সংবাদ

আদিবাসী জরিপ: যে প্রশ্নগুলো জরুরি


মিথুশিলাক মুরমু
মিথুশিলাক মুরমু
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

আদিবাসী জরিপ: যে প্রশ্নগুলো জরুরি
সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের বড় সংকটগুলোর একটি ভূমি দখল ও উচ্ছেদ

‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র‍্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ-২০২৫’ প্রকল্পের আওতায় ১ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই মহাযজ্ঞে যুক্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার গণনাকারী। নিঃসন্দেহে এটি দেশের প্রথম বিশেষায়িত আদিবাসী জরিপ। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাসহ বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে, অন্যদিকে সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জরিপের মাধ্যমে দেশে বসবাসরত আদিবাসীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। এতে পরিবারভিত্তিক বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক নানা সূচক যুক্ত করা হবে। ফলে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা ও দারিদ্র‍্যরে মাত্রা নিরূপণ করা সম্ভব হবে। সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত ও নির্বাচন করাও সহজ হবে।

জরিপের মূল উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য হলো—

ক. স্বতন্ত্র তথ্যভান্ডার: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারভিত্তিক যাবতীয় তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ফুল কাউন্ট’ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা;

খ. সামাজিক সূচক: তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র‍্য ও জনমিতিক পরিস্থিতি নিরূপণ করা;

গ. সুবিধাভোগী নির্বাচন: নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রকৃত উপকারভোগী সঠিকভাবে বাছাই করা।

ইতোপূর্বে জরিপের প্রাক্-পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে—বিশেষত বান্দরবান, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, পঞ্চগড়, নেত্রকোণা, সিলেট ও পটুয়াখালীসহ বেশ কয়েকটি জেলায়। তথ্য সংগ্রহকারীরা প্রধানত জানতে চাইবেন—এলাকার পরিচিতি, নৃগোষ্ঠীর খানা বা পরিবার শনাক্তকরণ, খানার বৈশিষ্ট্য, সদস্যদের তথ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, ১০ বছরের বেশি বয়সী সদস্যদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিদেশে বা পরিবারের বাইরে বসবাসকারী সদস্যদের তথ্য। এছাড়া পরিবারে কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন কি না, কেউ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আছেন কি না, জাতীয় পরিচয়পত্র আছে কি না, সদস্যদের বৈবাহিক অবস্থা, জন্মসনদ আছে কি না, ধর্মীয় পরিচয়, কোনো এনজিওর সহায়তা পেয়েছেন কি না, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় হিসাব আছে কি না, রেমিট্যান্স আসে কি না—এসব তথ্যও সংগ্রহ করা হবে।

সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, দেশের সব শ্রেণি, পেশা ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উন্নয়নের জন্য সঠিক তথ্য প্রয়োজন। পরিসংখ্যান হাতে না থাকলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ কঠিন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার চায় সব বিষয়ে প্রকৃত তথ্য উঠে আসুক। কারণ তথ্য সঠিক না হলে পরিকল্পনাও সঠিক হবে না।

তবে আদিবাসী জরিপ নিয়ে অনেকের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় প্রশ্নমালার কিছু নীতিগত দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে।

নামকরণে জটিলতা: প্রশ্নপত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দের পরিবর্তে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব পরিচয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা সেখানে দেওয়া হয়নি। কারা উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশিকা সাধারণের সামনে দৃশ্যমান নয়।

তালিকার বাইরে থাকা জাতিগোষ্ঠীর সংকট: সরকারি গেজেটে থাকা ৫০টি নামের বাইরে কোনো ছোট বা প্রান্তিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী থাকলে তাদের নাম ওই তালিকায় খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে মূলধারার বাঙালি কিংবা বড় কোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর নামে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের আদমশুমারিতে আদিবাসী হিসেবে উল্লেখিত কয়েকটি নামও বর্তমান গেজেটের বাইরে রয়েছে। এভাবে কোনো জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার বিষয়টি হতাশাজনক।

চা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। কিন্তু তারা প্রধানত ‘চা শ্রমিক’ হিসেবেই পরিচিত। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে কর্মরত অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, প্রায় ১১৬টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একমত হওয়া যায়নি। সাহিত্যে দেখা যায়, জাতি, গোত্র, বংশ, নাম ও পরিচয় মুছে চা-বাগানের শ্রমিকদের একসময় ‘কুলি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে; পরে ‘বাগানি’ এবং এখন ‘চা শ্রমিক’ নামে পরিচিত করা হচ্ছে। জনশুমারিতে তথ্যনির্ভরভাবে এসব জাতিগোষ্ঠীর উপস্থিতি তুলে ধরা জরুরি।

আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় গণনাকারী হিসেবে আদিবাসীদের দায়িত্ব দিলে নামের বানান, পদবি ও উচ্চারণের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। দু-একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর পদবি বাঙালি পদবির মতোই। যেমন, মালপাহাড়িয়াদের পদবি ‘বিশ্বাস’ ও ‘দাস’। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে পরিচয় স্পষ্ট না করলে তাকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুলের কারণে আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সংশোধনের চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে হতাশ হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের প্রয়োজন হয়, যা প্রান্তিক মানুষের জন্য বড় বাধা।

ধর্মের সুনির্দিষ্ট পরিচয় না থাকা: আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ধর্ম বা প্রকৃতিপূজারী বিশ্বাসের পৃথক পরিচয় না থাকায়—যেমন সাঁওতালদের সারনা ধর্ম—তাদের অনেককে ‘অন্যান্য’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এতে তাদের সঠিক ধর্মীয় পরিসংখ্যান আড়ালে থেকে যায়।

মাতৃভাষার প্রশ্নের অনুপস্থিতি: প্রশ্নপত্রে ‘আপনার মাতৃভাষা কী?’ অথবা ‘আপনি কোন ভাষায় কথা বলেন?’—এ ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকা জরুরি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে কতগুলো আদিবাসী ভাষা টিকে আছে এবং কতগুলো বিলুপ্তির পথে, সে বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যভান্ডার তৈরি করা সম্ভব হতো।

একটি আদর্শ, বৈজ্ঞানিক ও অধিকারভিত্তিক আদিবাসী জরিপ করতে হলে বর্তমান সংকট ও বঞ্চনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আদিবাসীদের মতে, বর্তমান জরিপে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হলে তাদের প্রকৃত চিত্র সামনে আসত।

১. ভূমি ও ভিটেমাটি হারানোর পরিসংখ্যান

ক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবার কি গত এক দশকে কোনো ধরনের প্রথাগত ভূমি বা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে?’ অথবা ‘আপনাদের ঐতিহ্যবাহী জমির কত অংশ এখন বেদখল হয়ে গেছে?’

খ. কেন জরুরি: সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের বড় সংকটগুলোর একটি ভূমি দখল ও উচ্ছেদ। এই প্রশ্ন থাকলে কত মানুষ নিজ ভূমিতে পরবাসী বা ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন, তার একটি ধারণা পাওয়া যেত।

২. অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতি

ক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘কাজ বা নিরাপত্তার খোঁজে আপনার পরিবারের কোনো সদস্য কি পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্য কোনো বড় শহরে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন?’

খ. কেন জরুরি: কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার অভাবে অনেক সাঁওতাল, গারো বা ত্রিপুরা তরুণ-তরুণী নিজ এলাকা ছেড়ে শহরে এসে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। শুধু গ্রামের বাড়ির ঠিকানার ভিত্তিতে তাদের গণনা করা হলে শহরে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা ও দুর্দশার চিত্র আড়ালে থেকে যাবে।

৩. আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা ও দারিদ্র‍্যরে সূচক

ক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবার কি সরকারের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—যেমন বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা শিক্ষাবৃত্তি—পাচ্ছে?’

খ. কেন জরুরি: আদিবাসীদের জন্য জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন বিশেষ বরাদ্দ ও সুযোগ থাকে। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে এসব সহায়তা প্রকৃত প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা কঠিন।

৪. মাতৃভাষার বিলুপ্তি ও সংকট

ক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবারের নতুন প্রজন্মের শিশুরা কি নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পারে?’

খ. কেন জরুরি: বাংলাদেশের অনেক আদিবাসী ভাষা এখন বিলুপ্তির পথে। এ ধরনের তথ্য থাকলে কোন ভাষা সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন এবং কোথায় মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক চালু করা দরকার, তা নির্ধারণ করা সহজ হতো।

আদিবাসী জরিপের প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম তাদের নিজস্ব ভাষায় রেডিও, টেলিভিশন বা লিফলেটের মাধ্যমে করা উচিত ছিল। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জরিপের গুরুত্ব সহজে বুঝতে পারতেন। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের কাছে পৌঁছানো, সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের আস্থা অর্জন—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে আদিবাসী জরিপ কেবল কিছু শুষ্ক সংখ্যার যোগ-বিয়োগ নয়। এটি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, অধিকার ও উন্নয়ন বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ২০২৬ সালের এই বিশেষায়িত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জরিপ যদি সততা, স্বচ্ছতা এবং আদিবাসী সমাজের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে অতীতের পদ্ধতিগত ভুলগুলো অনেকটাই দূর করার সুযোগ তৈরি হবে। রাষ্ট্র যখন তার প্রান্তিক নাগরিকদের সঠিক পরিসংখ্যান সততার সঙ্গে গ্রহণ করবে, তখনই একটি প্রকৃত বৈচিত্র‍্যময় ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: কলামিস্ট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


আদিবাসী জরিপ: যে প্রশ্নগুলো জরুরি

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র‍্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ-২০২৫’ প্রকল্পের আওতায় ১ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই মহাযজ্ঞে যুক্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার গণনাকারী। নিঃসন্দেহে এটি দেশের প্রথম বিশেষায়িত আদিবাসী জরিপ। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাসহ বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে, অন্যদিকে সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জরিপের মাধ্যমে দেশে বসবাসরত আদিবাসীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। এতে পরিবারভিত্তিক বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক নানা সূচক যুক্ত করা হবে। ফলে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা ও দারিদ্র‍্যরে মাত্রা নিরূপণ করা সম্ভব হবে। সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত ও নির্বাচন করাও সহজ হবে।

জরিপের মূল উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য হলো—

ক. স্বতন্ত্র তথ্যভান্ডার: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারভিত্তিক যাবতীয় তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ফুল কাউন্ট’ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা;

খ. সামাজিক সূচক: তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র‍্য ও জনমিতিক পরিস্থিতি নিরূপণ করা;

গ. সুবিধাভোগী নির্বাচন: নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রকৃত উপকারভোগী সঠিকভাবে বাছাই করা।

ইতোপূর্বে জরিপের প্রাক্-পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে—বিশেষত বান্দরবান, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, পঞ্চগড়, নেত্রকোণা, সিলেট ও পটুয়াখালীসহ বেশ কয়েকটি জেলায়। তথ্য সংগ্রহকারীরা প্রধানত জানতে চাইবেন—এলাকার পরিচিতি, নৃগোষ্ঠীর খানা বা পরিবার শনাক্তকরণ, খানার বৈশিষ্ট্য, সদস্যদের তথ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, ১০ বছরের বেশি বয়সী সদস্যদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিদেশে বা পরিবারের বাইরে বসবাসকারী সদস্যদের তথ্য। এছাড়া পরিবারে কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন কি না, কেউ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আছেন কি না, জাতীয় পরিচয়পত্র আছে কি না, সদস্যদের বৈবাহিক অবস্থা, জন্মসনদ আছে কি না, ধর্মীয় পরিচয়, কোনো এনজিওর সহায়তা পেয়েছেন কি না, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় হিসাব আছে কি না, রেমিট্যান্স আসে কি না—এসব তথ্যও সংগ্রহ করা হবে।

সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, দেশের সব শ্রেণি, পেশা ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উন্নয়নের জন্য সঠিক তথ্য প্রয়োজন। পরিসংখ্যান হাতে না থাকলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ কঠিন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার চায় সব বিষয়ে প্রকৃত তথ্য উঠে আসুক। কারণ তথ্য সঠিক না হলে পরিকল্পনাও সঠিক হবে না।

তবে আদিবাসী জরিপ নিয়ে অনেকের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় প্রশ্নমালার কিছু নীতিগত দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে।

নামকরণে জটিলতা: প্রশ্নপত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দের পরিবর্তে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব পরিচয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা সেখানে দেওয়া হয়নি। কারা উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশিকা সাধারণের সামনে দৃশ্যমান নয়।

তালিকার বাইরে থাকা জাতিগোষ্ঠীর সংকট: সরকারি গেজেটে থাকা ৫০টি নামের বাইরে কোনো ছোট বা প্রান্তিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী থাকলে তাদের নাম ওই তালিকায় খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে মূলধারার বাঙালি কিংবা বড় কোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর নামে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের আদমশুমারিতে আদিবাসী হিসেবে উল্লেখিত কয়েকটি নামও বর্তমান গেজেটের বাইরে রয়েছে। এভাবে কোনো জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার বিষয়টি হতাশাজনক।

চা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। কিন্তু তারা প্রধানত ‘চা শ্রমিক’ হিসেবেই পরিচিত। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে কর্মরত অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, প্রায় ১১৬টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একমত হওয়া যায়নি। সাহিত্যে দেখা যায়, জাতি, গোত্র, বংশ, নাম ও পরিচয় মুছে চা-বাগানের শ্রমিকদের একসময় ‘কুলি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে; পরে ‘বাগানি’ এবং এখন ‘চা শ্রমিক’ নামে পরিচিত করা হচ্ছে। জনশুমারিতে তথ্যনির্ভরভাবে এসব জাতিগোষ্ঠীর উপস্থিতি তুলে ধরা জরুরি।

আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় গণনাকারী হিসেবে আদিবাসীদের দায়িত্ব দিলে নামের বানান, পদবি ও উচ্চারণের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। দু-একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর পদবি বাঙালি পদবির মতোই। যেমন, মালপাহাড়িয়াদের পদবি ‘বিশ্বাস’ ও ‘দাস’। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে পরিচয় স্পষ্ট না করলে তাকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুলের কারণে আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সংশোধনের চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে হতাশ হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের প্রয়োজন হয়, যা প্রান্তিক মানুষের জন্য বড় বাধা।

ধর্মের সুনির্দিষ্ট পরিচয় না থাকা: আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ধর্ম বা প্রকৃতিপূজারী বিশ্বাসের পৃথক পরিচয় না থাকায়—যেমন সাঁওতালদের সারনা ধর্ম—তাদের অনেককে ‘অন্যান্য’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এতে তাদের সঠিক ধর্মীয় পরিসংখ্যান আড়ালে থেকে যায়।

মাতৃভাষার প্রশ্নের অনুপস্থিতি: প্রশ্নপত্রে ‘আপনার মাতৃভাষা কী?’ অথবা ‘আপনি কোন ভাষায় কথা বলেন?’—এ ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকা জরুরি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে কতগুলো আদিবাসী ভাষা টিকে আছে এবং কতগুলো বিলুপ্তির পথে, সে বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যভান্ডার তৈরি করা সম্ভব হতো।

একটি আদর্শ, বৈজ্ঞানিক ও অধিকারভিত্তিক আদিবাসী জরিপ করতে হলে বর্তমান সংকট ও বঞ্চনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আদিবাসীদের মতে, বর্তমান জরিপে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হলে তাদের প্রকৃত চিত্র সামনে আসত।

১. ভূমি ও ভিটেমাটি হারানোর পরিসংখ্যান

ক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবার কি গত এক দশকে কোনো ধরনের প্রথাগত ভূমি বা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে?’ অথবা ‘আপনাদের ঐতিহ্যবাহী জমির কত অংশ এখন বেদখল হয়ে গেছে?’

খ. কেন জরুরি: সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের বড় সংকটগুলোর একটি ভূমি দখল ও উচ্ছেদ। এই প্রশ্ন থাকলে কত মানুষ নিজ ভূমিতে পরবাসী বা ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন, তার একটি ধারণা পাওয়া যেত।

২. অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতি

ক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘কাজ বা নিরাপত্তার খোঁজে আপনার পরিবারের কোনো সদস্য কি পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্য কোনো বড় শহরে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন?’

খ. কেন জরুরি: কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার অভাবে অনেক সাঁওতাল, গারো বা ত্রিপুরা তরুণ-তরুণী নিজ এলাকা ছেড়ে শহরে এসে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। শুধু গ্রামের বাড়ির ঠিকানার ভিত্তিতে তাদের গণনা করা হলে শহরে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা ও দুর্দশার চিত্র আড়ালে থেকে যাবে।

৩. আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা ও দারিদ্র‍্যরে সূচক

ক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবার কি সরকারের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—যেমন বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা শিক্ষাবৃত্তি—পাচ্ছে?’

খ. কেন জরুরি: আদিবাসীদের জন্য জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন বিশেষ বরাদ্দ ও সুযোগ থাকে। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে এসব সহায়তা প্রকৃত প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা কঠিন।

৪. মাতৃভাষার বিলুপ্তি ও সংকট

ক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবারের নতুন প্রজন্মের শিশুরা কি নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পারে?’

খ. কেন জরুরি: বাংলাদেশের অনেক আদিবাসী ভাষা এখন বিলুপ্তির পথে। এ ধরনের তথ্য থাকলে কোন ভাষা সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন এবং কোথায় মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক চালু করা দরকার, তা নির্ধারণ করা সহজ হতো।

আদিবাসী জরিপের প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম তাদের নিজস্ব ভাষায় রেডিও, টেলিভিশন বা লিফলেটের মাধ্যমে করা উচিত ছিল। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জরিপের গুরুত্ব সহজে বুঝতে পারতেন। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের কাছে পৌঁছানো, সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের আস্থা অর্জন—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে আদিবাসী জরিপ কেবল কিছু শুষ্ক সংখ্যার যোগ-বিয়োগ নয়। এটি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, অধিকার ও উন্নয়ন বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ২০২৬ সালের এই বিশেষায়িত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জরিপ যদি সততা, স্বচ্ছতা এবং আদিবাসী সমাজের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে অতীতের পদ্ধতিগত ভুলগুলো অনেকটাই দূর করার সুযোগ তৈরি হবে। রাষ্ট্র যখন তার প্রান্তিক নাগরিকদের সঠিক পরিসংখ্যান সততার সঙ্গে গ্রহণ করবে, তখনই একটি প্রকৃত বৈচিত্র‍্যময় ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: কলামিস্ট]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত