চাঁদাবাজি শুধু কারও পকেট থেকে জোর করে টাকা নেওয়া নয়। এর পেছনে আছে একটি অর্থনীতি। এই অর্থনীতির নিজস্ব বাজার আছে, আদায়কারী আছে, মধ্যস্বত্বভোগী আছে, পৃষ্ঠপোষক আছে; আছে ক্রেতা-বিক্রেতার মতো সম্পর্কও। পার্থক্য একটাই—এই বাজারের মুদ্রা অনেক সময় টাকা নয়, ভয়।
চাঁদাবাজি যেন বাংলাদেশের জনজীবনের একটি পুরোনো শব্দ। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিনের খবরের শিরোনামগুলো পাশাপাশি রাখলে শব্দটির ভেতরের একটি নতুন বাস্তবতা চোখে পড়ে। চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ আছে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, আছে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে; কোথাও পরিবহন খাতে, কোথাও বাজারে, কোথাও সরকারি দপ্তর ঘিরে, আবার কোথাও ব্যক্তিকে সরাসরি হুমকি দিয়ে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের রাজধানীর ইসিবি চত্বরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের পরও চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জায়গাটি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ ছিল এবং বিএনপির বিরুদ্ধে সালমানের চাঁদাবাজির অভিযোগ ‘ঢালাও’।
পুলিশও প্রাথমিকভাবে জমি দখলকে কেন্দ্র করে হামলার কথা জানিয়েছে। ফলে এই ঘটনা চাঁদাবাজির প্রমাণ নয়; বরং চাঁদাবাজি ও দখল—দুই ধরনের অভিযোগ কীভাবে একই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে, তার একটি উদাহরণ।
যেমন, কক্সবাজারে স্থানীয় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ট্রাফিক পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে অবৈধ যানবাহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কর্মকর্তার নামও এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং জেলা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ এখানে অভিযোগ আছে, কিন্তু তদন্তের ফল এখনো নেই।
অন্যদিকে ফেনীতে সরকারি উন্নয়নকাজে ৫–৭ শতাংশ চাঁদা দাবির অভিযোগে বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। মামলা হওয়া মানে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া নয়; কিন্তু এ ধরনের ঘটনা দেখায়, রাজনৈতিক পরিচয়ও কখনো কখনো অর্থ আদায়ের ক্ষমতায় রূপ নিতে পারে।
চলতি বছরে ঢাকা চেম্বার বলেছে, উৎপাদক থেকে পণ্য পরিবহন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসার খরচ কমানো সম্ভব নয়। এখানে চাঁদাবাজি শুধু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা নয়। শেষ পর্যন্ত সেই টাকা কোনো না কোনোভাবে পণ্যের দামে যোগ হয়। অর্থাৎ দোকানদারের কাছ থেকে নেওয়া ১০০ টাকা অনেক সময় ক্রেতার কাছ থেকে ফিরে আসে ১১০ বা ১২০ টাকা হয়ে। চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব এখানেই—ভুক্তভোগী শুধু যিনি টাকা দেন, তিনি নন।
চাঁদাবাজির চার স্তর
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে একটি কাঠামোয় রাখলে চাঁদাবাজির অন্তত চারটি ধরন দেখা যায়। প্রথমত, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক চাঁদাবাজি। কোনো এলাকায় একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব থাকলে তার স্থানীয় নেতা-কর্মী বা সমর্থকেরা সেই প্রভাবকে অর্থ আদায়ের কাজে ব্যবহার করতে পারেন—এমন অভিযোগ বাংলাদেশের সংবাদে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এসেছে। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগ থাকা আর দলীয়ভাবে চাঁদাবাজি পরিচালিত হওয়া এক কথা নয়। প্রতিটি ঘটনায় ব্যক্তির ভূমিকা, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ও প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, অপরাধী চক্রের চাঁদাবাজি। এখানে রাজনৈতিক পরিচয় থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। ভয় দেখানো, মারধর, অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা হত্যার হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় এই মডেলের বৈশিষ্ট্য। চট্টগ্রামে চিকিৎসককে হত্যার হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবির সাম্প্রতিক অভিযোগ তার একটি উদাহরণ।
তৃতীয়ত, ‘সেবা’ বা ‘অনুমতির’ বিনিময়ে অবৈধ অর্থ। কোনো জায়গায় গাড়ি চলবে কি না, দোকান বসবে কি না, পণ্য নামবে কি না, কোনো কাজ দ্রুত হবে কি না—এসবের ওপর অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে সেটি অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করে। এ ধরনের ব্যবস্থায় চাঁদাবাজ কখনো সরাসরি বলে না—‘চাঁদা দাও।’ বরং বলা হয়—লাইন খরচ। সমিতির টাকা। নিরাপত্তার টাকা। ম্যানেজমেন্ট খরচ। টার্মিনাল খরচ। স্থানীয় খরচ। নাম বদলায়, অর্থনীতিটা একই থাকে।
চতুর্থত, দখল ও চাঁদাবাজির মিশ্র মডেল। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ঘটনাটি এ জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী সেখানে জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। আবার হামলার পর চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। জমি দখল এবং চাঁদাবাজি অনেক সময় আলাদা অপরাধ হলেও বাস্তবে একই ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কারণ দুটির জন্যই দরকার ভয় দেখানোর ক্ষমতা এবং স্থানীয় প্রভাব।
কেন মানুষ চাঁদা দেয়?
এটি হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।চাঁদাবাজির অর্থনীতি শুধু চাঁদাবাজের কারণে টিকে থাকে না। এটি টিকে থাকে কারণ ভুক্তভোগী অনেক সময় টাকা দিতে বাধ্য হন। কেন? কারণ অভিযোগ করলে দোকান বন্ধ হতে পারে। গাড়ি আটকে যেতে পারে। মামলা হতে পারে। মারধর হতে পারে। ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে। কাজ আটকে যেতে পারে। অথবা প্রশাসনের কাছে যাওয়ার পরও প্রতিকার না পাওয়ার ভয় থাকতে পারে। অর্থাৎ চাঁদাবাজির মূল শক্তি টাকা নয়—ভয়। আর ভয়কে কার্যকর করে তোলার দ্বিতীয় উপাদান হলো দায়মুক্তির ধারণা।
রাষ্ট্র যেখানে দুর্বল, চাঁদাবাজ সেখানে শক্তিশালী
চাঁদাবাজি আসলে রাষ্ট্রের বিকল্প করব্যবস্থা নয়; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফাঁক ব্যবহার করে তৈরি হওয়া একটি অনানুষ্ঠানিক করব্যবস্থা। সরকার একটি রাস্তা বানিয়েছে। সেই রাস্তায় হাজার গাড়ি চলছে। কিন্তু রাস্তার কোনো একটি মোড়ে একটি গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে টাকা নিচ্ছে। রাষ্ট্রের আইন সেখানে বলে—টাকা নেওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলে—টাকা না দিলে সমস্যা হবে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই চাঁদাবাজির ভিত্তি।
একদিকে রাজনৈতিক বক্তব্যে চাঁদাবাজি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে স্থানীয় সংবাদে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে; ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বলছেন; আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও কোথাও কোথাও অভিযোগ উঠছে।
এখানে একটি পুরোনো অভিজ্ঞতাও মনে রাখা যায়। পরিবহন খাতে অতীতে চাঁদাবাজি নিয়ে গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির কাঠামো ভাঙার বদলে আদায়কারীর পরিবর্তন ঘটেছে—অর্থাৎ পুরোনো নেটওয়ার্কের জায়গায় নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে।
এটি যদি সত্য হয়, তাহলে সমস্যাটি কোনো একটি দলের নয়।সমস্যাটি হলো ক্ষমতা থেকে অর্থ আহরণের একটি সংস্কৃতি।চাঁদাবাজির আসল পণ্য কী?চাঁদাবাজ আসলে শুধু টাকা বিক্রি করে না। সে বিক্রি করে— নিরাপত্তা। চলাচলের অনুমতি। ব্যবসা করার নিশ্চয়তা। জমি দখলের সক্ষমতা। আইন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ।
চাঁদার টাকার গন্তব্য
এবার দরকার চাঁদাবাজির অর্থনীতির অনুসন্ধান। চাঁদাবাজি নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদে অভিযোগের অভাব নেই। অভাব হলো টাকার পথ অনুসরণের। একটি ট্রাক থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হলে সেই টাকা কার কাছে যায়? লাইনম্যান কত রাখে? স্থানীয় প্রভাবশালী কত পান? রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অংশ আছে কি? পুলিশ বা প্রশাসনের কেউ জড়িত কি না? একটি বাজারে প্রতিদিন কত টাকা ওঠে? মাসে কত? বছরে কত? কোনো রসিদ আছে কি? কোনো বৈধ অনুমতি আছে কি? আর সেই টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে চাঁদাবাজিকে আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখতে হবে না। তখন দেখা যাবে, এটি আসলে স্থানীয় ক্ষমতা, অপরাধ, রাজনীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অর্থনীতির সংযোগস্থলে তৈরি হওয়া একটি ছায়া-ব্যবস্থা। বাংলাদেশে চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো চাঁদা চাওয়া নয়। সমস্যা হলো—চাঁদা চাওয়ার মতো ক্ষমতা কোথা থেকে আসে। আর সেই ক্ষমতা যদি বারবার শুধু একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে যায়, কিন্তু কাঠামোটি থেকে যায়, তাহলে চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না। শুধু চাঁদাবাজ বদলায়।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চাঁদাবাজি শুধু কারও পকেট থেকে জোর করে টাকা নেওয়া নয়। এর পেছনে আছে একটি অর্থনীতি। এই অর্থনীতির নিজস্ব বাজার আছে, আদায়কারী আছে, মধ্যস্বত্বভোগী আছে, পৃষ্ঠপোষক আছে; আছে ক্রেতা-বিক্রেতার মতো সম্পর্কও। পার্থক্য একটাই—এই বাজারের মুদ্রা অনেক সময় টাকা নয়, ভয়।
চাঁদাবাজি যেন বাংলাদেশের জনজীবনের একটি পুরোনো শব্দ। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিনের খবরের শিরোনামগুলো পাশাপাশি রাখলে শব্দটির ভেতরের একটি নতুন বাস্তবতা চোখে পড়ে। চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ আছে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, আছে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে; কোথাও পরিবহন খাতে, কোথাও বাজারে, কোথাও সরকারি দপ্তর ঘিরে, আবার কোথাও ব্যক্তিকে সরাসরি হুমকি দিয়ে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের রাজধানীর ইসিবি চত্বরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের পরও চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জায়গাটি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ ছিল এবং বিএনপির বিরুদ্ধে সালমানের চাঁদাবাজির অভিযোগ ‘ঢালাও’।
পুলিশও প্রাথমিকভাবে জমি দখলকে কেন্দ্র করে হামলার কথা জানিয়েছে। ফলে এই ঘটনা চাঁদাবাজির প্রমাণ নয়; বরং চাঁদাবাজি ও দখল—দুই ধরনের অভিযোগ কীভাবে একই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে, তার একটি উদাহরণ।
যেমন, কক্সবাজারে স্থানীয় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ট্রাফিক পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে অবৈধ যানবাহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কর্মকর্তার নামও এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং জেলা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ এখানে অভিযোগ আছে, কিন্তু তদন্তের ফল এখনো নেই।
অন্যদিকে ফেনীতে সরকারি উন্নয়নকাজে ৫–৭ শতাংশ চাঁদা দাবির অভিযোগে বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। মামলা হওয়া মানে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া নয়; কিন্তু এ ধরনের ঘটনা দেখায়, রাজনৈতিক পরিচয়ও কখনো কখনো অর্থ আদায়ের ক্ষমতায় রূপ নিতে পারে।
চলতি বছরে ঢাকা চেম্বার বলেছে, উৎপাদক থেকে পণ্য পরিবহন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসার খরচ কমানো সম্ভব নয়। এখানে চাঁদাবাজি শুধু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা নয়। শেষ পর্যন্ত সেই টাকা কোনো না কোনোভাবে পণ্যের দামে যোগ হয়। অর্থাৎ দোকানদারের কাছ থেকে নেওয়া ১০০ টাকা অনেক সময় ক্রেতার কাছ থেকে ফিরে আসে ১১০ বা ১২০ টাকা হয়ে। চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব এখানেই—ভুক্তভোগী শুধু যিনি টাকা দেন, তিনি নন।
চাঁদাবাজির চার স্তর
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে একটি কাঠামোয় রাখলে চাঁদাবাজির অন্তত চারটি ধরন দেখা যায়। প্রথমত, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক চাঁদাবাজি। কোনো এলাকায় একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব থাকলে তার স্থানীয় নেতা-কর্মী বা সমর্থকেরা সেই প্রভাবকে অর্থ আদায়ের কাজে ব্যবহার করতে পারেন—এমন অভিযোগ বাংলাদেশের সংবাদে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এসেছে। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগ থাকা আর দলীয়ভাবে চাঁদাবাজি পরিচালিত হওয়া এক কথা নয়। প্রতিটি ঘটনায় ব্যক্তির ভূমিকা, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ও প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, অপরাধী চক্রের চাঁদাবাজি। এখানে রাজনৈতিক পরিচয় থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। ভয় দেখানো, মারধর, অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা হত্যার হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় এই মডেলের বৈশিষ্ট্য। চট্টগ্রামে চিকিৎসককে হত্যার হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবির সাম্প্রতিক অভিযোগ তার একটি উদাহরণ।
তৃতীয়ত, ‘সেবা’ বা ‘অনুমতির’ বিনিময়ে অবৈধ অর্থ। কোনো জায়গায় গাড়ি চলবে কি না, দোকান বসবে কি না, পণ্য নামবে কি না, কোনো কাজ দ্রুত হবে কি না—এসবের ওপর অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে সেটি অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করে। এ ধরনের ব্যবস্থায় চাঁদাবাজ কখনো সরাসরি বলে না—‘চাঁদা দাও।’ বরং বলা হয়—লাইন খরচ। সমিতির টাকা। নিরাপত্তার টাকা। ম্যানেজমেন্ট খরচ। টার্মিনাল খরচ। স্থানীয় খরচ। নাম বদলায়, অর্থনীতিটা একই থাকে।
চতুর্থত, দখল ও চাঁদাবাজির মিশ্র মডেল। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ঘটনাটি এ জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী সেখানে জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। আবার হামলার পর চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। জমি দখল এবং চাঁদাবাজি অনেক সময় আলাদা অপরাধ হলেও বাস্তবে একই ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কারণ দুটির জন্যই দরকার ভয় দেখানোর ক্ষমতা এবং স্থানীয় প্রভাব।
কেন মানুষ চাঁদা দেয়?
এটি হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।চাঁদাবাজির অর্থনীতি শুধু চাঁদাবাজের কারণে টিকে থাকে না। এটি টিকে থাকে কারণ ভুক্তভোগী অনেক সময় টাকা দিতে বাধ্য হন। কেন? কারণ অভিযোগ করলে দোকান বন্ধ হতে পারে। গাড়ি আটকে যেতে পারে। মামলা হতে পারে। মারধর হতে পারে। ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে। কাজ আটকে যেতে পারে। অথবা প্রশাসনের কাছে যাওয়ার পরও প্রতিকার না পাওয়ার ভয় থাকতে পারে। অর্থাৎ চাঁদাবাজির মূল শক্তি টাকা নয়—ভয়। আর ভয়কে কার্যকর করে তোলার দ্বিতীয় উপাদান হলো দায়মুক্তির ধারণা।
রাষ্ট্র যেখানে দুর্বল, চাঁদাবাজ সেখানে শক্তিশালী
চাঁদাবাজি আসলে রাষ্ট্রের বিকল্প করব্যবস্থা নয়; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফাঁক ব্যবহার করে তৈরি হওয়া একটি অনানুষ্ঠানিক করব্যবস্থা। সরকার একটি রাস্তা বানিয়েছে। সেই রাস্তায় হাজার গাড়ি চলছে। কিন্তু রাস্তার কোনো একটি মোড়ে একটি গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে টাকা নিচ্ছে। রাষ্ট্রের আইন সেখানে বলে—টাকা নেওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলে—টাকা না দিলে সমস্যা হবে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই চাঁদাবাজির ভিত্তি।
একদিকে রাজনৈতিক বক্তব্যে চাঁদাবাজি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে স্থানীয় সংবাদে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে; ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বলছেন; আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও কোথাও কোথাও অভিযোগ উঠছে।
এখানে একটি পুরোনো অভিজ্ঞতাও মনে রাখা যায়। পরিবহন খাতে অতীতে চাঁদাবাজি নিয়ে গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির কাঠামো ভাঙার বদলে আদায়কারীর পরিবর্তন ঘটেছে—অর্থাৎ পুরোনো নেটওয়ার্কের জায়গায় নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে।
এটি যদি সত্য হয়, তাহলে সমস্যাটি কোনো একটি দলের নয়।সমস্যাটি হলো ক্ষমতা থেকে অর্থ আহরণের একটি সংস্কৃতি।চাঁদাবাজির আসল পণ্য কী?চাঁদাবাজ আসলে শুধু টাকা বিক্রি করে না। সে বিক্রি করে— নিরাপত্তা। চলাচলের অনুমতি। ব্যবসা করার নিশ্চয়তা। জমি দখলের সক্ষমতা। আইন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ।
চাঁদার টাকার গন্তব্য
এবার দরকার চাঁদাবাজির অর্থনীতির অনুসন্ধান। চাঁদাবাজি নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদে অভিযোগের অভাব নেই। অভাব হলো টাকার পথ অনুসরণের। একটি ট্রাক থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হলে সেই টাকা কার কাছে যায়? লাইনম্যান কত রাখে? স্থানীয় প্রভাবশালী কত পান? রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অংশ আছে কি? পুলিশ বা প্রশাসনের কেউ জড়িত কি না? একটি বাজারে প্রতিদিন কত টাকা ওঠে? মাসে কত? বছরে কত? কোনো রসিদ আছে কি? কোনো বৈধ অনুমতি আছে কি? আর সেই টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে চাঁদাবাজিকে আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখতে হবে না। তখন দেখা যাবে, এটি আসলে স্থানীয় ক্ষমতা, অপরাধ, রাজনীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অর্থনীতির সংযোগস্থলে তৈরি হওয়া একটি ছায়া-ব্যবস্থা। বাংলাদেশে চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো চাঁদা চাওয়া নয়। সমস্যা হলো—চাঁদা চাওয়ার মতো ক্ষমতা কোথা থেকে আসে। আর সেই ক্ষমতা যদি বারবার শুধু একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে যায়, কিন্তু কাঠামোটি থেকে যায়, তাহলে চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না। শুধু চাঁদাবাজ বদলায়।

আপনার মতামত লিখুন