সংবাদ

কুসংস্কার দূর করতে চাই জ্ঞানের আলো


বাবুল রবিদাস
বাবুল রবিদাস
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

কুসংস্কার দূর করতে চাই জ্ঞানের আলো
কুসংস্কার থেকে মুক্তির প্রধান পথ শিক্ষা

অনগ্রসর, দলিত-বঞ্চিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক মানুষ শিক্ষা ও তথ্যের সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকায় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের শিকার হন। কোনো কথা সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকলেই তা সত্য বা বিজ্ঞানসম্মত হয়ে যায় না। বরং প্রচলিত বিশ্বাসকে যুক্তি, জ্ঞান ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বিজ্ঞান আমাদের শেখায়—আগে জানতে হবে, তারপর বিশ্বাস করতে হবে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময়ও কুসংস্কারের নানা দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। কোথাও কোথাও মানুষ রোগ থেকে রক্ষা পেতে পূজা বা নানা আচার-অনুষ্ঠানের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু এসবের মাধ্যমে কেউ রোগমুক্ত হয়েছেন—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিধি ও টিকাই কার্যকর পথ। তাই অন্ধভাবে কোনো কিছু বিশ্বাস না করে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

আমাদের সমাজে এখনো নানা কুসংস্কার প্রচলিত। শ্মশান বা কবরস্থানের দিকে আঙুল তুলে পরে সেই আঙুল মুখে কামড় দিলে অমঙ্গল দূর হয়—এমন বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় গর্ভবতী নারী কিছু কাটাকাটি করলে সন্তানের ক্ষতি হবে—এ ধারণাও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। গ্রহণ একটি প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা; এর সঙ্গে গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক গঠনের এমন কোনো সম্পর্ক নেই।

স্বাভাবিক শারীরিক বিষয় নিয়েও সমাজে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের স্বপ্নদোষ একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। অথচ এ নিয়ে অনেকের মধ্যে লজ্জা, ভয় ও অপরাধবোধ কাজ করে। স্বপ্নদোষের কারণে কেউ অপবিত্র হয়ে যায় কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না—এ ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। শরীর সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও সুস্থ মানসিকতা এ ধরনের ভুল ধারণা দূর করতে পারে।

দৈনন্দিন জীবনেও কুসংস্কারের নানা প্রকাশ দেখা যায়। পরীক্ষার আগে ডিম বা মিষ্টি খেলে ফল খারাপ হবে, বাসন পড়ে গেলে অমঙ্গল হবে, বাড়ির পাশে কাক ডাকলে বিপদ আসবে, রাতে পেঁচা ডাকলে গর্ভবতী নারীর ক্ষতি হবে কিংবা খাবারের আগে হাঁচি দিলে কেউ তাকে স্মরণ করছে—এসব বিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব ঘটনা বা বৈজ্ঞানিক সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো নিছক প্রচলিত ধারণা।

সন্তান জন্মের পর অশুভ শক্তির হাত থেকে নবজাতককে রক্ষার নামে দরজা-জানালায় নানা বস্তু ঝুলিয়ে রাখা কিংবা অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে ঝাড়ফুঁকের জন্য নিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। একইভাবে ভাগ্যনির্ভর মানসিকতাও মানুষের অগ্রগতির পথে বাধা। কে কী হবে সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত—এমন ধারণা মানুষকে কর্ম ও চেষ্টা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ শিক্ষা, পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবন বদলাতে পারে। ‘জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো’—এই বোধ সমাজে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

কুসংস্কারের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা না দেওয়া। দলিত-বঞ্চিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে অস্পৃশ্য ভাবা, শিক্ষা থেকে দূরে রাখা, ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়া, পোশাক বা জুতা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কিংবা বিবাহ ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা—এসবও কুসংস্কার ও সামাজিক অন্যায়। আধুনিক রাষ্ট্রে এমন বৈষম্যের কোনো স্থান থাকতে পারে না।

কুসংস্কার থেকে মুক্তির প্রধান পথ শিক্ষা। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বিজ্ঞানমনস্কতা, তথ্যপ্রযুক্তি, অনুসন্ধান ও যুক্তিবোধও বাড়াতে হবে। কোনো বিশ্বাস বহু বছর ধরে চলে আসছে বলেই তা সত্য—এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রভাবশালী কেউ কোনো কথা বললেই তা মেনে নেওয়া উচিত নয়; প্রয়োজন হলে তার ভিত্তি যাচাই করতে হবে।

কুসংস্কার সমাজের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সৃজনশীলতার পথে বাধা। তাই সব নাগরিককে সমান মর্যাদা দিয়ে জ্ঞান, বিজ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আজ নয়তো কাল, সচেতনতার পথ ধরেই কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব হবে—এই প্রত্যাশাই থাকা উচিত।

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


কুসংস্কার দূর করতে চাই জ্ঞানের আলো

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

অনগ্রসর, দলিত-বঞ্চিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক মানুষ শিক্ষা ও তথ্যের সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকায় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের শিকার হন। কোনো কথা সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকলেই তা সত্য বা বিজ্ঞানসম্মত হয়ে যায় না। বরং প্রচলিত বিশ্বাসকে যুক্তি, জ্ঞান ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বিজ্ঞান আমাদের শেখায়—আগে জানতে হবে, তারপর বিশ্বাস করতে হবে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময়ও কুসংস্কারের নানা দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। কোথাও কোথাও মানুষ রোগ থেকে রক্ষা পেতে পূজা বা নানা আচার-অনুষ্ঠানের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু এসবের মাধ্যমে কেউ রোগমুক্ত হয়েছেন—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিধি ও টিকাই কার্যকর পথ। তাই অন্ধভাবে কোনো কিছু বিশ্বাস না করে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

আমাদের সমাজে এখনো নানা কুসংস্কার প্রচলিত। শ্মশান বা কবরস্থানের দিকে আঙুল তুলে পরে সেই আঙুল মুখে কামড় দিলে অমঙ্গল দূর হয়—এমন বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় গর্ভবতী নারী কিছু কাটাকাটি করলে সন্তানের ক্ষতি হবে—এ ধারণাও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। গ্রহণ একটি প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা; এর সঙ্গে গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক গঠনের এমন কোনো সম্পর্ক নেই।

স্বাভাবিক শারীরিক বিষয় নিয়েও সমাজে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের স্বপ্নদোষ একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। অথচ এ নিয়ে অনেকের মধ্যে লজ্জা, ভয় ও অপরাধবোধ কাজ করে। স্বপ্নদোষের কারণে কেউ অপবিত্র হয়ে যায় কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না—এ ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। শরীর সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও সুস্থ মানসিকতা এ ধরনের ভুল ধারণা দূর করতে পারে।

দৈনন্দিন জীবনেও কুসংস্কারের নানা প্রকাশ দেখা যায়। পরীক্ষার আগে ডিম বা মিষ্টি খেলে ফল খারাপ হবে, বাসন পড়ে গেলে অমঙ্গল হবে, বাড়ির পাশে কাক ডাকলে বিপদ আসবে, রাতে পেঁচা ডাকলে গর্ভবতী নারীর ক্ষতি হবে কিংবা খাবারের আগে হাঁচি দিলে কেউ তাকে স্মরণ করছে—এসব বিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব ঘটনা বা বৈজ্ঞানিক সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো নিছক প্রচলিত ধারণা।

সন্তান জন্মের পর অশুভ শক্তির হাত থেকে নবজাতককে রক্ষার নামে দরজা-জানালায় নানা বস্তু ঝুলিয়ে রাখা কিংবা অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে ঝাড়ফুঁকের জন্য নিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। একইভাবে ভাগ্যনির্ভর মানসিকতাও মানুষের অগ্রগতির পথে বাধা। কে কী হবে সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত—এমন ধারণা মানুষকে কর্ম ও চেষ্টা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ শিক্ষা, পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবন বদলাতে পারে। ‘জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো’—এই বোধ সমাজে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।


কুসংস্কারের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা না দেওয়া। দলিত-বঞ্চিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে অস্পৃশ্য ভাবা, শিক্ষা থেকে দূরে রাখা, ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়া, পোশাক বা জুতা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কিংবা বিবাহ ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা—এসবও কুসংস্কার ও সামাজিক অন্যায়। আধুনিক রাষ্ট্রে এমন বৈষম্যের কোনো স্থান থাকতে পারে না।

কুসংস্কার থেকে মুক্তির প্রধান পথ শিক্ষা। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বিজ্ঞানমনস্কতা, তথ্যপ্রযুক্তি, অনুসন্ধান ও যুক্তিবোধও বাড়াতে হবে। কোনো বিশ্বাস বহু বছর ধরে চলে আসছে বলেই তা সত্য—এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রভাবশালী কেউ কোনো কথা বললেই তা মেনে নেওয়া উচিত নয়; প্রয়োজন হলে তার ভিত্তি যাচাই করতে হবে।

কুসংস্কার সমাজের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সৃজনশীলতার পথে বাধা। তাই সব নাগরিককে সমান মর্যাদা দিয়ে জ্ঞান, বিজ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আজ নয়তো কাল, সচেতনতার পথ ধরেই কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব হবে—এই প্রত্যাশাই থাকা উচিত।

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত