সংবাদ

দিল্লিতে ব্রিকস: কী বার্তা দিলেন মোদি-শি-পুতিন?


দীপক মুখার্জী
দীপক মুখার্জী প্রতিনিধি, কলকাতা
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

দিল্লিতে ব্রিকস: কী বার্তা দিলেন মোদি-শি-পুতিন?
দিল্লিতে BRICS মহাবৈঠক: মোদি-শি-পুতিনের সমীকরণে কী বার্তা পেল বিশ্ব?

নয়াদিল্লিতে ব্রিকস ( BRICS)-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে আজ বিশ্বের নজর ভারতের দিকে। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মেলন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার বৈঠক নয়—বরং বদলে যাওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত, চীন, রাশিয়া এবং Global South-এর অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। ভারতের এবারের সভাপতিত্বের মূল ভাবনা—Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability—অর্থাৎ প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থিতিশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ভারত মণ্ডপমে ১২-১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

কিন্তু মূল বৈঠকে নেতারা বসার আগেই দিল্লির কূটনৈতিক পরিসরে শুরু হয়ে গিয়েছিল একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। কারণ এবারের BRICS সম্মেলনের সময় বিশ্ব রাজনীতি অত্যন্ত অস্থির। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কের চাপ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব—প্রতিটি বিষয়ই BRICS-এর আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি নজর ছিল ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের দিকে। BRICS সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক হয়েছে। দুই নেতা বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পরমাণু সহযোগিতা, অবকাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যের কথাও সামনে এসেছে।

অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক যে এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—দিল্লির এই বৈঠক তারই স্পষ্ট বার্তা। একই সঙ্গে ইউক্রেন সংঘাতের ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান বদলায়নি। ভারত বারবার বলেছে, সংঘাতের সমাধানের পথ হওয়া উচিত সংলাপ ও কূটনীতি। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও ভারত নিজেকে কোনো যুদ্ধশিবিরের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে না।

এরপর আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ—ভারত ও চীন। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, গত কয়েক বছরে তা ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা চলছে। সীমান্তে উত্তেজনা কমানো, যোগাযোগ বাড়ানো, বিমান পরিষেবা ও ভিসা ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে সম্পর্ককে অন্তত স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের ভারত সফর তাই নিছক একটি BRICS সফর নয়; এর মধ্যে ভারত-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আছে। ভারত-চীন সম্পর্কের বরফ কিছুটা গললেও সীমান্ত প্রশ্ন, বাণিজ্য ঘাটতি এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের সমস্যা এখনও রয়েছে। তাই মোদি-শি বৈঠককে সম্পর্কের সম্পূর্ণ স্বাভাবিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রিত thaw—অর্থাৎ উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ককে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকলেও সংঘাতের ঝুঁকি কম থাকে।

পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিও এবারের BRICS-এর একটি বড় বিষয়। সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বৈঠক হয়েছে। সেখানে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি, আঞ্চলিক শান্তি, স্বাধীন নৌচলাচল এবং বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারত আবারও স্পষ্ট করেছে—আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

এই তিনটি বৈঠক—রাশিয়া, চীন এবং ইরান—একসঙ্গে দেখলেই ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানটি পরিষ্কার হয়। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংলাপ, আবার পশ্চিম এশিয়ার সংকটে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই ভারত নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখছে।

এর পাশাপাশি BRICS-কে শুধু রাজনৈতিক মঞ্চ না রেখে বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এগিয়ে নিতে চাইছে ভারত। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, স্টার্টআপ, সরবরাহ-শৃঙ্খল, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং Global South-এর জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ—এসবই ভারতের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি BRICS মঞ্চে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছেন—আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে Global South-এর প্রতিনিধিত্ব কোথায়? রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা ভারত জোর দিয়ে বলেছে। ভারতের যুক্তি, বিশ্বের বড় বড় সংকটের প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপর সবচেয়ে বেশি পড়লেও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের প্রভাব এখনও তুলনামূলকভাবে কম।

আর এখানেই এবারের BRICS-এর রাজনৈতিক গুরুত্ব। সংগঠনটি এখন শুধু পাঁচটি দেশের পুরনো কাঠামো নয়। সম্প্রসারণের পর এতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও রয়েছে। ফলে একই মঞ্চে এখন একাধিক অঞ্চল, অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।

এই কারণেই মূল বৈঠকের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—এত ভিন্ন স্বার্থের দেশ কি একটি যৌথ রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে? মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, শুল্কনীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মতো প্রশ্নে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভারত চাইছিল BRICS-কে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরতে, যেখানে মতভেদ থাকলেও সংলাপ বন্ধ হবে না।

আজকের বৈঠকের পর সেই প্রশ্নের প্রথম উত্তরও পাওয়া গেছে। BRICS নেতারা সর্বসম্মতভাবে New Delhi Declaration গ্রহণ করেছেন। ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে সর্বোচ্চ সংযম এবং সংলাপ-কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে একতরফা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

অর্থাৎ দিনের শুরুতে যে কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছিল, দিনের শেষে তার একটি যৌথ রাজনৈতিক রূপও সামনে এসেছে।

তবে এখানেই শেষ নয়। আজকের বৈঠক আসলে আগামী দিনের বৃহত্তর BRICS agenda-এর ভিত্তি তৈরি করেছে। আর সেই agenda-র সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—BRICS কি শুধু ঘোষণাপত্র প্রকাশ করবে, নাকি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠবে?

সেখানেই আগামী পর্বের আসল গল্প।

কারণ আজকের বৈঠকের রাজনৈতিক বার্তা একদিকে ভারত-চীন সম্পর্কের সতর্ক thaw, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা, পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান এবং Global South-এর নেতৃত্বে ভারতের বাড়তে থাকা ভূমিকা। কিন্তু এই সবকিছুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এখন New Delhi Declaration-এ—কী বলা হয়েছে, কোন বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে এবং কোন জায়গায় BRICS বিশ্ব রাজনীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।

সেই বিশ্লেষণেই পরিষ্কার হবে—দিল্লির BRICS সম্মেলন শুধু একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক, নাকি বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থার নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


দিল্লিতে ব্রিকস: কী বার্তা দিলেন মোদি-শি-পুতিন?

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

নয়াদিল্লিতে ব্রিকস ( BRICS)-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে আজ বিশ্বের নজর ভারতের দিকে। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মেলন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার বৈঠক নয়—বরং বদলে যাওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত, চীন, রাশিয়া এবং Global South-এর অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। ভারতের এবারের সভাপতিত্বের মূল ভাবনা—Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability—অর্থাৎ প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থিতিশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ভারত মণ্ডপমে ১২-১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

কিন্তু মূল বৈঠকে নেতারা বসার আগেই দিল্লির কূটনৈতিক পরিসরে শুরু হয়ে গিয়েছিল একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। কারণ এবারের BRICS সম্মেলনের সময় বিশ্ব রাজনীতি অত্যন্ত অস্থির। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কের চাপ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব—প্রতিটি বিষয়ই BRICS-এর আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি নজর ছিল ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের দিকে। BRICS সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক হয়েছে। দুই নেতা বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পরমাণু সহযোগিতা, অবকাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যের কথাও সামনে এসেছে।

অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক যে এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—দিল্লির এই বৈঠক তারই স্পষ্ট বার্তা। একই সঙ্গে ইউক্রেন সংঘাতের ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান বদলায়নি। ভারত বারবার বলেছে, সংঘাতের সমাধানের পথ হওয়া উচিত সংলাপ ও কূটনীতি। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও ভারত নিজেকে কোনো যুদ্ধশিবিরের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে না।

এরপর আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ—ভারত ও চীন। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, গত কয়েক বছরে তা ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা চলছে। সীমান্তে উত্তেজনা কমানো, যোগাযোগ বাড়ানো, বিমান পরিষেবা ও ভিসা ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে সম্পর্ককে অন্তত স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের ভারত সফর তাই নিছক একটি BRICS সফর নয়; এর মধ্যে ভারত-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আছে। ভারত-চীন সম্পর্কের বরফ কিছুটা গললেও সীমান্ত প্রশ্ন, বাণিজ্য ঘাটতি এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের সমস্যা এখনও রয়েছে। তাই মোদি-শি বৈঠককে সম্পর্কের সম্পূর্ণ স্বাভাবিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রিত thaw—অর্থাৎ উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ককে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকলেও সংঘাতের ঝুঁকি কম থাকে।

পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিও এবারের BRICS-এর একটি বড় বিষয়। সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বৈঠক হয়েছে। সেখানে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি, আঞ্চলিক শান্তি, স্বাধীন নৌচলাচল এবং বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারত আবারও স্পষ্ট করেছে—আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

এই তিনটি বৈঠক—রাশিয়া, চীন এবং ইরান—একসঙ্গে দেখলেই ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানটি পরিষ্কার হয়। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংলাপ, আবার পশ্চিম এশিয়ার সংকটে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই ভারত নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখছে।

এর পাশাপাশি BRICS-কে শুধু রাজনৈতিক মঞ্চ না রেখে বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এগিয়ে নিতে চাইছে ভারত। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, স্টার্টআপ, সরবরাহ-শৃঙ্খল, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং Global South-এর জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ—এসবই ভারতের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি BRICS মঞ্চে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছেন—আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে Global South-এর প্রতিনিধিত্ব কোথায়? রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা ভারত জোর দিয়ে বলেছে। ভারতের যুক্তি, বিশ্বের বড় বড় সংকটের প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপর সবচেয়ে বেশি পড়লেও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের প্রভাব এখনও তুলনামূলকভাবে কম।

আর এখানেই এবারের BRICS-এর রাজনৈতিক গুরুত্ব। সংগঠনটি এখন শুধু পাঁচটি দেশের পুরনো কাঠামো নয়। সম্প্রসারণের পর এতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও রয়েছে। ফলে একই মঞ্চে এখন একাধিক অঞ্চল, অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।

এই কারণেই মূল বৈঠকের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—এত ভিন্ন স্বার্থের দেশ কি একটি যৌথ রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে? মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, শুল্কনীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মতো প্রশ্নে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভারত চাইছিল BRICS-কে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরতে, যেখানে মতভেদ থাকলেও সংলাপ বন্ধ হবে না।

আজকের বৈঠকের পর সেই প্রশ্নের প্রথম উত্তরও পাওয়া গেছে। BRICS নেতারা সর্বসম্মতভাবে New Delhi Declaration গ্রহণ করেছেন। ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে সর্বোচ্চ সংযম এবং সংলাপ-কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে একতরফা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

অর্থাৎ দিনের শুরুতে যে কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছিল, দিনের শেষে তার একটি যৌথ রাজনৈতিক রূপও সামনে এসেছে।

তবে এখানেই শেষ নয়। আজকের বৈঠক আসলে আগামী দিনের বৃহত্তর BRICS agenda-এর ভিত্তি তৈরি করেছে। আর সেই agenda-র সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—BRICS কি শুধু ঘোষণাপত্র প্রকাশ করবে, নাকি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠবে?

সেখানেই আগামী পর্বের আসল গল্প।

কারণ আজকের বৈঠকের রাজনৈতিক বার্তা একদিকে ভারত-চীন সম্পর্কের সতর্ক thaw, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা, পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান এবং Global South-এর নেতৃত্বে ভারতের বাড়তে থাকা ভূমিকা। কিন্তু এই সবকিছুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এখন New Delhi Declaration-এ—কী বলা হয়েছে, কোন বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে এবং কোন জায়গায় BRICS বিশ্ব রাজনীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।

সেই বিশ্লেষণেই পরিষ্কার হবে—দিল্লির BRICS সম্মেলন শুধু একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক, নাকি বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থার নতুন অধ্যায়ের সূচনা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত