মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দেওয়া কোনো রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা ফেটে গেলে স্ট্রোক হতে পারে। বয়স ও পারিবারিক ইতিহাসের মতো কিছু ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও খাদ্যাভ্যাস, ওজন, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তবে কোনো একটি খাবার একাই স্ট্রোক ঠেকাতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে উপকার পেতে প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন।
শাকসবজি
পালংশাক, লালশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক ও ব্রোকলিসহ বিভিন্ন সবুজ শাকসবজিতে আঁশ, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ফোলেইট পাওয়া যায়।
কিছু শাকসবজিতে থাকা প্রাকৃতিক নাইট্রেট শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এটি রক্তনালী প্রসারিত করা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। গবেষণায় বেশি শাকসবজি খাওয়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ফল
আম, পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, পেঁপে, জাম, আপেল ও নাশপাতির মতো ফল খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এসব ফলে রয়েছে আঁশ, পটাসিয়াম, ভিটামিন ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
প্রতিদিন অতিরিক্ত ২০০ গ্রাম ফল খাওয়ার সঙ্গে প্রায় ৩২ শতাংশ কম স্ট্রোকের ঝুঁকির পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে ফলের জুসের চেয়ে গোটা ফল খাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ গোটা ফলে থাকা আঁশ পেট ভরা রাখতে এবং রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বাদাম
চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম ও আখরোটে রয়েছে অসম্পৃক্ত চর্বি, আঁশ, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও বিভিন্ন খনিজ। আখরোটে পাওয়া যায় উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।
একটি মেটা-বিশ্লেষণে বেশি বাদাম খাওয়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে বেশি লবণ, চিনি বা মসলা দেওয়া বাদামের বদলে লবণহীন বা কম প্রক্রিয়াজাত বাদাম পরিমিত খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শস্য
ওটস, লাল বা বাদামি চাল এবং আটার রুটির মতো গোটা শস্যে আঁশ, বি ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় খনিজ থাকে।
ওটসে থাকা দ্রবণীয় আঁশ রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে সাদা ভাতের বদলে লাল চাল এবং সাদা পাউরুটির পরিবর্তে আটার রুটি বেছে নেওয়া উপকারী।
মাছ
ইলিশ, রুই, কাতলা, বোয়াল ও চিতলসহ বিভিন্ন মাছ ভালো মানের প্রোটিনের উৎস। সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত কিছু মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়।
বিভিন্ন গবেষণায় বেশি মাছ খাওয়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ১৪ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মাছ খাদ্যতালিকায় রাখলে বেশি সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত প্রাণিজ খাবারের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর প্রোটিন পাওয়ার সুযোগ থাকে।
তবে অতিরিক্ত তেলে ভাজা বা বেশি লবণ দেওয়া মাছের পরিবর্তে ভাপানো, সেদ্ধ কিংবা অল্প তেলে রান্না করা মাছ বেছে নেওয়া ভালো।
কম চিনির দই ও গাঁজন করা খাবার
দই থেকে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও পটাসিয়াম পাওয়া যায়। কিছু দইয়ে থাকা উপকারী জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া বা প্রোবায়োটিক অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে।
তাই বেশি চিনি দেওয়া মিষ্টি দইয়ের পরিবর্তে টক দই বা কম চিনিযুক্ত দই বেছে নেওয়া যেতে পারে। ডায়াবেটিস বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা থাকলে দইয়ে যোগ করা চিনির পরিমাণের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার সঙ্গে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর ভালো স্বাস্থ্যের ইতিবাচক সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
ডাল ও শিমজাতীয় খাবার
মসুর ও মুগ ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, বরবটি, রাজমাসহ বিভিন্ন শিমজাতীয় খাবারে রয়েছে আঁশ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন। এসব খাবার নিয়মিত খেলে চর্বিযুক্ত লাল মাংসের মতো প্রাণিজ প্রোটিনের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
এ ছাড়া এসব খাবারের আঁশ কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি ও মাছ রাখলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাবার তৈরি করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস
সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, বাদাম ও মাছ থেকে অসম্পৃক্ত চর্বি পাওয়া যায়। মাখন, ঘি বা অতিরিক্ত প্রাণিজ চর্বির পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে এসব উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে স্বাস্থ্যকর হলেও সব ধরনের তেল ও চর্বিতে ক্যালরি বেশি থাকে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার করা উচিত নয়। সম্পৃক্ত চর্বির বদলে পরিমিত অসম্পৃক্ত চর্বি ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে হৃদযন্ত্রের জন্য নিরাপদ।
খাবারের পাশাপাশি জীবনযাপনেও নজর
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে শুধু নির্দিষ্ট কোনো একটি খাবারের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, গোটা ফল, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম ও মাছের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণ, চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো প্রয়োজন।
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি তৈরি করে। তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দেওয়া কোনো রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা ফেটে গেলে স্ট্রোক হতে পারে। বয়স ও পারিবারিক ইতিহাসের মতো কিছু ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও খাদ্যাভ্যাস, ওজন, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তবে কোনো একটি খাবার একাই স্ট্রোক ঠেকাতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে উপকার পেতে প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন।
শাকসবজি
পালংশাক, লালশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক ও ব্রোকলিসহ বিভিন্ন সবুজ শাকসবজিতে আঁশ, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ফোলেইট পাওয়া যায়।
কিছু শাকসবজিতে থাকা প্রাকৃতিক নাইট্রেট শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এটি রক্তনালী প্রসারিত করা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। গবেষণায় বেশি শাকসবজি খাওয়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ফল
আম, পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, পেঁপে, জাম, আপেল ও নাশপাতির মতো ফল খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এসব ফলে রয়েছে আঁশ, পটাসিয়াম, ভিটামিন ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
প্রতিদিন অতিরিক্ত ২০০ গ্রাম ফল খাওয়ার সঙ্গে প্রায় ৩২ শতাংশ কম স্ট্রোকের ঝুঁকির পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে ফলের জুসের চেয়ে গোটা ফল খাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ গোটা ফলে থাকা আঁশ পেট ভরা রাখতে এবং রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বাদাম
চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম ও আখরোটে রয়েছে অসম্পৃক্ত চর্বি, আঁশ, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও বিভিন্ন খনিজ। আখরোটে পাওয়া যায় উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।
একটি মেটা-বিশ্লেষণে বেশি বাদাম খাওয়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে বেশি লবণ, চিনি বা মসলা দেওয়া বাদামের বদলে লবণহীন বা কম প্রক্রিয়াজাত বাদাম পরিমিত খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শস্য
ওটস, লাল বা বাদামি চাল এবং আটার রুটির মতো গোটা শস্যে আঁশ, বি ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় খনিজ থাকে।
ওটসে থাকা দ্রবণীয় আঁশ রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে সাদা ভাতের বদলে লাল চাল এবং সাদা পাউরুটির পরিবর্তে আটার রুটি বেছে নেওয়া উপকারী।
মাছ
ইলিশ, রুই, কাতলা, বোয়াল ও চিতলসহ বিভিন্ন মাছ ভালো মানের প্রোটিনের উৎস। সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত কিছু মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়।
বিভিন্ন গবেষণায় বেশি মাছ খাওয়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ১৪ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মাছ খাদ্যতালিকায় রাখলে বেশি সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত প্রাণিজ খাবারের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর প্রোটিন পাওয়ার সুযোগ থাকে।
তবে অতিরিক্ত তেলে ভাজা বা বেশি লবণ দেওয়া মাছের পরিবর্তে ভাপানো, সেদ্ধ কিংবা অল্প তেলে রান্না করা মাছ বেছে নেওয়া ভালো।
কম চিনির দই ও গাঁজন করা খাবার
দই থেকে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও পটাসিয়াম পাওয়া যায়। কিছু দইয়ে থাকা উপকারী জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া বা প্রোবায়োটিক অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে।
তাই বেশি চিনি দেওয়া মিষ্টি দইয়ের পরিবর্তে টক দই বা কম চিনিযুক্ত দই বেছে নেওয়া যেতে পারে। ডায়াবেটিস বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা থাকলে দইয়ে যোগ করা চিনির পরিমাণের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার সঙ্গে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর ভালো স্বাস্থ্যের ইতিবাচক সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
ডাল ও শিমজাতীয় খাবার
মসুর ও মুগ ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, বরবটি, রাজমাসহ বিভিন্ন শিমজাতীয় খাবারে রয়েছে আঁশ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন। এসব খাবার নিয়মিত খেলে চর্বিযুক্ত লাল মাংসের মতো প্রাণিজ প্রোটিনের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
এ ছাড়া এসব খাবারের আঁশ কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি ও মাছ রাখলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাবার তৈরি করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস
সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, বাদাম ও মাছ থেকে অসম্পৃক্ত চর্বি পাওয়া যায়। মাখন, ঘি বা অতিরিক্ত প্রাণিজ চর্বির পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে এসব উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে স্বাস্থ্যকর হলেও সব ধরনের তেল ও চর্বিতে ক্যালরি বেশি থাকে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার করা উচিত নয়। সম্পৃক্ত চর্বির বদলে পরিমিত অসম্পৃক্ত চর্বি ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে হৃদযন্ত্রের জন্য নিরাপদ।
খাবারের পাশাপাশি জীবনযাপনেও নজর
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে শুধু নির্দিষ্ট কোনো একটি খাবারের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, গোটা ফল, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম ও মাছের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণ, চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো প্রয়োজন।
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি তৈরি করে। তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন