সংবাদ

সুচ-সুতার ছোঁয়ায় বছরে আসছে ৫০ কোটি টাকা


প্রতিনিধি, শেরপুর (বগুড়া)
প্রতিনিধি, শেরপুর (বগুড়া)
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫০ এএম

 সুচ-সুতার ছোঁয়ায় বছরে আসছে ৫০ কোটি টাকা
বগুড়ার শেরপুর ও ধুনটে গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে জালি টুপি বুনে স্বাবলম্বী হচ্ছেন প্রায় ৫ লাখ নারী। ছবি : সংবাদ

বগুড়ার শেরপুর ও ধুনট উপজেলার গ্রামীণ নারীরা সংসারের কাজের ফাঁকে ক্রুশকাঠি আর চিকন সুতা দিয়ে নিপুণ হাতে জালি টুপি তৈরি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও এই টুপি এক বিশাল স্থান দখল করে নিয়েছে, যার বর্তমান বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এটি রপ্তানি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই টুপি রপ্তানি থেকে বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে।

এই সম্ভাবনার সূচনা ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকারী বন্যার পর। কাজ না থাকায় বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে মানুষ যখন হন্যে হয়ে চেষ্টা করছিল, ঠিক তখন শেরপুরের চকমাকড়ানী গ্রামের ওয়াজেদা বেগমের হাতে একটি সুতার টুপি ও ক্রুশকাঠি তুলে দেন তার স্বামী আজহার আলী। চেষ্টা চালাতে গিয়ে বছর দুয়েকের মধ্যে হস্তশিল্পটিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন ওয়াজেদা। এরপর অন্য নারীদেরও তিনি সুচ-সুতার এই কাজ শেখাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে পুরো গ্রামজুড়ে শুরু হয় জালি টুপি তৈরির কর্মযজ্ঞ। ওয়াজেদা ও তার সঙ্গীরা কেবল নিজেদের দারিদ্র্যই জয় করেননি, বরং সুঘাট ইউনিয়নের চকধলী ও চকমাকড়ানী গ্রামের শত শত নারীকে স্বচ্ছলতার পথ দেখিয়েছেন।


বগুড়া জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের এই দুই গ্রাম থেকে শুরু হওয়া টুপিশিল্পের বিস্তার এখন ছড়িয়ে পড়েছে শেরপুর, ধুনট, শাহজাহানপুর, শিবগঞ্জ ও বগুড়া সদরের গ্রামে গ্রামে। বর্তমানে শেরপুরের কাশিয়াবালা, তালপুকুরিয়া, ভাটারাসহ অন্তত ৩০টি গ্রামের প্রায় ৫ লাখ নারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। গৃহিণীদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাদের পড়াশোনার খরচ চালাতে টুপি বুুনছেন। এতে একেকজন মাসে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় করছেন।

টুপিশিল্পকে ঘিরে এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত কারখানা, সুতা তৈরি ও ধোলাই কারখানা। বর্তমানে এই জালি টুপি সৌদি আরব, পাকিস্তান, দুবাই, কাতার ও ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাইকারি বাজারে এখানকার টুপির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ৭৫ টাকার এক ববিন সুতা দিয়ে গড়ে ১২টি টুপি তৈরি করা সম্ভব, যা বাজারে প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। শিক্ষার্থীরা দিনে একটি করে টুপি বুনে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। আগে যে সুতার ববিন ৬০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন ৭৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ জালি টুপি ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জুয়েল আকন্দ জানান, প্রতি বছর টুপি রপ্তানি করে ৫০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে। করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে ওঠার পর বিশেষ করে 'তাহফিজ' টুপির প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়েছে। তবে এই শিল্পে সরকারি কোনো অনুদান বা সহযোগিতা মেলেনি। সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা জরুরি বলে দাবি জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


সুচ-সুতার ছোঁয়ায় বছরে আসছে ৫০ কোটি টাকা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বগুড়ার শেরপুর ও ধুনট উপজেলার গ্রামীণ নারীরা সংসারের কাজের ফাঁকে ক্রুশকাঠি আর চিকন সুতা দিয়ে নিপুণ হাতে জালি টুপি তৈরি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও এই টুপি এক বিশাল স্থান দখল করে নিয়েছে, যার বর্তমান বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এটি রপ্তানি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই টুপি রপ্তানি থেকে বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে।

এই সম্ভাবনার সূচনা ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকারী বন্যার পর। কাজ না থাকায় বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে মানুষ যখন হন্যে হয়ে চেষ্টা করছিল, ঠিক তখন শেরপুরের চকমাকড়ানী গ্রামের ওয়াজেদা বেগমের হাতে একটি সুতার টুপি ও ক্রুশকাঠি তুলে দেন তার স্বামী আজহার আলী। চেষ্টা চালাতে গিয়ে বছর দুয়েকের মধ্যে হস্তশিল্পটিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন ওয়াজেদা। এরপর অন্য নারীদেরও তিনি সুচ-সুতার এই কাজ শেখাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে পুরো গ্রামজুড়ে শুরু হয় জালি টুপি তৈরির কর্মযজ্ঞ। ওয়াজেদা ও তার সঙ্গীরা কেবল নিজেদের দারিদ্র্যই জয় করেননি, বরং সুঘাট ইউনিয়নের চকধলী ও চকমাকড়ানী গ্রামের শত শত নারীকে স্বচ্ছলতার পথ দেখিয়েছেন।


বগুড়া জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের এই দুই গ্রাম থেকে শুরু হওয়া টুপিশিল্পের বিস্তার এখন ছড়িয়ে পড়েছে শেরপুর, ধুনট, শাহজাহানপুর, শিবগঞ্জ ও বগুড়া সদরের গ্রামে গ্রামে। বর্তমানে শেরপুরের কাশিয়াবালা, তালপুকুরিয়া, ভাটারাসহ অন্তত ৩০টি গ্রামের প্রায় ৫ লাখ নারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। গৃহিণীদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাদের পড়াশোনার খরচ চালাতে টুপি বুুনছেন। এতে একেকজন মাসে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় করছেন।

টুপিশিল্পকে ঘিরে এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত কারখানা, সুতা তৈরি ও ধোলাই কারখানা। বর্তমানে এই জালি টুপি সৌদি আরব, পাকিস্তান, দুবাই, কাতার ও ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাইকারি বাজারে এখানকার টুপির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ৭৫ টাকার এক ববিন সুতা দিয়ে গড়ে ১২টি টুপি তৈরি করা সম্ভব, যা বাজারে প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। শিক্ষার্থীরা দিনে একটি করে টুপি বুনে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। আগে যে সুতার ববিন ৬০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন ৭৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ জালি টুপি ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জুয়েল আকন্দ জানান, প্রতি বছর টুপি রপ্তানি করে ৫০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে। করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে ওঠার পর বিশেষ করে 'তাহফিজ' টুপির প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়েছে। তবে এই শিল্পে সরকারি কোনো অনুদান বা সহযোগিতা মেলেনি। সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা জরুরি বলে দাবি জানান তিনি।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত