জাতিসংঘকে সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।’
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তার প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা বৈশ্বিক ইস্যু তুলে ধরেন।
সমঝোতামূলক বিশ্ব ও শান্তির আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিটি রাষ্ট্রেই পড়ে। তাই সংঘাতের সমাধানে আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতাকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিতে হবে। তিনি বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন বাজেট কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতাকে তিনি বিশ্বশান্তির অন্তরায় হিসেবে অভিহিত করেন।
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ ও ‘থ্রি-আর’ কৌশল
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ আজ মুক্ত। তিনি এই আন্দোলনে সকল শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’
রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেড় দশকের ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতে তার সরকার ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) কৌশল অনুসরণ করছে। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সরকারের ৩১ দফা রূপরেখা বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণ
বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তিনি স্মরণ করে বলেন, এই মঞ্চেই তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশের মানুষের কথা বলতে ভাষণ দিয়েছিলেন। আজ তিনিও একই ধারায় বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ ও বিশ্বশান্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছেন।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্লাইমেট জাস্টিস বা জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। এ ছাড়া বন্যা ও খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ ও ‘পদ্মা ব্যারাজ’ বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি।
রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিন ইস্যু
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় এটি ভবিষ্যতে চরম মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের পক্ষে নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন।
সামাজিক সুরক্ষা ও তরুণ প্রজন্ম
দারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক সুরক্ষা কার্ডগুলোকে সমন্বিত করে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ প্রবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।
এ ছাড়া তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ তহবিল এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার উদ্যোগের কথাও তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে এবারই শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’কে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এ উত্তরণকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা থেকেও পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
বক্তব্যের শেষে তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ সদস্যদের অবদানের কথা গর্বের সাথে স্মরণ করেন এবং বহুপাক্ষিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতিসংঘকে সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।’
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তার প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা বৈশ্বিক ইস্যু তুলে ধরেন।
সমঝোতামূলক বিশ্ব ও শান্তির আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিটি রাষ্ট্রেই পড়ে। তাই সংঘাতের সমাধানে আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতাকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিতে হবে। তিনি বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন বাজেট কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতাকে তিনি বিশ্বশান্তির অন্তরায় হিসেবে অভিহিত করেন।
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ ও ‘থ্রি-আর’ কৌশল
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ আজ মুক্ত। তিনি এই আন্দোলনে সকল শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’
রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেড় দশকের ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতে তার সরকার ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) কৌশল অনুসরণ করছে। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সরকারের ৩১ দফা রূপরেখা বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণ
বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তিনি স্মরণ করে বলেন, এই মঞ্চেই তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশের মানুষের কথা বলতে ভাষণ দিয়েছিলেন। আজ তিনিও একই ধারায় বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ ও বিশ্বশান্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছেন।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্লাইমেট জাস্টিস বা জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। এ ছাড়া বন্যা ও খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ ও ‘পদ্মা ব্যারাজ’ বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি।
রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিন ইস্যু
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় এটি ভবিষ্যতে চরম মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের পক্ষে নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন।
সামাজিক সুরক্ষা ও তরুণ প্রজন্ম
দারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক সুরক্ষা কার্ডগুলোকে সমন্বিত করে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ প্রবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।
এ ছাড়া তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ তহবিল এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার উদ্যোগের কথাও তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে এবারই শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’কে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এ উত্তরণকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা থেকেও পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
বক্তব্যের শেষে তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ সদস্যদের অবদানের কথা গর্বের সাথে স্মরণ করেন এবং বহুপাক্ষিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

আপনার মতামত লিখুন