৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দিবসটি শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার নিয়ে কথা বলার দিন। প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে চতুর্থবারের মতো সরকারিভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
ইউনেস্কো প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বক্তব্য হলো—শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং ৬০ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা ও অবস্থান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ সভায় ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয় জন্মদাতা অথবা জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে বিবেচিত শিক্ষক সমাজের মান-সম্মান, মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যেই দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শিক্ষার অধিকার একটি মানবিক ও মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের ঘোষণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়। সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা, মাধ্যমিক স্তরে সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে বৈষম্যহীন শিক্ষা নীতি, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও গুণগত মান উন্নয়ন, পদোন্নতি, পেশাগত আচরণবিধি, নারী শিক্ষকদের জন্য কর্মবান্ধব পরিবেশ, শিক্ষকদের অধিকার ও নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সরকারপ্রধান বা তাঁদের প্রতিনিধিরা এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন।
শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্যে মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও জীবনব্যাপী শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং তাঁদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের দক্ষতা, আন্তরিকতা, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে এখনও নানা ঘাটতি রয়েছে। অবসর ও কল্যাণ তহবিলে কর্তন করা অর্থ অবসরে যাওয়ার তিন-চার বছর পরও অনেক শিক্ষক-কর্মচারী পাচ্ছেন না। কাগজপত্র জমা দেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে পাওনা পরিশোধের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের ওপর হামলা, মারধর, হত্যা এবং গলায় জুতার মালা পরানোর মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী ও গভর্নিং বডির সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার বিচার না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও মর্যাদাহানির বোধ তৈরি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন এবং আইনবহির্ভূতভাবে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক দূরত্বও পাঠদান কার্যক্রমের জন্য নতুন সংকট হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতার পাশাপাশি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। ইউনেস্কো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে জাতীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশেও ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ করে তা পর্যায়ক্রমে ৭ শতাংশে উন্নীত করার এবং ১০ বছরের মধ্যে শিক্ষাকে সরকারিকরণের তাগিদ দিয়েছিল।
কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষাখাতে বরাদ্দের হার কিছুটা বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এর সুফল যথেষ্ট পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে জিডিপির ৫, ৬ বা ৭ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা ৫৫ বছরে কখনও ২ দশমিক ৪ শতাংশের ওপরে ওঠেনি। এসডিজির আলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে মানসম্মত, সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং মাধ্যমিক স্তরে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালনার জন্য পরিকল্পনা কমিশন জিডিপির ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছিল। এর বিপরীতে শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বর্তমানে তা প্রায় ২ শতাংশ। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে এবং ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়ার পরিবর্তে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষা এখনো বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ তুলনামূলকভাবে কম। বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরিজীবনে পদোন্নতির সুযোগও সীমিত। প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার পর অনেকের পদোন্নতির সুযোগ থাকে না। কর্মদক্ষতাভিত্তিক পদোন্নতির ব্যবস্থাও নেই। সময়ভিত্তিক পদোন্নতি এবং চাকরিজীবনে সীমিত পদোন্নতির কারণে এই পেশায় মেধাবীদের অংশগ্রহণ কমছে। একই সঙ্গে পেশাগত মান বৃদ্ধির চেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বেতন-ভাতার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হচ্ছে। যারা আসছেন, তাঁদেরও ধরে রাখা যাচ্ছে না।
শিক্ষক সংগঠনের অবস্থান
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ঐতিহাসিক ঘোষণা এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে বাংলাদেশের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছেন। তবে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের বাইরে স্বাধীন ও পেশাদার অবস্থান থেকে বৃহৎ আন্দোলন তেমন গড়ে ওঠেনি। গভর্নিং বডির দলীয়করণের কারণে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ, পৃথক নিয়োগ কমিশন এবং বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষকদের আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতার আওতায় কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন এবং পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে অন্য কাজে শিক্ষকদের যুক্ত না করা, পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং আর্থিক নিরাপত্তার জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।
ইউনেস্কোর ঘোষণার পাশাপাশি সংবিধানে শিক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশের শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছে কি না, সে বিষয়ে ইউনেস্কোর কার্যকর তদারকি থাকা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী শিক্ষক সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি পাক। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কার্যক্রমের পাশাপাশি বস্তুনিষ্ঠভাবে দেশ, জাতি ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুন—এটাই প্রত্যাশা। শিক্ষক যেমন তাঁর অধিকার ভোগ করবেন, তেমনি দায়িত্বও পালন করবেন। এ জন্য প্রয়োজন মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক, ভালো শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষকদের আন্তসম্পর্কের উন্নয়ন।
[লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি]

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দিবসটি শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার নিয়ে কথা বলার দিন। প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে চতুর্থবারের মতো সরকারিভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
ইউনেস্কো প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বক্তব্য হলো—শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং ৬০ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা ও অবস্থান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ সভায় ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয় জন্মদাতা অথবা জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে বিবেচিত শিক্ষক সমাজের মান-সম্মান, মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যেই দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শিক্ষার অধিকার একটি মানবিক ও মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের ঘোষণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়। সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা, মাধ্যমিক স্তরে সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে বৈষম্যহীন শিক্ষা নীতি, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও গুণগত মান উন্নয়ন, পদোন্নতি, পেশাগত আচরণবিধি, নারী শিক্ষকদের জন্য কর্মবান্ধব পরিবেশ, শিক্ষকদের অধিকার ও নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সরকারপ্রধান বা তাঁদের প্রতিনিধিরা এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন।
শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্যে মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও জীবনব্যাপী শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং তাঁদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের দক্ষতা, আন্তরিকতা, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে এখনও নানা ঘাটতি রয়েছে। অবসর ও কল্যাণ তহবিলে কর্তন করা অর্থ অবসরে যাওয়ার তিন-চার বছর পরও অনেক শিক্ষক-কর্মচারী পাচ্ছেন না। কাগজপত্র জমা দেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে পাওনা পরিশোধের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের ওপর হামলা, মারধর, হত্যা এবং গলায় জুতার মালা পরানোর মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী ও গভর্নিং বডির সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার বিচার না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও মর্যাদাহানির বোধ তৈরি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন এবং আইনবহির্ভূতভাবে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক দূরত্বও পাঠদান কার্যক্রমের জন্য নতুন সংকট হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতার পাশাপাশি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। ইউনেস্কো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে জাতীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশেও ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ করে তা পর্যায়ক্রমে ৭ শতাংশে উন্নীত করার এবং ১০ বছরের মধ্যে শিক্ষাকে সরকারিকরণের তাগিদ দিয়েছিল।
কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষাখাতে বরাদ্দের হার কিছুটা বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এর সুফল যথেষ্ট পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে জিডিপির ৫, ৬ বা ৭ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা ৫৫ বছরে কখনও ২ দশমিক ৪ শতাংশের ওপরে ওঠেনি। এসডিজির আলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে মানসম্মত, সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং মাধ্যমিক স্তরে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালনার জন্য পরিকল্পনা কমিশন জিডিপির ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছিল। এর বিপরীতে শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বর্তমানে তা প্রায় ২ শতাংশ। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে এবং ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়ার পরিবর্তে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষা এখনো বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ তুলনামূলকভাবে কম। বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরিজীবনে পদোন্নতির সুযোগও সীমিত। প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার পর অনেকের পদোন্নতির সুযোগ থাকে না। কর্মদক্ষতাভিত্তিক পদোন্নতির ব্যবস্থাও নেই। সময়ভিত্তিক পদোন্নতি এবং চাকরিজীবনে সীমিত পদোন্নতির কারণে এই পেশায় মেধাবীদের অংশগ্রহণ কমছে। একই সঙ্গে পেশাগত মান বৃদ্ধির চেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বেতন-ভাতার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হচ্ছে। যারা আসছেন, তাঁদেরও ধরে রাখা যাচ্ছে না।
শিক্ষক সংগঠনের অবস্থান
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ঐতিহাসিক ঘোষণা এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে বাংলাদেশের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছেন। তবে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের বাইরে স্বাধীন ও পেশাদার অবস্থান থেকে বৃহৎ আন্দোলন তেমন গড়ে ওঠেনি। গভর্নিং বডির দলীয়করণের কারণে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ, পৃথক নিয়োগ কমিশন এবং বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষকদের আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতার আওতায় কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন এবং পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে অন্য কাজে শিক্ষকদের যুক্ত না করা, পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং আর্থিক নিরাপত্তার জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।
ইউনেস্কোর ঘোষণার পাশাপাশি সংবিধানে শিক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশের শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছে কি না, সে বিষয়ে ইউনেস্কোর কার্যকর তদারকি থাকা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী শিক্ষক সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি পাক। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কার্যক্রমের পাশাপাশি বস্তুনিষ্ঠভাবে দেশ, জাতি ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুন—এটাই প্রত্যাশা। শিক্ষক যেমন তাঁর অধিকার ভোগ করবেন, তেমনি দায়িত্বও পালন করবেন। এ জন্য প্রয়োজন মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক, ভালো শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষকদের আন্তসম্পর্কের উন্নয়ন।
[লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি]

আপনার মতামত লিখুন