সংবাদ

নারীর কর্মসংস্থানে বাধা কোথায়


এইচ এম নাজমুল আলম
এইচ এম নাজমুল আলম
প্রকাশ: ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১০ এএম

নারীর কর্মসংস্থানে বাধা কোথায়
একটি দেশ যদি তার উচ্চশিক্ষিত নারীদের ৯৫ শতাংশের বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রেখে দেয়, তবে সেটি শুধু অসমতাই নয়, এটি অর্থনৈতিক অপচয়ও

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। সংখ্যাটি শুধু শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, কর্মসংস্কৃতি এবং উন্নয়নের ধারণার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রতিফলন। গত কয়েক দশক ধরে আমাদের বলা হচ্ছে, নারী শিক্ষা বেড়েছে, মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, পরীক্ষার ফল ভালো করছে, পেশাগত দক্ষতা অর্জন করছে। কিন্তু শিক্ষার দরজা পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রের দরজায় এসে যদি অধিকাংশ নারী থেমে যান, তাহলে আমরা তাদের কীসের জন্য শিক্ষিত করছি?

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘দ্য জেন্ডার পে গ্যাপ ইন বাংলাদেশ: ট্রেন্ডস, কজেস অ্যান্ড পলিসি অপশনস’ প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী হলেও তাদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। একই সময়ে ২০২৩ সালে পুরুষের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, নারীর ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই ব্যবধান ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ৫ শতাংশ নয়, বরং বাকি ৯৫ শতাংশ। তারা কি কাজ করতে চান না? নাকি তাদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়নি? দুটো প্রশ্ন এক নয়। একটি সমাজ যদি শিক্ষিত নারীর বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রাখে, তবে সেই অনুপস্থিতিকে ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ বলে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু তাতে সমস্যার কাঠামোগত চরিত্রটি আড়াল হয়ে যায়।

শিক্ষা যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং পেশাগত পরিচয়ে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে শিক্ষার সামাজিক সুফল অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একজন শিক্ষিত নারী চাকরি করতে চাইলেন, কিন্তু শিশুর যত্ন, নিরাপদ যাতায়াত, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ কিংবা পরিবারের প্রত্যাশা তাকে নিরুৎসাহিত করল। আরেকজন নারী হয়তো চাকরি পেলেন, কিন্তু এমন পেশায় যেখানে তার শ্রমের মূল্য কম। এই ঘটনাগুলো আলাদা মনে হলেও বাস্তবে একই কাঠামোর ভিন্ন প্রকাশ।

শ্রমের মজুরি ব্যবধান এই সমস্যাকে আরও গভীর করে। আইএলওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যবেক্ষণযোগ্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও নারী ও পুরুষের উপার্জনে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান থাকে। সামগ্রিকভাবে নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কম আয় করেন। সহজভাবে বলতে গেলে, পুরুষ যদি এক হাজার টাকা আয় করেন, নারীর আয় দাঁড়ায় প্রায় ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা। তবে এই ব্যবধান সব ক্ষেত্রে একই থাকে না। পেশা, খাত, কর্মঘণ্টা, কাজের ধরন ও কর্মসংস্থানের বৈশিষ্ট্যও মজুরি নির্ধারণ করে।

আইএলওর তথ্যমতে, মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে থাকা নারীদের ৪১ শতাংশ উৎপাদন খাতে কাজ করেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৩ শতাংশ। নারীদের আরও ১৯ শতাংশ গৃহস্থালি কাজে এবং ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে নিয়োজিত। অর্থাৎ শ্রমবাজারে নারীর প্রবেশ ঘটলেও তাদের অবস্থান সমান ক্ষমতা বা সমান আয়ের জায়গায় হচ্ছে না। পোশাকশিল্পে নারীর বিপুল উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু উৎপাদন লাইনে নারীর সংখ্যা বেশি হওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীর উপস্থিতি বেশি হওয়া এক বিষয় নয়।

ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পরিসংখ্যানটি তাই বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। দেশে ব্যবস্থাপনা পদে থাকা ব্যক্তিদের মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ নারী। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ নারী শুধু শ্রমবাজারে কম প্রবেশ করছেন না, প্রবেশ করলেও নেতৃত্বের সিঁড়িতে ওপরে ওঠার পথ সংকীর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মী অনেক থাকতে পারেন, কিন্তু যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদে তাদের উপস্থিতি সামান্য হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামো কতটা বদলেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

নারীর কর্মসংস্থান বাড়াতে আমরা প্রায়ই দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলি। দক্ষতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান প্রশিক্ষণ নয়। একজন নারীকে আরও একটি প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি তাকে একই অনিরাপদ, কম মজুরির এবং সীমিত উন্নতির চাকরিতে পাঠানো হয়, তবে তার দক্ষতা বাড়বে, কিন্তু শ্রমের মূল্য বাড়বে না। দক্ষতার পাশাপাশি দরকার কাজের মান, মজুরি কাঠামো, নিরাপত্তা, পদোন্নতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রবেশাধিকার।

আরও বড় অদৃশ্য বাধা রয়েছে ঘরের ভেতরে। বেতনভোগী নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, পুরুষেরা করেন ৭ দশমিক ৬ ঘণ্টা। বেতনভোগী ও গৃহস্থালি কাজ মিলিয়ে নারীদের সাপ্তাহিক কাজের সময় দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৭ ঘণ্টা, পুরুষদের ৫৯ ঘণ্টা। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার পরও নারীর দ্বিতীয় কর্মদিবস শেষ হয় না। অফিস থেকে ফিরে তার আরেকটি কর্মক্ষেত্র অপেক্ষা করে। সেই কাজের কোনো বেতন নেই, ছুটি নেই, পদোন্নতি নেই, বার্ষিক মূল্যায়ন নেই।

একজন পুরুষের কর্মজীবনকে স্বাভাবিক পেশাগত যাত্রা এবং একজন নারীর কর্মজীবনকে পারিবারিক সমঝোতার ফল হিসেবে দেখা হয়। এর প্রভাব নিয়োগ থেকে পদোন্নতি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। সন্তান হবে, মাতৃত্বকালীন ছুটি লাগবে, পরিবারে যত্নের দায়িত্ব থাকবে, তাই নারী হয়তো কম সময়ের কাজ বেছে নেবেন বা ক্যারিয়ারের মাঝপথে বিরতি নেবেন। এরপর সেই বিরতিই আবার তার কম আয় বা পদোন্নতি না পাওয়ার যুক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এটি এক ধরনের চক্র। সমাজ নারীর ওপর পারিবারিক যত্নের দায়িত্ব যত বেশি দেয়, শ্রমবাজারে তার অংশগ্রহণ তত সীমিত হয়। অংশগ্রহণ সীমিত হলে অভিজ্ঞতা ও আয় কমে। আয় কম হলে পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার অংশগ্রহণের ক্ষমতাও কমে যায়। তারপর বলা হয়, নারীর চাকরি না করাই হয়তো পরিবারের জন্য সুবিধাজনক। অর্থাৎ যে বাধা আমরা তৈরি করেছি, পরে সেটিকেই নারীর পছন্দ হিসেবে ব্যাখ্যা করি।

বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় এবং শ্রম আইনেও সমান মজুরি ও কর্মপরিবেশের বিধান রয়েছে। কিন্তু কাগজে অধিকার থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে তার বাস্তব মূল্য পাওয়া এক বিষয় নয়। আইএলও বলছে, সমান মজুরির বিধানের বাস্তব প্রয়োগ সীমিত। ন্যূনতম মজুরি কাঠামো সব খাতকে সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে না। নারীর অংশগ্রহণ বেশি এমন কাজের মূল্যায়নে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত যথেষ্টভাবে বিবেচিত হয় না।

এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নিয়োগকর্তারও দায় আছে। বেতন নির্ধারণ যদি অস্বচ্ছ হয়, পদোন্নতির মানদণ্ড যদি অস্পষ্ট হয়, একই ধরনের কাজের মূল্যায়ন যদি ভিন্নভাবে করা হয়, তাহলে আইন থাকা সত্ত্বেও বৈষম্য শনাক্ত করা কঠিন। তাই শুধু সমান মজুরির ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বেতন কাঠামোয় স্বচ্ছতা, কাজের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, শক্তিশালী শ্রম পরিদর্শন এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। আইএলওর সাম্প্রতিক নীতিগত আলোচনাতেও বেতন কাঠামোর স্বচ্ছতা, বস্তুনিষ্ঠ কাজের মূল্যায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, পরিচর্যা নীতি এবং শ্রম পরিদর্শনের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে এই সমস্যাকে কেবল নারীর সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একজন শিক্ষিত নারী যখন শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন না, তখন শুধু তার ব্যক্তিগত আয় হারায় না; দেশ হারায় তার দক্ষতা, করদাতা হিসেবে সম্ভাব্য অবদান, উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনের সুযোগ। একজন মেধাবী নারী যদি বছরের পর বছর ঘরের অবৈতনিক কাজে আটকে থাকেন, তার শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে জাতীয় সম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে নারী কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নও বটে।

আমাদের উন্নয়নের ভাষাতেও তাই পরিবর্তন দরকার। শুধু কতজন মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, কতজন পাস করল, কিংবা কতজন নারী শ্রমবাজারে ঢুকলেন, তা দিয়ে অগ্রগতি মাপা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে তারা কোন পেশায় ঢুকছেন, কত আয় করছেন, কত ঘণ্টা কাজ করছেন, নিরাপত্তা কেমন, পদোন্নতির সুযোগ কতটা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় কতজন পৌঁছাচ্ছেন। সংখ্যায় অংশগ্রহণ বাড়লেও যদি নারীরা নিচের সারিতে আটকে থাকেন, তাহলে সেটি পূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নয়।

একটি দেশ যদি তার উচ্চশিক্ষিত নারীদের ৯৫ শতাংশের বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রেখে দেয়, তবে সেটি শুধু অসমতাই নয়, এটি অর্থনৈতিক অপচয়ও। যে সমাজ মেয়েদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে বিনিয়োগ করে, কিন্তু কর্মজীবনে তাদের জায়গা দিতে পারে না, সে সমাজ নিজের তৈরি মানবসম্পদের একটি বড় অংশ ব্যবহার না করেই এগিয়ে যেতে চায়। আর যে নারী একই সঙ্গে চাকরি ও ঘরের কাজ করেন, কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই তার শ্রমের মূল্য কম, তার কাছে সমতা শব্দটি কোনো অর্থ বহন করে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নারীরা কাজ করবেন কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, তারা কেন কাজের বাইরে থাকবেন, কেন কম মজুরির কাজে বেশি থাকবেন, কেন নেতৃত্বে এত কম থাকবেন এবং কেন ঘরের কাজের ভার তাদের কাঁধেই বেশি থাকবে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বদলাতে পারলেই ৫ শতাংশের পরিসংখ্যানটি কেবল একটি হতাশাজনক সংখ্যা হয়ে থাকবে না; এটি একটি পুরোনো শ্রমবাজারকে নতুন করে ভাবার সূচনা হতে পারে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রভাষক, ইংরেজি ও আধুনিক ভাষা বিভাগ, আইইউবিএটি]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬


নারীর কর্মসংস্থানে বাধা কোথায়

প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। সংখ্যাটি শুধু শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, কর্মসংস্কৃতি এবং উন্নয়নের ধারণার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রতিফলন। গত কয়েক দশক ধরে আমাদের বলা হচ্ছে, নারী শিক্ষা বেড়েছে, মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, পরীক্ষার ফল ভালো করছে, পেশাগত দক্ষতা অর্জন করছে। কিন্তু শিক্ষার দরজা পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রের দরজায় এসে যদি অধিকাংশ নারী থেমে যান, তাহলে আমরা তাদের কীসের জন্য শিক্ষিত করছি?

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘দ্য জেন্ডার পে গ্যাপ ইন বাংলাদেশ: ট্রেন্ডস, কজেস অ্যান্ড পলিসি অপশনস’ প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী হলেও তাদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। একই সময়ে ২০২৩ সালে পুরুষের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, নারীর ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই ব্যবধান ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ৫ শতাংশ নয়, বরং বাকি ৯৫ শতাংশ। তারা কি কাজ করতে চান না? নাকি তাদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়নি? দুটো প্রশ্ন এক নয়। একটি সমাজ যদি শিক্ষিত নারীর বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রাখে, তবে সেই অনুপস্থিতিকে ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ বলে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু তাতে সমস্যার কাঠামোগত চরিত্রটি আড়াল হয়ে যায়।

শিক্ষা যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং পেশাগত পরিচয়ে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে শিক্ষার সামাজিক সুফল অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একজন শিক্ষিত নারী চাকরি করতে চাইলেন, কিন্তু শিশুর যত্ন, নিরাপদ যাতায়াত, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ কিংবা পরিবারের প্রত্যাশা তাকে নিরুৎসাহিত করল। আরেকজন নারী হয়তো চাকরি পেলেন, কিন্তু এমন পেশায় যেখানে তার শ্রমের মূল্য কম। এই ঘটনাগুলো আলাদা মনে হলেও বাস্তবে একই কাঠামোর ভিন্ন প্রকাশ।

শ্রমের মজুরি ব্যবধান এই সমস্যাকে আরও গভীর করে। আইএলওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যবেক্ষণযোগ্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও নারী ও পুরুষের উপার্জনে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান থাকে। সামগ্রিকভাবে নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কম আয় করেন। সহজভাবে বলতে গেলে, পুরুষ যদি এক হাজার টাকা আয় করেন, নারীর আয় দাঁড়ায় প্রায় ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা। তবে এই ব্যবধান সব ক্ষেত্রে একই থাকে না। পেশা, খাত, কর্মঘণ্টা, কাজের ধরন ও কর্মসংস্থানের বৈশিষ্ট্যও মজুরি নির্ধারণ করে।

আইএলওর তথ্যমতে, মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে থাকা নারীদের ৪১ শতাংশ উৎপাদন খাতে কাজ করেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৩ শতাংশ। নারীদের আরও ১৯ শতাংশ গৃহস্থালি কাজে এবং ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে নিয়োজিত। অর্থাৎ শ্রমবাজারে নারীর প্রবেশ ঘটলেও তাদের অবস্থান সমান ক্ষমতা বা সমান আয়ের জায়গায় হচ্ছে না। পোশাকশিল্পে নারীর বিপুল উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু উৎপাদন লাইনে নারীর সংখ্যা বেশি হওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীর উপস্থিতি বেশি হওয়া এক বিষয় নয়।

ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পরিসংখ্যানটি তাই বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। দেশে ব্যবস্থাপনা পদে থাকা ব্যক্তিদের মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ নারী। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ নারী শুধু শ্রমবাজারে কম প্রবেশ করছেন না, প্রবেশ করলেও নেতৃত্বের সিঁড়িতে ওপরে ওঠার পথ সংকীর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মী অনেক থাকতে পারেন, কিন্তু যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদে তাদের উপস্থিতি সামান্য হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামো কতটা বদলেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

নারীর কর্মসংস্থান বাড়াতে আমরা প্রায়ই দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলি। দক্ষতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান প্রশিক্ষণ নয়। একজন নারীকে আরও একটি প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি তাকে একই অনিরাপদ, কম মজুরির এবং সীমিত উন্নতির চাকরিতে পাঠানো হয়, তবে তার দক্ষতা বাড়বে, কিন্তু শ্রমের মূল্য বাড়বে না। দক্ষতার পাশাপাশি দরকার কাজের মান, মজুরি কাঠামো, নিরাপত্তা, পদোন্নতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রবেশাধিকার।

আরও বড় অদৃশ্য বাধা রয়েছে ঘরের ভেতরে। বেতনভোগী নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, পুরুষেরা করেন ৭ দশমিক ৬ ঘণ্টা। বেতনভোগী ও গৃহস্থালি কাজ মিলিয়ে নারীদের সাপ্তাহিক কাজের সময় দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৭ ঘণ্টা, পুরুষদের ৫৯ ঘণ্টা। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার পরও নারীর দ্বিতীয় কর্মদিবস শেষ হয় না। অফিস থেকে ফিরে তার আরেকটি কর্মক্ষেত্র অপেক্ষা করে। সেই কাজের কোনো বেতন নেই, ছুটি নেই, পদোন্নতি নেই, বার্ষিক মূল্যায়ন নেই।

একজন পুরুষের কর্মজীবনকে স্বাভাবিক পেশাগত যাত্রা এবং একজন নারীর কর্মজীবনকে পারিবারিক সমঝোতার ফল হিসেবে দেখা হয়। এর প্রভাব নিয়োগ থেকে পদোন্নতি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। সন্তান হবে, মাতৃত্বকালীন ছুটি লাগবে, পরিবারে যত্নের দায়িত্ব থাকবে, তাই নারী হয়তো কম সময়ের কাজ বেছে নেবেন বা ক্যারিয়ারের মাঝপথে বিরতি নেবেন। এরপর সেই বিরতিই আবার তার কম আয় বা পদোন্নতি না পাওয়ার যুক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এটি এক ধরনের চক্র। সমাজ নারীর ওপর পারিবারিক যত্নের দায়িত্ব যত বেশি দেয়, শ্রমবাজারে তার অংশগ্রহণ তত সীমিত হয়। অংশগ্রহণ সীমিত হলে অভিজ্ঞতা ও আয় কমে। আয় কম হলে পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার অংশগ্রহণের ক্ষমতাও কমে যায়। তারপর বলা হয়, নারীর চাকরি না করাই হয়তো পরিবারের জন্য সুবিধাজনক। অর্থাৎ যে বাধা আমরা তৈরি করেছি, পরে সেটিকেই নারীর পছন্দ হিসেবে ব্যাখ্যা করি।

বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় এবং শ্রম আইনেও সমান মজুরি ও কর্মপরিবেশের বিধান রয়েছে। কিন্তু কাগজে অধিকার থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে তার বাস্তব মূল্য পাওয়া এক বিষয় নয়। আইএলও বলছে, সমান মজুরির বিধানের বাস্তব প্রয়োগ সীমিত। ন্যূনতম মজুরি কাঠামো সব খাতকে সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে না। নারীর অংশগ্রহণ বেশি এমন কাজের মূল্যায়নে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত যথেষ্টভাবে বিবেচিত হয় না।

এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নিয়োগকর্তারও দায় আছে। বেতন নির্ধারণ যদি অস্বচ্ছ হয়, পদোন্নতির মানদণ্ড যদি অস্পষ্ট হয়, একই ধরনের কাজের মূল্যায়ন যদি ভিন্নভাবে করা হয়, তাহলে আইন থাকা সত্ত্বেও বৈষম্য শনাক্ত করা কঠিন। তাই শুধু সমান মজুরির ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বেতন কাঠামোয় স্বচ্ছতা, কাজের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, শক্তিশালী শ্রম পরিদর্শন এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। আইএলওর সাম্প্রতিক নীতিগত আলোচনাতেও বেতন কাঠামোর স্বচ্ছতা, বস্তুনিষ্ঠ কাজের মূল্যায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, পরিচর্যা নীতি এবং শ্রম পরিদর্শনের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে এই সমস্যাকে কেবল নারীর সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একজন শিক্ষিত নারী যখন শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন না, তখন শুধু তার ব্যক্তিগত আয় হারায় না; দেশ হারায় তার দক্ষতা, করদাতা হিসেবে সম্ভাব্য অবদান, উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনের সুযোগ। একজন মেধাবী নারী যদি বছরের পর বছর ঘরের অবৈতনিক কাজে আটকে থাকেন, তার শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে জাতীয় সম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে নারী কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নও বটে।

আমাদের উন্নয়নের ভাষাতেও তাই পরিবর্তন দরকার। শুধু কতজন মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, কতজন পাস করল, কিংবা কতজন নারী শ্রমবাজারে ঢুকলেন, তা দিয়ে অগ্রগতি মাপা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে তারা কোন পেশায় ঢুকছেন, কত আয় করছেন, কত ঘণ্টা কাজ করছেন, নিরাপত্তা কেমন, পদোন্নতির সুযোগ কতটা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় কতজন পৌঁছাচ্ছেন। সংখ্যায় অংশগ্রহণ বাড়লেও যদি নারীরা নিচের সারিতে আটকে থাকেন, তাহলে সেটি পূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নয়।

একটি দেশ যদি তার উচ্চশিক্ষিত নারীদের ৯৫ শতাংশের বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রেখে দেয়, তবে সেটি শুধু অসমতাই নয়, এটি অর্থনৈতিক অপচয়ও। যে সমাজ মেয়েদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে বিনিয়োগ করে, কিন্তু কর্মজীবনে তাদের জায়গা দিতে পারে না, সে সমাজ নিজের তৈরি মানবসম্পদের একটি বড় অংশ ব্যবহার না করেই এগিয়ে যেতে চায়। আর যে নারী একই সঙ্গে চাকরি ও ঘরের কাজ করেন, কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই তার শ্রমের মূল্য কম, তার কাছে সমতা শব্দটি কোনো অর্থ বহন করে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নারীরা কাজ করবেন কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, তারা কেন কাজের বাইরে থাকবেন, কেন কম মজুরির কাজে বেশি থাকবেন, কেন নেতৃত্বে এত কম থাকবেন এবং কেন ঘরের কাজের ভার তাদের কাঁধেই বেশি থাকবে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বদলাতে পারলেই ৫ শতাংশের পরিসংখ্যানটি কেবল একটি হতাশাজনক সংখ্যা হয়ে থাকবে না; এটি একটি পুরোনো শ্রমবাজারকে নতুন করে ভাবার সূচনা হতে পারে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রভাষক, ইংরেজি ও আধুনিক ভাষা বিভাগ, আইইউবিএটি]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত