বি এম সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৪ এএম

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাই খামারভিত্তিক কৌশল
ক্ষতিকর উপাদানকে খাদ্যচক্রে ঢোকার আগেই যদি আমরা খামার পর্যায়ে রুখে দিতে না পারি, তবে কেবল শেষ মুহূর্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা ও প্রতিবেদন আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ যে এখন আর কেবল নদী, সমুদ্র কিংবা শহরের ডাস্টবিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা অত্যন্ত নীরবে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ঢুকে পড়েছে, দুধের এই চিত্র তারই অকাট্য প্রমাণ। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে এ নিয়ে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারগুলোতে দুধ পরীক্ষার কড়াকড়ি এবং ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চারদিকে আলোচনা চলছে।

ভোক্তাদের এই উদ্বেগ মোটেও অমূলক নয়। তবে এই চলমান জনআলোচনার আড়ালে সংকটের আসল গোড়াটি অধরাই থেকে যাচ্ছে। দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক ধরা পড়া মানে সমস্যার শুরু নয়; বরং এটি আমাদের অসচেতন ও অপরিকল্পিত কৃষি-পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার একটি অনিবার্য শেষ পরিণতি।

নিশ্চিতভাবেই দুধ পরীক্ষা করা জরুরি।  এটি ভোক্তাকে সাময়িক সচেতনতা দেয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সতর্ক করে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ একটি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ব্যবস্থা। পরীক্ষা কেবল আমাদের বলে দেয় যে দুধ দূষিত হয়েছে, কিন্তু তা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়,সেই স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না।  মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে সত্যিকার অর্থে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের নজর দিতে হবে খামারের দিকে, যেখানে এই বিষাক্ত কণাগুলো প্রথম খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি দুধে তৈরি হয় না। এগুলো অনেক আগেই জমা হয় আমাদের কৃষিজমি, পশুখাদ্য এবং খামারের পানিতে।  দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পবর্জ্য মিশ্রিত পানি দিয়ে সেচ দেওয়া, স্লাজ সার হিসেবে ব্যবহার এবং কৃষিতে প্লাস্টিক মালচিং- এর অবাধ ব্যবহারের কারণে কৃষিজমিতে প্লাস্টিক কণা জমছে।  এ ছাড়া ফসলের মাঠের পাশে যেখানে-সেখানে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে তা ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যায়।  এই মাটিতে যে ঘাস, ভুষি বা খড় উৎপাদিত হয়, তা গবাদিপশু খাওয়ার মাধ্যমে সরাসরি তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক বহন করে নিয়ে যায়।

পশুখাদ্যের বাণিজ্যিক সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় ঝুঁকি আরও বেশি। বাণিজ্যিক পোলট্রি ফিড, গরুর দানাদার খাদ্য কিংবা মাছের খাবার সাধারণত প্লাস্টিকের বস্তায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়।  পরিবহনকালীন ঘর্ষণ, অতিরিক্ত তাপ বা প্লাস্টিকের বস্তার ক্ষয় থেকে অতিক্ষুদ্র কণা খাদ্যের সঙ্গে মিশে যায়। আবার শহরতলির ডেইরি খামারগুলোতে দেখা যায়, গরু প্রায়ই রাস্তার পাশে বা আবর্জনার স্তূপ থেকে খাবার খুঁজতে গিয়ে পলিথিন গিলে ফেলে। এই প্লাস্টিক কণাগুলো প্রাণীর শরীরে ঢুকলে তা কেবল বর্জ্য হিসেবে মলমূত্রের সাথে বেরিয়ে যায় না, বরং প্রাণীর শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া করে।

খামারের পানিও এই দূষণের আরেকটি বড় উৎস।  গবাদিপশু যে পুকুর, খাল বা ভূগর্ভস্থ পানি পান করে, তাতে সিন্থেটিক ফাইবার, গাড়ির টায়ারের ক্ষয় থেকে তৈরি অতিক্ষুদ্র কণা এবং প্লাস্টিকের ভাঙা অংশ মিশে থাকে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এই উৎসগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত, এবং বাংলাদেশের কৃষি-পরিবেশও এখন হুবহু একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

প্রাণীর শরীরে এই প্লাস্টিক কণার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা খুবই সীমিত। মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রাণীর শরীরে ঢুকলে তা ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের দেয়ালে ক্রমাগত ঘর্ষণ ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। এতে অন্ত্রের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হজম ও রোগপ্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ‘মাইক্রোবায়োম’ -এর ভারসাম্য নষ্ট হয়। দুগ্ধবতী গাভী ও পোলট্রির ক্ষেত্রে এই অস্বাভাবিকতা খাদ্য হজমের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে এবং নানাবিধ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের আরেকটি ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য হলো ‘প্লাস্টিস্ফিয়ার’ তৈরি করা। এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলোর ওপর ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জমে একধরনের জৈব আস্তরণ বা ‘বায়োফিল্ম’ তৈরি করে, যেখানে বিভিন্ন রোগজীবাণু এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। যখন এই প্লাস্টিস্ফিয়ার প্রাণীর অন্ত্রে প্রবেশ করে, তখন তা ক্ষতিকর জীবাণুর বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।  এর ফলে প্রাণী ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে, চিকিৎসায় জটিলতা দেখা দেয় এবং খামারিদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।  এটি মূলত বৈশ্বিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ,অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধির একটি অন্যতম অনালোচিত পথ।

এই পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তীব্র তাদপ্রবাহ। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গবাদিপশু মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপজনিত চাপের মধ্যে থাকে।  উচ্চ তাপমাত্রা এমনিতেই পশুর খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দেয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে। এই তাপজনিত চাপের কারণে যখন অন্ত্রের সুরক্ষা ভেঙে পড়ে, তখন মাইক্রোপ্লাস্টিক আরও সহজে অন্ত্র ভেদ করে প্রাণীর রক্তপ্রবাহে ঢুকে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত দুধের মাধ্যমে মানবদেহে পৌঁছায়। সুতরাং, ল্যাবরেটরিতে দুধে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে, তা আসলে খামারের সামগ্রিক পরিবেশগত সংকটের শেষ ধাপ মাত্র।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বর্তমান নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিভঙ্গি এখনো সমস্যার ভুল জায়গায় আলো ফেলছে। প্লাস্টিক দূষণকে আমরা এখনো কেবল সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখি।  আর খাদ্য নিরাপত্তা তদারকি করা হয় কেবল শহরের বাজারে তৈরি পণ্য বা দুধ পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু কৃষি জমি, পশুখাদ্য এবং খামারের পানি,যেখান থেকে মূল দূষণ ছড়াচ্ছে, তা পুরোপুরি নজরদারির বাইরে।  বাংলাদেশে পশুখাদ্যে বা কৃষিজমির পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো সর্বোচ্চ সহনশীলতার মানদণ্ড নেই। পাশাপাশি, ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ও অত্যন্ত সীমিত।

দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও খামার ব্যবস্থা প্লাস্টিক দূষণের আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। যদি আমরা সত্যি সত্যি নিরাপদ দুধ ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চাই, তবে আমাদের কৌশল বদলাতে হবে।  বাজার থেকে নমুনা পরীক্ষা করার চিরাচরিত প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে খামার পর্যায় থেকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

কৃষিজমির পানি ও মাটিতে প্লাস্টিক কণার অনুপ্রবেশের ওপর নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে পশুখাদ্যের উৎপাদন, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণে প্লাস্টিকের বিকল্প নিরাপদ উপাদানের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। সর্বোপরি, ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব ও এএমআর ঝুঁকিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষতিকর উপাদানকে খাদ্যচক্রে ঢোকার আগেই যদি আমরা খামার পর্যায়ে রুখে দিতে না পারি, তবে কেবল শেষ মুহূর্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

[লেখক: সাবেক ডিন, ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন; সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথশেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাই খামারভিত্তিক কৌশল

প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা ও প্রতিবেদন আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ যে এখন আর কেবল নদী, সমুদ্র কিংবা শহরের ডাস্টবিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা অত্যন্ত নীরবে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ঢুকে পড়েছে, দুধের এই চিত্র তারই অকাট্য প্রমাণ। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে এ নিয়ে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারগুলোতে দুধ পরীক্ষার কড়াকড়ি এবং ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চারদিকে আলোচনা চলছে।

ভোক্তাদের এই উদ্বেগ মোটেও অমূলক নয়। তবে এই চলমান জনআলোচনার আড়ালে সংকটের আসল গোড়াটি অধরাই থেকে যাচ্ছে। দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক ধরা পড়া মানে সমস্যার শুরু নয়; বরং এটি আমাদের অসচেতন ও অপরিকল্পিত কৃষি-পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার একটি অনিবার্য শেষ পরিণতি।

নিশ্চিতভাবেই দুধ পরীক্ষা করা জরুরি।  এটি ভোক্তাকে সাময়িক সচেতনতা দেয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সতর্ক করে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ একটি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ব্যবস্থা। পরীক্ষা কেবল আমাদের বলে দেয় যে দুধ দূষিত হয়েছে, কিন্তু তা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়,সেই স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না।  মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে সত্যিকার অর্থে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের নজর দিতে হবে খামারের দিকে, যেখানে এই বিষাক্ত কণাগুলো প্রথম খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি দুধে তৈরি হয় না। এগুলো অনেক আগেই জমা হয় আমাদের কৃষিজমি, পশুখাদ্য এবং খামারের পানিতে।  দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পবর্জ্য মিশ্রিত পানি দিয়ে সেচ দেওয়া, স্লাজ সার হিসেবে ব্যবহার এবং কৃষিতে প্লাস্টিক মালচিং- এর অবাধ ব্যবহারের কারণে কৃষিজমিতে প্লাস্টিক কণা জমছে।  এ ছাড়া ফসলের মাঠের পাশে যেখানে-সেখানে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে তা ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যায়।  এই মাটিতে যে ঘাস, ভুষি বা খড় উৎপাদিত হয়, তা গবাদিপশু খাওয়ার মাধ্যমে সরাসরি তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক বহন করে নিয়ে যায়।

পশুখাদ্যের বাণিজ্যিক সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় ঝুঁকি আরও বেশি। বাণিজ্যিক পোলট্রি ফিড, গরুর দানাদার খাদ্য কিংবা মাছের খাবার সাধারণত প্লাস্টিকের বস্তায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়।  পরিবহনকালীন ঘর্ষণ, অতিরিক্ত তাপ বা প্লাস্টিকের বস্তার ক্ষয় থেকে অতিক্ষুদ্র কণা খাদ্যের সঙ্গে মিশে যায়। আবার শহরতলির ডেইরি খামারগুলোতে দেখা যায়, গরু প্রায়ই রাস্তার পাশে বা আবর্জনার স্তূপ থেকে খাবার খুঁজতে গিয়ে পলিথিন গিলে ফেলে। এই প্লাস্টিক কণাগুলো প্রাণীর শরীরে ঢুকলে তা কেবল বর্জ্য হিসেবে মলমূত্রের সাথে বেরিয়ে যায় না, বরং প্রাণীর শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া করে।

খামারের পানিও এই দূষণের আরেকটি বড় উৎস।  গবাদিপশু যে পুকুর, খাল বা ভূগর্ভস্থ পানি পান করে, তাতে সিন্থেটিক ফাইবার, গাড়ির টায়ারের ক্ষয় থেকে তৈরি অতিক্ষুদ্র কণা এবং প্লাস্টিকের ভাঙা অংশ মিশে থাকে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এই উৎসগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত, এবং বাংলাদেশের কৃষি-পরিবেশও এখন হুবহু একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

প্রাণীর শরীরে এই প্লাস্টিক কণার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা খুবই সীমিত। মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রাণীর শরীরে ঢুকলে তা ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের দেয়ালে ক্রমাগত ঘর্ষণ ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। এতে অন্ত্রের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হজম ও রোগপ্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ‘মাইক্রোবায়োম’ -এর ভারসাম্য নষ্ট হয়। দুগ্ধবতী গাভী ও পোলট্রির ক্ষেত্রে এই অস্বাভাবিকতা খাদ্য হজমের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে এবং নানাবিধ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের আরেকটি ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য হলো ‘প্লাস্টিস্ফিয়ার’ তৈরি করা। এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলোর ওপর ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জমে একধরনের জৈব আস্তরণ বা ‘বায়োফিল্ম’ তৈরি করে, যেখানে বিভিন্ন রোগজীবাণু এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। যখন এই প্লাস্টিস্ফিয়ার প্রাণীর অন্ত্রে প্রবেশ করে, তখন তা ক্ষতিকর জীবাণুর বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।  এর ফলে প্রাণী ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে, চিকিৎসায় জটিলতা দেখা দেয় এবং খামারিদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।  এটি মূলত বৈশ্বিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ,অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধির একটি অন্যতম অনালোচিত পথ।

এই পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তীব্র তাদপ্রবাহ। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গবাদিপশু মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপজনিত চাপের মধ্যে থাকে।  উচ্চ তাপমাত্রা এমনিতেই পশুর খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দেয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে। এই তাপজনিত চাপের কারণে যখন অন্ত্রের সুরক্ষা ভেঙে পড়ে, তখন মাইক্রোপ্লাস্টিক আরও সহজে অন্ত্র ভেদ করে প্রাণীর রক্তপ্রবাহে ঢুকে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত দুধের মাধ্যমে মানবদেহে পৌঁছায়। সুতরাং, ল্যাবরেটরিতে দুধে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে, তা আসলে খামারের সামগ্রিক পরিবেশগত সংকটের শেষ ধাপ মাত্র।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বর্তমান নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিভঙ্গি এখনো সমস্যার ভুল জায়গায় আলো ফেলছে। প্লাস্টিক দূষণকে আমরা এখনো কেবল সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখি।  আর খাদ্য নিরাপত্তা তদারকি করা হয় কেবল শহরের বাজারে তৈরি পণ্য বা দুধ পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু কৃষি জমি, পশুখাদ্য এবং খামারের পানি,যেখান থেকে মূল দূষণ ছড়াচ্ছে, তা পুরোপুরি নজরদারির বাইরে।  বাংলাদেশে পশুখাদ্যে বা কৃষিজমির পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো সর্বোচ্চ সহনশীলতার মানদণ্ড নেই। পাশাপাশি, ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ও অত্যন্ত সীমিত।

দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও খামার ব্যবস্থা প্লাস্টিক দূষণের আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। যদি আমরা সত্যি সত্যি নিরাপদ দুধ ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চাই, তবে আমাদের কৌশল বদলাতে হবে।  বাজার থেকে নমুনা পরীক্ষা করার চিরাচরিত প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে খামার পর্যায় থেকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

কৃষিজমির পানি ও মাটিতে প্লাস্টিক কণার অনুপ্রবেশের ওপর নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে পশুখাদ্যের উৎপাদন, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণে প্লাস্টিকের বিকল্প নিরাপদ উপাদানের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। সর্বোপরি, ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব ও এএমআর ঝুঁকিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষতিকর উপাদানকে খাদ্যচক্রে ঢোকার আগেই যদি আমরা খামার পর্যায়ে রুখে দিতে না পারি, তবে কেবল শেষ মুহূর্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

[লেখক: সাবেক ডিন, ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন; সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথশেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত