নয়াদিল্লিতে ব্রিকস নেতাদের সর্বসম্মতিতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) গৃহীত ১৪০ দফার ‘নিউ দিল্লি ঘোষণা’কে শুধু একটি সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই আড়ালে থেকে যাবে। কারণ এই দলিলের বিস্তার দেখাচ্ছে—ব্রিকস এখন আর শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, বাণিজ্য, আর্থিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, জলবায়ু এবং গ্লোবাল সাউথ-এর প্রতিনিধিত্ব—সব ক্ষেত্রেই একটি বিকল্প বহুপাক্ষিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা স্পষ্ট।
এই ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত ঐকমত্যটি নিজেই। কারণ ব্রিকস-এর বর্তমান সদস্যদের রাজনৈতিক স্বার্থ এক নয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর প্রশ্নে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই মঞ্চে রয়েছে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে সংযম, সংলাপ এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির ভাষা বেছে নেওয়া আসলে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষার কৌশল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ঘোষণাপত্রটি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল। বরং নাম না করে একটি বৃহত্তর বার্তা দেওয়া হয়েছে—আন্তর্জাতিক বিরোধের সমাধান একতরফা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও একতরফা শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্যিক বাধার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এখানেই ব্রিকসের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে আসে—বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রভাব বাড়ানো।
সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গেও ঘোষণাপত্রটি ভারতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২৬ জন নিহতের পাহেলগাম হামলার নিন্দা করে ব্রিকস সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলেছে এবং সন্ত্রাসবাদকে তার পেছনের উদ্দেশ্য বা পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে দেখার বিরোধিতা করেছে। অর্থাৎ ভারতের দীর্ঘদিনের একটি কূটনৈতিক বক্তব্য—সন্ত্রাসবাদের কোনও ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ রূপ নেই—সেটিও এই বহুপাক্ষিক ঘোষণার মধ্যে জায়গা পেয়েছে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দিক হল একক ব্রিকস মুদ্রার পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার দিকে জোর। অর্থাৎ আপাতত ডলারকে সরিয়ে নতুন একটি মুদ্রা চালুর মতো উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ নয়; বরং ধাপে ধাপে বিকল্প আর্থিক পরিকাঠামো তৈরির চেষ্টা। ব্রিকস-এর পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিউ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক-এর মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
এখানেই ঘোষণাপত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক—গ্লোবাল সাউথ-এর কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার দাবি। রাষ্ট্রসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ব্রিকস সরাসরি কোনও বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে নতুন ব্যবস্থা তৈরির কথা বলছে না; বরং সেই প্রতিষ্ঠানগুলির সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার দাবি তুলছে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নয়নমুখী ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ফলে ব্রিকস-এর ভবিষ্যৎ agenda শুধু তেল, গ্যাস, বাণিজ্য বা ব্যাংকিংয়ে আটকে থাকছে না—AI, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং নতুন প্রযুক্তির শাসনব্যবস্থাও তার আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—ঘোষণাপত্র যতটা বিস্তৃত, বাস্তবায়ন কি ততটাই সম্ভব? ব্রিকস-এর সদস্যদের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তা-স্বার্থে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ফলে ১৪০টি পয়েন্টে ঐকমত্য তৈরি করা এক বিষয়, আর সেই সিদ্ধান্তগুলিকে বাস্তব নীতিতে পরিণত করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। বিশেষ করে বাণিজ্য, স্থানীয় মুদ্রা, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্কার এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য ভবিষ্যতে পরীক্ষা দেবে।
তাই ১২ সেপ্টেম্বরের ঘোষণাপত্রকে ব্রিকস-এর চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার চেয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রোডম্যাপ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। এই দলিল দেখিয়ে দিল, ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলিও কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নে একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই ঐকমত্য কতটা কার্যকর সহযোগিতায় পরিণত হবে, সেটিই এখন আসল পরীক্ষা।
আর সেই কারণেই আগামী ২৩ সেপ্টেম্বরের পর্যালোচনা পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ—যদি নির্ধারিত পর্যালোচনায় ঘোষণাপত্রের সিদ্ধান্তগুলির বাস্তব অগ্রগতি, বাস্তবায়নের কাঠামো এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়, তাহলে সেখান থেকেই বোঝা যাবে ১২ সেপ্টেম্বরের ঐকমত্য কেবল কূটনৈতিক ভাষ্যে সীমাবদ্ধ থাকল, নাকি ব্রিকস সত্যিই একটি কার্যকর বিকল্প বহুপাক্ষিক শক্তি হিসেবে আরও এক ধাপ এগোল।
অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বরের ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ব্রিকস কী বলল, তা নয়; ব্রিকস যা বলল, তার কতটা বাস্তবে করতে পারল। আগামী দিনের মূল্যায়ন সেখানেই।

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস নেতাদের সর্বসম্মতিতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) গৃহীত ১৪০ দফার ‘নিউ দিল্লি ঘোষণা’কে শুধু একটি সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই আড়ালে থেকে যাবে। কারণ এই দলিলের বিস্তার দেখাচ্ছে—ব্রিকস এখন আর শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, বাণিজ্য, আর্থিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, জলবায়ু এবং গ্লোবাল সাউথ-এর প্রতিনিধিত্ব—সব ক্ষেত্রেই একটি বিকল্প বহুপাক্ষিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা স্পষ্ট।
এই ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত ঐকমত্যটি নিজেই। কারণ ব্রিকস-এর বর্তমান সদস্যদের রাজনৈতিক স্বার্থ এক নয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর প্রশ্নে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই মঞ্চে রয়েছে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে সংযম, সংলাপ এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির ভাষা বেছে নেওয়া আসলে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষার কৌশল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ঘোষণাপত্রটি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল। বরং নাম না করে একটি বৃহত্তর বার্তা দেওয়া হয়েছে—আন্তর্জাতিক বিরোধের সমাধান একতরফা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও একতরফা শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্যিক বাধার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এখানেই ব্রিকসের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে আসে—বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রভাব বাড়ানো।
সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গেও ঘোষণাপত্রটি ভারতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২৬ জন নিহতের পাহেলগাম হামলার নিন্দা করে ব্রিকস সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলেছে এবং সন্ত্রাসবাদকে তার পেছনের উদ্দেশ্য বা পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে দেখার বিরোধিতা করেছে। অর্থাৎ ভারতের দীর্ঘদিনের একটি কূটনৈতিক বক্তব্য—সন্ত্রাসবাদের কোনও ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ রূপ নেই—সেটিও এই বহুপাক্ষিক ঘোষণার মধ্যে জায়গা পেয়েছে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দিক হল একক ব্রিকস মুদ্রার পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার দিকে জোর। অর্থাৎ আপাতত ডলারকে সরিয়ে নতুন একটি মুদ্রা চালুর মতো উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ নয়; বরং ধাপে ধাপে বিকল্প আর্থিক পরিকাঠামো তৈরির চেষ্টা। ব্রিকস-এর পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিউ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক-এর মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
এখানেই ঘোষণাপত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক—গ্লোবাল সাউথ-এর কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার দাবি। রাষ্ট্রসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ব্রিকস সরাসরি কোনও বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে নতুন ব্যবস্থা তৈরির কথা বলছে না; বরং সেই প্রতিষ্ঠানগুলির সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার দাবি তুলছে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নয়নমুখী ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ফলে ব্রিকস-এর ভবিষ্যৎ agenda শুধু তেল, গ্যাস, বাণিজ্য বা ব্যাংকিংয়ে আটকে থাকছে না—AI, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং নতুন প্রযুক্তির শাসনব্যবস্থাও তার আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—ঘোষণাপত্র যতটা বিস্তৃত, বাস্তবায়ন কি ততটাই সম্ভব? ব্রিকস-এর সদস্যদের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তা-স্বার্থে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ফলে ১৪০টি পয়েন্টে ঐকমত্য তৈরি করা এক বিষয়, আর সেই সিদ্ধান্তগুলিকে বাস্তব নীতিতে পরিণত করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। বিশেষ করে বাণিজ্য, স্থানীয় মুদ্রা, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্কার এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য ভবিষ্যতে পরীক্ষা দেবে।
তাই ১২ সেপ্টেম্বরের ঘোষণাপত্রকে ব্রিকস-এর চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার চেয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রোডম্যাপ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। এই দলিল দেখিয়ে দিল, ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলিও কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নে একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই ঐকমত্য কতটা কার্যকর সহযোগিতায় পরিণত হবে, সেটিই এখন আসল পরীক্ষা।
আর সেই কারণেই আগামী ২৩ সেপ্টেম্বরের পর্যালোচনা পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ—যদি নির্ধারিত পর্যালোচনায় ঘোষণাপত্রের সিদ্ধান্তগুলির বাস্তব অগ্রগতি, বাস্তবায়নের কাঠামো এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়, তাহলে সেখান থেকেই বোঝা যাবে ১২ সেপ্টেম্বরের ঐকমত্য কেবল কূটনৈতিক ভাষ্যে সীমাবদ্ধ থাকল, নাকি ব্রিকস সত্যিই একটি কার্যকর বিকল্প বহুপাক্ষিক শক্তি হিসেবে আরও এক ধাপ এগোল।
অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বরের ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ব্রিকস কী বলল, তা নয়; ব্রিকস যা বলল, তার কতটা বাস্তবে করতে পারল। আগামী দিনের মূল্যায়ন সেখানেই।

আপনার মতামত লিখুন