সংবাদ

হাইল হাওরে লাল শাপলার মেলা, বাড়ছে পর্যটকের ভিড়


প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম

হাইল হাওরে লাল শাপলার মেলা, বাড়ছে পর্যটকের ভিড়
লাল শাপলা বিল। ছবি : সংবাদ

প্রকৃতির রঙে সাজানো মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। পাহাড়, বন, উঁচু-নিচু টিলা, বিস্তীর্ণ চা-বাগান, হাওর ও লেক–সব মিলিয়ে ‘চা-এর রাজধানী’খ্যাত এই উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। সেই পরিচিত পর্যটন মানচিত্রে এবার নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে হাইল হাওরের বিস্তীর্ণ জলাভূমি। বর্ষার শেষে সেখানে ফুটে থাকা হাজারো লাল শাপলা মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের।

শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে মির্জাপুর ইউনিয়নের পূর্ব পাশে হাইল হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিবছরই ফুটে লাল শাপলা। স্থানীয়ভাবে এখন জায়গাটি পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘লাল শাপলা বিল’ নামে। হাওরের পশ্চিম প্রান্তে গোপলা নদীর আশপাশের বোরো ধানের জমি ও জলাভূমিজুড়ে একসঙ্গে ফুটে থাকা অসংখ্য শাপলা যেন পানির ওপর বিছিয়ে দিয়েছে লাল রঙের চাদর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাপলা বিলের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বদলে গেছে জায়গাটির চিত্র। যে জলাভূমি এতদিন স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হলেও পর্যটকদের কাছে ছিল অনেকটাই অচেনা, এখন সেখানে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ ক্যামেরা হাতে ছুটে আসছেন ভোরের আলোয় শাপলার সৌন্দর্য ধারণ করতে।

ভোরের প্রথম আলোয় এই বিলের সৌন্দর্য যেন সবচেয়ে বেশি প্রাণ পায়। সূর্যের নরম আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পানির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা লাল শাপলাগুলো পূর্ণ বিকশিত হয়ে ওঠে। চারপাশে হাওরের নীরবতা, পাখির কিচিরমিচির আর জলের ওপর সারি সারি শাপলা মিলে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। দুপুরে ফুলগুলো কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়লেও বিকেলে আবারও জলাভূমিজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শাপলার রঙ।

এ কারণে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাওরপাড়ের গ্রামীণ সড়কে দেখা যায় দর্শনার্থীদের আনাগোনা। কেউ দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ নৌকায় চড়ে শাপলা বিল ঘুরে দেখছেন। আবার কেউ দূর থেকে মুগ্ধ চোখে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই আয়োজন।

এক পর্যটক জানান, ভোরের আলোয় একসঙ্গে এত লাল শাপলা তিনি আগে কখনো দেখেননি। ফুটন্ত শাপলায় পুরো জলাভূমি যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে। সকাল থেকে দিনভর শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করেই তারা সময় কাটিয়েছেন।

বান্ধবীদের সঙ্গে ঘুরতে আসা আরেক দর্শনার্থী বলেন, এত লাল শাপলা আগে কখনো দেখেননি। হাজার হাজার শাপলা যেন পুরো প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজিয়েছে। তার কাছে জায়গাটি একই সঙ্গে শান্ত, মনোরম ও উপভোগ্য মনে হয়েছে।

আরেক পর্যটকের ভাষায়, দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল শাপলা বিল দেখার। ভোরের আলোয় মাথা উঁচু করে থাকা শাপলা মনকে প্রফুল্ল করে। তার সঙ্গে পাখির কিচিরমিচির ডাক যোগ করে অন্যরকম আবহ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও এখানে তেমন দর্শনার্থীর দেখা মিলত না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন ব্লগার শাপলা বিলের ছবি ও তথ্য প্রকাশ করার পর দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে এর সৌন্দর্যের খবর। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। এখন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ শুধু লাল শাপলার সৌন্দর্য দেখতেই ছুটে আসছেন। হাওরে ঘুরতে এসে অনেকেই বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও দেখছেন।

মির্জাপুরের প্রবীণ শিক্ষক বিপ্লব দাস বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাপলা বিলের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর গত কয়েক দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। আগে এখানে তেমন কেউ আসতেন না। এখন প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আসছেন এবং নৌকায় ঘুরে শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।

তিনি জানান, প্রতিবছর বর্ষার শেষে বিস্তীর্ণ এলাকায় শাপলা ফোটে। শুষ্ক মৌসুমেও এর কিছু অংশে শাপলা থাকে। তার মতে, মির্জাপুর বাজার থেকে হাওরপাড়ের গ্রামীণ সড়কটি উন্নত করা গেলে জায়গাটি আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

শাপলা বিল ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় ট্যুর অপারেটররাও। ‘হ্যালো শ্রীমঙ্গল ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেল’-এর কর্ণধার তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, ‘এই এলাকাটি বর্তমানে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। যেহেতু এটি মৌলভীবাজার জেলার দুটি উপজেলায় বিস্তৃত, বিশেষ করে শ্রীমঙ্গলে অধিকাংশ এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া এই হাইল হাওরের মির্জাপুর অংশে পড়েছে শাপলা বিলটি। এটি খুবই সৌন্দর্যপূর্ণ ও মনোরম, যা সকলেরই মন হরণ করবে।’

শ্রীমঙ্গলের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল এ দিক দিয়ে খুব ভাগ্যবান যে এখানে যতগুলো পর্যটন স্পট রয়েছে, প্রত্যেকটিই প্রায় আকর্ষণীয়। রাজঘাট ও সিন্দুরখান ইউনিয়নে রয়েছে শাপলা বিল। এছাড়া ওই দুটি ইউনিয়নের হরিণছড়া ও তার আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে অসংখ্য গিরিখাত ও গুহা, যা এখনো পর্যটকদের কাছে অজানা। অনেকেই জানেন না এসব ব্যাপারে।’ তার ভাষ্য, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা তেমন উন্নত না হওয়ায় অনেক আকর্ষণীয় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানে সহজে যাওয়া সম্ভব হয় না। অথচ এসব এলাকায় রয়েছে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা।

শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান থাকলেও পর্যটকদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার মতো স্থানীয় ট্যুরের অভাব রয়েছে বলেও মনে করেন তাজুল ইসলাম জাবেদ। তিনি বলেন, ‘দেশ-বিদেশ থেকে যারা পর্যটক আসেন এবং আমাদের সহযোগিতা চান, আমরা তাদের সহযোগিতা করে থাকি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্রীমঙ্গল ও তার আশপাশ এলাকার যতগুলো স্পট রয়েছে, সেগুলোতে পর্যটকেরা গাইডের অভাবে ভ্রমণ করতে পারেন না। এছাড়াও অনেকেরই লুকায়িত স্পটগুলো সম্পর্কে ধারণা নেই।’

হরিণছড়া ও আশপাশের এলাকার গিরিখাতগুলোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেন, ‘হরিণছড়া ও তার আশপাশ এলাকায় শতাধিক গিরিখাত ও গুহা রয়েছে, যেগুলো পর্যটকদের কাছে এখনো অজানা। এমনকি স্থানীয় প্রশাসনও অনেক ক্ষেত্রে এসব স্পট সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গভাবে অবগত নয়।’

তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টিও সামনে এসেছে। শাপলার সৌন্দর্য দেখতে এসে কেউ কেউ ফুল তুলে নিয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাপলা তুলে ছবি প্রকাশের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে সেই সৌন্দর্যেরই ক্ষতি করা উচিত নয়। শাপলা বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে দর্শনার্থীদের সচেতন হওয়া জরুরি।

সাম্প্রতিককালে শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতিপ্রেমী, শিক্ষক ও সৌখিন ফটোগ্রাফার তারিক হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শাপলা তুলে নেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘আচ্ছা রে, তোমরা যে শাপলা বিলে গিয়ে ইচ্ছামতো ফুল তুলে আনো, এইগুলো এনে কাকে দাও? এটা কোনো কালচার তোমাদের যে যেখানেই যাও সব উজাড় করে দাও পঙ্গপালের মতো? তোমাদের হাতে কাশফুল নিরাপদ না, শাপলাফুল নিরাপদ না, পরিবেশ-প্রতিবেশ কোনোকিছুই নিরাপদ না!’

শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল হাই ডন বলেন, ‘মির্জাপুরের গোলাপি শাপলার বিল এখন দেশ-বিদেশের পর্যটকের আকর্ষণ। প্রতিদিন দর্শনার্থীর ভিড় বাড়ছে। এখানে পর্যটনের সম্ভাবনা অনেক। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।’

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে শ্রীমঙ্গল এমনিতেই দেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটন এলাকা। চারপাশের পাহাড়, বনাঞ্চল, উঁচু-নিচু টিলা, হাওর, লেক ও বিস্তীর্ণ চা-বাগান মিলে এ উপজেলার প্রকৃতি যেন সবুজের গালিচা। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই সবুজের সমারোহ। সেই সবুজের রাজ্যে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে হাইল হাওরের লাল শাপলার বিস্তীর্ণ জলরাশি।

তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হাওরপাড়ের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, নিরাপদ নৌভ্রমণের ব্যবস্থা এবং স্থানীয়ভাবে পর্যটন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। একই সঙ্গে শাপলা, জলাভূমি, পাখি ও সামগ্রিক প্রতিবেশ রক্ষায়ও নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিকল্পিতভাবে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখা গেলে মির্জাপুরের ‘লাল শাপলা বিল’ শ্রীমঙ্গলের পর্যটন মানচিত্রে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে। চা-বাগান আর সবুজ পাহাড়ের শহর শ্রীমঙ্গলের সঙ্গে তখন হাইল হাওরের লাল শাপলাও হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতিপ্রেমীদের নতুন গন্তব্য–যেখানে পর্যটন আর প্রকৃতি পাশাপাশি এগোবে, একে অন্যের ক্ষতি না করে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হাইল হাওরে লাল শাপলার মেলা, বাড়ছে পর্যটকের ভিড়

প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

প্রকৃতির রঙে সাজানো মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। পাহাড়, বন, উঁচু-নিচু টিলা, বিস্তীর্ণ চা-বাগান, হাওর ও লেক–সব মিলিয়ে ‘চা-এর রাজধানী’খ্যাত এই উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। সেই পরিচিত পর্যটন মানচিত্রে এবার নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে হাইল হাওরের বিস্তীর্ণ জলাভূমি। বর্ষার শেষে সেখানে ফুটে থাকা হাজারো লাল শাপলা মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের।

শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে মির্জাপুর ইউনিয়নের পূর্ব পাশে হাইল হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিবছরই ফুটে লাল শাপলা। স্থানীয়ভাবে এখন জায়গাটি পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘লাল শাপলা বিল’ নামে। হাওরের পশ্চিম প্রান্তে গোপলা নদীর আশপাশের বোরো ধানের জমি ও জলাভূমিজুড়ে একসঙ্গে ফুটে থাকা অসংখ্য শাপলা যেন পানির ওপর বিছিয়ে দিয়েছে লাল রঙের চাদর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাপলা বিলের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বদলে গেছে জায়গাটির চিত্র। যে জলাভূমি এতদিন স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হলেও পর্যটকদের কাছে ছিল অনেকটাই অচেনা, এখন সেখানে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ ক্যামেরা হাতে ছুটে আসছেন ভোরের আলোয় শাপলার সৌন্দর্য ধারণ করতে।

ভোরের প্রথম আলোয় এই বিলের সৌন্দর্য যেন সবচেয়ে বেশি প্রাণ পায়। সূর্যের নরম আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পানির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা লাল শাপলাগুলো পূর্ণ বিকশিত হয়ে ওঠে। চারপাশে হাওরের নীরবতা, পাখির কিচিরমিচির আর জলের ওপর সারি সারি শাপলা মিলে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। দুপুরে ফুলগুলো কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়লেও বিকেলে আবারও জলাভূমিজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শাপলার রঙ।

এ কারণে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাওরপাড়ের গ্রামীণ সড়কে দেখা যায় দর্শনার্থীদের আনাগোনা। কেউ দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ নৌকায় চড়ে শাপলা বিল ঘুরে দেখছেন। আবার কেউ দূর থেকে মুগ্ধ চোখে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই আয়োজন।

এক পর্যটক জানান, ভোরের আলোয় একসঙ্গে এত লাল শাপলা তিনি আগে কখনো দেখেননি। ফুটন্ত শাপলায় পুরো জলাভূমি যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে। সকাল থেকে দিনভর শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করেই তারা সময় কাটিয়েছেন।

বান্ধবীদের সঙ্গে ঘুরতে আসা আরেক দর্শনার্থী বলেন, এত লাল শাপলা আগে কখনো দেখেননি। হাজার হাজার শাপলা যেন পুরো প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজিয়েছে। তার কাছে জায়গাটি একই সঙ্গে শান্ত, মনোরম ও উপভোগ্য মনে হয়েছে।

আরেক পর্যটকের ভাষায়, দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল শাপলা বিল দেখার। ভোরের আলোয় মাথা উঁচু করে থাকা শাপলা মনকে প্রফুল্ল করে। তার সঙ্গে পাখির কিচিরমিচির ডাক যোগ করে অন্যরকম আবহ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও এখানে তেমন দর্শনার্থীর দেখা মিলত না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন ব্লগার শাপলা বিলের ছবি ও তথ্য প্রকাশ করার পর দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে এর সৌন্দর্যের খবর। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। এখন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ শুধু লাল শাপলার সৌন্দর্য দেখতেই ছুটে আসছেন। হাওরে ঘুরতে এসে অনেকেই বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও দেখছেন।

মির্জাপুরের প্রবীণ শিক্ষক বিপ্লব দাস বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাপলা বিলের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর গত কয়েক দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। আগে এখানে তেমন কেউ আসতেন না। এখন প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আসছেন এবং নৌকায় ঘুরে শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।

তিনি জানান, প্রতিবছর বর্ষার শেষে বিস্তীর্ণ এলাকায় শাপলা ফোটে। শুষ্ক মৌসুমেও এর কিছু অংশে শাপলা থাকে। তার মতে, মির্জাপুর বাজার থেকে হাওরপাড়ের গ্রামীণ সড়কটি উন্নত করা গেলে জায়গাটি আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

শাপলা বিল ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় ট্যুর অপারেটররাও। ‘হ্যালো শ্রীমঙ্গল ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেল’-এর কর্ণধার তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, ‘এই এলাকাটি বর্তমানে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। যেহেতু এটি মৌলভীবাজার জেলার দুটি উপজেলায় বিস্তৃত, বিশেষ করে শ্রীমঙ্গলে অধিকাংশ এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া এই হাইল হাওরের মির্জাপুর অংশে পড়েছে শাপলা বিলটি। এটি খুবই সৌন্দর্যপূর্ণ ও মনোরম, যা সকলেরই মন হরণ করবে।’

শ্রীমঙ্গলের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল এ দিক দিয়ে খুব ভাগ্যবান যে এখানে যতগুলো পর্যটন স্পট রয়েছে, প্রত্যেকটিই প্রায় আকর্ষণীয়। রাজঘাট ও সিন্দুরখান ইউনিয়নে রয়েছে শাপলা বিল। এছাড়া ওই দুটি ইউনিয়নের হরিণছড়া ও তার আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে অসংখ্য গিরিখাত ও গুহা, যা এখনো পর্যটকদের কাছে অজানা। অনেকেই জানেন না এসব ব্যাপারে।’ তার ভাষ্য, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা তেমন উন্নত না হওয়ায় অনেক আকর্ষণীয় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানে সহজে যাওয়া সম্ভব হয় না। অথচ এসব এলাকায় রয়েছে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা।

শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান থাকলেও পর্যটকদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার মতো স্থানীয় ট্যুরের অভাব রয়েছে বলেও মনে করেন তাজুল ইসলাম জাবেদ। তিনি বলেন, ‘দেশ-বিদেশ থেকে যারা পর্যটক আসেন এবং আমাদের সহযোগিতা চান, আমরা তাদের সহযোগিতা করে থাকি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্রীমঙ্গল ও তার আশপাশ এলাকার যতগুলো স্পট রয়েছে, সেগুলোতে পর্যটকেরা গাইডের অভাবে ভ্রমণ করতে পারেন না। এছাড়াও অনেকেরই লুকায়িত স্পটগুলো সম্পর্কে ধারণা নেই।’

হরিণছড়া ও আশপাশের এলাকার গিরিখাতগুলোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেন, ‘হরিণছড়া ও তার আশপাশ এলাকায় শতাধিক গিরিখাত ও গুহা রয়েছে, যেগুলো পর্যটকদের কাছে এখনো অজানা। এমনকি স্থানীয় প্রশাসনও অনেক ক্ষেত্রে এসব স্পট সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গভাবে অবগত নয়।’

তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টিও সামনে এসেছে। শাপলার সৌন্দর্য দেখতে এসে কেউ কেউ ফুল তুলে নিয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাপলা তুলে ছবি প্রকাশের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে সেই সৌন্দর্যেরই ক্ষতি করা উচিত নয়। শাপলা বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে দর্শনার্থীদের সচেতন হওয়া জরুরি।

সাম্প্রতিককালে শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতিপ্রেমী, শিক্ষক ও সৌখিন ফটোগ্রাফার তারিক হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শাপলা তুলে নেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘আচ্ছা রে, তোমরা যে শাপলা বিলে গিয়ে ইচ্ছামতো ফুল তুলে আনো, এইগুলো এনে কাকে দাও? এটা কোনো কালচার তোমাদের যে যেখানেই যাও সব উজাড় করে দাও পঙ্গপালের মতো? তোমাদের হাতে কাশফুল নিরাপদ না, শাপলাফুল নিরাপদ না, পরিবেশ-প্রতিবেশ কোনোকিছুই নিরাপদ না!’

শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল হাই ডন বলেন, ‘মির্জাপুরের গোলাপি শাপলার বিল এখন দেশ-বিদেশের পর্যটকের আকর্ষণ। প্রতিদিন দর্শনার্থীর ভিড় বাড়ছে। এখানে পর্যটনের সম্ভাবনা অনেক। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।’

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে শ্রীমঙ্গল এমনিতেই দেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটন এলাকা। চারপাশের পাহাড়, বনাঞ্চল, উঁচু-নিচু টিলা, হাওর, লেক ও বিস্তীর্ণ চা-বাগান মিলে এ উপজেলার প্রকৃতি যেন সবুজের গালিচা। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই সবুজের সমারোহ। সেই সবুজের রাজ্যে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে হাইল হাওরের লাল শাপলার বিস্তীর্ণ জলরাশি।

তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হাওরপাড়ের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, নিরাপদ নৌভ্রমণের ব্যবস্থা এবং স্থানীয়ভাবে পর্যটন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। একই সঙ্গে শাপলা, জলাভূমি, পাখি ও সামগ্রিক প্রতিবেশ রক্ষায়ও নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিকল্পিতভাবে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখা গেলে মির্জাপুরের ‘লাল শাপলা বিল’ শ্রীমঙ্গলের পর্যটন মানচিত্রে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে। চা-বাগান আর সবুজ পাহাড়ের শহর শ্রীমঙ্গলের সঙ্গে তখন হাইল হাওরের লাল শাপলাও হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতিপ্রেমীদের নতুন গন্তব্য–যেখানে পর্যটন আর প্রকৃতি পাশাপাশি এগোবে, একে অন্যের ক্ষতি না করে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত