সংবাদ

ডিজেলের দামে ধাক্কা, বিঘায় খরচ বাড়ল ২৫০০ টাকা


কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ
কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম

ডিজেলের দামে ধাক্কা, বিঘায় খরচ বাড়ল ২৫০০ টাকা
ডিজেলের দামে ধাক্কায় ধানচাষে বিঘাপ্রতি খরচ বাড়ছে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত।-সংবাদ।

ধানের জেলা হিসেবে পরিচিত নওগাঁয় কৃষকের উৎপাদন খরচে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি। লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা হওয়ায় সেচ, জমি চাষ, মাড়াই ও ফসল পরিবহনে বাড়ছে ব্যয়।

কৃষকদের হিসাবে, এসব খাতে মিলিয়ে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এতে সামনে বোরো মৌসুমে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের শঙ্কাও করছেন তাঁরা।

নওগাঁয় ধান, সবজি ও বিভিন্ন অর্থকরী ফসল উৎপাদনে ডিজেলচালিত সেচপাম্প, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও মাড়াইযন্ত্রের ব্যবহার রয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ে।

সদর উপজেলার শিকারপুর এলাকার কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, এক বিঘা জমিতে সেচ, জমি প্রস্তুত, মাড়াই ও পরিবহন মিলিয়ে আগে যে খরচ হতো, ডিজেলের দাম বাড়ায় এবার অন্তত ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত লাগতে পারে। এর মধ্যে সেচেই প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং জমি চাষ ও মাড়াইয়ে আরও কয়েক শ টাকা বাড়বে।

তার ভাষায়, ‘বীজ, সার ও কীটনাশকের দাম আগেই বেড়েছে। এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় জমি তৈরি থেকে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত সব খাতেই খরচ বাড়ছে।’

মহাদেবপুর উপজেলার বৃন্দারামপুরের কৃষক আসিব আলী বলেন, তাদের এলাকার অনেক জমি উঁচু হওয়ায় সেচে বেশি পানি দিতে হয়। এক বিঘা জমিতে সেচ বাবদ আগের তুলনায় প্রায় ১ হাজার টাকা বেশি লাগতে পারে। জমি চাষ, মাড়াই ও ধান পরিবহনে আরও প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বাড়তি খরচ হলে মোট ব্যয় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, ‘সার-বীজের খরচ সামলানোর পর এই বাড়তি টাকা জোগাড় করাই কঠিন।’

রানীনগরের বর্গাচাষি সাইদুজ্জামান বলেন, বর্গা জমিতে চাষ করায় উৎপাদন খরচের চাপ আরও বেশি। তাঁর হিসাবে, এক বিঘা জমিতে সেচে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, জমি প্রস্তুত ও মাড়াইয়ে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং ধান পরিবহনে আরও কয়েক শ টাকা বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে অতিরিক্ত খরচ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় দাঁড়াতে পারে।

তিনি বলেন, ‘ফসল ঘরে তোলার আগেই বাড়তি খরচের হিসাব করতে হচ্ছে। কিন্তু ধানের দাম সেই অনুপাতে বাড়বে কি না, তা তো জানা নেই।’

মান্দার গণেশপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের হিরা বলেন, ‘ধান চাষের শুরু থেকে বাজারে নেওয়া পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি কাজেই ডিজেলের প্রয়োজন হয়। তেলের দাম বাড়ায় ট্রাক্টর, সেচযন্ত্র ও মাড়াইযন্ত্রের ভাড়া বাড়বে। এক বিঘায় সব মিলিয়ে অন্তত দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা বাড়তি খরচ হতে পারে।’

কৃষকেরা বলছেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু সেচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জমি প্রস্তুত, মাড়াই ও ফসল পরিবহনের খরচও বাড়বে। ফলে উৎপাদিত ধানের প্রকৃত খরচ বাড়লেও বাজারে সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে বর্গাচাষিদের ওপর এর চাপ বেশি পড়তে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে সরকারি প্রণোদনা ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সেচের খরচ কমাতে কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এতে জ্বালানি ব্যয় কমানো সম্ভব।

জমি চাষে বাড়তি খরচের বোঝা।

সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল বলেন, নওগাঁর কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। ডিজেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন-দুই ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়বে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। কৃষকদের সুরক্ষায় কৃষি খাতে বিশেষ জ্বালানি ভর্তুকি বা সহজ শর্তে প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

কৃষকেরা বলছেন, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমের বাড়তি খরচের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। এতে এক বিঘা জমিতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা করছেন তাঁরা। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে এই বাড়তি ব্যয়ের ভার শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘাড়েই পড়বে। তাই বোরো মৌসুম শুরুর আগেই সেচ ও কৃষিযন্ত্রের ব্যয় কমানোর কার্যকর উদ্যোগ চান তারা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ডিজেলের দামে ধাক্কা, বিঘায় খরচ বাড়ল ২৫০০ টাকা

প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ধানের জেলা হিসেবে পরিচিত নওগাঁয় কৃষকের উৎপাদন খরচে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি। লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা হওয়ায় সেচ, জমি চাষ, মাড়াই ও ফসল পরিবহনে বাড়ছে ব্যয়।

কৃষকদের হিসাবে, এসব খাতে মিলিয়ে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এতে সামনে বোরো মৌসুমে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের শঙ্কাও করছেন তাঁরা।

নওগাঁয় ধান, সবজি ও বিভিন্ন অর্থকরী ফসল উৎপাদনে ডিজেলচালিত সেচপাম্প, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও মাড়াইযন্ত্রের ব্যবহার রয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ে।

সদর উপজেলার শিকারপুর এলাকার কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, এক বিঘা জমিতে সেচ, জমি প্রস্তুত, মাড়াই ও পরিবহন মিলিয়ে আগে যে খরচ হতো, ডিজেলের দাম বাড়ায় এবার অন্তত ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত লাগতে পারে। এর মধ্যে সেচেই প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং জমি চাষ ও মাড়াইয়ে আরও কয়েক শ টাকা বাড়বে।

তার ভাষায়, ‘বীজ, সার ও কীটনাশকের দাম আগেই বেড়েছে। এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় জমি তৈরি থেকে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত সব খাতেই খরচ বাড়ছে।’

মহাদেবপুর উপজেলার বৃন্দারামপুরের কৃষক আসিব আলী বলেন, তাদের এলাকার অনেক জমি উঁচু হওয়ায় সেচে বেশি পানি দিতে হয়। এক বিঘা জমিতে সেচ বাবদ আগের তুলনায় প্রায় ১ হাজার টাকা বেশি লাগতে পারে। জমি চাষ, মাড়াই ও ধান পরিবহনে আরও প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বাড়তি খরচ হলে মোট ব্যয় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, ‘সার-বীজের খরচ সামলানোর পর এই বাড়তি টাকা জোগাড় করাই কঠিন।’

রানীনগরের বর্গাচাষি সাইদুজ্জামান বলেন, বর্গা জমিতে চাষ করায় উৎপাদন খরচের চাপ আরও বেশি। তাঁর হিসাবে, এক বিঘা জমিতে সেচে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, জমি প্রস্তুত ও মাড়াইয়ে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং ধান পরিবহনে আরও কয়েক শ টাকা বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে অতিরিক্ত খরচ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় দাঁড়াতে পারে।

তিনি বলেন, ‘ফসল ঘরে তোলার আগেই বাড়তি খরচের হিসাব করতে হচ্ছে। কিন্তু ধানের দাম সেই অনুপাতে বাড়বে কি না, তা তো জানা নেই।’

মান্দার গণেশপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের হিরা বলেন, ‘ধান চাষের শুরু থেকে বাজারে নেওয়া পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি কাজেই ডিজেলের প্রয়োজন হয়। তেলের দাম বাড়ায় ট্রাক্টর, সেচযন্ত্র ও মাড়াইযন্ত্রের ভাড়া বাড়বে। এক বিঘায় সব মিলিয়ে অন্তত দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা বাড়তি খরচ হতে পারে।’

কৃষকেরা বলছেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু সেচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জমি প্রস্তুত, মাড়াই ও ফসল পরিবহনের খরচও বাড়বে। ফলে উৎপাদিত ধানের প্রকৃত খরচ বাড়লেও বাজারে সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে বর্গাচাষিদের ওপর এর চাপ বেশি পড়তে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে সরকারি প্রণোদনা ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সেচের খরচ কমাতে কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এতে জ্বালানি ব্যয় কমানো সম্ভব।

জমি চাষে বাড়তি খরচের বোঝা।

সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল বলেন, নওগাঁর কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। ডিজেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন-দুই ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়বে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। কৃষকদের সুরক্ষায় কৃষি খাতে বিশেষ জ্বালানি ভর্তুকি বা সহজ শর্তে প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

কৃষকেরা বলছেন, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমের বাড়তি খরচের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। এতে এক বিঘা জমিতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা করছেন তাঁরা। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে এই বাড়তি ব্যয়ের ভার শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘাড়েই পড়বে। তাই বোরো মৌসুম শুরুর আগেই সেচ ও কৃষিযন্ত্রের ব্যয় কমানোর কার্যকর উদ্যোগ চান তারা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত